তুরস্কে কয়েক ঘণ্টার একটি অভ্যুত্থানচেষ্টা যেভাবে পাল্টে দিয়েছে পুরো দেশকে

অভ্যুত্থানচেষ্টায় জড়িত সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করার পর প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ানের সমর্থকেরা ইস্তানবুলের বসফরাস সেতুতে একটি সেনা ট্যাংক দখল করে তুরস্কের পতাকা নাড়ছেন
ছবির ক্যাপশান, অভ্যুত্থানচেষ্টাটি মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল, কিন্তু এর পরিণতি গত এক দশকে তুর্কি রাজনীতিকে পুনর্গঠন করেছে
    • Author, বিবিসি নিউজ টার্কিশ
  • Published
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

রাস্তায় গোলাগুলি, চলমান ট্যাংক, সরকারি ভবনের ওপর নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া যুদ্ধবিমান, সংসদ ভবনে হামলা – সবকিছুই সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল টেলিভিশনে।

তিনটি সামরিক অভ্যুত্থান এবং আরও দুটি সামরিক হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা থাকা একটি দেশের জন্যও ২০১৬ সালের ১৫ই জুলাইয়ের রাতটি ছিল নজিরবিহীন।

এর আগে কখনও তুরস্কের সংসদ ভবন হামলার শিকার হয়নি এবং ইস্তানবুলের বসফরাস সেতু, যা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ১৫ই জুলাই শহীদ সেতু নামে পরিচিত, কখনও এমন রক্তপাতের সাক্ষী হয়নি।

প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ানের আহ্বানে সাধারণ মানুষ অভ্যুত্থানকারীদের প্রতিরোধে নেমে এসেছিল।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান ২০১৬ সালের ১৬ই জুলাই ভোরে ইস্তানবুলে ফেসটাইম কলের মাধ্যমে সিএনএন টুর্ক-এ কথা বলছেন।
ছবির ক্যাপশান, অভ্যুত্থানচেষ্টার রাতের অন্যতম প্রতীকী দৃশ্যে পরিণত হয়েছিল অজ্ঞাত স্থান থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সরাসরি উপস্থিতি

অজ্ঞাত একটি স্থান থেকে মোবাইল ফোন অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে সরাসরি একজন টেলিভিশন উপস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে এরদোয়ান সেদিন রাতে তার সমর্থকদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানান।

সারা দেশের মসজিদগুলোও তাদের লাউডস্পিকারের মাধ্যমে তার বার্তা প্রচার করে।

সকালের মধ্যেই অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হয়। মোট ২৫৩ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১৮৪ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। এছাড়া কথিত ৩৪ জন ষড়যন্ত্রকারীও নিহত হন।

২০১৬ সালের ১৫ই জুলাই হেলিকপ্টার হামলার পর তুরস্কের সংসদ ভবনের ভেতরের ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করছেন এক ব্যক্তি। দেয়ালে বড় একটি গর্ত দেখা যাচ্ছে এবং ভাঙা জানালা, কাচ ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে।
ছবির ক্যাপশান, তুরস্কে সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এর আগে কখনও সংসদ ভবন সরাসরি হামলার মুখে পড়েনি

অভ্যুত্থানচেষ্টাটি মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল, কিন্তু এর পরিণতি গত এক দশকে তুর্কি রাজনীতিকে পুনর্গঠন করেছে।

এতে দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে এবং বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে নির্ধারিত হয়েছে।

ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান

সরকার তখন দাবি করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইসলামপন্থি ধর্মগুরু ফেতুল্লাহ গুলেনের নেটওয়ার্ক এই অভ্যুত্থানচেষ্টার পরিকল্পনা করেছিল।

২০২৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গুলেন এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অভ্যুত্থানচেষ্টার কয়েকদিন পর জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, যা ২০১৮ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল এবং সাতবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল।

সেই সময়ে কর্তৃপক্ষ তুরস্কের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শুদ্ধি অভিযানের একটি পরিচালনা করে।

সরকার বলেছিল, গুলেন নেটওয়ার্ককে ভেঙে দিতে এসব ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল।

২০১৩ সালের ৩০শে ডিসেম্বর ইস্তানবুলে সরকারের বিরুদ্ধে একটি বিক্ষোভে একজন তুর্কি বিক্ষোভকারী রেচেপ তাইপ এরদোয়ান ও ফেতুল্লাহ গুলেনের ছবি সম্বলিত ব্যানার ধরে আছেন।
ছবির ক্যাপশান, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এবং ইসলামপন্থি ধর্মগুরু ফেতুল্লাহ গুলেন কয়েক দশক ধরে ঘনিষ্ঠ মিত্র থাকার পর ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হন

একসময় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন গুলেন। তার ধর্মীয় আন্দোলনের সদস্যরা কয়েক দশক ধরে তুর্কি রাষ্ট্র ও আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।

অভ্যুত্থানচেষ্টার পর হাজার হাজার সেনাসদস্য, যার মধ্যে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও জেনারেলও ছিলেন, বিচারক, প্রসিকিউটর বা আইনজীবী, পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও সরকারি কর্মচারীদের গ্রেফতার, বরখাস্ত বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

গুলেন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ থাকা শত শত বেসরকারি স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়, পাশাপাশি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ হয়।

সমালোচকদের দাবি, এই দমন অভিযান শুধু কথিত অভ্যুত্থানকারী ও গুলেনপন্থিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আরও বিস্তৃতভাবে ভিন্নমত দমনেও ব্যবহৃত হয়।

বিরোধী রাজনীতিকদের অভিযোগ, শুদ্ধি অভিযানের পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্য কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

তবে সরকারি কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।

এরদোয়ানের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ

অনেকের মতে, অভ্যুত্থানচেষ্টার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের হাতে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হওয়া।

২০১৮ সালের ১৫ই জুলাই ইস্তানবুলে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১৫ই জুলাই শহীদ সেতুতে জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান
ছবির ক্যাপশান, সমালোচকদের মতে, অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পর আনা পরিবর্তনগুলো একজন ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছে
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

২০১৭ সালে ভোটাররা অল্প ব্যবধানে এমন সাংবিধানিক পরিবর্তনের পক্ষে মত দেন, যার মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা বাদ দিয়ে শক্তিশালী নির্বাহী রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়।

পরের বছর এসব পরিবর্তন কার্যকর হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করা হয় এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানো হয়।

সমর্থকদের মতে, নতুন ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আরও কার্যকর শাসন নিশ্চিত করেছে।

অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এতে প্রেসিডেন্টের হাতে, বিশেষ করে একজন ব্যক্তির চারপাশে, অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ফ্রিডম হাউজ বলছে, রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার অধীনে নীতিনির্ধারণে আইনপ্রণেতাদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে।

তুরস্ক নিয়ে তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "(মি. এরদোয়ান) প্রায়ই মন্ত্রণালয় এবং স্বাধীন সরকারি সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেন, যখন তারা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়।"

ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক দোগান চেতিনকায়াও এ মূল্যায়নের সঙ্গে একমত।

তার মতে, প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা "খামখেয়ালিপনা এবং অস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো" দ্বারা চিহ্নিত।

কর্তৃত্ববাদ নিয়ে উদ্বেগ

তুরস্ক সরকার বহু বছর ধরেই মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে সমালোচনার মুখে ছিল। তবে অভ্যুত্থানচেষ্টা এবং পরবর্তী শুদ্ধি অভিযানের পর সেই উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।

২০১৬ সালের ৩০শে অগাস্ট বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে আঙ্কারার আতাতুর্ক সমাধিসৌধের সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। পেছনে সরকারি কর্মকর্তারা। আর সামনে দুই জন সামরিক সদস্য তুরস্কের পতাকার রংয়ের একটি পুষ্পস্তবক বহন করছেন।
ছবির ক্যাপশান, "গত এক দশকে তুরস্ক ক্রমেই আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে," বলছে ফ্রিডম হাউজ

গুলেন আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে হাজার হাজার বিচারক ও প্রসিকিউটরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর মানবাধিকার সংগঠন ও ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

অধ্যাপক চেতিনকায়া বলেন, "১৫ই জুলাইয়ের পর তুরস্কের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে ফেলা হয় এবং তারা তাদের স্বায়ত্তশাসন হারায়।"

"বিচার বিভাগ এবং আইনসভা আর অর্থবহ ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেনি।"

২০২৫ সালের মার্চে ইস্তানবুলে গ্রেফতার হওয়া মেয়রের সমর্থনে আয়োজিত এক সমাবেশে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করছে তুর্কি দাঙ্গা পুলিশ।
ছবির ক্যাপশান, তুরস্কে বিক্ষোভ ও জনসমাবেশে পুলিশের ব্যাপক হস্তক্ষেপ নিয়ে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছে

এর পর থেকে জনসমাবেশ আয়োজন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। কর্তৃপক্ষ প্রায়ই সমাবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করছে এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোতায়েন করছে।

গণমাধ্যমের মালিকানার ওপর সরকারের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং বিশিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার কারণে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও দুর্বল হয়েছে।

২০২৬ সালের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে তুরস্কের অবস্থান ১৬৩তম।

দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে।

সম্প্রতি একজন জনপ্রিয় স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান প্রেসিডেন্টকে অপমানের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি সাংবাদিক, রাজনীতিক ও জনপরিচিত ব্যক্তিদের সেই দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

"গত এক দশকে তুরস্ক সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, স্বাধীন সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের সদস্যদের কারাবন্দি করার মাধ্যমে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে," বলছে ফ্রিডম হাউজ।

২০২৩ সালের মে মাসে একটি জনসমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন ইস্তানবুলের মেয়র একরেম ইমামোগলু; তিনি মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে জনতার উদ্দেশে কথা বলছেন।
ছবির ক্যাপশান, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা একরেম ইমামোগলুর জন্য ২,৪০০ বছরেরও বেশি কারাদণ্ড চেয়েছেন

ইস্তানবুলের মেয়র একরেম ইমামোগলু, যাকে ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোয়ানের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকেই, ২০২৫ সালের মার্চে দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

তার সঙ্গে আরও কয়েক ডজন পৌর কর্মকর্তা গ্রেফতার হন। যদিও তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বিচারপ্রক্রিয়া এখনো চলছে।

২০২৬ সালের মে মাসে একটি আদালতের আদেশ কার্যত তার দল, প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি-এর নেতৃত্বে হস্তক্ষেপ করে এবং বর্তমান নেতার পরিবর্তে একজন সাবেক নেতাকে দায়িত্ব দেয়। বিরোধীরা এ ঘটনাকে "বিচারিক অভ্যুত্থান" হিসেবে বর্ণনা করেন।

তবে সরকার গণতান্ত্রের যাত্রা পিছিয়ে দেওয়া সংক্রান্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।

সরকারের বক্তব্য হলো, অভ্যুত্থানচেষ্টা এবং পরবর্তী শুদ্ধি অভিযানের পর গৃহীত পরিবর্তনগুলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করেছে। কারণ এগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি বলে বিবেচিত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অপসারণ করা হয়েছে।

ইয়িলদিরিম বেয়াজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নুরি সালিক বলেন, "বর্তমান ব্যবস্থাকে আমি অভ্যুত্থানচেষ্টার মাধ্যমে উন্মোচিত অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রের গড়ে তোলা একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখি।"

"আমি এটিকে শুধু কর্তৃত্ববাদের দিকে অগ্রসর হওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে দেখি না; বরং রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার প্রবৃত্তিরই একটি সম্প্রসারণ হিসেবে দেখি।"

সামরিক বাহিনীর ভূমিকার অবসান

দশকের পর দশক ধরে তুর্কি সামরিক বাহিনী নিজেদের মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক প্রতিষ্ঠিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের অভিভাবক হিসেবে দেখেছে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বারবার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে।

২০১৬ সালের অভ্যুত্থানচেষ্টার পর ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীকে দৃঢ়ভাবে বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে আনা হয়।

২০১৬ সালের ১৬ই জুলাই ইস্তানবুলের বসফরাস সেতুতে আত্মসমর্পণকারী অভ্যুত্থানকারী সৈন্যদের ফেলে যাওয়া পোশাক ও অস্ত্র মাটিতে পড়ে আছে।
ছবির ক্যাপশান, অনেক বিশ্লেষকের মতে, গত এক দশকে আনা পরিবর্তনগুলো কার্যত তুর্কি রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের যুগের অবসান ঘটিয়েছে

নিয়োগ ও নেতৃত্বে নতুন কাঠামো চালু করা হয়। সামরিক একাডেমি ও হাসপাতালগুলো পুনর্গঠিত বা বন্ধ করা হয় এবং সামরিক ইউনিটগুলোকে শহরকেন্দ্রের বাইরে সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়।

অনেক বিশ্লেষকের বিশ্বাস, এসব পরিবর্তন কার্যত তুর্কি রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের যুগের অবসান ঘটিয়েছে।

অধ্যাপক সালিক বলেন, "সেনাবাহিনী সবসময় রাজনীতির ওপর অভিভাবকত্বের একটি ব্যবস্থা হিসেবে বিদ্যমান ছিল।"

"আধুনিক তুর্কি ইতিহাসে (১৫ই জুলাই) প্রথমবারের মতো মানুষ সক্রিয়ভাবে একটি সামরিক হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করেছে। সে অর্থে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদল।"

তার বিশ্বাস, তুর্কি রাজনীতি গভীরভাবে প্রভাবিত করার সক্ষমতা সামরিক বাহিনী এখন "সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছে"।

তিনি বলেন, "এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।"

নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতি

অভ্যুত্থানচেষ্টার পর তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।

পরবর্তী মাস ও বছরগুলোতে আঙ্কারা উত্তর সিরিয়ায় তিনটি বড় সীমান্তপার সামরিক অভিযান চালায়, যার লক্ষ্য ছিল ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠী এবং পিপলস প্রোটেকশন ইউনিট (ওয়াইপিজি)।

২০১৮ সালের ২১শে জানুয়ারি তুরস্কের হাতায় প্রদেশের হাসা শহরের কাছে সিরীয় সীমান্ত সংলগ্ন পিপলস প্রোটেকশন ইউনিটস (ওয়াইপিজি)-এর অবস্থান লক্ষ্য করে তুর্কি কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়। এদিকে, কুর্দি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করতে সম্প্রতি তুরস্কের স্থলবাহিনী সিরিয়ায় প্রবেশ করেছে এবং এর আপাত প্রতিশোধ হিসেবে একটি সীমান্ত শহরে রকেট হামলা চালানো হয়েছে।
ছবির ক্যাপশান, আঙ্কারা উত্তর সিরিয়ায় ওয়াইপিজি-নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে, পাশাপাশি পিকেকে-র সঙ্গে একটি পুনরুজ্জীবিত শান্তি প্রক্রিয়াও চালিয়ে যাচ্ছে

তুরস্ক ওয়াইপিজি-কে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মনে করে। পিকেকে-কে তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিকেকে-এর সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ দেখা গেছে, যদিও অগ্রগতি এখনো অনিশ্চিত।

অধ্যাপক সালিকের মতে, ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা তুর্কি রাষ্ট্রের ভেতরে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও শক্তিশালী করেছে।

তিনি বলেন, "রাষ্ট্রের সুরক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছিল।"

২০২৬ সালের ৭ই জুলাই আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে বেসতেপে প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদে আনুষ্ঠানিক আগমনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হাঁটছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান
ছবির ক্যাপশান, নেটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে আঙ্কারায় পৌঁছালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এক জমকালো আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানো হয়

একই সময়ে, নেটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে আরও বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে।

রাশিয়ান এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তুরস্ককে এফ-থার্টিফাইফ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেয়।

তবে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবেন এবং এফ-থার্টিফাইফ বিক্রির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদিও এমন কোনো পদক্ষেপ কংগ্রেসে উল্লেখযোগ্য বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার জন্য তুরস্কের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় খুব কম অগ্রগতি হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে অন্তর্ভুক্তি-সংক্রান্ত আলোচনা কার্যত স্থগিত রয়েছে।