প্রশ্ন ফাঁস ও অনলাইনে শেয়ারসহ পরীক্ষায় কী কী করলে শাস্তি হবে

বাংলাদেশে পাবলিক পরীক্ষায় বিপুল সংখ্যক পরিক্ষার্থী অংশ নিয়ে থাকে

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে পাবলিক পরীক্ষায় বিপুল সংখ্যক পরিক্ষার্থী অংশ নিয়ে থাকে
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশে শিক্ষা বোর্ডগুলোর অধীনে হওয়া পাবলিক পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের জন্য শাস্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবর্তন এনে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) অ্যাক্ট, ২০২৬।

মূলত দেশের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন ফাঁস ও জাল সার্টিফিকেট তৈরিসহ নানা ধরনের অপরাধ মোকাবিলার জন্য ১৯৮০ সালে যে আইন করা হয়েছিল সেই আইনে কিছু পরিবর্তন এনে নতুন এই আইন সংসদে পাশ করা হলো।

যদিও আইনটিতে ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন ও ডিজিটাল কারসাজিকে কারাদণ্ড ও জরিমানার আওতায় আনা হলেও কিছু ক্ষেত্রে সাজার মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ কমানো হয়েছে।

"ডিজিটাল ক্রাইম বেড়েছে বলে সংশোধন করা হয়েছে। সাজার মেয়াদ কিছুটা কমানো হয়েছে সত্য, কিন্তু সবকিছু সুনিপুণভাবে বিবেচনা করে আইনটিতে রাখা হয়েছে," সংসদে বিলটি পাশের প্রস্তাব করে বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

এর আগে গত ২৮শে জুন বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়েছিল। তখন বিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল, "পাবলিক পরীক্ষাসমূহে সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং ডিজিটাল পদ্ধতি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরীক্ষা সংক্রান্ত অপরাধসমূহ এবং এর দণ্ড আইনের আওতায় আনয়নের উদ্দেশ্যে বিদ্যমান আইনের সংশোধন জরুরি ভিত্তিতে আবশ্যক"।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায় থেকে শুরু করে, বিসিএস বা চাকরির অন্যান্য পরীক্ষা, এমনকি দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রশ্নও ফাঁস হওয়ার নজির আছে। তবে এই আইনটি বলবৎ হবে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুষ্ঠিত, পরিচালিত, নিয়ন্ত্রিত কিংবা সংগঠিত হয় বা হতে পারে এইরূপ যেকোনো পরীক্ষার ক্ষেত্রে।

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার দৃশ্য

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার দৃশ্য, ফাইল ছবি

নতুন আইনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য

১৯৮০ সালের আইনে অনলাইনে প্রশ্ন ফাঁস বা ডিজিটাল ফরম্যাটে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান ছিল না।

নতুন করে সংশোধনীসহ আইনটি পাশ হওয়ার ফলে সাইবার অপরাধের মাধ্যমে পরীক্ষার ডাটাবেজে কেউ অননুমোদিত দখল নিলে, পরীক্ষার খাতা বা রেজাল্ট শিটে ডিজিটাল টেম্পারিং বা কোনো ধরনের ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানার সুযোগ তৈরি হলো।

তবে আগের আইনে প্রশ্ন ফাঁস ও বিতরণের জন্য ১০ বছর কারাদণ্ডের যে বিধান ছিল সেটা কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে নতুন আইনে। একই সাথে একজনের হয়ে অন্য কেউ পরীক্ষা দিলে তার কারাদণ্ডের শাস্তিও কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে পাবলিক ও সরকারি বেসরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে থাকে।

আবার নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষা দিতে গিয়েও অনেককে আটক করার উদাহরণ আছে।

ইলেকট্রনিক ডিভাইস হলে নিলে কী শাস্তি

নতুন পাশ হওয়া আইনে 'ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ প্রবেশ এবং নির্দেশনা লঙ্ঘন' শীর্ষক ধারায় বলা হয়েছে কেউ অননুমোদিত ইলেকট্রনিক ডিভাইস সাথে নিয়ে পরীক্ষার হল বা কেন্দ্রে প্রবেশ করলে বা প্রবেশের চেষ্টা করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।

"যে ব্যক্তি বৈধ কর্তৃত্ব বা অনুমতি ব্যতীত, কোনো পাবলিক পরীক্ষার পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস সঙ্গে নিয়ে কোনো পরীক্ষা হল বা পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করে বা প্রবেশের চেষ্টা করে অথবা উক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারিকৃত কোনো বৈধ নির্দেশ, আদেশ বা বিধি ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করে, তিনি অনধিক পাঁচ বছর মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন," আইনে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ও সরকারি বেসরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের প্রবণতা অনেক বেড়েছে।

আইনটিতে বলা হয়েছে, যিনিই ডিজিটাল কারসাজি সংঘটিত করুন না কেন, তিনি অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডও হবে।

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার অংশ নিচ্ছে একটি কেন্দ্রের পরিক্ষার্থীরা

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার অংশ নিচ্ছে একটি কেন্দ্রের পরিক্ষার্থীরা

প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ফাঁস

জাতীয় সংসদে আজ পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ যেকোনোভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাজা হবে পাঁচ বছর। এত দিন আইনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাজা ছিল ১০ বছর।

এর ফলে ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে প্রশ্ন ফাঁস বা বিতরণ করলেও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

আইন অনুযায়ী, পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র বা উত্তরপত্র নিজের কাছে রাখা, প্রকাশ, প্রচার বা বিতরণ করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।

এছাড়া অনুমোদনহীন পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন বা পরিচালনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

এ ধরনের কেন্দ্র পরিচালনায় জড়িত ব্যক্তি এবং জেনেশুনে অবৈধ পরীক্ষার জন্য নিজস্ব স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া মালিকদের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।

এছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধে সহায়তা করলে অথবা কর্মীদের যথাযথ তদারকি করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

পরীক্ষা নিয়ে সংঘবদ্ধ অপরাধের শাস্তি কী

নতুন আইনে পাবলিক পরীক্ষায় সংগঠিতভাবে পরীক্ষা জালিয়াতি বা চক্র গঠন করলে কঠোর শাস্তি এবং জরিমানার বিধান অন্তর্ভুক্ত করার কথা আগেই জানিয়েছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

আইনে বলা হয়েছে, "যে ব্যক্তি কোনো পাবলিক পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থীকে অসাধু উপায় অবলম্বনে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে উক্ত পরীক্ষার্থী বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তির সহিত, লিখিত বা মৌখিক, কোনো চুক্তি, সমঝোতা বা বন্দোবস্তে আবদ্ধ হন, উহাতে আবদ্ধ হওয়ার প্রস্তাব প্রদান করেন, অথবা উক্ত চুক্তি, সমঝোতা বা বন্দোবস্ত অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করেন, তিনি অনধিক পাঁচ বছর মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হইবেন।"

পাবলিক পরীক্ষায় ডিজিটাল অপরাধ ঠেকানোতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন আইনে

ছবির উৎস, SOPA Images via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পাবলিক পরীক্ষায় ডিজিটাল অপরাধ ঠেকানোতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন আইনে

উত্তরপত্রের অযৌক্তিক মূল্যায়নে শাস্তি

আইনটির উত্তরপত্রের অযৌক্তিক মূল্যায়ন শীর্ষক ধারায় বলা হয়েছে, "যে ব্যক্তি কোনো পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্রের অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন করেন, তিনি অনধিক দুই বছর মেয়াদের কারাদণ্ডে বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন"।

তবে শর্ত থাকে যে, তৃতীয় পরীক্ষক কর্তৃক উক্ত অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন নির্ধারিত না হইলে, এই ধারার অধীন কোনো ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হবেন না।

সুরক্ষা পাবেন তথ্যদাতা

নতুন আইন অনুযায়ী দেশের পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো ধরনের অপরাধের তথ্য কেউ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দিলে তিনি আইনি সুরক্ষা পাবেন এবং তার পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না।

"যে ব্যক্তি পরীক্ষা-সংক্রান্ত কোনো অপরাধ সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রদান করেন, তাহার পরিচয় প্রকাশ, আইনগত দায় এবং প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড হইতে তাহাকে সুরক্ষা প্রদান করা হইবে। এই ধারা কেউ লঙ্ঘন করলে তিনি অনধিক ছয় মাস মেয়াদের কারাদণ্ডে বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন," আইনে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ পরীক্ষা নিয়ে অপরাধের তথ্য কেউ দেওয়ার পর যদি তার পরিচয় কেউ প্রকাশ করেন তাহলে তিনিই সাজার মুখোমুখি হবেন।