ধর্ষণ: বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষিত ছেলেদের সুবিচার পাওয়ার সুযোগ কতটা আছে

পরিণত বয়সে আসার পর অনেকে পুরুষই এখন শিশু অবস্থায় তার উপর যৌন নির্যাতনের বিষয়ে মুখ খুলছেন।
ছবির ক্যাপশান, পরিণত বয়সে আসার পর অনেকে পুরুষই এখন শিশু অবস্থায় তার উপর যৌন নির্যাতনের বিষয়ে মুখ খুলছেন।
    • Author, নাগিব বাহার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৩ মিনিট

বাংলাদেশে সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ডের বিধানকে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে নির্ধারণ করে আইন পরিবর্তন করলেও আইনের 'অস্পষ্টতা' এবং বিচার প্রক্রিয়ার সাথে জড়িতদের 'অজ্ঞতা'র কারণে পুরুষ ধর্ষণের বিচার হয় না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে নারী বা মেয়ে শিশু ধর্ষণের ঘটনা বর্তমানে আগের চেয়ে বেশি সংখ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে জানানো হলেও পুরুষ বা ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনার অধিকাংশই কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয় না।

বাংলাদেশের আইনে 'ধর্ষণ'এর সংজ্ঞায় অস্পষ্টতা থাকার পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেও এটিকে শুধু নারীর বিরুদ্ধে হওয়া যৌন অপরাধ মনে করা হয়, যার ফলে ধর্ষণের শিকার পুরুষরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রচলিত আইনের অস্পষ্টতা

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন নিয়ে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাসলিমা ইয়াসমিন। তিনি মনে করেন, যথাযথ গবেষণা এবং কেস স্টাডি পর্যালোচনার মাধ্যমে আইনে 'ধর্ষণ'এর সংজ্ঞা পরিবর্তন না করলে ছেলেদের ধর্ষণের বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, "বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ধর্ষণের শিকার হতে পারে শুধু একজন 'নারী', এবং (তা ঘটবে) একজন পুরুষের মাধ্যমে (দণ্ডবিধি ধারা-৩৭৫)। শুধু তাই নয়, দণ্ডবিধির সংজ্ঞাটি বলছে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে যৌন সঙ্গম বিবেচনা করার জন্য 'পেনিট্রেশন'-ই (প্রবিষ্ট করা) যথেষ্ট।"

"অথচ সংজ্ঞাটিতে কোথাও 'পেনিট্রেশন'-এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।"

ঢাকার হাই কোর্ট ভবন, ২০১৮ সালে তোলা ছবি।
ছবির ক্যাপশান, হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে ছেলে শিশুর ধর্ষণের ব্যাপারে অস্পষ্ট ধারনা থাকার বিষয়টি ইঙ্গিত করে।

আরো পড়তে পারেন:

তাসলিমা ইয়াসমিন মনে করেন, সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা না থাকার কারণে অনেক সময়ই মামলায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে এমন মামলা রুজু করা হয় যেটির গুরুত্ব এবং শাস্তি অপেক্ষাকৃত কম।

তিনি বলেন, "বাংলাদেশে ধরেই নেয়া হয় 'পেনিট্রেশন' মানে নারীর যৌনাঙ্গে পুরুষের যৌনাঙ্গ প্রবেশ করানো। আর আইনে এই বিষয়ের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দেয়া থাকায় অনেকক্ষেত্রেই ধর্ষণ প্রমাণ করা সম্ভব হয় না।"

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা কঠোরভাবে দমন করতে ২০০০ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন'। এই আইনটিতে 'শিশু'র যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাতে কোন লিঙ্গ বিশেষে নয় বরং ১৬-বছরের কম বয়সী যে কোন শিশুই এই আইনে বিচার পাওয়ার কথা।

মিজ ইয়াসমিন বলছেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে এরকম ক্ষেত্রে মামলার এফআইআর রুজু হয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায়, যেটি সমকামিতাসহ 'প্রাকৃতিক' নিয়মের বিরুদ্ধে করা যৌন সঙ্গমকে দণ্ডনীয় করেছে।

আবার অনেকসময় এই ধরণের মামলায় অভিযোগ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধারা-৯ এর অধীনে না করে ধারা-১০ এর অধীনে করায় ধর্ষণের বদলে যৌন সহিংসতার মামলা করা হয় এবং শাস্তিও অপেক্ষাকৃত কম হয়।

"অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে শিশুদের যৌনাঙ্গে নির্যাতনকারীরা কলম, বোতল বা লাঠির মত বস্তু প্রবেশ করানো হয়। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে বিবাদী পক্ষের আইনজীবী চাইলে এরকম ঘটনার ক্ষেত্রে 'ধর্ষণ হয়নি' বলে প্রমাণ করতে পারবেন।"

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পরিবর্তন আনার কথা বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা ইয়াসমীন।
ছবির ক্যাপশান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পরিবর্তন আনার কথা বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা ইয়াসমীন।

"সেক্ষেত্রে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ধারা-৯ এর অধীনে না ফেলে ধারা-১০ এর অধীনে ফেলা যায়, যেটি আইনের ভাষায় 'যৌন পীড়ন' হিসেবে চিহ্নিত হবে এর শাস্তিও ধারা-৯ এর শাস্তির চেয়ে কম", বলেন তাসলিমা ইয়াসমিন।

ধারা ৯ বলছে, ১৬ বছরের নীচে যে কোন শিশুর সাথে যৌন সঙ্গমকেই ধর্ষণ বলা হবে এবং শিশুর সম্মতি ছিল কিনা, তা বিচার্য হবে না।

আইনের ফাঁকফোকরের পাশাপাশি ছেলে ধর্ষণ বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও বিচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যেও ভুল ধারণা এবং বিচক্ষণতা ও দক্ষতার অভাবের কারণে বিচার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করেন তিনি।

"একটা ধর্ষণের ঘটনাস্থল থেকে কী কী আলামত সংগ্রহ করতে হবে, সেসব আলামত কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তের ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে - এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ বা ধারণা যেমন খুব কম পুলিশের আছে, তেমনি বিচারকদের মধ্যে অনেকেই এই ধরণের মামলার বিচারকাজ চালানোর ব্যাপারে অভিজ্ঞ নন।"

এছাড়া ধর্ষণ প্রমাণ করা না গেলে মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে না গিয়ে ফৌজদারি আদালতে যায়, যেসব ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়ে ভুক্তভোগীর বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা আরো ক্ষীণ হয়।

একই বিষয়ে বিবিসির একটি ভিডিও প্রতিবেদন:

Skip YouTube post
Google YouTube কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of YouTube post

তবে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ২০০০-এর অধীনে ১৬-বছরের কম বয়সী ছেলে শিশুদের বিরুদ্ধে হওয়া ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের বিচার হওয়ার সুযোগ থাকলেও ১৬ বছরের বেশি বয়সী পুরুষের ধর্ষণের বিচারের কোনো সুযোগ বাংলাদেশের আইনে নেই।

তাসলিমা ইয়াসমিন বলেন, "আমাদের ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে যৌন সহিংসতার সাথে সম্পৃক্ত যতগুলো ধারা আছে, সেগুলোতে পরিষ্কার বলা রয়েছে 'যখন একজন পুরুষ একজন নারীর' বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতামূলক আচরণ করেন। অর্থাৎ ধরেই নেয়া হয়েছে যে একজন পুরুষ নিজে যৌন আক্রমণের শিকার হতে পারেন না।"

এরকম ক্ষেত্রে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন হলে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় মামলা হতে পারে। অথবা ভুক্তভোগী শারীরিকভাবে আঘাত পাওয়ার অভিযোগ করতে পারেন।"

যার ফলে বাংলাদেশে ১৬-বছরের বেশি বয়সী একজন পুরুষ তার বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা হলেও তার অভিযোগ নিয়ে আইনগতভাবে সুবিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর: