হিন্দুদের ওপর হামলা : বাংলাদেশের ঘটনার জেরে ভারতে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক

নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াতে প্রতিবাদ। ডিসেম্বর, ২০১৯
ছবির ক্যাপশান, নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াতে প্রতিবাদ। ডিসেম্বর, ২০১৯
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
  • Published
  • পড়ার সময়: ৩ মিনিট

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় গত কয়েকদিনে হিন্দুদের ওপর একের পর এক হামলার জেরে ভারতে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে বিতর্ক আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে।

বিজেপির বিভিন্ন স্তরের নেতারা অনেক আগে থেকেই এই আইন বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন, এখন বিরোধী দলগুলোর অনেক প্রথম সারির নেতাও বলছেন সংশোধিত এই আইনটির পরিধিকে বিস্তৃত করে বাংলাদেশে এখন নির্যাতিত হিন্দুদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্যও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

পাশাপাশি, ভারতের এই নাগরিকত্ব আইন যে বাংলাদেশ বা আফগানিস্তানের সংখ্যালঘুদের বিপদে কোনও কাজে আসেনি, সে কথাও অনেক বিরোধী দল মনে করিয়ে দিচ্ছে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পার্লামেন্টে পাস হয়েছিল সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ - যাতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে আসা হিন্দু-শিখ-খ্রীষ্টান-বৌদ্ধদের এ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।

এই আইনটিকে মুসলিম-বিরোধী ও অসাংবিধানিক বলে বর্ণনা করে এরপর গোটা দেশ জুড়ে যে তীব্র বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়, তা ছিল কার্যত নজিরবিহীন।

Skip X post, 1
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of X post, 1

তবে গত বছরের মার্চে কোভিড লকডাউন শুরু হতে না-হতেই সে আন্দোলনে ভাঁটা পড়ে - পুলিশ জোর করে তুলে দেয় দিল্লির শাহীনবাগের অবরোধ, যা ছিল সিএএ-বিরোধী প্রতিবাদের এপিসেন্টার।

কিন্তু সেই ঘটনার দেড় বছরেরও বেশি সময় পর আবার ভারতে সিএএ নিয়ে তুমুল তর্কবিতর্ক শুরু হয়েছে।

কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা মিলিন্দ দেওরা বিবিসিকে বলছিলেন, "সাধারণত দেখা যায় একটা বিল আইনে পরিণত হওয়ার ছমাসের মধ্যেই সেটির বাস্তবায়নের নিয়মকানুনগুলো চূড়ান্ত করা হয়।"

"কিন্তু এক্ষেত্রে সিএএ পাস হওয়ার দুবছর পরেও সেগুলো কিছুই করা হয়নি।"

আরও পড়তে পারেন :

বাংলাদেশের কুমিল্লায় পুজোমন্ডপে ভাঙচুরের পর
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের কুমিল্লায় পুজোমন্ডপে ভাঙচুরের পর

"ওদিকে আমরা দেখছি বাংলাদেশ, আফগানিস্তান-সহ উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হয়েই চলেছেন ... তাহলে কি সিএএ শুধুই একটা রাজনৈতিক গিমিক ছিল?"

তিনদিন আগেই মি দেওরা বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করে একটি টুইট করেন - যাতে তিনি লিখেছিলেন যারা এখন ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশ থেকে চলে আসতে চাইবেন, তাদেরকেও সিএএ-র আওতায় আনতে আইনটি সংশোধন করা প্রয়োজন।

স্পষ্টতই এই মুহুর্তে আইনটিতে যে ২০১৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতে আসার ডেডলাইন নির্ধারিত আছে - তিনি সেই সময়সীমার মেয়াদ বাড়ানোর কথাই বলেছেন এবং ওই টুইট নিয়ে জল্পনাও হচ্ছে বিস্তর।

মাসদুয়েক আগে কংগ্রেসের আরেকজন নেতা ও মুখপাত্র জয়বীর শেরগিলও দলীয় লাইনের বিরুদ্ধে গিয়ে সিএএ-র আওতায় আফগানিস্তান থেকে শিখ ও হিন্দুদের ভারতে নিয়ে আসার দাবি তুলেছিলেন।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ, এমপি ও এনসিপি নেতা মাজিদ মেমন
ছবির ক্যাপশান, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, এমপি ও এনসিপি নেতা মাজিদ মেমন

সিএএ-র পক্ষে এই মুহুর্তে আওয়াজ উঠছে বলেই ভারতে ওই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনের গুরুত্ব খাটো হয়ে যাচ্ছে, তা অবশ্য একেবারেই মনে করেন না এনসিপি দলের সিনিয়র নেতা ও এমপি মাজিদ মেমন।

মি মেমনের মতে, "বাংলাদেশে এই মুহুর্তে যা ঘটছে তার সঙ্গে ভারতে সিএএ বিরোধিতাকে এক করে দেখাটা মোটেই ঠিক হবে না। বরং যারা এদেশে সিএএ-র বিরোধিতা করছেন তাদের নিজস্ব যুক্তি আছে, সেগুলো ধৈর্য ধরে শুনতে হবে।"

এদিকে শিবসেনা দলের মুখপাত্র ও এমপি প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদীও টুইট করেছেন, "বাংলাদেশে দুর্গাপুজোর মন্ডপ, ইস্কনের মন্দির ও হিন্দুদের ঘরবাড়ি আক্রান্ত হলেও ভারত সরকার তার নিন্দা করে একটি কথাও বলছে না।"

তিনি সেই সঙ্গেই প্রশ্ন তুলেছেন, "যে সিএএ নিয়ে এত হইচই করা হচ্ছিল, কোথায় গেল সে আইন?"

Skip X post, 2
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of X post, 2

আর গোটা দেশে যে দলটি সিএএ-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সবচেয়ে সরব ছিল, সেই তৃণমূল কংগ্রেস কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনার পর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্যই করেনি।

তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি কেন বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন ও সিএএ নিয়ে এখন নীরব, বিজেপি সে প্রশ্নও তুলেছে।

তবে গত দুবছরে সিএএ বাস্তবায়নে কেন এক পা-ও এগোনো যায়নি, বিজেপিকেও সে প্রশ্নে অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে।

দিল্লিতে দলের মুখপাত্র সঞ্জু ভার্মা এই নিষ্ক্রিয়তার জন্য সাফাই দিয়ে দাবি করছেন, "স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন সিএএ বাস্তবায়নের নিয়মকানুন খুব শীঘ্রই নোটিফাই করা হবে।"

সিএএ-র বিরুদ্ধে কলকাতার সভামঞ্চ থেকে মমতা ব্যানার্জির প্রতিবাদ। জানুয়ারি, ২০২০
ছবির ক্যাপশান, সিএএ-র বিরুদ্ধে কলকাতার সভামঞ্চ থেকে মমতা ব্যানার্জির প্রতিবাদ। জানুয়ারি, ২০২০

দেরির জন্য তিনি দায়ী করছেন কোভিড মহামারিকেও, পাশাপাশি বলছেন "তা ছাড়া এই আইনের ৫, ৬ ও ১৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী 'ন্যাচারালাইজেশন' বা নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়াকে এমনিতেই যথেষ্ঠ ত্বরাণ্বিত করা হয়েছে - বাধ্যতামূলক বারো বছরের বদলে এখন পাঁচ-ছবছরের মধ্যেই সেটা পাওয়া সম্ভব।"

তবে বাস্তবতা হল, বাংলাদেশে গত দশ-বারো দিনে যে সব হিন্দু পরিবার আক্রান্ত হয়েছেন তারা যদি কেউ ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে চলে আসতে চান, বর্তমান আকারে এ দেশের নাগরিকত্ব আইন তাদের কোনও কাজেই আসবে না।

বিরোধী নেতারা অনেকেই এখন আইনটির সেই দুর্বলতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।

পাশাপাশি তারা এটাও বলছেন যে সিএএ বাংলাদেশের হিন্দুদের জীবনযাপনকে সুরক্ষিত করার বদলে আরও কঠিন করে তুলেছে - কারণ এতে তাদের ওপর ভারতে চলে যাওয়ার চাপ বেড়েছে।