মার্কিন খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখানোয় ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ, ইউরোপিয়ানদের তোপের মুখে ফিফা

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, ডেল জনসন
- Role, ফুটবল বিষয়ক সংবাদদাতা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
টানা ১০ বছর ধরে ফিফার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। আগামী বছর তিনি আবারও এই পদে নির্বাচনে অংশ নেবেন।
ফিফা পিস প্রাইজ, বিশ্বকাপের টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে ক্লাব বিশ্বকাপ – ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফার নানা সিদ্ধান্তই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
তবে বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তই কি শেষ পর্যন্ত জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অবস্থানকে নড়বড়ে করে তুলবে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা এবার বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক, তাদের হয়ে এখন পর্যন্ত তিনটি গোল করে দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল খেলোয়াড় বালোগান। কিন্তু তিনি লাল কার্ড পেয়েছিলেন।
তবে ফিফা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় লাল কার্ড পেয়েও তিনি পরের ম্যাচে খেলতে পারবেন। অথচ বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী, লাল কার্ডের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগই নেই।
সোমবার ফিফা এ বিষয়ে ৮৭১ শব্দের একটি বিবৃতি দিলেও নিষেধাজ্ঞা বাতিলের সিদ্ধান্তের কারণ স্পষ্ট করেনি। তবে পরে এ নিয়ে ব্যাখ্যা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইনফান্তিনোর সঙ্গে এ বিষয়ে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, "এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে আমিই ভূমিকা রেখেছি।"
তবে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি শুধু সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে ইনফান্তিনোকে তিনি নির্দেশ দেননি।
কিন্তু এমন একটি বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপের অভিযোগই ফুটবল অঙ্গনে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অনেকে মনে করছেন, বালোগুনের সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছিল।
তাদের মতে, তাকে আরেকটি ম্যাচে নিষিদ্ধ রাখা উচিত নয়। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে লাল কার্ড পেয়ে ম্যাচের বাকি সময় মাঠের বাইরে থাকাটাই তার জন্য যথেষ্ট শাস্তির ছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইনফান্তিনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কিন্তু মানুষের কাছে বিষয়টি কীভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ছবির উৎস, Getty Images
কারণ এই সিদ্ধান্তের সুবিধা অন্য কোনো দল পায়নি। সুবিধা পেয়েছে বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র। আর দেশটির নেতৃত্বে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি বহুবার ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাকে নিজের বন্ধু বলেও উল্লেখ করেছেন।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তটি যেন রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমা ঘোষণার মতো মনে হয়েছে।
সাবেক লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ বলেন, "এটি আমাদের খেলা, তাদের নয়।"
"যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজেদের মধ্যে কথা বলে এই বিষয়টির সমাধান করে থাকেন, তাহলে তা পাগলামি। এতে পুরো ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
প্রশ্ন উঠছে, চলমান বিতর্ক কি ইনফান্তিনোর সভাপতির পদকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলবে?
ফিফার নিয়মে ফুটবলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ফিফার নিয়মে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ফুটবলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনের কাজে বিভিন্ন দেশের সরকার হস্তক্ষেপ করার কারণে ফিফা নিয়মিতই সেসব দেশকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ (সাসপেন্ড) করে।
উদাহরণ হিসেবে, গত আট বছরে তিনবার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে পাকিস্তান।
কিন্তু বিষয়টি যখন ইনফান্তিনো ও ট্রাম্পকে ঘিরে, তখন কি সেই নিয়মগুলো ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে প্রথমবারের মতো 'ফিফা পিস প্রাইজ' দেওয়া হয়।
ঘটনাটি দেখে মনে হয়েছে, গত দুই বছর ধরে ইনফান্তিনো যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছিলেন, সেটিরই যেন চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ওই মুহূর্তটি।
পুরস্কারটি তুলে দেওয়ার সময় ইনফান্তিনো ট্রাম্পকে বলেন, "মিস্টার প্রেসিডেন্ট, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে আপনি সবসময় আমার সমর্থন, পুরো ফুটবল সম্প্রদায়ের সমর্থন পাবেন।"
মানবাধিকারবিষয়ক প্রচার সংগঠন ফেয়ারস্কয়ার গত ডিসেম্বরে ফিফার এথিকস (নৈতিকতা) কমিটির কাছে অভিযোগ করে যে এই পুরস্কার চালুর মাধ্যমে ইনফান্তিনো ফিফার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নীতিমালা লঙ্ঘন করেছেন।
কিন্তু ওই অভিযোগের জবাব পাওয়া যায়নি। এরপর গত মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৫০ জন সদস্য এথিকস কমিটিকে আবারও চিঠি লিখে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তবে ফিফার অনেক ঘটনার মতো সেবারও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এরপর টুর্নামেন্ট শুরু হলো। কিন্তু ট্রাম্প বিশ্বকাপের একটি ম্যাচেও উপস্থিত হননি।
কিন্তু তারপরও দেখা গেল, বালোগুনকে ঘিরে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ যেন তিনি নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন।
ফুটবল নিজে কথা বলার সুযোগ পায়নি, অর্থাৎ ফুটবলের চেয়ে বাইরের প্রভাবই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, এমন ঘটনাগুলোর আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকলো এটি।
এমন ঘটনা আগেও দেখা গেছে, সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানের ক্ষেত্রে।

ছবির উৎস, Getty Images
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্মকর্তারা আরতানকে দেশে প্রবেশ করতে দেননি। এরপর অভিযোগ ওঠে, ইনফান্তিনো নিজের আয়োজিত বিশ্বকাপের ওপরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন।
তবে গত মাসে তিন বছরেরও বেশি সময় পর যখন তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন, তিনি বিষয়টিকে হালকাভাবে এড়িয়ে যাওয়ার মতো উত্তর দেন।
আরতানের পরিস্থিতি নিয়ে ইনফান্তিনো বলেন, "আরে, একটু শান্ত থাকুন, আরাম করুন।"
বিতর্ক যেন সবসময়ই দোরগোড়ায় অপেক্ষা করছিল। মনে হচ্ছিল, ভেতরে ভেতরে কিছু একটা চাপা পড়ে আছে। আর পুরো সময়জুড়ে খুব কমই ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে।
শুক্রবারের সেই পাঁচ ঘণ্টার অনিশ্চয়তার কথাই ধরা যাক। ফিফা প্রথমে ইংল্যান্ড ও মেক্সিকোর শেষ ষোলোর ম্যাচের কিক-অফের সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে আবার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। অথচ এমন আচরণ করে, যেন এমন সিদ্ধান্ত কখনো নেওয়াই হয়নি।
বালোগুনকে ঘিরে ঘটনাটিও যেন একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি।
একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, কিন্তু কেন নেওয়া হলো তার ব্যাখ্যা দেওয়া হলো না।
শুধু জানিয়ে দেওয়া হলো যে এটা হচ্ছে এবং এটিকেই মেনে নিতে হবে।
বিশ্বকাপে ভেতরে ভেতরে দানা বাঁধছিল বিতর্ক
সাম্প্রতিক সময়ে ফুটবলকে ঘিরে যত বিতর্ক হয়েছে, তার সবগুলো তালিকাভুক্ত করতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে।
তবে দুই বছর আগে ২০৩০ ও ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ নির্বাচনের ঘটনাটির কথা ধরা যেতে পারে, যেটি অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

ছবির উৎস, Getty Images
সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে আফ্রিকা, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে।
ফলে নিয়ম অনুযায়ী, ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক হবে কেবল এশিয়া বা ওশেনিয়ার কোনো দেশ।
বাস্তবে কার্যকর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় এটি প্রায় নিশ্চিত যে কাতারের মতো মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের মুখে থাকা সৌদি আরবই হবে ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক।
এ সময় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বাধীন ফিফার সঙ্গে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও গড়ে ওঠে।
এদিকে, নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশন এই সিদ্ধান্তে ভোটদানে বিরত থাকে।
তারা অভিযোগ করে যে আয়োজক বাছাইয়ের প্রক্রিয়া ফিফায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নেওয়া সংস্কার উদ্যোগকে দুর্বল করেছে এবং ফিফার প্রতি আস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ক্লাব বিশ্বকাপ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, গ্রীষ্মকালীন এই টুর্নামেন্টটির প্রতি বড় ধরনের আগ্রহ নেই। বরং মনে করা হচ্ছে, ক্লাব ফুটবলের বিপুল অর্থ ও প্রভাবের একটি অংশ নিজেদের দখলে নিতে ফিফা এই টুর্নামেন্ট চালু করেছে।
গত বছর ফুটবলারদের বৈশ্বিক সংগঠন ফিফপ্রোর সভাপতি সারজিও মার্কি বলেন, "কোনো ধরনের সংলাপ, সংবেদনশীলতা বা সম্মান দেখানো ছাড়াই এই টুর্নামেন্ট চালু করা হয়েছে।"
এরপর আসে বালোগানের ঘটনা। এটি এতটাই বিতর্কিত যে যার নিজের নৈতিক অবস্থান নিয়েই অতীতে প্রশ্ন উঠেছিল, তিনিও এখন ফিফার সমালোচনা করার সুযোগ পেয়ে গেছেন।
সাবেক ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার এক্সে লিখেছেন, "ফুটবল কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতার খেলাঘর হয়ে উঠতে পারে না।"
মজার বিষয় হলো, ব্ল্যাটার নিজেই দুর্নীতিকাণ্ডের জেরে ফিফা সভাপতির পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে ২০১৬ সালে তার স্থলাভিষিক্ত হন ইনফান্তিনো।

ছবির উৎস, Getty Images
উয়েফা কি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারবে?
বালোগানকে ঘিরে ফিফার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে উয়েফা।
সংস্থাটি বলেছে, ফিফা একটি "লাল রেখা" অতিক্রম করেছে এবং সিদ্ধান্তটি নজিরবিহীন।
তবে ফিফা ও উয়েফার দ্বন্দ্ব নতুন নয়। ২০২৫ সালে ফিফা কংগ্রেসে দেরিতে পৌঁছানোয় উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিনের নেতৃত্বে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা সভা থেকে বেরিয়ে যান।
বিশ্বকাপ চলাকালেও দুই সংস্থার টানাপোড়েন দেখা গেছে। উয়েফা বিশ্বকাপের টিকিটের উচ্চমূল্যের সমালোচনা করেছে এবং নিজেদের টুর্নামেন্টের সঙ্গে তুলনা টেনেছে।
তবে এসব সমালোচনা সত্ত্বেও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অবস্থান এখনো শক্তিশালী।
ফিফা ফরওয়ার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে ফুটবল উন্নয়নে অর্থায়ন এবং বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৩২ থেকে ৪৮ করায় এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের অনেক দেশের সমর্থন পেয়েছেন তিনি। এতে কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেয়েছে।
ফিফার ২১১ সদস্য দেশের মধ্যে সভাপতি নির্বাচনে জিততে প্রয়োজন ১০৬ ভোট।
দক্ষিণ আমেরিকার ১০টি, আফ্রিকার ৫৪টি এবং এশিয়ার ৪৭টি সদস্য দেশ ইতোমধ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অর্থাৎ, তার পক্ষে ইতোমধ্যে ১১১ ভোট নিশ্চিত।
ফলে উয়েফা আপত্তি জানালেও ২০২৭ সালের নির্বাচনে ইনফান্তিনোকে হারানো বা তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।








