বিবর্তিত মেসি কেন এখন মাঠে হেঁটে বেড়ান?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, গিলেম বালাগে
- Role, বিবিসি স্পোর্ট কলামিস্ট
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
আর্জেন্টিনা যদি ১৯৬২ সালের পর প্রথম দেশ হিসেবে তাদের বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখতে পারে - এবং ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় দেশ হিসেবে এই কীর্তি গড়তে পারে - তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন লিওনেল মেসি।
৩৮ বছর বয়সী মেসি তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর ফলে মেসি পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং মেক্সিকোর গুইলারমো ওচোয়ার সাথে যৌথভাবে রেকর্ডটির মালিক হবেন। তবে ২০০৩ সালে বার্সেলোনায় অভিষেক হওয়া সেই মেসির সাথে আজকের মেসির অনেক পার্থক্য।
সাধারণত বয়স বাড়লে ফুটবলারদের খেলার মান পড়ে যায়। কিন্তু সেরা খেলোয়াড়রা নতুন পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেন। রোনালদো তার গতি কমে যাওয়ার পর নিজেকে একজন গোলস্কোরার হিসেবে নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন।
মেসি অবশ্য কেবল মানিয়ে নেননি। তিনি খেলাটিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন যাতে তার বয়স বা গতির অভাব বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনায় অভিষেকের পর থেকে মেসি অন্তত পাঁচবার নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। আজকের আর্জেন্টিনা এবং ইন্টার মায়ামির মেসি সেই দীর্ঘ পরিবর্তনেরই ফসল।

ছবির উৎস, Marcelo Endelli/Getty Images)
কেন গার্দিওলা মেসিকে মাঝ মাঠে সরিয়ে এনেছিলেন?
রোনালদিনহো, যিনি তখন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন, মেসিকে অনুশীলনে দেখার পরই বলেছিলেন, "ও সবার সেরা হবে।"
দুই বছর পর, ২০০৫ সালের আগস্টে জুভেন্টাসের বিপক্ষে ম্যাচে সারা বিশ্ব মেসিকে চিনল। ১৮ বছর বয়সী এই তরুণকে দেখে জুভেন্টাস ম্যানেজার ফ্যাবিও ক্যাপেলো এতটাই অবাক হয়েছিলেন যে, তিনি তাকে দলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
মেসির বয়স যখন ২১, বার্সেলোনার কোচ ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড চেয়েছিলেন মেসি যেন মাঠের মাঝখানে খেলেন। তিনি বলেছিলেন, "তাকে একদম মাঝখানে রাখুন। সে যত বেশি বল পায়ে পাবে, দলের জন্য তত ভালো।"
২০০৮ সালে গার্দিওলা যখন কোচ হলেন, তখন মেসি খেলতেন ডান উইং বা মাঠের ডান দিকে।
গার্দিওলা প্রথমবার মেসিকে সেখান থেকে সরিয়ে মাঝখানে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কারণ মেসি রক্ষণভাগে সাহায্য করছিলেন না। কোচ জানতেন, মেসিকে শেষ পর্যন্ত মাঠের কেন্দ্রবিন্দুতেই খেলতে হবে।
এরপর দলটিকে মেসির নতুন অবস্থানের ওপর ভিত্তি করেই সাজানো হয়।

ছবির উৎস, PSG/PSG via Getty Images
'ফলস নাইন' বা নতুন কৌশলের জন্ম
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
দোসরা মে, ২০০৯। রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচে গার্দিওলা বড় একটি সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি মেসিকে উইং থেকে সরিয়ে আক্রমণভাগের একদম সামনে নিয়ে এলেন। তবে তিনি প্রথাগত স্ট্রাইকারের মতো খেলেননি।
তাকে বলা হলো: একটু নিচে নেমে এসো, বল ধরো এবং খেলা নিয়ন্ত্রণ করো। সেই ম্যাচে বার্সা ৬-২ গোলে জিতেছিল। ফুটবলের ভাষায় এই কৌশলটিকে বলা হয় 'ফলস নাইন'।
শুরুতে মেসিকে আটকানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। মেসি যখন নিচে নেমে আসতেন, তখন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা বুঝতে পারতেন না তাকে অনুসরণ করবেন নাকি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবেন। কোনো সিদ্ধান্তই কাজে আসছিল না।
কয়েক সপ্তাহ পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে মেসি গোল করেন। ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে মেসি লা লিগায় ৬৯ ম্যাচে ৯৬টি গোল করেছিলেন।
২০০৯ সালে প্রথম ব্যালন ডি'অর পাওয়ার পর তিনি এটি আরও সাতবার জিতেছেন। মেসি বলেছিলেন, "আগে আমি খেলার কৌশল নিয়ে খুব একটা ভাবতাম না। কিন্তু গার্দিওলার অধীনে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমি বুঝেছি মাঠের জায়গা কীভাবে ব্যবহার করতে হয় এবং খেলা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।"

ছবির উৎস, Leonardo Fernandez/Getty Images
দায়িত্ব বাড়ল মেসির ওপর
২০১৫ সালে জাভি এবং তিন বছর পর ইনিয়েস্তা যখন বার্সা ছাড়লেন, তখন মেসির ওপর দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেল। মাঝমাঠের যে খেলোয়াড়রা তাকে বল জোগান দিতেন, তারা চলে যাওয়ার পর মেসিকেই একইসাথে গোল তৈরি করতে হতো এবং গোল করতে হতো।
এটি যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই কঠিন কাজ। তিনি নিজেকে আবার বদলে ফেললেন। গোলস্কোরার থেকে তিনি হয়ে উঠলেন 'প্লেমেকার'। নিচে নেমে এসে তিনি নিজেই আক্রমণ সাজাতেন, আবার নিজেই গোল করতেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তার গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্ট বা গোল করানোর হারও বেড়ে গেল। পিএসজিতে খেলার সময় তার অ্যাসিস্ট বা গোল করানোর সংখ্যা গোলের চেয়েও বেশি ছিল।

ছবির উৎস, Tnani Badreddine/Defodi Images via Getty Images
অধিনায়কের লড়াই ও জয়
মেসির জন্য আর্জেন্টিনা দলের জার্সিতে ক্যারিয়ারটা ছিল অনেক সংগ্রামের।
২০১১ সালে তিনি অধিনায়ক হন। এরপর ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালসহ টানা তিনটি বড় ফাইনালে হার তাকে বেশ হতাশ করেছিল। শেষ হারের পর তিনি একবার অবসর নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু তিনি ফিরে এলেন এবং বদলে গেলেন।
২০২১ কোপা আমেরিকা জেতার পর আর্জেন্টিনার দীর্ঘ শিরোপা খরা কাটে। ম্যাচের আগে মেসির দেওয়া বক্তব্য ড্রেসিংরুমের সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তুলেছিল।
২০২২ বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্স ছিল এক অসাধারণ বিষয়। সেমিফাইনালে তার সেই দৌড় এবং ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার নিখুঁত পাসিং ছিল দেখার মতো।
২০২৩ সালে জিনেদিন জিদানকে তিনি বলেছিলেন, "ফুটবল অনেক বদলে গেছে। এখনকার খেলা আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলগত এবং শারীরিক। আগে মাঠের খেলোয়াড়রা অনেক বেশি জায়গা পেতেন।"

ছবির উৎস, Maddie Meyer/Getty Images
'শেষ মেসিই সেরা মেসি'
ইন্টার মায়ামি এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা পর্যন্ত দেখা গেছে, মেসি এখন আগের চেয়ে হাঁটেন বেশি।
সমালোচকরা একসময় এটিকে তার দুর্বলতা বলতেন। কিন্তু এখন সবাই বোঝেন যে, তিনি খেলাটি বুঝতে পারছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের জন্য নিজের শক্তি জমিয়ে রাখছেন।
তার ছোটবেলার আদর্শ পাবলো আইমার বলেছিলেন, "সবশেষ মেসিই সবসময় সেরা মেসি।" সম্ভবত তিনি এখনও সঠিক।
দুই দশক ধরে মেসি যা অর্জন করেছেন, তা কেবল ট্রফি বা রেকর্ড নয়। এটি প্রতিটি পর্যায়ে একজন ফুটবলারের নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার গল্প।
এক সময়ের সেই কিশোর উইঙ্গার, পরে কৌশলী 'ফলস নাইন', এরপর সতীর্থদের সেরা করে তোলা প্লেমেকার এবং সবশেষে বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক—মেসি বারবার নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন।
বিশ্বকাপের আগে মেসিকে নিয়ে অনেক কথা শোনা যাবে। কিন্তু মূল বিষয়টি হলো, তিনি কেবল ভালো খেলোয়াড়ই নন, বরং ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে তিনি কতবার নিজেকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে তৈরি করেছেন।








