ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থা কীভাবে আগের চেয়ে অনেক আলাদা

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
- Author, পল অ্যাডামস
- Role, কূটনৈতিক সংবাদদাতা
- Published
- পড়ার সময়: ৯ মিনিট
গত মাসে ভার্সাই প্রাসাদে নৈশভোজের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেন, তখন অনেকেই এর মধ্যে এক ধরনের বিদ্রূপাত্মক দিক দেখেছিলেন।
তার আতিথ্যদাতা, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ হয়তো নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যাতে মি. ট্রাম্প মত পরিবর্তনের আগেই সমঝোতা স্মারকে সই হয়ে যায়, এবং সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন যে স্বর্ণালংকৃত হল অব মিররস তার মার্কিন অতিথির পছন্দ হবে।
কিন্তু দেড় পৃষ্ঠার ওই চুক্তি এবং এই ভেন্যু নির্বাচনের বিষয়টির সাথে অনিবার্যভাবেই ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে স্বাক্ষরিত অতি দীর্ঘ ভার্সাই চুক্তির তুলনা চলে আসে।
১৯১৯ সালের সে চুক্তি ইউরোপকে নতুন রূপ দিয়েছিল, কিন্তু ওই চুক্তিতে যে বিপুল ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল জার্মানিকে, তাতে দেশটিতে ব্যাপক ক্ষোভ ও তিক্ততা জন্ম নেয় এবং মাত্র ২০ বছর পর আরেকটি বৈশ্বিক সংঘাতের পথ তৈরি হয়।
এখন ভার্সাই চুক্তির চাইতে অনেক দিক থেকেই ভিন্ন হলেও, ইরান চুক্তিটিও কি শেষ পর্যন্ত সমানভাবে ভাগ্যনির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে?
দেখা যাচ্ছে, স্বাক্ষরের প্রায় তিন সপ্তাহ পরও একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি মোটামুটিভাবে টিকে আছে।
তবে, হরমুজ প্রণালির আশপাশে বিভিন্ন মাত্রার কয়েকটি সংঘর্ষের পর, এবং যুদ্ধের কারণ হয়ে ওঠা কোনো বিষয়ই সমাধানের কাছাকাছি না পৌঁছানোয়, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আগের মতোই অনিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে।
এদিকে, ইরান এক গভীর পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।
দেশটি তার সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে বিদায় জানাচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই নিহত হয়েছিলেন ইরানের সবোর্চ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
ওই হামলায় তেহরানের শাসনব্যবস্থার বড় অংশই কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।

ছবির উৎস, Getty Images
এটি দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত - পুরোনো নেতৃত্ব যে নতুনদের কাছে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, তার এক জাঁকজমকপূর্ণ স্মারক যেন।
আর নেতৃত্বে নতুন মুখের সঙ্গে এসেছে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যার নিজস্ব প্রভাব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো দেশটির সাবেক বহু নেতাকে হত্যা করেছে, কিন্তু তাদের জায়গায় কি এখন আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ তৈরি হয়েছে?
নতুনভাবে সাজানো দাবার ছক
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অধ্যাপক ভ্যালি নাসর বলছিলেন, "এই যুদ্ধকে আমরা এখন পর্যন্ত যতটা গুরুত্ব দিয়েছি, এর প্রভাব তার চেয়ে অনেক বেশি ও অনেক বড়।"
তিনি বলেন, "এই মাত্রার বড় যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত দাবার ছক নতুনভাবে সাজিয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও তাই-ই হবে।"
জানুয়ারিতে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল, যাকে মি. ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উভয়েই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখেছিলেন।
দশকের পর দশক ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই বিপর্যস্ত ছিল।
ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের ক্ষতও তখনো পুরোপুরি সারেনি।
দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়নি, যদিও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
পারমাণবিক কর্মসূচি আরও সমৃদ্ধকরণ করা হলে ১০ বা ১১টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য যথেষ্ট বলে মনে করা ইউরেনিয়ামের মজুত দেশটির ঠিক কোথায় আছে, তা নিশ্চিত ছিল না।
তবে, ধারণা করা হচ্ছিল এর বড় অংশ ইসফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সের কাছে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের দুর্বল জোট 'অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স'ও একের পর এক বড় ধাক্কার মুখে পড়ে।
এদিকে, সিরিয়ায় ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল-আসাদের শাসনব্যবস্থা ২০২৪ সালের শেষে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পতন ঘটেছিল।
লেবাননে ইরান-সমর্থিত হেজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের হত্যার পাশাপাশি বিস্ফোরকযুক্ত পেজার ও ওয়াকিটকির মাধ্যমে তাদের যোদ্ধাদের বড় অংশকেও অকার্যকর করে দেয় ইসরায়েল।
গাজা উপত্যকায় ইরানের আরেক মিত্র হামাসও একই ধরনের পরিণতির মুখে পড়ে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার জবাবে ইসরায়েল অব্যাহত সামরিক অভিযান চালায়, যা গাজার বড় অংশ ধ্বংস করে দেয় এবং হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ঘটায়।
অন্যদিকে, গাজা যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা যখন ইসরায়েলের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলা শুরু করে, তখন ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য সবাই পাল্টা হামলা চালায়, যার কিছু ছিল হুথি নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে।

ছবির উৎস, Getty Images
দেশে ও দেশের বাইরে এত বিপর্যয়ের পর একটি সাধারণ ধারণা ছিল যে, ইরান অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস সেসময় জানিয়েছিল, মি. ট্রাম্প একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন পেয়েছিলেন যেখানে বলা হয়েছিল ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যেকোনো সময়ের তুলনায় ইরান বেশ দুর্বল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান সমানে সমান লড়াই করতে পারবে - এ ধারণা একেবারেই অবাস্তব বলেই মনে হচ্ছিল তখন।
কিন্তু বাস্তবে ঠিক সেটাই ঘটেছে।
ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনো টিকে আছে, এর একটি কারণ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
তেহরানই কি সুবিধাজনক অবস্থানে?
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলতে ভালোবাসেন এবং প্রায়ই বলেন যে, তিনি ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ভালি নাসর ট্রাম্পের দাবির সাথে দ্বিমত করেন না, তবে তিনি মনে করেন, সেটি শেষ পর্যন্ত তেহরানের পক্ষেই গেছে।
তিনি বলেন, "এখন ইরানে একেবারে নতুন একটি প্রজন্ম ক্ষমতায় এসেছে। তাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট। তারা যুদ্ধ সামলেছে, এখন শান্তিচুক্তি ও বাকি সবকিছুও সামলাবে।"
অধ্যাপক নাসরের মতে, নতুন নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের ভাষায় 'অবাস্তব কল্পনায় বিভোর মতাদর্শিক মানুষ' নয়, বরং তারা মূলত বিপ্লব-পরবর্তী প্রজন্মের নেতা, যারা নিজের দেশ রক্ষায় চরমভাবে একমুখী এবং আগের নেতৃত্বের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
৫৬ বছর বয়সী নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বয়সে তার বাবা আলী খামেনির চেয়ে ৩০ বছরের ছোট। যুদ্ধের শুরুতেই নিহত হওয়ার সময় আলী খামেনির শারীরিক অবস্থা দুর্বল বলে মনে করা হতো।
প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ৭১ বছর বয়সী হলেও, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের প্রজন্মের সবাই এখন আর ক্ষমতায় নেই।
এই মূহুর্তে ইরানের প্রধান দুই ব্যক্তি, পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিপ্লবী গার্ডের প্রধান আহমাদ বাহিদি - দুইজনের বয়সই ষাটের ঘরে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতার মতো তাদেরও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, "ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জাহাজ এখন আর ৮৬ বছর বয়সী কেউ পরিচালনা করছেন না। ব্যবস্থার বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন আলী খামেনি।"

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
দশকের পর দশক ধরে সতর্ক খামেনি 'যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়' ধরনের নীতি অনুসরণ করে চলেছেন।
তার উত্তরসূরিরা তুলনামূলকভাবে বেশসাহসী।
তারা পুরো অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এমন শর্তে যুদ্ধ শেষের আলোচনা টেবিলে নিয়ে এসেছে, যা অন্তত আপাতদৃষ্টিতে তেহরানের জন্য অপমানজনক নয়।
অধ্যাপক নাসর বলেন, "তারা দেখিয়েছে যে আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মকভাবে যুদ্ধে জড়াতে তারা প্রস্তুত।"
২০২০ সালে ট্রাম্প যখন বিপ্লবী গার্ডের সাবেক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার জন্য বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন ইরান ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার আগেই ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দিয়েছিল।
সে সময় কোনো মার্কিন সামরিক কর্মী নিহত হননি।
কিন্তু এ বছর, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সর্বাত্মক হামলার মুখে ইরান এমন কোনো সংযম দেখায়নি।
তারা বাহরাইনে ফিফথ ফ্লিটের সদর দফতর এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিসহ পুরো অঞ্চল জুড়ে একাধিক মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
কুয়েতে ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। লড়াই চলাকালীন আহত হয়েছেন আরও শত শত সৈন্য।
উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা চালানো, বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ - হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ব্যাপারে ইরানের এই আগ্রাসী মনোভাব সম্ভবত হোয়াইট হাউজকে বেশ অবাক করেছে।
কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন তাদের সামরিক স্থাপনার নেটওয়ার্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের মাধ্যমে ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিল।
ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলার জবাবে ইরানের এই নাটকীয় প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয় যে, সে কৌশল আর কাজ করছে না।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ওয়ায়েজ বলেন, "এই দেশগুলোর অনেকেই আশা করেছিল যে, তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো তাদের নিরাপত্তা দেবে, তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে না।"
"উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এখন মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের নির্ভরযোগ্যতা এবং তাদের নিজস্ব প্রতিরোধ কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।"
বিভিন্ন প্রতিবেদনে আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে, বেশিরভাগ উপসাগরীয় দেশ ইরানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করছে এবং তাদের এই বিপজ্জনক প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে।

ছবির উৎস, Getty Images
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিকের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি এমনকি এও জানিয়েছে যে, কয়েক দশকের শত্রুতার পর ২০২৩ সালে তেহরানের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা সৌদি আরব একটি 'পুনর্মিলন সম্মেলন' আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যেখানে ইরান এবং সৌদি আরবের উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের একত্র করা হবে।
তবে, তাদের না চাওয়া এবং এড়িয়ে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করা সত্ত্বেও একটি যুদ্ধের মাঝে আটকে পড়ার কারণে যতই ক্ষুব্ধ হোক না কেন, ওয়ায়েজ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে এদের কেউই মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে প্রস্তুত নয়।
তিনি বলেন, "নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করা সম্ভব নয়। তারা ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু দিনশেষে তাদের এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প নেই।"
অতীতের বড় কোনো ঐতিহাসিক উপমার দিকে না গিয়ে ওয়ায়েজ বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি 'প্লাস্টিক মোমেন্ট' মানে পরিবর্তনশীল বা অস্থায়ী মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন, যা পুরনো শত্রুদের ভিন্ন মাত্রার সম্পর্কের কথা চিন্তা করার এক অপার সম্ভাবনায় ভরপুর।
তিনি বলেন, "আমি (নেতৃত্বে) এমন এক বাস্তবতাবোধ লক্ষ্য করছি যা অতীতে ছিল না।"
কিন্তু ইরানের সাধারণ মানুষের কী হবে?
নতুন বাস্তববাদী নেতৃত্ব
জানুয়ারিতে ট্রাম্প ইরানের নাগরিকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে 'সাহায্য আসছে'। এরপর ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করার সময় তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন।
তিনি তাদের বলেছিলেন, "আমাদের কাজ শেষ হলে, আপনারা আপনাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিন। এটি আপনাদেরই হবে।"
মি. ট্রাম্পের ওই প্রতিশ্রুতি এখন পর্যন্ত অলীক বা কাল্পনিক বলেই প্রমাণিত হয়েছে।
তেহরানে হয়তো এক নতুন প্রজন্ম ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু তারা এখনো তাদের জনগণকে একটি স্বাধীন ও আরও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের কোনো আশা দেখাতে পারেনি।
ইরানের শাসনব্যবস্থা বা রেজিম যখন পুরোপুরি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে রয়েছে, তখন চ্যাথাম হাউজের বিশ্লেষক আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি বলছেন, তিনি দেশটির ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি নেতৃত্বের কাছ থেকে নমনীয়তা আশা করছেন না।
তিনি বলেন, "তারা যে কোন বিক্ষোভ বা প্রতিবাদের ওপর খুবই কড়া নজরদারি বজায় রাখবে।"
তবে যুদ্ধের আগেই দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে হিজাব পরার বাধ্যবাধকতা শিথিল হওয়া এবং তেহরানের রেস্তোরাঁগুলোতে গোপনে অ্যালকোহল পাওয়া যাওয়ার মতো বিষয়গুলো ইঙ্গিত দেয় যে, রেজিম হয়তো ধীরে ধীরে কিছু পুরনো নিষেধাজ্ঞা বা সামাজিক ট্যাবুগুলো ঝেড়ে ফেলছে।

ছবির উৎস, Getty Images
অধ্যাপক ভালি নাসর বলেন, এসবই প্রয়োজনের তাগিদে করা হচ্ছে - রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, "তারা একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তাদের শাসন টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এ বিষয়গুলোতে কিছুটা ছাড় দেওয়া প্রয়োজন।"
জানুয়ারিতে ব্যাপক রক্তপাতের ফলে সৃষ্ট ধাক্কার পর, ইরানের শাসকদল অন্তত এটি দেখাতে পেরেছে যে তারা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সক্ষম।
ইরানিদের জন্য এ যুদ্ধ চরম বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেজিমের নির্মমতার প্রতি তাদের ক্ষোভ ধীরে ধীরে এক ভিন্ন ধরণের আতঙ্কে রূপ নেয়, যখন মার্কিন এবং ইসরায়েলি বোমা তাদের দেশের ওপর বর্ষিত হতে থাকে, যা শত শত বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতিসাধন করে।
যুদ্ধের প্রথম দিনে মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বহু শিশুর মৃত্যু অনেকের মনে এ প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে যে আসল শত্রু কে?
ইরানিদের মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যেন দেশটিকে ধ্বংস করতেই বদ্ধপরিকর বলে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পর, ইরানের নতুন নেতৃত্ব কি রেজিমের ভেঙে পড়া বৈধতা নতুন করে গঠনের এই সম্ভাব্য ক্ষণস্থায়ী সুযোগটিকে কাজে লাগাতে পারবে?
ওয়ায়েজ বলেন, "এটি মাও-পরবর্তী চীনের মতো এক মুহূর্ত। এ অর্থে যে, পুরো ব্যবস্থাটি অনুধাবন করতে পারছে যে কোথাও না কোথাও পরিবর্তন আনতেই হবে। এই নতুন নেতৃত্ব বোঝে যে তাদের একটি নতুন সামাজিক চুক্তির প্রয়োজন।"
তারা এটি বাস্তবায়ন করতে পারবে কী-না, তা একটি বড় প্রশ্ন।
ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আইআরজিসির নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত তরুণ, যারা এখনও জানুয়ারির রক্তাক্ত অভিযানে নিজেদের হাজার হাজার বন্ধুর হারানোর শোকে মূহ্যমান, তারা মনে করে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের কোনো বাস্তব ভূমিকা নেই।
এটি একটি সন্ধিক্ষণ, যেখানে ইরান দেশে এবং বিদেশে পুরনো নিশ্চিত অবস্থান ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনার মাঝে এক অনিশ্চিত দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছে।

ছবির উৎস, Getty Images
উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক বেশ কিছু উত্তেজনা সত্ত্বেও, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যার ফলে এমন একটি সম্পর্ক তৈরি হতে পারে, যাকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইতিমধ্যেই 'মৌলিকভাবে রূপান্তরিত সম্পর্ক' বলে অভিহিত করেছেন।
পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের লোভনীয় সম্ভাবনার মুখে, দেশের অর্থনীতি পরিচালনায় ইরানের শাসকদের সক্ষমতা তাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষুণ্ণ হওয়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করতে পারে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে ইরান ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণের সুবিধা পেয়েছে, যা তাদের ৬০ দিনের জন্য অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করার অনুমতি দিয়েছে।
এই ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালীন অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও আসতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে ইরানের অবরুদ্ধ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা এবং চূড়ান্ত চুক্তি হলে আন্তর্জাতিক সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার মতো বড় সাফল্য।
এই এমওইউ-তে একটি ৩০০ বিলিয়ন ডলারের (২২৫ বিলিয়ন পাউন্ড) 'পুনর্গঠন ও উন্নয়ন' পরিকল্পনা তৈরির কথাও উল্লেখ রয়েছে, যদিও এর অর্থায়ন কে করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে, এ আর্থিক প্রণোদনাগুলো ইরানের নতুন নেতাদের চুক্তি করার জন্য একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
সানাম ভাকিলও একমত যে এই অঞ্চলটির জন্য 'সম্ভাবনার একটি দ্বার' খুলে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
তবে তিনি বেশ সতর্কভাবে বলছেন, "এমন একটি পরিস্থিতিও হতে পারে যেখানে তারা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারল না, বিষয়টি বছরের পর বছর ঝুলে রইল এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ধৈর্য হারিয়ে... বললেন, 'ঠিক আছে, এবার তৃতীয় রাউন্ডের সময় এসেছে'।"
বিবিসি যেসব বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলেছে, তাদের কেউই ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত নন।
ইরান, তার মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক দশকের জটিল সম্পর্ক একটি বিষাক্ত উত্তরাধিকার রেখে গেছে, যা গভীর সন্দেহ এবং প্রায় সম্পূর্ণ আস্থার অভাব দ্বারা চিহ্নিত।
ব্যর্থ হওয়ার সুযোগের কোনো কমতি নেই, কারণ অনেকগুলো অমীমাংসিত বিষয় রয়ে গেছে - যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভিন্নমত, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ, লেবাননের যুদ্ধ এবং সব পক্ষের কট্টরপন্থীদের অনমনীয় মনোভাব।
এখন ছয়টি উত্তাল মাসের পর, এ অঞ্চলের চিত্র কিছুটা ভিন্ন হতে শুরু করেছে।
তবে, এই পরিবর্তনশীল মুহূর্তটিকে আরও ভালো কিছুতে রূপান্তর করতে হলে অনেক কিছুকে সঠিক পথে চলতে হবে।








