নরসিংদীতে শিশুর পা মুচড়ে দেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, পারিবারিক দ্বন্দ্বে শিশুর ওপর নৃশংসতা কেন?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
পারিবারিক কলহের জের ধরে নরসিংদীতে তিন মাস বয়সী একটি শিশুর বাম পা মুচড়ে দিচ্ছেন এক নারী, এমন একটি ঘটনার ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা চলছে।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি কক্ষে এক নারী বিছানার ওপর শোয়া শিশুটির গায়ের কাপড় সরিয়ে বাম পা বের করে মুচড়ে দিচ্ছেন। এরপর এদিক-সেদিক তাকিয়ে সাথে সাথেই ওই কক্ষ ছেড়ে চলে যান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে খোঁজ নিতে ঘটনাস্থলে যান।
এগারো জুলাইয়ের এই ঘটনাটি নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদীতে।
নরসিংদীর মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানান, ওই নারী ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন।
একইসঙ্গে, এই ঘটনায় ওই নারীর বাবা ও স্বামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এক থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে নয়টিই প্রতি মাসে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়।
২০২৪ সালের ২৩ শে জুন এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি।
সমাজ অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের নরসিংদীর ওই ঘটনা নতুন কোনো ঘটনা নয়।
পরিবারের বড় সদস্যদের মধ্যে থাকা শত্রুতা, দূরত্ব, দ্বন্দ্ব, পারিবারিক মনোমালিন্য, কথা কাটাকাটির জের ধরে শিশুর ওপরে প্রতিশোধ নেওয়া বাংলাদেশে রয়েছে, সেটি ইউনিসেফের ওই প্রতিবেদনেই প্রতিফলিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলছেন, "বড়দের সাথে বড়দের যখন কোন শত্রুতা, মনোমালিন্য তৈরি হয় এবং একজন আরেকজনের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে না, তখন তারা একে অপরের দুর্বল ও আবেগের জায়গা অনুসন্ধান করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা দেখি যে, শিশুর ওপরই প্রতিশোধ গ্রহণ করে ওই ব্যক্তিকে শিক্ষা দিতে চায়।"
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ

ছবির উৎস, Getty Images
নরসিংদীতে শিশুটির সাথে ঠিক কী ঘটেছিল?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ভিডিওটিতে দেখা যায়, নরসিংদীর মাধবদীর ভুক্তভোগী শিশুটি মায়ের পাশে বিছানায় শুয়ে আছে।
একপর্যায়ে মা উঠে গেলে, একজন নারী ওই কক্ষে প্রবেশ করে কাঁথা সরিয়ে তার বাম পা বের করে মুচড়ে ধরেন। অল্প কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি বের হয়ে যান। শিশুটি চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে।
যে নারীকে শিশুর পায়ে আঘাত করতে দেখা যাচ্ছে, তিনি শিশুটির চাচী বলে জানা গেছে।
শিশুটির মা গণমাধ্যমে বলেছেন, "আমাদের দুই জায়ের মধ্যে একটু ঝগড়া হইছিল ওইদিন। ওই রাগে একটু করছিল হয়তো, কথা কাটাকাটি হয়েছে।"
নরসিংদীর মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মো. কামাল হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানান, এই পরিবারটি একান্নবর্তী পরিবার। এখনো তারা ভাইয়েরা একসাথে ব্যবসা করেন এবং একই বাড়িতে একই হাঁড়িতে রান্না হয়।
এই পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, শিশুটির জন্মের পর থেকে প্রায় তিন মাসই অসুস্থ বলে হাসপাতালেই বেশি থাকতে হয়েছে।
"প্রাথমিকভাবে জানতে পারছি বাচ্চাটা যখন ভূমিষ্ট হইছে, তখনই বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে ভর্তি হয় হাসপাতালে, জন্মের পর থেকে ২১ দিন টানা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের আইসিউতে ছিল। বিভিন্ন সময় বাড়িতে নিয়ে আসলেও তাকে আবারও হসপিটালে নেওয়া হয়। প্রায় তিন মাস বয়স বাচ্চার, প্রায় দুই-আড়াই মাসের মত সে হসপিটালেই থাকে" বলেন মি. হোসেন।
তিনি জানান, একান্নবর্তী পরিবারে এখনও দুই ভাইয়ের আয়ের উৎস এক হওয়ায় সেখান থেকেই চিকিৎসার এই খরচ বহন করতে হয়েছে।
এছাড়া অসুস্থ শিশুটিকে নিয়ে তার মা বেশিরভাগ সময়ই হাসপাতালে থাকায় সংসারের কাজের চাপ একজনের ওপরই পড়েছে।
আর এটি নিয়েই দুই জায়ে কথা কাটাকাটি হয়।
মাধবদী থানার ওসি মো. কামাল হোসেন বলেন, "একান্নবর্তী পরিবার, এই টাকাটা দুই ভাইয়ের আয় থেকেই গেছে। ভিকটিমের মা দুই মাস ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত, সংসারের কোনো কাজই সহায়তা করতে পারে না। এটা নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি, ঝগড়া হইছে। এই সকল কারণে এই বাচ্চাটাকে স্বেচ্ছাকৃতভাবে সে আঘাত করতো। একটা ক্রুয়েলটি কাজ করছে তার ভিতর।"
এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শিশুটির মা ওই ঘটনার একটি ভিডিও গোপনে ধারণ করেছিল। পরে সেটি অভিযুক্ত নারীর স্বামী কাওসার হককে দিলে তারা তথ্য গোপন করার জন্য মোবাইল থেকে ডিলিট বা মুছে ফেলেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভিডিওটি দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে যান বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা মি. হোসেন।
"আমরা মোবাইলটা জব্দ করছি, প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভিডিওটা ডিলিট বা প্রপার্টিতে ওইটা নাই। আমরা ফরেনসিক করার জন্য জব্দ করছি। এই আলামত বা তথ্য গোপন করার জন্য তারা পরস্পর যোগসাজসে এটা করছে তাদের বিরুদ্ধে প্যানাল কোডের ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে" বলেন মাধবদী থানার ওসি।
পরিবারটি এই ঘটনায় মামলা করতে চায়নি, ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন বলেন, "একান্নবর্তী পরিবারে একসাথে বড় ভাই, ছোট ভাই ভাত খায়, কিভাবে মামলা করবে। তারাতো বলে কিছুই হয় নাই, এআই দিয়ে এগুলা করা হয়েছে। এটা একটা সামাজিক অপরাধ, শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা হয়েছে। এটা আরো বিস্তার লাভ করবে ধামাচাপা পড়ে গেলে, এ কারণেই সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে।"
তিনি জানান, পরে বিষয়টি স্থানীয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে পরে জেলা প্রবেশন কর্মকর্তা রিজা আক্তার তিনজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
এই ঘটনায় অভিযুক্ত নারী পলাতক, তবে ওই নারীর স্বামীসহ দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তাদেরকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদনের শুনানি হবে আগামী রোববার।
মাধবদী থানার ওসি মি. হোসেন বলেন, "মামলা করা হয়েছে ২০১৩ সালের শিশু আইনের সত্তর ধারায় স্বেচ্ছাকৃতভাবে শিশুকে আঘাত করা, পা মুচড়ে দেওয়ার বিষয়টিতে। আর যে মোবাইল দিয়ে ভিকটিম শিশুটির মা ভিডিও ধারণ করেছিল, সেই ধারণকৃত ভিডিও সে তার ভাসুরকে পাঠাইছিল। সে আর তার শ্বশুর আইসা দেখে তথ্য গোপন করার জন্য ডিলিট করে দেয়।"
মাধবদী থানার ওসি মো. কামাল হোসেন জানান, শিশুটির শারীরিক অবস্থা এবং যে পায়ে আঘাত পেয়েছে কিনা সেটি পরীক্ষার জন্য মেডিকেল টেস্ট করানো হয়েছে। তবে এখনও প্রতিবেদন পাননি তিনি।
এদিকে, নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ফরিদা গুলশানারা কবির জানান, ওই ঘটনার জন্য শিশুটির পায়ে এক্সরে করা হয়েছে। আঘাতের কারণে শিশুটির পায়ে 'কোনো ইনজুরি বা ক্ষত' পাওয়া যায়নি।
"আমরা তাকে শারীরিকভাবে পরীক্ষা করেছি এবং পায়ের এক্সরেও দিয়েছি। যে ঘটনা ঘটেছে সেই ঘটনার সাথে রিলেট কোন ইনজুরি আছে এরকম কিছু পাইনি" বলেন মিজ কবির।
শিশুটির আঘাতপ্রাপ্ত পায়ের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "কিছুটা অবশ্যই ব্যথা পেয়েছে তবে আমাদের কাছে যখন আসলো তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোন ইনজুরি পাইনি।"
কিন্তু, শিশুটি জন্মগতভাবেই কিছু সমস্যায় ভুগছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "সেই রিলেটেড কিছু সমস্যা আমাদের কাছে উঠে এসেছে এবং যে চিকিৎসা দরকার আমরা তাকে সেই চিকিৎসা করবো। বাচ্চাটি এই মুহূর্তে ভালো আছে কিন্তু তার জন্মগত যে সমস্যাগুলার চিকিৎসা তা সময়মতো করবো।"

ছবির উৎস, Getty Images
অপরাধ বিশ্লেষকরা যা বলছেন
এই লেখার শুরুতেই ইউনিসেফের যে প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪০ কোটি শিশু বা এই বয়সীদের মধ্যে প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে ছয় শিশু নিয়মিত বাসায় শারীরিক আঘাত বা শারীরিক শাস্তি সহ্য করে।"
"তাদের মধ্যে ৩৩ কোটির মতো শিশুকে শারীরিকভাবে শাস্তি দেওয়া হয়ে থাকে" বলে ইউনিসেফের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি বলছে, "শিশু অধিকার সনদ এর ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর বিকাশ এবং সুস্থতার নিশ্চয়তা দেয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলছেন, এমনও অনেক সময় দেখা যায়, পারিবারিক কলহের জের ধরে নিজের সন্তানকে হত্যা করে যার সাথে বিরোধ তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে প্রতিশোধ নেয়া হয়।
সমাজ ও ব্যক্তির সম্পর্ককেন্দ্রিক মনস্তত্ত্বগত জায়গা থেকে দেখলে এটি মানবিকতা বহির্ভূত মনস্তত্ত্ব হলেও এটিকে অপরাধমূলক ঘটনা হিসেবেই গণ্য করতে হবে বলে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অধ্যাপক হক বলেন, "মানবিকতা বহির্ভূত এক ধরনের মনস্তত্ত্ব ওই নারীর মাঝে কাজ করেছে। এটা অনেকের মধ্যেই আছে। এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যখন তিনি কাউকে আক্রমণ করা, হাত-পা ভাঙা অথবা জীবন বিনাশকারী আচরণ করবেন, সেটাকে অপরাধমূলক মনস্তত্ত্ব হিসেবে গণ্য করেই পরিবার মামলা না করলেও রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মামলা করতে হবে।"
তবে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা এসব ঘটনাকে ত্বরান্বিত করে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই বিশ্লেষক।
সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, "দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে না পারলে এসব ঘটনার প্রভাবে হারিয়ে যায়। এবং এই ধরনের মনস্তত্ত্বের ব্যক্তি সেটা নারী কিংবা পুরুষ, তাদের সামনে সতর্ক হওয়ার বা আইনের ভয়ে ভালো আচরণ করার কোন দৃষ্টান্ত সহজে আমরা তৈরি করতে পারি না। ফলে ভিন্ন ভিন্ন পরিবারে বা পরিবেশে বারবার তারা এমন ঘটনা সংঘটিত করে থাকে।"
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের শিশু আইনের যেসব ধারায় নরসিংদীর ঘটনায় মামলা করা হয়েছে, তাতে শিশুকে আঘাত করার শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।








