দূষণে বিপর্যস্ত তুরাগ

তুরাগের পানি কালো বর্ণ ধারণ করেছে।
ছবির ক্যাপশান, তুরাগের পানি কালো বর্ণ ধারণ করেছে।
Published

দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এটি একটি নদ। কোন স্রোত নেই, প্রাণ নেই। এই তুরাগ নদ এখন বিভিন্ন জায়গায় নর্দমার আকার ধারণ করেছে।

নৌকায় ঘুরে বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেল অবলীলায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে তুরাগে। তুরাগ পাড়েই জন্ম ৬৫ বছর বয়সী জালালউদ্দিনের।

তুরাগের অবস্থা দেখে তার মুখে শুধুই আফসোসের সুর। তার শৈশবের স্মৃতি বর্ণনা করে জালালউদ্দিন জানালেন একসময় এই নদীতে স্রোত ছিল।

* <bold><link type="page"><caption> দেখুন: ইন্টার‍্যাকটিভ ম্যাপে বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ নদী</caption><url href="http://www.bbc.com/bengali/news/2016/04/160406_amar_nodi_interactive_map" platform="highweb"/></link> </bold>

চোখের সামনে কিভাবে এই নদী ধীরে ধীরে দূষণের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে উঠল সেটি দেখলে তার কাছে ‘অবিশ্বাস্য’ মনে হয়।

তুরাগের পাড়েই জীবন পার করছেন জালালউদ্দিন।
ছবির ক্যাপশান, তুরাগের পাড়েই জীবন পার করছেন জালালউদ্দিন।

জালালউদ্দিন বলেন , “ এই নদী অনেক সুন্দর ছিল। বর্তমানে এটা ড্রেনের উপযুক্ত হয়ে গেছে।”

এই তুরাগ নদে গোসল করে, সাতার কেটে জালালউদ্দিনের মতো আরো বহু নদী তীরের মানুষ।

* <bold><link type="page"><caption> ক্লিক করুন: আমার নদী, বিবিসি বাংলার ফেসুবক পাতা</caption><url href="https://www.facebook.com/events/175701469475522/?active_tab=posts" platform="highweb"/></link> </bold>

নদীতে মাছ ধরে অনেকে জীবন-জীবিকা যেমন চালিয়েছেন তেমনি খাবারের পাতেও তুরাগের মাছ ছিল একটি স্বাভাবিক বিষয়।

কিন্তু দূষণে বিপর্যস্ত এই নদীতে এখন মাছের দেখা পাওয়া মুশকিল। নদীতে জাল ফেলতে দেখলাম মজনু মিয়া নামের এক জেলেকে।

তিনি জানালেন এখন নদীতে শুধু অল্প-স্বল্প শিং মাছ পাওয়া যায়। এছাড়া অন্য কোন মাছের অস্তিত্ব নেই।

মাছ ধরার চেষ্টায় জেলে মজনু মিয়া।
ছবির ক্যাপশান, মাছ ধরার চেষ্টায় জেলে মজনু মিয়া।

“পঁচা পানির মধ্যে শুধু শিং মাছই থাকে আরকি। অন্য কোন মাছ থাকেনা,” বলছিলেন মজনু মিয়া।

কিন্ত মাছ ধরে বাড়িতে নিয়ে তাৎক্ষনিকভাবে রান্না করার উপায় নেই। মজনু মিয়া জানালেন নদীতে দূষণের কারণে মাছে এতো গন্ধ থাকে য সেটি ঠিক হতে চার-পাঁচদিন সময় লাগে।

তিনি বলেন, “ শিং মাছ ধরার পর বাড়িতে নিয়ে কলসির মধ্যে রাখলে তারপর গন্ধ দূর হয়। ”

টঙ্গি ব্রিজ থেকে নৌকায় করে প্রায় এক ঘণ্টা পূর্ব দিকে চলেছি। যতদূর গিয়েছে নদীর পানি একবারে কালো দেখেছি।

কখনো কখনো পানিতে দুর্গন্ধের মাত্রা এতটাই তীব্র যে নৌকায় বসে থাকা মুশকিল। নদীর ধারে যেসব কল-কারখানা দেখা যায় তাদের প্রায় সবার বর্জ্য এসে পড়ছে নদীতে।

কোন কোন কারখানার বর্জ্য পরিশোধন না করেই নদীতে ফেলা হচ্ছে।
ছবির ক্যাপশান, কোন কোন কারখানার বর্জ্য পরিশোধন না করেই নদীতে ফেলা হচ্ছে।

কোন কোন কারখানা থেকে বিভিন্ন রংয়ের পানি এসে পড়ছে নদীতে। নদীর দু’ধারে যেসব বসতী আছে সেগুলোর আবর্জনাও এসে পড়ছে নদীতে।

নদীর বুকে ভাসছে নানা ধরনের আবর্জনা – প্লাস্টিক, পলিথিন ব্যাগ, কাপড় এবং আরো নানা ধরনের আবর্জনা।

তুরাগ নদের দুই পাড়ে দীর্ঘ এলাকাজুড়ে একদিকে যেমন ঘনবসতি গড়ে উঠেছে অন্যদিকে শিল্প-কারখানাও হয়েছে সমানতালে। তুরাগ নদ বিভিন্ন জায়গায় এখন ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত কয়েকবছরে তুরাগে তীরের বিভিন্ন জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করা হলেও দূষণের মাত্রা কমেনি বলে জানাচ্ছেন পরিবেশবাদীরা।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের আবু নাসের খান বলছিলেন একটা সময় শিল্প স্থাপন করাটাই গুরুত্ব পেয়েছিল বেশি, পরিবেশ নয়।

গৃহস্থালির বর্জ্যও দূষন করছে তুরাগকে।
ছবির ক্যাপশান, গৃহস্থালির বর্জ্যও দূষন করছে তুরাগকে।

বেসরকারি মালিকানায় শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে সরকার উদার দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে। লক্ষ্য ছিল বেশি শিল্প স্থাপন করে কর্মসংস্থান তৈরি করা। সেজন্য পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে বলে জানালেন আবু নাসের খান।

আবু নাসের খান বলেন , “অনেক শিল্প কারখানা থেকে দূষণের মাত্রা কমলেও সার্বিকভাবে দূষণের মাত্রা কমেনি।”

তিনি বলেন নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে তুরাগে দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করেছে।

তুরাগ পারে যেসব শিল্পকারখানা আছে তাদের অনেকেরই তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি নেই।

যাদের ইটিপি আছে খরচ বাঁচানোর জন্য তাদের অনেকেই সেটি ব্যবহার করছেনা। যার কারণে বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে।

মাল্টিফ্যাব নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানার কর্ণধার মেজবাহ ফারুকী।
ছবির ক্যাপশান, মাল্টিফ্যাব নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানার কর্ণধার মেজবাহ ফারুকী।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সার্টিফিকেট অনুযায়ী যে কয়েকটি কারখানা ঠিকমতো ইটিপি ব্যবহার করে তার মধ্যে মাল্টিফ্যাব নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানা অন্যমত।

এ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মেসবাহ ফারুকী বলছেন যেভাবে নদী দূষণ হচ্ছে সেটি সত্যিই হতাশাজনক।

অনেক শিল্প-কারখানার মালিক যথাযথভাবে ইটিপি ব্যবহার করতে চায় না। কারণ এর সাথে বড় অংকের খরচ জড়িত।

মি: ফারুকী জানালেন তরল বর্জ্য পরিশোধন করতে তার প্রতিমাসে ১৫ থেকে বিশ লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু অনেক মালিক এই আর্থিক ভার বহন করতে রাজি নয়।

গত ৩০ বছরে তুরাগের তীরে অনেক কলকারখানা হয়েছে।
ছবির ক্যাপশান, গত ৩০ বছরে তুরাগের তীরে অনেক কলকারখানা হয়েছে।

মি: ফারুকী বলেন, “ আমি এতো টাকা খরচ করে কারখানার পানি পরিশোধন করে নদীতে ছাড়ছি। কিন্তু আমার আশপাশের কারখানায় কোন ইটিপি নেই। তারা বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলছে। তাহলে কী লাভ হলো? ফলাফল তো শূন্য হবে।”

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে তুরাগের টঙ্গি-গাজীপুর অংশে তরল বর্জ্য নির্গমনকারী কারখানার সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশ।

অধিদপ্তরের গাজীপুর অংশের উপ-পরিচালক বেগম সোনিয়া সুলতানা বলছেন কারখানাগুলো যাতে বর্জ্য পরিশোধন করে সেটি তারা তদারকি করছেন। তিনি জানালেন এখন ইটিপি ছাড়া কোন কারখানাকে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না।

তিনি বলেন নদী দূষণের শুধু কারখানার বর্জ্য একা দায়ী নয়। এর পাশাপাশি পয়:বর্জ্যও এসে নদীতে পড়ছে।

নদী দূষণ নিয়ে অনেক মানুষের মধ্যে কোন সচেতনতা নেই।
ছবির ক্যাপশান, নদী দূষণ নিয়ে অনেক মানুষের মধ্যে কোন সচেতনতা নেই।

যেসব কারখানায় ২০০’র বেশি শ্রমিক থাকবে তাদেরকে পয়:বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে বলে জানালেন সোনিয়া সুলতানা।

নদীকে দূষণমুক্ত করা নিয়ে পরিবেশবাদীরা অনেক আন্দোলন করলে বিষয়টি নিয়ে নদী তীরের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে কোন সচেতনতাই নেই। তুরাগের পাড় ঘুরে সে কথাই মনে হলো।