সুইজারল্যান্ডের সাথে আর্জেন্টিনার জয়ের ম্যাচে আলোচনায় রেফারির লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত

সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলোর লাল কার্ড নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলোর লাল কার্ড নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

বিশ্বকাপ ফুটবলে মিশরের সাথে আর্জেন্টিনার রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচের পর যেমন রেফারিং নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, শেষ কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-১ গোলের জয়ের পরও একই অবস্থা।

এবার রেফারির একটি লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে ম্যাচের ৭২ মিনিটের দিকে, দুই দল যখন ১-১ এর সমতায়।

আর্জেন্টিনার প্রথমার্ধে করা গোলের জবাবে তার কিছুক্ষণ আগেই সুইজারল্যান্ড একটি গোল করেছে।

গোল করার পর আর্জেন্টিনার ডিফেন্স আর গোলকিপারকে সুইজারল্যান্ডের খেলোয়াড়রা খানিকটা চাপের ওপরই রাখছিলো সেসময়।

এমন সময় আর্জেন্টিনার হাফের মাঝামাঝি অংশের বাম দিকে সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোকে ফাউল করায় আর্জেন্টিনার লেয়ান্দ্রো পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি।

আপাতদৃষ্টিতে ফুটবল মাঠের হিসেবে এটি খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা।

কিন্তু ওই ট্যাকেল আর হলুদ কার্ডের পর খেলা শুরু হতে কিছুটা দেরি হচ্ছিল, মাত্র হলুদ কার্ড পাওয়া পারেদেসকে দেখা যাচ্ছিল রেফারির সাথে কথা বলতে।

লাল কার্ড পাওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন এমবোলো

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, লাল কার্ড পাওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন এমবোলো

মিনিটখানেকের মধ্যে ফিল্ড রেফারি মাঠের পাশে থাকা মনিটরে সিদ্ধান্ত রিভিউ করতে যান।

ফিরে এসে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং পারেদেসের জায়গায় ব্রিল এমবোলোকে হলুদ কার্ড দেখান।

সুইস ফরোয়ার্ডের সেটি ছিল ম্যাচে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড, তাই স্বাভাবিকভাবেই রেফারিকে তার পকেট থেকে লাল কার্ডও বের করতে হয়।

এমব্রোলো লাল কার্ড দেখে মাঠের বাইরে যেতে যেতে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এরপর ১০ জনের দল সুইজারল্যান্ড শেষ পর্যন্ত আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি।

৯০ মিনিটের খেলা ১-১ গোলে শেষ হলে অতিরিক্ত সময়ের শেষ ১০ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজ আর লাউতারো মার্টিনেজের দুই গোলে ৩-১ এর হার নিশ্চিত হয় সুইসদের।

যে নিয়মে লাল কার্ড দেখতে হলো এমবোলোকে

এবারের বিশ্বকাপে ফিফার নতুন এক আইন অনুযায়ী দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখতে হয়েছে সুইস ফরোয়ার্ডকে।

'মিসটেইকেন আইডেন্টিটি রুল' অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় যদি একটি ফাউলের জন্য হলুদ বা লাল কার্ড দেখে, কিন্তু ফাউলটি আসলে প্রতিপক্ষের কোনো খেলোয়াড়ের করা হয়ে থাকে, তাহলে ওই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দায়ী খেলোয়াড়কে একই শাস্তি দেবেন রেফারি।

ম্যাচের ১১১ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজের গোলে লিড নেয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ম্যাচের ১১১ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজের গোলে লিড নেয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা

অর্থাৎ, আর্জেন্টিনার পারেদেসকে যদি রেফারি হলুদ কার্ড না দেখাতেন, তাহলে এমবোলোকে মিসটেইকেন আইডেন্টিটি রুল অনুযায়ী হলুদ কার্ড দেখতে হতো না।

এবারের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র আর প্যারাগুয়ের ম্যাচে এই নিয়মের প্রয়োগ দেখা গেছে একবার।

ওই ম্যাচে প্যারাগুয়ের মিগেল আলমিরনকে যুক্তরাষ্ট্রের টিম রিম ফাউল করায় প্যারাগুয়ে ফ্রি কিক পায় ও টিম রিমকে দেখতে হয় হলুদ কার্ড।

কিন্তু পরে ভিএআর রিভিউ করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয় এবং ডাইভ দেয়া বা ফুটবলের পরিভাষায় 'সিমুলেশন' এর অপরাধে উল্টো হলুদ কার্ড দেখেন আলমিরন।

টিম রিমের হলুদ কার্ড ফিরিয়ে নেয়া হয়।

আর্জেন্টিনার সাথে ম্যাচে এমবোলো যেভাবে ফাউল আদায় করতে ডাইভ দিয়েছেন, সেরকম ক্ষেত্রেও অনেক সময় হলুদ কার্ড দেখিয়ে থাকেন রেফারিরা।

তবে ডাইভ দেয়া বা সিমুলেশনের ক্ষেত্রে সবসময় হলুদ কার্ড দেখাতেই হবে, এমন বাধাধরা নিয়ম নেই।

প্রথমার্ধের ১০ মিনিটেই ম্যাক আলিস্টারের গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, প্রথমার্ধের ১০ মিনিটেই ম্যাক আলিস্টারের গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা

ফুটবল বিশ্লেষকরা যা বলছেন

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচ শেষে এমবোলোর লাল কার্ড পাওয়া, রেফারির সিদ্ধান্তে ভিএআরের হস্তক্ষেপসহ নানা বিষয় নিয়ে তৈরি হয় আলোচনা।

ফুটবল বিষয়ক বিশ্লেষকরা রেফারির সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে থাকেন।

মেজর লিগ সকারের সাবেক ফরোয়ার্ড ব্র্যাডলি রাইট ফিলিপস আইটিভির ওয়ার্ল্ডকাপ প্র্রোগ্রামে বলছিলেন যে, "আমি এমবোলোর সতীর্থদের জন্য সহমর্মী, কিন্তু এমবোলোর জন্য নয়। তার জন্য তার দল হয়তো সেমিফাইনালে যেতে পারলো না।"

আবার এমবোলোর ডাইভ বা সিমুলেশনের সমালোচনা করলেও কোনো কোনো বিশ্লেষক লাল কার্ড দেখানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।

আইটিভি স্পোর্টসে সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্যাপ্টেন রয় কিন মন্তব্য করেছেন যে এই সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপের রেফারিংয়ের ধারাবাহিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় কারণ এই বিশ্বকাপে এর আগে একাধিকবার এমন ডাইভ বা সিমুলেশনের ঘটনা ঘটলেও কার্ড দেখানো হয়নি।

রয় কিন বলেন, "আমার কাছে সামান্য ট্যাকেলে এমবোলোর পড়ে যাওয়াটা বিষয় নয়, বড় বিষয় হলো ধারাবাহিকতা।

যদি এই ম্যাচে এ নিয়ম মানা হয়, তাহলে আগের ম্যাচগুলোতেও একই নিয়ম মানা উচিৎ ছিল। একজন খেলোয়াড়কে একটি অপরাধের জন্য আপনি শাস্তি দিতে পারেন না, যদি সেই একই অপরাধ এর আগে পাঁচ থেকে ছয়বার আপনি ক্ষমা করে দিয়ে আসেন।"

দ্বিতীয়ার্ধে সুইজারল্যান্ডের হয়ে সমতাসূচক গোল করেন এনদোয়ে

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, দ্বিতীয়ার্ধে সুইজারল্যান্ডের হয়ে সমতাসূচক গোল করেন এনদোয়ে

রয় কিন সিমুলেশন বা ডাইভ দেয়ার বিষয়টির ওপর জোর দিলেও বিবিসি স্পোর্টসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এমবোলোর হলুদ কার্ড এই ক্ষেত্রে সিমুলেশন বা ডাইভ দেয়ার জন্য দেয়া হয়নি।

তার হলুদ কার্ডের পেছনে কারণ ফিফার নতুন 'মিসটেইকেন আইডেন্টিটি রুল।'

পারেদেসকে হলুদ কার্ড না দেখালে রেফারির হাতে সুযোগ থাকবতো এমবোলোকে কার্ড না দেখানোর।

কিন্তু পারেদেসকে কার্ড দেখানোর ফলে নিয়ম অনুযায়ী এমবোলোকে কার্ড দেখানো ছাড়া কিছু কারর ছিল না রেফারির।

রয় কিনের মত বিশ্লেষকদের অনেকে রেফারির সমালোচনা করলেও সাবেক ফুটবলারদের একটা বড় অংশ এমবোলোর সমালোচনা করেছেন ডাইভ দিয়ে আরেকজন খেলোয়াড়কে ভুক্তভোগী করার চেষ্টা করার জন্য।

তাদের মধ্যে সবচেয়ে কড়া সমালোচক ছিলেন সম্ভবত ফ্রান্সের থিয়েরি অঁরি।

ফুটবলারদের ন্যায়পরায়নতা আর স্পোর্টসম্যানশিপের উদাহরণ তুলে এমবোলোর তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স স্পোর্টসের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠানে এই ডাইভ সম্পর্কে তার মতামত ছিল, "আপনি যদি এই ঘটনায় এমবোলোকে সমর্থন করেন, তাহলে ফুটবল আপনার জন্য নয়।"

এমবোলো লাল কার্ড পেলে দশ জন নিয়ে ম্যাচে ফিরতে পারেনি সুইসরা

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, এমবোলো লাল কার্ড পেলে দশ জন নিয়ে ম্যাচে ফিরতে পারেনি সুইসরা