ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ফ্রান্স ও স্পেন কার শক্তি কতটুকু?

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
- Author, সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ
- Role, অতিথি লেখক
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দলের ও ম্যাচের টুর্নামেন্টটি শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। একশোর অধিক ম্যাচ খেলার পর মাত্র চারটি দল টিকে আছে সেমিফাইনালের জমজমাট লড়াইয়ে।
পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে দারুণ সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলা এবং বেশ কিছু আপসেট হলেও শেষপর্যন্ত এই পর্যায়ে যে চারটি দল টিকে আছে তারা ফিফার র্যাংকিং অনুযায়ীও শীর্ষ চারটি দল। ফিফা ১৯৯২ সালে র্যাংকিং পদ্ধতি চালু করার পর এমনটি আর ঘটেনি। আর এই চারটি দল সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নও।
এর আগে মাত্র দুবার, ১৯৭০ এবং ১৯৯০ সালে চারটি সেমিফাইনালিস্টই ছিল প্রাক্তন চ্যাম্পিয়ন। এই চারটি দলই বিশ্বকাপের সেরা ফর্মে আছে এবং শেষতক চ্যাম্পিয়ন হবার স্বপ্ন দেখছে।
গতবারে ফাইনালে হেরে যাওয়া ফ্রান্স এবার টুর্নামেন্টে প্রথম থেকেই দারুন ফুটবল খেলে একের পর এক দলকে পরাস্ত করছে। তাদের লক্ষ্যে টানা তৃতীয়বারে মতো ফাইনালে উঠা এবং সেই খেলায় জয়লাভ করে ১৯৯৮ এবং ২০১৮ সালের পর আবার শিরোপা জেতা। সেই লক্ষ্যে আরো একটি বাধা পার হতে প্রথম সেমিফাইনালে দলটি মুখোমুখি হবে স্পেনের।
মঙ্গলবার রাতে, বাংলাদেশ সময় ১৫ই জুলাই রাত ১টায়, ডালাসে খেলাটি অনুষ্ঠিত হবে।
এই টুর্নামেন্টে এখনো পর্যন্ত ছয়টি ম্যাচ খেলে ছয়টিতেই জিতেছে ফ্রান্স। গ্রুপ পর্বে সেনেগাল, ইরাক ও নরওয়েকে হারিয়ে নয় পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয়; এরপর নকআউটে সুইডেনকে ৩-০, প্যারাগুয়েকে ১-০ এবং মরক্কোকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে।
গোলের বন্যা বইয়ে দেওয়া ফ্রান্সের হয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে আটটি, উসমান দেম্বলের পাঁচটি গোল করেছেন। পাঁচটি এসিস্ট করে তুখোড় ফর্মে আছে মধ্যমাঠের কান্ডারী মাইকেল অলিসে।
অন্যদিকে স্পেনের যাত্রাপথটা ছিল একটু অমসৃণ। প্রথম ম্যাচেই নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে। এরপর সৌদি আরবকে ৪-০ ও উরুগুয়েকে ১-০ ও অস্ট্রিয়াকে ৩-০ ব্যবধানে হারায়। তবে রাউন্ড অব ১৬ এর খেলায় পর্তুগালের বিপক্ষে মিকেল মেরিনোর ৯০তম মিনিটের গোলে ১-০ জয় পায়, আর কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে আবারও মেরিনোর ৮৮তম মিনিটের গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় পায়।
তবে, গোল দিতে কিছুটা বেগ পেতে হলেও ২০১০ সালের পর এই প্রথম সেমিফাইনালে উঠা স্পেন এবারের টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি গোল হজম করেছে।
ফলে, বলা যায় যে দুই ইউরোপীয় পরাশক্তির সেমিফাইনালটি হবে মূলত ফ্রান্সের দুর্দান্ত আক্রমণভাগ আর স্পেনের জমাট রক্ষণভাগের।

ছবির উৎস, FIFA via Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ফ্রান্সের আক্রমণভাগ সব দলের জন্য ভীতির সঞ্চার করেছে। এমবাপ্পে কেবল গোল্ডেন বুট জেতার রেসেই নেই, তিনি সর্বকালের রেকর্ড ভাঙ্গার দিকেও এগোচ্ছেন।
ব্যালন ডি অর জেতা উসমান দেম্বেলে ফ্রান্সের হয়ে সেরা ফর্মে আছেন। এই দুই দারুন গতিশীল খেলোয়াড় ফিনিশার হিসেবে বিশ্বসেরা। তবে, এই দলের মধ্যমাঠের প্রাণভোমরা হয়ে আছেন ওলিসে।
গত বিশ্বকাপের ফাইনালে হারার পর ফ্রান্স দলের বেশকিছু পরিবর্তন এসেছিলো। এর ফলশ্রুতিতে এমবাপ্পের মতো খেলোয়াড় থাকলেও ২০২৪ সালের ইউরোতে দলটি গোল পেতে হিমশিম খেয়েছিলো। শেষমেশ স্পেনের কাছে সেমিফাইনালে ২-১ গোলে হেরে দলটি বিদায় নেয়।
কিন্তু, সেই ফ্রান্সের খেলার ধার পরিবর্তন হয়ে গেছে ওলিসের উপস্থিতিতে। এমবাপ্পে, ডেম্বেলে আর বার্কোলার তুমুল গতিকে তিনি দারুণভাবে কাজে লাগান। ওলিসে সেই ধরনের মিডফিল্ডার যিনি প্রতিপক্ষের মুভমেন্ট এবং ফাঁকা স্পেস পড়তে পারেন এবং সেই অনুসারে বুদ্ধিদীপ্তভাবে দলের গতিশীল ফরোয়ার্ডদের বল সরবরাহ করেন।
আর ওলিসের সাথে মাঝমাঠে দারুন সহায়তা করেন অভিজ্ঞ আদ্রিয়ান রাবিও এবং মানু কোনে। এই দুইজন মূলত রক্ষণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন এবং মধ্যমাঠের দখল ধরে রাখেন। এর ফলে ফ্রান্সের রক্ষণভাগও জমাট থাকে। যার প্রমাণ হচ্ছে, নক আউট পর্বের তিনটি ম্যাচে দলটি কোনো গোল খায়নি।
ফ্রান্সের আরেকটি দারুণ শক্তির জায়গা হলো তাদের বেঞ্চ। পৃথিবীর ইতিহাসে সেরা দলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় বেঞ্চের শক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। খেলার শেষ দিকে প্রতিপক্ষ যখন ক্লান্ত থাকে তখন যদি মানসম্পন্ন বদলীরা মাঠে নামেন তবে খেলার ফলাফলে তা বড় ভূমিকা রাখে।
ফ্রান্সের আক্রমণ ত্রয়ির বদলি হিসেবে নামেন টানা দুইবার চ্যাম্পিয়নস লীগ জেতা পিএসজির স্ট্রাইকার ব্র্যাডলি বারকোলা। মধ্যমাঠে খেলা ম্যানচেস্টার সিটির রায়ান চেরকি এখনো মাঠে নামার সুযোগই পাননি। বেঞ্চ গরম করছেন লিভারপুলে খেলা রক্ষণভাগের খেলোয়াড় ইব্রাহিমা কোনাতে।
দিদিয়ের দেশম কোচ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দলটির সাথে আছেন। খেলোয়াড় ও কোচ উভয় ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জেতা দেশম এখনো পর্যন্ত দলটিকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতে পেরেছেন। এই দলটিকে হারানো প্রায় অসম্ভব মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
তবে, এই দলটিকে হারানোর মতো রসদ রয়েছে স্পেনের। একদল তরুণ খেলোয়াড় নিয়ে স্পেন দাপটের সাথে ইউরো ২০২৪ চ্যাম্পিয়ন হয়। লামিন ইয়ামাল চোট নিয়ে বিশ্বকাপে এসে এখনো পুরোপুরি জ্বলে উঠতে পারেননি। এযাবত মাত্র একটি গোল করেছেন। তবে নিজের দিনে এই তরুণ যে কোনো প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিতে পারেন।
ইয়ামালের গোলের অভাবটা অবশ্য টের পেতে দিচ্ছেন না মিকেল ওইয়ারসাবাল। বাস্কের এই স্ট্রাইকার ইতোমধ্যেই চারটি গোল দিয়েছেন। দানি অলমোও নিজের ঝলক দেখাতে শুরু করেছেন।
তবে, স্পেনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছেন বদলি খেলোয়াড় মিকেল মরেনো। মাত্র ১৩৬ মিনিট খেলেই রাউন্ড অব ১৬ ও কোয়ার্টার ফাইনালে জয়সূচক গোল করেছেন বদলি হিসেবে নেমে। দুইটি গোলই এসেছে খেলার একদম শেষের দিকে।
তবে, স্পেনের এবারের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি তাদের রক্ষণ। বেলজিয়াম ম্যাচের আগ পর্যন্ত টানা ছয় ম্যাচে কোনো গোল হজম করেনি, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে দীর্ঘতম রেকর্ড। সব মিলিয়ে পাঁচ ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে তারা, সেটাও কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে।
স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন ইতোমধ্যেই বিশ্বরেকর্ড করেছেন। পেদ্রো পোরো, আমেরিক লাপোর্তে, মার্ক কুকুরেয়ারা সিমনের সামনে নিশ্ছিদ্র রক্ষণ তৈরি করেন। আর এই দলের মাঝমাঠের কান্ডারী রদ্রি। ব্যালন ডি অর জেতা এই মিডফিল্ডার রক্ষণ এবং আক্রমণের মধ্যে দারুণ সমন্বয় গড়ে তোলেন। রদ্রির এই গুণের কারণে তিনি ম্যানচেস্টার সিটিতেও ছিলেন দলের প্রাণভোমরা।
স্পেন পজেশন ভিত্তিক ফুটবল খেলে। দলটি বল পায়ে রেখে নিজেদের মধ্যে পাস দেয় এবং প্রতিপক্ষের পায়ে বল গেলে দ্রুত আবার তা দখল করতে চেষ্টা করে। তবে, এই কৌশলের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, ফ্রান্সের মতো গতিশীল দলগুলো কাউণ্টার অ্যাটাক থেকে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত স্পেনের খেলোয়াড়রা যদি উপরে উঠার চেষ্টা করে তখন নিচে ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে আর তা কাজে লাগাতে মুখিয়ে থাকবেন এমবাপ্পে, ডেম্বেলেরা।
ট্যাকটিকাল জায়গা থেকে গুরুত্বপূর্ণ হবে রদ্রি কতটা খেলে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এই স্পেনীয় মিডফিল্ডার চাইবেন নিজের মতো করে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে, কিন্তু ফ্রান্সের কাজ হবে প্রেস করে তাকে বাধা দেওয়া।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
অন্যদিকে স্পেনের ডিফেন্ডার পেদ্রো পোরো এমবাপ্পেকে এবং কুকুরেয়া দেম্বেলেকে কীভাবে সামাল দেন তা ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। ফ্রান্সের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের ইয়ামালকে থামাতে হবে। বদলি খেলোয়াড়দের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেটপিসগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে ডালাসের গরমে দুপুর বেলা এক উত্তপ্ত লড়াই হওয়ার কথা। যদিও ছাদযুক্ত অবকাঠামোর কারণে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। স্পেন কিছুটা সুবিধা পাবে এই মাঠেই পর্তুগালের বিপক্ষে রাউন্ড অফ ১৬ এর ম্যাচটি খেলার কারণে। মাঠের আকারও স্পেনের পজিশন ভিত্তিক ফুটবলের জন্য সহায়ক হবে। তবে, মসৃণ ঘাসের পৃষ্ঠ ফ্রান্সের দ্রুতগতির ফুটবলের জন্য কার্যকরী হবে।
ফ্রান্স-স্পেন ইউরোপের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৩৮ বার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল, যেখানে স্পেন এগিয়ে ১৮ জয় নিয়ে, ফ্রান্সের জয় ১৩টি, আর ৭টি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে স্পেনই বেশি সফল। সর্বশেষ সাক্ষাতে, ২০২৫ সালের উয়েফা নেশন্স লিগ সেমিফাইনালে, ইয়ামালের জোড়া গোলের সুবাদে স্পেন ৫-৪ গোলে জিতেছিল এক রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে। এর আগে, ২০২৪ ইউরোর সেমিফাইনালেও ইয়ামাল ও দানি অলমোর গোলে ২-১ ব্যবধানে স্পেন জিতেছিল। ইউরো প্রতিযোগিতায় পাঁচ বারের সাক্ষাতে দুই দলই দুটি করে জয় পেয়েছে, একটি ড্র হয়েছে।
বিশ্বকাপ মঞ্চে অবশ্য মাত্র একবারই দুইদল মুখোমুখি হয়েছে। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে ২০০৬ সালের সেই ম্যাচে ফ্র্যাংক রিবেরি, প্যাট্রিক ভিয়েরা ও জিনেদিন জিদানের গোলে ফ্রান্স ৩-১ ব্যবধানে জিতেছিল।
মাঠের শক্তি, কৌশল ও ইতিহাস সব মিলিয়ে সমানে সমানে এক লড়াই হওয়ার কথা বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে।








