'সতর্কতা' সত্ত্বেও গত ছয় মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ১০ জন নিহত কেন?

    • Author, মরিয়ম সুলতানা
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ভারত থেকে কথিত 'পুশ ইন' ঠেকাতে কয়েক মাস ধরেই সীমান্তে নজরদারি ও সতর্কতা বাড়ানোর কথা বলছে বাংলাদেশ সরকার। তবে এরপরও প্রাণহানি থামেনি।

স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) সংশ্লিষ্ট অন্তত ২১টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

আর এসব ঘটনায় মোট ১০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে সাতজনই নিহত হন গুলিতে।

এদিকে, গত ছয় মাসে বিভিন্ন সীমান্ত সহিংসতার ঘটনায় বিএসএফের হাতে ছয়জন নিহত হওয়ার তথ্য বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

২০২৪ সালের অগাস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। এরপর সীমান্তে 'পুশ ইন' নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয় এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্তে টহল ও নজরদারিও বাড়ানো হয়।

বাংলাদেশের বিজিবি 'সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়' থাকার কথাও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।

তবে কড়াকড়ির কথা বলা হলেও সীমান্তে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বছরের পর বছর ধরে পরিস্থিতি যেমন ছিল, এর তেমন কোনো পরিবর্তন এখনো হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ছয় মাসে সীমান্তে নিহত ১০ জন

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বিএসএফ-এর হাতে অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন; এর মধ্যে সাতজন গুলিতে এবং তিনজন শারীরিক নির্যাতনের কারণে প্রাণ হারান।

গুলিতে নিহতদের মধ্যে সিলেট বিভাগে তিনজন, রংপুরে দুইজন এবং চট্টগ্রামে দুইজন ছিলেন।

নির্যাতনে নিহতদের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে ছিলেন দুইজন এবং রংপুর বিভাগে একজন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য সংগ্রহের কথাও জানিয়েছে আসক।

তাদের হিসাবে, একই সময়ে সীমান্ত সহিংসতায় আহত হয়েছেন আরও ১০ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে পাঁচজন, খুলনা ও রংপুর বিভাগে দু'জন করে এবং রাজশাহী বিভাগে একজন আহত হন।

বিবিসি বাংলাকে আসক জানিয়েছে, হতাহতের ঘটনাগুলো মূলত খুলনা বিভাগের ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা; সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ; রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটেছে।

এছাড়া, রংপুর বিভাগে একজনকে অপহরণ বা আটক করার ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে আসক।

তবে এই সময়ে বিএসএফের ধাওয়া খেয়ে কারও মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড হয়নি।

সেইসাথে, অপহরণ বা আটক হওয়ার পর কাউকে ফেরত দেওয়ার ঘটনাও সংস্থাটির হিসাবে নেই।

এদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে, তাদের হিসেবে গত ছয় মাসে বিভিন্ন সীমান্ত সহিংসতার ঘটনায় বিএসএফের হাতে ছয়জন নিহত হয়েছেন এবং এই নিহতদের মাঝে বাংলাদেশিদের পাশাপাশি একজন ভারতের নাগরিকও রয়েছেন।

বিজিবি'র তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে যে দু'জন নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ভারতীয়। এছাড়া, মে মাসে তিনজন ও জুন মাসে একজন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।

বিগত বছরগুলোয় একই সময়ে হতাহত কত ছিল?

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে সীমান্তে আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি আহত ও নিহত হয়েছিলেন। ওই সময়ে ১৫ জন নিহত এবং ২৯ জন আহত হন। এর মধ্যে ১০ জন গুলিতে এবং পাঁচজন শারীরিক নির্যাতনের কারণে প্রাণ হারান।

গুলিতে নিহতদের মধ্যে খুলনা ও রংপুর বিভাগে তিনজন করে, সিলেটে দুইজন এবং চট্টগ্রামে দুইজন ছিলেন। অন্যদিকে, শারীরিক নির্যাতনে নিহতদের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে দুইজন এবং খুলনা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে একজন করে ছিলেন।

একই সময়ে সীমান্ত সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় আহত হন আরও ২৯ জন। এর মধ্যে খুলনা বিভাগে ১৩ জন, রাজশাহীতে সাতজন, রংপুরে পাঁচজন, চট্টগ্রামে তিনজন এবং সিলেটে একজন আহত হন।

এছাড়া, ওই সময়ের মাঝে নয়জনকে অপহরণ বা আটক করার ঘটনাও নথিভুক্ত করে আসক।

এর আগের বছর, ২০২৪ সালের একই সময়ে নিহত হন ১৪ জন এবং আহত হন ১১ জন।

এদিকে, ২০২৩ সালেও সীমান্তে নিহতের সংখ্যা ছিল ১১ জন, আহত হন ১৪ জন।

এর আগে, ২০২২ সালের জানুয়ারি-জুন, এই সময়ে নিহত হন পাঁচজন এবং আহত হন চারজন। ২০২১ সালের একই সময়ে নিহত হন ছয়জন এবং আহত হন চারজন।

গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে। ওই ছয় মাসে সীমান্তে ২৬ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ১৫ জন আহত হন।

এরও আগে, ২০১৯ সালের একই সময়ে সীমান্তে ২০ জন নিহত হন এবং আহত হন পাঁচজন।

কড়াকড়ি সত্ত্বেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হচ্ছে না কেন?

চলতি বছরের গত ছয় মাসের ওইসব ঘটনা বা তার আগের বছরগুলোর জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো কম-বেশি স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় এসেছে।

সেগুলোর বেশ কিছু খবর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিটি প্রাণহানি পেছনে পরিস্থিতি একই ধরনের ছিল না। কেউ সীমান্ত পেরিয়ে গবাদিপশু আনতে গিয়েছিলেন, কাউকে চোরাকারবারি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে, কেউ বা আবার গবাদিপশুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলামের মতে, সীমান্ত হত্যার ক্ষেত্রে ভারত যেমন 'অনুপ্রবেশ' ইস্যুটিকে সামনে আনে, সেটা সব ঘটনার ক্ষেত্রে একভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। অনেকেই তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেন।

"এ পাড়ের আত্মীয়স্বজন মনে করে, ও পাড়ে গিয়ে একটু দেখে আসি। অথবা, এ পাড়ের গরু ও পাড়ে গেছে এবং তখন সেই গরু আনতে যাওয়ায় গুলি করে দিয়েছে বিএসএফ," বলছিলেন তিনি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথমার্ধে সীমান্তে হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কম হওয়ার পেছনে সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়ানোর প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

যদিও আরও আগের বছরগুলোর, বিশেষ করে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল, একই সময়সীমার দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২১ ও ২০২২ সাল ছাড়া বাকি বছরগুলোয় বিএসএফের হাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণহানির ও আহতের ঘটনা ঘটেছে।

সেই সময়ের ব্যাপারে মি. ইসলাম বলেন, অতীতে সীমান্তে হতাহতের বড় একটি কারণ ছিল গবাদিপশু চোরাচালান। তবে বাংলাদেশে গরুর খামার বাড়ায় এবং দেশ গরু উৎপাদনে অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠায় এই চোরাচালান আগের তুলনায় কমেছে। একসময় ফেনসিডিল পাচারও সীমান্তে সংঘাতের একটি বড় কারণ ছিল।

তবে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, 'পুশইন' ইস্যুতে সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়লেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

কারণ চার হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্তে সব জায়গায় একই মাত্রার নজরদারি রাখা সম্ভব নয়। টহলের মধ্যেও ফাঁক থেকে যায়, আর সেই সুযোগেই মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে।

তিনি বলেন, "এ পাড়-ও পাড়ের মানুষ একটি রেখার মধ্য দিয়ে যেভাবে বিভাজিত... দেখা গেছে যে একটি জমির বা বাড়ির এক অংশ বাংলাদেশে, আরেক অংশ ভারতে... সেখানে দুই দেশের মানুষ প্রয়োজনে বা আত্মীয়তার কারণে আসা-যাওয়া করে। এটা তাদের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।"

বাংলাদেশ থেকে অনেকে চিকিৎসা, বাজার-সদাই, পূজাপার্বপণ দেখতে ভারতে যান। আবার, ভারতের যেসব এলাকায় বাজার-ঘাট দূরে, তারাও বাংলাদেশে বাজার করতে আসেন- উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, "অনেক সময় বাংলাদেশের নাগরিকরা সীমান্তের কাছাকাছি গেলে ভারত গুলি চালায়। এক্ষেত্রে অজুহাত দেখায় যে চোরাকারবারি।"

তবে তার অভিমত, চোরাচালানের অভিযোগ থাকলে গুলি না করে তাদের আটক করে বিচারের মুখোমুখি করা যেতে পারে।

এদিকে, এমদাদুল ইসলামের মতো তিনিও মনে করেন যে বর্তমানে 'পুশ ইন' ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবির বাড়তি সতর্কতা এবং সীমান্ত এলাকার মানুষের সচেতনতার কারণে চলতি বছরের প্রথমার্ধে হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কমেছে, কিন্তু এর মানে বলা যাবে না যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

তার ভাষায়, "বিগত বছরগুলোতে এক সরকারের সাথে আরেক সরকারের সম্পর্ক 'ভালো' হলেও সীমান্ত হত্যাকাণ্ড কখনোই থেমে থাকেনি। সুসম্পর্ক থাকাকালীনও সীমান্ত হত্যা ঘটেছে, কখনও কখনও সংখ্যায় অনেক বেশি। এটা আসলে দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় না।"

"আমরা বলি যে সম্পর্ক 'ভালো' ছিল। কিন্তু সম্পর্ক যেসব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে ভালো বা মন্দ বলা হয়, সেই বিষয়গুলোকে হিসেবে নেওয়া হয়নি। যেমন– সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক বিনিময়কে সামনে আনলে সম্পর্ক ভালো ছিল বলার সুযোগ নেই।"