ইরান যুদ্ধে ফ্রন্টলাইনের পেছনে ইউরোপের কোন ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র?

যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর একটি বি-৫২ বোমারু বিমান উড়ছে; ২০২৬ সালের ১৯শে মার্চের ছবি
ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর একটি বি-৫২ বোমারু বিমান উড়ছে; ২০২৬ সালের ১৯শে মার্চের ছবি
    • Author, রেজা সাবেতি
    • Role, সাংবাদিক
  • Published
  • পড়ার সময়: ৯ মিনিট

সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের ওপর হামলার জন্য মার্কিন বোমারু বিমানগুলোকে আতিথ্য দেওয়া ব্রিটিশ ঘাঁটি ফেয়ারফোর্ডকে ঘিরে কয়েকদিন আগের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনা আবারও এই যুদ্ধে ইউরোপীয় বিমানঘাঁটিগুলোর ভূমিকার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

ব্রিটিশ সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ বলছে, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তারা একজন ব্রিটিশ-ইরানি দ্বৈত নাগরিককে গ্রেফতার করেছে। এর আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেছিলেন, ইরান জড়িত থাকার "জোরালো প্রমাণ" রয়েছে।

ইরান কোনো সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।

ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে তিনটি সন্দেহজনক যানবাহনের খবর পাওয়ার পর ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী পাঁচজন ব্রিটিশ নাগরিককে ২৭শে সেপ্টেম্বর সকালে গ্রেফতার করা হয়। বিস্ফোরক-সংক্রান্ত অপরাধ এবং 'সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি' নেওয়ার সন্দেহে গ্রেফতার করা হয় তাদের।

একদিন পর তাদের সবাইকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, যানবাহনগুলোতে কিছু পেট্রল পাওয়া গেছে, তবে কোনো বিস্ফোরক ডিভাইস পাওয়া যায়নি। আরও জানা গেছে, গ্রেফতার হওয়ার আগে ওই ব্যক্তিদের একজন পুলিশের জরুরি নম্বরে ফোন করেছিলেন।

ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির গুরুত্ব হলো, সাম্প্রতিক যুদ্ধের শুরু থেকেই এটি ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি মার্কিন অভিযানে ব্যবহৃত একটি ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল।

জুলাই মাসে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি বিশেষভাবে ফেয়ারফোর্ডের নাম উল্লেখ করে সতর্ক করেছিল যে, ইরানে বোমা হামলার জন্য ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলো হবে "বৈধ লক্ষ্যবস্তু"।

ইরান যুদ্ধে ইউরোপীয় বিমানঘাঁটিগুলোর ভূমিকা একরকম ছিল না।

পর্তুগালের লাজেস, জার্মানির রামস্টাইন এবং গ্রিসের সুদার মতো কিছু ঘাঁটি মূলত মার্কিন সহায়তা নেটওয়ার্কের অংশ ছিল এবং যুদ্ধবিমান পরিবহন, আকাশে জ্বালানি সরবরাহ, মেরামত ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ভূমিকা রেখেছিল।

আবার স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালির মতো কিছু দেশ যুদ্ধ-সংক্রান্ত কাজে যুক্তরাষ্ট্রের তাদের ভূখণ্ড ও ঘাঁটি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা ও মতবিরোধের সৃষ্টি করে।

পোল্যান্ডভিত্তিক সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজের মতে, ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তরিত সামরিক সম্পদের পরিমাণ ওই অঞ্চলে থাকা মোট মার্কিন বাহিনীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ছিল, যদিও বাহিনীর মূল অংশ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পাঠানো হয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপ মার্কিন অভিযানের জন্য আকাশপথে সহায়তা এবং জ্বালানি সরবরাহের একটি প্রধান কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছিল।

যুক্তরাজ্যের লেইকেনহিথ ব্রিটিশ ঘাঁটিতে এফ-১৫ যুদ্ধবিমান; ২০২৬ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বরের ছবি
ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাজ্যের লেইকেনহিথ ব্রিটিশ ঘাঁটিতে এফ-১৫ যুদ্ধবিমান; ২০২৬ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বরের ছবি

ব্রিটেন: ইরানে মার্কিন হামলার ঘাঁটি

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

যুদ্ধের একেবারে প্রথম দিনগুলো থেকেই আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ৬ই মার্চ থেকে গ্লুচেস্টারশায়ারের এই ঘাঁটিতে মার্কিন বি-১বি ল্যান্সার বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়, যেখান থেকে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।

৯ই মার্চ থেকে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় বি-৫২ বোমারু বিমান। ফ্লাইট তথ্য ও উন্মুক্ত সূত্রের ভিত্তিতে জানা যায়, ১৩ই মার্চের মধ্যে ফারফোর্ডে বোমারু বিমানের সংখ্যা বেড়ে ১৮-তে পৌঁছায়, যার মধ্যে ১২টি বি-১বি এবং ছয়টি বি-৫২ ছিল।

এই মোতায়েন ছিল 'অপারেশন এপিক ফিউরির' অংশ, যা যুক্তরাষ্ট্র ২৮শে ফেব্রুয়ারি শুরু করেছিল।

মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কিন বলেন, যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমান থেকে শুরু করে ট্যাংকার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমানসহ ১০০টির বেশি বিমান সমন্বিতভাবে মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় তারা ১,০০০-এর বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়, যার মধ্যে ছিল কমান্ড সেন্টার, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, ইরানের গোয়েন্দা অবকাঠামো এবং নৌবাহিনী। যুদ্ধের শুরুতে বি-২ বোমারু বিমানও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে ৩৭ ঘণ্টার যাওয়া-আসার মিশন পরিচালনা করে।

যুদ্ধের শুরুর দিকে ব্রিটেন জোর দিয়ে বলেছিল যে, তারা প্রাথমিক হামলায় অংশ নেয়নি। কিন্তু পহেলা মার্চ সন্ধ্যায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ঘোষণা করেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংসে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের জন্য ওয়াশিংটনের অনুরোধে লন্ডন সম্মতি দিয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার এই অনুমতিকে মিত্রদের এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের সমষ্টিগত প্রতিরক্ষার কাঠামোর মধ্যে একটি সীমিত, "প্রতিরক্ষামূলক" ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করে।

তবে ইরানের অভ্যন্তরে পরিচালিত হামলার কারণে এই ব্যাখ্যা নিয়ে আইনি বিতর্ক তৈরি হয়। ২০শে মার্চ লন্ডন নিশ্চিত করে যে এই অনুমতি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ লক্ষ্য করে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ও সক্ষমতার বিরুদ্ধে হামলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ইউরোপের ঘাঁটিগুলোর মধ্যে ফেয়ারফোর্ডই সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ, যেখান থেকে মার্কিন বোমারু বিমান সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

ব্রিটেনের অন্য ঘাঁটিগুলো মূলত মার্কিন বাহিনীর পরিবহন ও সহায়তা নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।

খবর অনুসারে, ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে এখনো প্রায় এক ডজন মার্কিন বি-১বি বোমারু বিমান রয়েছে, তবে বি-৫২ বিমানগুলো ইতোমধ্যে চলে গেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী সেখানে মোতায়েন বোমারু বিমানের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। এই হিসাব উন্মুক্ত সূত্র ও ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের ভিত্তিতে করা হয়েছে।

ওয়ারশভিত্তিক সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩০টি এফ-৩৫ এবং ৩৬টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ব্রিটেন থেকে ইসরায়েল ও জর্ডানে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।

লেইকেনহিথ ও ওয়েলফোর্ডের মতো ঘাঁটিগুলো বাহিনী মোতায়েন, স্থানান্তর ও শক্তিবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

ব্রিটিশ সরকার জোর দিয়ে বলেছে যে, সাইপ্রাসে তাদের অ্যাক্রোতিরিসহ ঘাঁটিগুলো আক্রমণাত্মক অভিযান বা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলায় ব্যবহার করা হয়নি। দোসরা মার্চ অ্যাক্রোতিরিতে ড্রোন হামলা হলে সীমিত ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ড্রোনটি ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়নি এবং সম্ভবত লেবানন বা ইরাক থেকে উড়ে এসেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর একটি বিমান

পর্তুগাল, ফ্রান্স ও স্পেন: ওয়াশিংটনের প্রতি তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া

পর্তুগাল: লাজেস ঘাঁটি

যুদ্ধ শুরুর আগেই আজোরেসের লাজেস ঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক বিমানের চলাচল বেড়ে গিয়েছিল। পর্তুগিজ সরকার জানায়, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ১৯৫১ সালের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটিটি ব্যবহার করতে পারে, তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সামরিক অভিযানের সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্লাইটের জন্য লিসবনের পৃথক অনুমতি প্রয়োজন ছিল।

৭ই এপ্রিল পর্যন্ত পর্তুগাল যুদ্ধ-সংক্রান্ত কাজে লাজেসে মার্কিন সামরিক বিমানের ৭৬টি অবতরণ এবং তাদের আকাশসীমা দিয়ে ২৫টি উড্ডয়ন অনুমোদন করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী লুইজ মন্টেনেগ্রোর সরকার বলেছিল, কেবল "প্রতিরক্ষামূলক", প্রয়োজনীয় এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ মিশনের জন্যই অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলায় পর্তুগিজ স্থাপনা ব্যবহারের অনুমতি নেই।

পর্তুগিজ পররাষ্ট্রমন্ত্রীও নিশ্চিত করেন যে, লিসবন ওয়াশিংটনের কিছু অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।

বাস্তবে লাজেস মার্কিন অভিযানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও সহায়তা কেন্দ্র ছিল, তবে জনসম্মুখে থাকা তথ্য ইঙ্গিত করে না যে, এই ঘাঁটি থেকে সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে কোনো হামলা চালানো হয়েছিল।

ফ্রান্স: ইস্টার ও আভর ঘাঁটি

প্যারিস একটি মধ্যপন্থা গ্রহণ করে, যেখানে মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা দেওয়া এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণের মধ্যে পার্থক্য করা হয়।

৫ই মার্চ ফরাসি সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ ঘোষণা করে যে, মার্কিন সহায়ক বিমানগুলো সাময়িকভাবে ফরাসি ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে, তবে তারা যেন কোনোভাবেই ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ না নেয়।

পরে লা মঁদ জানায়, সি-১৭ পরিবহন বিমান এবং কেসি-১৩৫ ট্যাংকার ইস্টার ও আভর ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হয়েছিল, তবে এই অনুমতির আওতায় যুদ্ধবিমান ছিল না।

মার্চের শেষ দিকে এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন ইরান যুদ্ধ-সংক্রান্ত মার্কিন অস্ত্র পরিবহনে ইসরায়েলের ফরাসি আকাশসীমা ব্যবহারে প্যারিস আপত্তি তোলে। তবে ফ্রান্স সামরিক ফ্লাইটের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি এবং প্রতিটি অনুরোধ আলাদাভাবে বিবেচনা করছিল।

স্পেন: মোরোন ও রোতা ঘাঁটি

ইউরোপীয় ঘাঁটি যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে স্পষ্ট অবস্থানগুলোর একটি নেয় মাদ্রিদ।

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও মোরোন ও রোতা ঘাঁটি স্পেনের সার্বভৌমত্বের অধীন এবং ইরানে হামলার জন্য এগুলো ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

এই সিদ্ধান্তের পর ১৫টি মার্কিন সামরিক বিমান, প্রধানত কেসি-১৩৫ ট্যাংকার ওই ঘাঁটিগুলো ছেড়ে যায় এবং এর মধ্যে অন্তত সাতটি জার্মানির রামস্টাইন বিমানঘাঁটিতে স্থানান্তরিত হয়।

মাদ্রিদের এই সিদ্ধান্ত দ্রুত ওয়াশিংটনের সঙ্গে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় রূপ নেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দেন এবং এই বিরোধকে নেটোর প্রতিরক্ষা ব্যয়ে দুই দেশের আগের মতবিরোধের সঙ্গে যুক্ত করেন।

ফলে ইরানে হামলার জন্য নিজ ভূখণ্ড ব্যবহারের বিরোধিতাকারী ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে স্পেন সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণে পরিণত হয়।

স্পেনের রোতা সামরিক ঘাঁটির দৃশ্য - ৪ঠা মার্চ, ২০২৬
ছবির ক্যাপশান, স্পেনের রোতা সামরিক ঘাঁটির দৃশ্য - ৪ঠা মার্চ, ২০২৬

জার্মানি, ইতালি ও গ্রিস; যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই সহায়তা

জার্মানি: রামস্টাইন ও স্প্যাংডালেম ঘাঁটি

জার্মানি ঘোষণা করেছিল যে তারা যুদ্ধে অংশ নেবে না, তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারে বাধাও দেয়নি।

যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহ পর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযান নেটোর মিশন নয়। তিনি আরও যোগ করেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বার্লিনের সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করেনি।

তবুও রামস্টাইনে মার্কিন অভিযান চলতে থাকে। জার্মান সরকার জানায়, মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটি ব্যবহার বিদ্যমান মোতায়েন চুক্তির আওতায় ছিল এবং ওয়াশিংটন এসব চুক্তি লঙ্ঘন করেছে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই।

এই অবস্থান জার্মানির ভেতরে বিতর্ক সৃষ্টি করে। কারণ অনেকের মতে, আইনি বৈধতা নিয়ে বিতর্কিত একটি অভিযানের ক্ষেত্রে বার্লিনের সম্ভাব্য দায় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

রামস্টাইন কার্যত একটি বড় পরিবহন ও সহায়তা কেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে স্পেনে বিধিনিষেধ আরোপের পর সেখান থেকে সরানো যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও অবস্থান নেয়।

সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজ মনে করে, মার্কিন কিছু নির্দেশিত অস্ত্র রামস্টাইন থেকে এসেছে বলে 'জোরালো সম্ভাবনা' রয়েছে, যদিও তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

জার্মানির স্প্যাংডালেম বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত এফ-১৬ 'ওয়াইল্ড উইজেল' যুদ্ধবিমানও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছিল, যা পরে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা দমন অভিযানে অংশ নেয়।

জার্মানির রামস্টাইন বিমান ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সি-১৭ গ্লোবমাস্টার পরিবহন বিমান, ২০২৬ সালের এপ্রিলের ছবি
ছবির ক্যাপশান, জার্মানির রামস্টাইন বিমান ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সি-১৭ গ্লোবমাস্টার পরিবহন বিমান, ২০২৬ সালের এপ্রিলের ছবি

ইতালি: আভিয়ানো ও সিগোনেলা ঘাঁটি

রোমও মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা দেওয়া এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানার চেষ্টা করে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আভিয়ানোয় অবস্থানরত এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করা হয়েছিল, তবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার জোর দিয়ে বলেছিল যে, দেশের ঘাঁটিগুলো কেবল প্রযুক্তিগত, লজিস্টিক ও অ-যুদ্ধ কার্যক্রমের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

২৭শে মার্চ এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়, যখন রোম সিগোনেলায় কয়েকটি মার্কিন সামরিক বিমান অবতরণের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইতালীয় সরকারের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নেয়নি এবং ঘাঁটি ব্যবহারের নিয়ম অনুযায়ী দেশটির সামরিক কমান্ডের সঙ্গেও পরামর্শ করা হয়নি।

জুন মাসে ইতালীয় ঘাঁটিগুলোর ভূমিকা আবারও বিতর্কের জন্ম দেয়।

নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, অপারেশন এপিক ফিউরির সমর্থনে প্রায় ৫০০ মার্কিন বিমান ইতালির ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করেছে। এর জবাবে ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, রোম কেবল প্রযুক্তিগত, লজিস্টিক ও অ-যুদ্ধ কার্যক্রম অনুমোদন করেছিল এবং এর বাইরে কোনো অনুরোধ গ্রহণ করেনি।

গ্রিস: সুদা ঘাঁটি

ক্রিট দ্বীপে অবস্থিত এই ঘাঁটির ভূমিকা ছিল মূলত নৌ ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান। বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাওয়ার আগে সরবরাহ নেওয়ার জন্য সুদায় থামে এবং অভিযান চলাকালে অগ্নিকাণ্ডের পর সাময়িক বিরতির জন্য আবারও ঘাঁটিটিতে ফেরার কথা ছিল।

গ্রিসে সুদা ঘাঁটির ব্যবহার বিরোধিতা ছাড়া হয়নি। ক্রিট দ্বীপে একদল বিরোধী বিক্ষোভ করে। একই সময়ে ঘাঁটিটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়।

অন্য একটি ঘটনায়, গ্রিক কর্তৃপক্ষ ঘাঁটিটিকে কেন্দ্র করে সন্দেহভাজন এক গুপ্তচর এবং ইরানে থাকা কারও সঙ্গে তার সম্ভাব্য যোগাযোগের তদন্ত শুরু করে। তবে আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব কর্মকাণ্ডকে ইরান সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কোনো কারণ নেই বলে তারা জানায়।

রোমানিয়ার মিহাইল কোগালনিচানুতে অবস্থিত ৫৭তম বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাবাহিনীর অ্যাপাচি এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার — নভেম্বর ২০২৫
ছবির ক্যাপশান, রোমানিয়ার মিহাইল কোগালনিচানুতে অবস্থিত ৫৭তম বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাবাহিনীর অ্যাপাচি এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার — নভেম্বর ২০২৫

রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া; পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত সহায়তা নেটওয়ার্কের বিস্তার

রোমানিয়া

১১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ইরান-সংক্রান্ত অভিযানের জন্য আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, নজরদারি সরঞ্জাম এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা মোতায়েনে সম্মতি দেয় বুখারেস্ট।

সে সময় রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকোশের ডান এসব সরঞ্জামের "প্রতিরক্ষামূলক" চরিত্রের ওপর জোর দেন। সুপ্রিম ডিফেন্স কাউন্সিলের অনুমোদনের পর পার্লামেন্টে এই সিদ্ধান্ত পাস হয়, যদিও ডানপন্থি উগ্র দলগুলো এর বিরোধিতা করেছিল।

তবে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানগুলো ঠিক কোথায় মোতায়েন করা হয়েছিল, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতির কারণে মিহাইল কোগালনিচানু ঘাঁটির নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, তবে মিশনটি ওই ঘাঁটি থেকে পরিচালিত হয়েছিল বলে নিশ্চিত করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। যোগাযোগ সরঞ্জামগুলোকে ডোসলভ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।

বুলগেরিয়া: বেজমার ঘাঁটি

যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পর বুলগেরিয়ার ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ২২শে জুলাই দেশটির পার্লামেন্ট বেজমার ঘাঁটিতে সর্বোচ্চ আটটি কেসি-১৩৫ ট্যাংকার বিমান এবং ২৫০ জন মার্কিন সেনা সাময়িকভাবে মোতায়েনের অনুমোদন দেয়।

সোফিয়া জোর দিয়ে বলে, বুলগেরিয়ার ভূমি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি হামলা চালানো হবে না এবং এই মোতায়েন কেবল সহায়তামূলক ও লজিস্টিক প্রকৃতির।

বাস্তবে ৩১শে জুলাই দুটি কেসি-১৩৫ বিমান বেজমারে পৌঁছায়। এই মোতায়েন স্থানীয় কিছু বাসিন্দার বিক্ষোভ ও ইরানের কূটনৈতিক আপত্তির মুখে পড়ে।

নির্ধারিত সময়ের কয়েক সপ্তাহ আগেই, ২১শে অগাস্ট দুটি বিমান বুলগেরিয়া ত্যাগ করে।

মোতায়েন শেষ হওয়ার পর বুলগেরিয়ার কর্মকর্তারা বলেন, বিমানগুলো দক্ষিণমুখী কোনো ফ্লাইট পরিচালনা করেনি এবং তাদের কার্যক্রম নেটো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রশিক্ষণ ও মহড়ায় সীমাবদ্ধ ছিল।

তুরস্ক: ইনজিরলিক বিমানঘাঁটি

ইনজিরলিকে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও তুরস্ক বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলায় এই ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়নি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলারও নিন্দা জানিয়েছেন।

যুদ্ধ চলাকালে তুরস্কের ভূমিকা মূলত নিজস্ব আকাশসীমা সুরক্ষা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

আঙ্কারা বলেছে, ইরান থেকে উৎক্ষেপিত এবং তুর্কি আকাশসীমার দিকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়।

ইনজিরলিক তুরস্কের এশীয় অংশে আদানা শহরে অবস্থিত এবং কঠোর ভৌগোলিক সংজ্ঞা অনুযায়ী এটি ইউরোপীয় ঘাঁটি নয়।