সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের ঘটনায় কী বলছে পুলিশ

আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের ছবি
ছবির ক্যাপশান, পুলিশ দাবি করছে, গ্রেফতারকৃত সেনা কর্মকর্তারা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে 'রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে' লিপ্ত ছিলেন
    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে অর্থায়নের মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে 'ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড ও উস্কানিমূলক প্রচারণা চালানোর' অভিযোগে সাবেক দুই জন সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে দেশটির গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

তারা হলেন- অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা (৪৩) এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ (৪৭)।

গত রোববার রাতে ঢাকার পল্লবী ও বনানী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম।

গ্রেফতারের পর সেনাবাহিনীর সাবেক ওই দুই কর্মকর্তাকে ঢাকার মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলা গ্রেফতার দেখিয়ে সোমবার বিকেলে আদালতে তোলে পুলিশ। সেখানে তদন্তকারী কর্মকর্তা সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করলেও শুনানি শেষে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

এদিকে, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি'র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী সোমবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জানান, গ্রেফতার হওয়া সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা বাংলাদেশে নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন।

গতবছর ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের যে 'গোপন বৈঠক ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা' অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেটির সঙ্গেও গ্রেফতারকৃত সাবেক এই দুই সেনা কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র।

গত বছরের জুলাই মাসের ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সেনাবাহিনীর মেজর মো. সাদিকুল হককে চাকরিচ্যুত করে আইনের আওতায় আনা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে গ্রেফতার হওয়া সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার পক্ষের বা তাদের পরিবারের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

বিএনপি'র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী
ছবির ক্যাপশান, বিএনপি'র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী

'অবৈধ অর্থায়ন'

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সোমবার এক বিবৃতিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে যে, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

সেগুলোর মধ্যে একটি অভিযোগ হচ্ছে, 'দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে' যুক্ত থাকা'।

গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই ওই দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক ও সাজাপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিলেন এবং 'বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র' করছিলেন।

এরই অংশ হিসেবে, গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা সহযোগীদের সঙ্গে মিলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ইন্টারনেটে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নানান 'সরকারবিরোধী প্রচারণা, উস্কানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার' করছিলেন।

এসব কাজে জড়িত থাকার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনায় 'অবৈধভাবে অর্থায়ন' করারও অভিযোগ রয়েছে গ্রেফতার হওয়া দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা হোয়াটসঅ্যাপে 'বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টারস আলফা নাম্বার ওয়ান' এর মতো গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির পক্ষে অর্থ সংগ্রহও করে আসছিলেন।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাদেরকে ধরতে রোববার রাত ১২টা থেকে রাত তিনটা পর্যন্ত অভিযান চালান গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা।

ওই সময় ঢাকার পল্লবী এলাকা থেকে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরাকে এবং বনানী ডিওইচএস এলাকা থেকে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষকে গ্রেফতার করা হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে ডিএমপি।

হাতকড়া
ছবির ক্যাপশান, গ্রেফতারের পর ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয় সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে

'নাশকতার পরিকল্পনা'

দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার মাধ্যমে তারেক রহমানের সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা নানান ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।

আসন্ন দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বিভিন্ন স্থানে 'নাশকতার পরিকল্পনা হচ্ছে' বলেও মন্তব্য করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।

"এই জিনিসটা মাথায় রাখতে হবে, সামনে দুর্গাপূজা...পরাজিত শক্তি এবং তাদেরকে যারা মদদ দিচ্ছে, তারা নানাভাবে এটাকে ম্লান করার জন্য, সরকারের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করার জন্য তারা চেষ্টা করবে," সোমবার ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন মি. রিজভী।

রোববার রাতে সাবেক যে দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তারাও নাশকতার পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করেন বিএনপি'র এই শীর্ষ নেতা।

"চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র কিন্তু থেমে নেই। গতকাল (রোববার) অবসরপ্রাপ্ত দু'জন সামরিক কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কারণ, নানান নাশকতার পরিকল্পনা হচ্ছিলো," বলেন মি. রিজভী।

অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি প্রতিমা বিসর্জনের নিরাপত্তায় ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

তারপরও পরিস্থিতি যেন কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেজন্য বিএনপি নেতাকর্মীদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি'র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।

"আমাদেরকে থাকতে হবে ঘুমহীন একটা গার্ড এর মতো, প্রহরীর মতো...প্রত্যেকটি পূজামণ্ডপে আমাদের পাহারার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমাদের পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকতে হবে, আমাদের নজরদারির মধ্যে থাকতে হবে," নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন মি. রিজভী।

পুলিশের ছবি
ছবির ক্যাপশান, নাশকতা ঠেকাতে পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে সরকার

গ্রেফতারকৃতরা কারা?

গ্রেফতার হওয়ার পর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষের বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

যদিও তাদের বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ।

তবে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে অতীতে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যাচ্ছে, অভিযুক্ত মিজ আরা ও মি. দেবাশীষ বেশ আগেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসরে গেছেন।

এর মধ্যে লেফটেন্যান্ট পদে থাকাকালে মিজ আরা ২০০৭ সালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন বলে জানা যাচ্ছে।

এরপর তিনি ঢাকার বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মিজ আরা একপর্যায়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে ব্যবসা শুরু করেন বলে জানা যাচ্ছে।

মিজ আরা ও মি. দেবাশীষের সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের 'সখ্যতা' ছিল বলে দাবি করেছে পুলিশ।

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটার পর থেকে তারা বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে 'ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড ও উস্কানিমূলক প্রচারণা' চালিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের যে 'গোপন বৈঠক' অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেটির সঙ্গেও গ্রেফতারকৃত সাবেক এই দুই সেনা কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা সব ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে দেখছেন।

গ্রেফতারকৃত সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে সোমবার আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তবে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।