কুয়াকাটা ও সলিমপুরে 'সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা' ঘোষণা কেন

সলিমপুরের উপকূলে জেলেদের তৎপরতা

ছবির উৎস, Mashiul Alam Mehedi

ছবির ক্যাপশান, সলিমপুরের উপকূলে জেলেদের তৎপরতা
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের পটুয়াখালী জেলার কুয়াকাটা এবং চট্টগ্রামের সলিমপুর কাট্টলি সমুদ্র সৈকত এলাকায় 'সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা' ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।

সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মৎস্য অধিদফতরের ব্লু ইকনমি বিভাগ ও সমুদ্র বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র সংরক্ষণে এবং সমুদ্র সম্পদের ব্যবস্থাপনার জন্য দারুণ সহায়ক হবে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ নিয়ে এখন বাংলাদেশের সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকার সংখ্যা দাঁড়ালো ছয়টিতে, যার ফলে দেশের সমুদ্রসীমার দশ শতাংশ এলাকা সংরক্ষিত করার যে বাধ্যবাধকতা রিও কনভেনশনে বলা হয়েছিল তা পূরণ হলো।

প্রসঙ্গত, পরিবেশ রক্ষা বিষয়ে জাতিসংঘের তিনটি কনভেনশন বা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এগুলো রিও কনভেনশন হিসেবে পরিচিত। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো শহরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের 'ধরিত্রী সম্মেলন'-এ এগুলো গৃহীত হয়েছিল।

সামুদ্রিক মৎস্য আইন ২০২০ অনুযায়ী সরকার বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য জলসীমার মধ্যে যেসব এলাকায় জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীকুল সংকটাপন্ন বা বিলুপ্তির ঝুঁকির মধ্যে আছে যেসব এলাকা কিংবা যেসব এলাকায় সামুদ্রিক জলজ জীব ক্রমহ্রাসমান পর্যায়ে আছে সেসব এলাকাকে 'সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা' ঘোষণা করতে পারে।

একই সাথে এই আইন অনুযায়ী সরকার সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকায় জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রে, আবাসস্থলের নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি এবং বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা ও গবেষণা কর্মের প্রসারে পরিকল্পনা প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবে।

"কুয়াকাটা ও সলিমপুরে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা হয়েছে। এখন আমরা এসব এলাকা নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে সেগুলো বাস্তবায়নের দিকে যাবো," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মৎস্য অধিদপ্তরের ব্লু-ইকোনমি বিভাগের উপপরিচালক ডঃ মুহাম্মদ তানভীর হোসেন চৌধুরী।

কুয়াকাটা ও সলিমপুর সামুদ্রিক এলাকায় গবেষণা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশনোগ্রাফি বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ডঃ সুব্রত সরকার। ওই দুটি এলাকা নিয়ে যে টেকনিক্যাল কমিটি করা হয়েছিল মি. সরকার তারও সদস্য।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা মাছসহ সেখানকার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে"।

কুয়াকাটা সামুদ্রিক এলাকার বিভিন্ন দৃশ্য

ছবির উৎস, Md. Shahadat Hossain

ছবির ক্যাপশান, কুয়াকাটা সামুদ্রিক এলাকার বিভিন্ন দৃশ্য

কুয়াকাটা ও সলিমপুরের কোথায় সংরক্ষিত এলাকা এবং কেন

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কুয়াকাটা সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে সরকার যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, সেখানে বলা হয়েছে, সংরক্ষিত এলাকাটি হবে কুয়াকাটা সংলগ্ন উপকূলীয় এবং সামুদ্রিক মৎস্য জলসীমা এবং এই জলসীমার পরিমাণ ৪ হাজার ২৪০ বর্গকিলোমিটার।

সেখানে জলসীমার গভীরতা প্রায় ২০ মিটার পর্যন্ত। এলাকাটি উত্তরে তেঁতুলিয়া নদী, গলাচিপা নদী ও আন্ধারমানিক নদীর মুখে অবস্থিত আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।

এর পূর্ব দিকে আছে নিঝুম দ্বীপ সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা আর পশ্চিম দিকে আছে সোয়াচ অব নো-গ্রাউন্ড সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা।

অন্যদিকে সলিমপুর সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকার অবস্থান হলো চট্টগ্রাম জেলার গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত হতে সলিমপুর কাট্টলি সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন উপকূলীয় ও সামুদ্রিক জলসীমায়।

এই জলসীমার আয়তন প্রায় ১৮৫ বর্গকিলোমিটার এবং সেখানে পানির গভীরতা প্রায় দশ মিটার পর্যন্ত।

সলিমপুরের যে এলাকাটিকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে, তার উত্তরে সীতাকুণ্ড ও গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত ও সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চল। আর দক্ষিণে সলিমপুর কাট্টলি সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চল ও বঙ্গোপসাগর।

অন্যদিকে এলাকাটি পূর্বে অনিয়মিত তটরেখা এবং ইন্টারটাইডাল অঞ্চল। আর পশ্চিমে আছে সন্দ্বীপ ও সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর এলাকা।

সলিমপুর সংরক্ষিত এলাকার চিত্র

ছবির উৎস, Jerin Tithi

ছবির ক্যাপশান, সলিমপুর সংরক্ষিত এলাকার চিত্র

ডঃ মুহাম্মদ তানভীর হোসেন চৌধুরী বলছেন, কুয়াকাটার সামুদ্রিক এলাকায় সব ধরনের মৎস্য প্রজাতির বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র আছে আর সলিমপুর সামুদ্রিক এলাকায় লবণাক্ত জলাভূমি বাস্তুতন্ত্র ও এর ওপর নির্ভরশীল জীববৈচিত্র আছে।

তিনি বলছেন, "সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকাগুলোতে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা করা হবে যে কোন সময়ে মাছ ধরা হবে। যেগুলো বিলুপ্ত হবে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে না। সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করতে জেলেদের মোটিভেট করা হবে"।

ডঃ সুব্রত সরকার বলছেন, "কুয়াকাটা চেওয়া মাছ, পাঙ্গাস, তপসে, রিটা ও ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এটি ইলিশ মাছের অন্যতম প্রধান প্রজননক্ষেত্র। এছাড়া কুয়াকাটা উপকূল লাল কাঁকড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল (হটস্পট) হিসেবে পরিচিত"।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে চেওয়া ও পাঙ্গাসসহ কিছু প্রজাতির মাছ ধরার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি টেকসই নয় এমন পদ্ধতিতে মাছ ধরার কারণে ধরা পড়ছে পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রজাতি।

এর মধ্যে রয়েছে- পূর্ণবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক গিটারফিশ, হাতুড়ি হাঙর, করাত মাছ, বিভিন্ন প্রজাতির হাঙর ও স্টিংরে।

অন্যদিকে সলিমপুর সামুদ্রিক এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, মলাস্ক (শামুক-ঝিনুকজাতীয় প্রাণী), কাঁকড়া, হর্স শু কাঁকড়া, বেন্থোস (তলদেশবাসী জীব), উপকূলীয় পাখি আছে। এটি জলজ প্রাণীর খাদ্যগ্রহণ, প্রজনন ও বাচ্চা প্রতিপালনের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।

মি. সরকার বলছেন কুয়াকাটা ও সলিমপুরের কোথায় মাছ ধরা হয় এবং কী ধরনের মাছ ধরা পড়ে সেগুলো নিয়ে প্রায় দু বছর ধরে জরিপ ও গবেষণা করে বিস্তারিত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা করা হয়েছে।

"দেখা যাচ্ছে ডলফিন তিমি মারা যাচ্ছে। কোথাও কোথায় মাছের ব্রিডিং জোন আছে। পাশাপাশি সংরক্ষিত এলাকা হলে জেলেদের বিকল্প আয়ের উৎস কী হবে। জীবনযাত্রা ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণের সব কিছুর বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনা করা হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন সুব্রত সরকার।

কুয়াকাটা সামুদ্রিক এলাকার গেজেট

ছবির উৎস, https://www.dpp.gov.bd/

ছবির ক্যাপশান, কুয়াকাটা সামুদ্রিক এলাকার গেজেট
সলিমপুর সামুদ্রিক এলাকার গেজেট

ছবির উৎস, https://www.dpp.gov.bd/

ছবির ক্যাপশান, সলিমপুর সামুদ্রিক এলাকার গেজেট

দেশে মোট সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা কয়টি

ডঃ মুহাম্মদ তানভীর হোসেন চৌধুরী বলছেন দেশে এখন মোট ছয়টি সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা আছে, যার কোনটি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আবার কোনটি ঘোষণা করেছে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়।

এগুলো হলো- সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড, নিঝুম দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন, নাফ মোহনা, কুয়াকাটা ও সলিমপুর।

এর মধ্যে একমাত্র সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যেখানে ২০১৪ সালে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৩৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছিল। এখানে সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাসস্থল আছে।

টেকনাফ সংলগ্ন নাফ মোহনার জলভাগের একটি এলাকাকে ২০২৪ সালের জুনে 'নাফ সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা' ঘোষণা করেছিল সরকার। কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন যে, বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ২৭টি প্রজাতির মাছের পোনার বিচরণ ক্ষেত্র এটি।

এর আগে ২০২২ সালে সমুদ্র সম্পদের টেকসই আহরণের উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে 'সেন্ট মার্টিন মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া' ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল সরকার।

এছাড়া ২০১৯ সালে নিঝুম দ্বীপ অর্থাৎ নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে এ দ্বীপ ও সংলগ্ন সামুদ্রিক এলাকাকে সংরক্ষিত ঘোষণা করেছিল সরকার।

এছাড়া বঙ্গোপসাগরের মিডলগ্রাউন্ড মৎস্যক্ষেত্রের একটি ঘোষিত মেরিন রিজার্ভ এলাকা আছে, যার আয়তন প্রায় ৬৯৮ বর্গ কিলোমিটার।

মাছের প্রজনন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাকে সফল করতে এই মেরিন রিজার্ভ ঘোষণা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ডঃ তানভীর হোসেন চৌধুরী।