কোভিড: ' আট মাস বেকার ছিলাম, অনেক কষ্ট করেছি'

মোহাম্মদ ইব্রাহীম

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মোহাম্মদ ইব্রাহীম

ঢাকার মোহাম্মদপুরের কলেজগেট এলাকার একটি রেস্তোঁরায় ওয়েটারের কাজ করেন মোহাম্মদ ইব্রাহীম। গত বছর মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর যে বিপর্যয়ে পড়েছেন তিনি তেমন অভিজ্ঞতা তার প্রায় দু'দশকের রেস্তোঁরায় কাজের অভিজ্ঞতায় সম্পূর্ণ নতুন।

লকডাউন আর সাধারণ ছুটির সময়কালে রেস্তোরা হঠাৎ বন্ধ গেলে রীতিমত দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন তিনি, যার ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি তার পক্ষে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আট মাস বেকার থেকে আমার বাসা ছেড়ে দিতে হয়েছে। আমার পরিবার পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে। আবার যখন চাকরী নিলাম আবার করোনায় লকডাউন। মালিক দোকান খোলা রেখে পোষাতে পারেনা। এজন্য হাফ বেতনে চলতে হচ্ছে। কোন সার্ভিস নাই তাই ওয়েটার রেখে তো মালিকের লাভ নেই। এজন্য জীবন যাপন হয়ে পড়েছে কষ্টের"।

বাংলাদেশের হোটেল রেস্তোরায় যে হাজার হাজার ওয়েটার কাজ করেন তাদের বেশিরভাগই কাজ করেন দৈনন্দিন আয়ের ভিত্তিতে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

বাংলাদেশে গত বছর করোনা সংক্রমণের পর থেকে রেস্তোরা গুলো দীর্ঘ সময় বন্ধই ছিলো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে গত বছর করোনা সংক্রমণের পর থেকে রেস্তোরা গুলো দীর্ঘ সময় বন্ধই ছিলো

আনুষ্ঠানিক নিয়োগ প্রক্রিয়া অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট বেতন, নিয়োগপত্র নিয়ে কাজ করা বা চাকুরী ছাড়লে সুবিধা পাওয়ার মতো বিষয়গুলো এ খাতের শ্রমিকদের জন্য নেই বললেই চলে। এমনকি শ্রম আইনের আওতায় মজুরি কাঠোমাতে সর্বনিম্ন বেতন তিন হাজার টাকা দেয়ার কথা থাকলেও অনেকেই তা পান না।

এসব কারণে তাদের নির্ভার করতে হয় প্রতিদিনের আয়ের উপর। মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলছিলেন স্বাভাবিক সময়ে তার আয়ের ওপরই নির্ভরশীল ছিলো গ্রামে বাবা মাসহ তার পরিবারের সদস্যরা। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ও তার সহকর্মীদের অনেককেই অনেক টাকা ঋণও করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

"এখানেই আমরা ৭০/৮০ জন। সবাই অনেক কষ্ট করেছি। তাদের সবার জীবন যাপন কষ্টের ছিলো। আমরা তো যা আয় করি এখানে, সেটাই। বাড়তি তো কোনো ইনকাম নেই। সেজন্য আমাদের কষ্টটাও ছিলো বেশি", মি. ইব্রাহীম বলেন।

হোটেল রেস্তোঁরা মালিক ও শ্রমিকদের নানা সংগঠনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ৬০/৭০ হাজার রেস্তোরায় বিভিন্ন ধরণের কাজ করেন অন্তত পনের লাখ শ্রমিক। যার মধ্যে ওয়েটার, সহকারী ওয়েটার, বাবুর্চি, সহকারী বাবুর্চি, রুটি কারিগরসহ নানা ধরণের কাজ করে থাকেন।

তবে কিছু রেস্তোঁরা পার্সেল সার্ভিস বা হোম ডেলিভারি চালু রাখায় বাবুর্চি বা রান্নার কারিগররা কাজে থাকলেও ওয়েটারদের কোন প্রয়োজনীয়তা ছিলো না।

ঢাকার একটি রেস্তোঁরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকার একটি রেস্তোঁরা

ফলে মোহাম্মদ ইব্রাহীমের মতো ওয়েটারদের হঠাৎ করেই আয়হীন হয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। মোহাম্মদ ইব্রাহীমের স্ত্রী মোসাম্মৎ রেশমি বলছেন, মাস শেষে টাকা আসতো নিয়মিত সেটি বন্ধ হয়ে পড়ায় পরিবারের প্রতিটি মানুষকে অবর্ণনীয় দু:খ কষ্টের মধ্যেই দিন পার করতে হয়েছে।

"স্বামীর চাকরী চলে গেছে। বাসা ভাড়া দিতে পারিনি। খেতে পারিনাই ঠিক মতো। দু'তিন মাস বাসা ভাড়া বাকী পড়ছে। বাড়ীওয়ালার কথা শুনতে হইছে। ঠিকমতো দিতে পারি নাই বলে চলে গেছি গ্রামের বাড়ীতে। এভাবে খাইছি, চলছি, ধার করছি। বর্তমানে অনেক দেনা আছি। সন্তানদের কিছু দিতে পারি নাই। এভাবে ধার কর্য করে চলতেছি," তিনি বলেন।

তবে শুধু ঢাকাতেই নয়, ঢাকার বাইরেও বিশেষ করে বড় শহরগুলোর রেস্তোঁরায় কাজ করা ওয়েটারদের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। সিলেটের আনসার আলী বলছিলেন তিনি এখনো চাকরীর অপেক্ষায়।

"আমার পেশা হল চাকরী আর চাকরিটা হলে আমি ওয়েটার। আমার ওয়েটারির ওপর পরিবার নির্ভরশীল,'' তিনি বলেন।

''বেশি কষ্ট হয়েছে কারণ আমি আর কোন কাজ জানিনা। গত বছর লকডাউন ঘোষণার পর থেকে আমি এখনো বেকার। আর সিলেটের লকডাউন কিছুটা শিথিলের পর কিছু রেস্তোঁরা খুললেও অর্ধেক শ্রমিক কাজ পেয়েছে। বাকীরা কাজ পায়নি। এখন অপেক্ষা করছি যে যদি লকডাউন উঠে যায় তাহলে কাজ শুরুর চিন্তা করছি"।

তবে কবে আবার কবে স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ ফিরে আসবে এবং তার মতো ওয়েটাররা রেস্তেঁরায় কাজ ফেরত পাবে, সেটি করোরই জানা নেই।