স্বাধীনতা যুদ্ধ: বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব দেশ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জন করেছে

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনী এবং গেরিলাদের ভূমিকা সমান ছিল।
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনী এবং গেরিলাদের ভূমিকা সমান ছিল।
    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

স্বাধীন দেশ হিসাবে জাতিসংঘের সদস্য হিসাবে রয়েছে ১৯৩টি দেশ। আরো দুইটি দেশ রয়েছে পর্যবেক্ষক সদস্য হিসাবে।

এসব সদস্য দেশের অনেক দেশ বরাবরই স্বাধীন দেশ হিসাবে থেকেছে। আবার অনেক দেশ পরাধীনতা থেকে বা কলোনি থেকে আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। কোন কোন দেশ আলোচনাার মাধ্যমে, আবার কোন কোন দেশ বিপক্ষ শক্তিকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের মতো খুব কম দেশই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেছে। আরো যেসব দেশ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিপক্ষ শক্তিকে পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, এখানে সেসব দেশের বর্ণনা তুলে ধরা হলো।

বাংলাদেশ

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন দেশ হিসাবে ঘোষণা করে বাংলাদেশ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়।

২৫শে মার্চ রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ, সামরিক বাহিনী ও সাধারণ জনগণের ওপর হামলা শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে বাংলাদেশ। প্রবাসী মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়।

বাঙ্গালী জনতা ভারতের সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী গঠন করে তাদের প্রতিরোধ করতে শুরু করে। পরবর্তীতে ভারত এই যুদ্ধে অংশ নিলে দুই বাহিনী মিলে যৌথ বাহিনী গঠিত হয়।

সেই মুক্তিযুদ্ধে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী প্রায় ৯৩ হাজার সৈন্য বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতের সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোন যুদ্ধে এতো বড় বাহিনী আত্মসমর্পণ করেনি।

আরো পড়ুন:

১৭৭৬ সাল থেকে ১৭৮৩ সাল ধরে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছিল, যাকে আমেরিকার বিপ্লবী যুদ্ধ বলেও বর্ণনা করা হয়।
ছবির ক্যাপশান, ১৭৭৬ সাল থেকে ১৭৮৩ সাল ধরে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছিল, যাকে আমেরিকার বিপ্লবী যুদ্ধ বলেও বর্ণনা করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র

১৭৭৬ সাল থেকে ১৭৮৩ সাল ধরে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছিল, যাকে আমেরিকার বিপ্লবী যুদ্ধ বলেও বর্ণনা করা হয়।

একসময় ব্রিটিশ কলোনি হিসাবে থাকলেও, ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া করারোপে বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়।

ব্রিটেনের বিরুদ্ধে উত্তর আমেরিকার ১৩টি কলোনি স্বাধীনতা ঘোষণা করে ১৭৭৬ সালের জুলাই মাসে। যদিও উভয় উভয় পক্ষের মধ্যে লড়াই শুরু হয়েছিল ১৭৭৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে।

টানা কয়েক বছর যুদ্ধের পর ফরাসি বাহিনী ও জর্জ ওয়াশিংটনের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা চার্লস কর্নওয়ালিস।

তবে আমেরিকার যুদ্ধ শেষ হলেও আমেরিকার যুদ্ধ সমর্থনকারী দেশ ফ্রান্স, স্পেন ও তৎকালীন ডাচ রিপাবলিকের সঙ্গে ব্রিটেনের যুদ্ধ চলতে থাকে।

অবশেষে ১৭৮৩ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর ট্রিটি অব প্যারিসের মাধ্যমে ব্রিটেন আমেরিকার সার্বভৌমত্ব এবং সীমানা স্বীকার করে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ওই চুক্তিটি ১৭৮৪ সালের জানুয়ারি মাসে গ্রহণ করে।

সেই সঙ্গে পৃথক কয়েকটি চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স, স্পেন ও ডাচ রিপাবলিকের সঙ্গে ব্রিটেনের যুদ্ধের অবসান হয়।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া যুদ্ধের সময় একটি শিবিরে ইথিওপিয়ান বন্দীরা
ছবির ক্যাপশান, ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া যুদ্ধের সময় একটি শিবিরে ইথিওপিয়ান বন্দীরা

ইরিত্রিয়া

ইথিওপিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হতে সেপ্টেম্বর ১৯৬১ সাল থেকে মে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত লড়াই করে ইরিত্রিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদীরা।

ইটালির উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পরে ১৯৪৭ সালে ইরিত্রিয়া স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ইথিওপিয়ার রাজা শাসন দাবি করে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের হস্তক্ষেপে ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার সঙ্গে প্রথমে একটি ফেডারেশন, পরবর্তীতে সাংবিধানিক স্টেট হিসাবে থাকে। তবে ইরিত্রিয়া স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ১৯৬১ সালে ফেডারেশন বাতিল করে ইরিত্রিয়াকে একীভূত করে নেয় ইথিওপিয়া।

এরপর থেকেই ইরিত্রিয়ার বিভিন্ন গোষ্ঠী স্বাধীনতার আন্দোলন চালাতে থাকে। সে সময় স্নায়ু যুদ্ধের বিভিন্ন পক্ষ ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়াকে সহায়তা করে।

অবশেষে ১৯৯১ সালের মে মাসে ইথিওপিয়ার বাহিনীকে পরাজিত করে ইরিত্রিয়ার ইপিএলএফ মুক্তিযোদ্ধারা।

একমাস পরেও ইপিএলএফ বাহিনীর সহায়তায় ইথিওপিয়ান পিপলস রেভ্যুলশনারি ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট আদ্দিস আবাবার দখল নেয়ার করে নেয়।

১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে একটি গণভোট হয়, যেখানে ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে ভোট পড়ে। সেই বছরেই ইরিত্রিয়া স্বাধীন হয়।

ভিডিওর ক্যাপশান, স্বাধীনতা - কার কাছে কী অর্থ?

আলজেরিয়া

ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রায় আট বছর ধরে স্বাধীনতা যুদ্ধ করার পর স্বাধীনতা লাভ করে আলজেরিয়া।

ফ্রান্সের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার সংগ্রাম শুরু ১৯৫৪ সালের ১ লা নভেম্বর। ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (এফএলএন) অনেকটা গেরিলা ধরণের এই সংগ্রাম শুরু করে, যা ফ্রান্সের রাজনীতিকে কাঁপিয়ে দেয়। পাল্টা জবাব হিসাবে দমন-পীড়ন আর নির্যাতনের পথ বেছে নেয় ফ্রান্স।

১৯৬০ সালে আলজেরিস এবং বেশ কয়েকটি শহরে স্বাধীনতার পক্ষে সমাবেশের পর স্বাধীনতার অধিকারের পক্ষে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ফলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গল এফএলএনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন।

ফলশ্রুতিকে ১৯৬২ সালে গণভোট আয়োজিত হয়, যেখানে স্বাধীনতার পক্ষে বেশিরভাগ ভোট পড়ে।

১৮৩০ সালের ২৫শে অগাস্ট ব্রাসেলসে জাতীয়তাবাদী দাঙ্গা শুরু হয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
ছবির ক্যাপশান, ১৮৩০ সালের ২৫শে অগাস্ট ব্রাসেলসে জাতীয়তাবাদী দাঙ্গা শুরু হয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

বেলজিয়াম

ইউনাইটেড কিংডম অব নেদারল্যান্ডস থেকে ১৮৩০ সালে স্বাধীনতা লাভ করে বেলজিয়াম। এতদিন একসঙ্গে থাকলেও বেকারত্ব ও শিল্প খাতের নৈরাজ্যের কারণে বেলজিয়াম অংশে ক্ষোভ ছিল।

১৮৩০ সালের ২৫শে অগাস্ট ব্রাসেলসে জাতীয়তাবাদী দাঙ্গা শুরু হয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

দাঙ্গা দমন করতে সেনা পাঠান নেদারল্যান্ডসের রাজা উইলিয়াম। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চল থেকে নিয়োগ করা বেশিরভাগ কর্মী বাহিনী থেকে পালিয়ে গেলে সেনারা সরে আসতে বাধ্য হয়। এরপর স্বাধীনতা ঘোষণা করে বেলজিয়াম।

১৮৩০ সালের লন্ডন কনফারেন্সে বেলজিয়ামকে স্বাধীন দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দেয় ইউরোপের বড় শক্তিগুলো। লিওপোল্ড প্রথম আবার রাজা হন।

কিন্তু পরের বছর কিং উইলিয়াম আরেকবার বেলজিয়ামের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করেন। দশদিনের সেই যুদ্ধে ফরাসি সহায়তায় নেদারল্যান্ডসকে ঠেকিয়ে দেয় বেলজিয়াম। ১৯৩৯ সালে বেলজিয়ামের স্বাধীনতা মেনে নেয় নেদারল্যান্ডস।

শেতাঙ্গ শাসকদের বাইরে প্রথম স্বাধীন দেশ হলেও পরবর্তীতে নানা সংকটের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে হাইতিকে
ছবির ক্যাপশান, শেতাঙ্গ শাসকদের বাইরে প্রথম স্বাধীন দেশ হলেও পরবর্তীতে নানা সংকটের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে হাইতিকে

হাইতি

এটি মূলত ফরাসি উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে হাইতির মানুষদের মুক্তির লড়াই। সে সময় দেশটির নাম ছিল সেইন্ট-ডোমিঙ্গ।

হাইতি প্রথমে স্পেন, পরে ফরাসি উপনিবেশ ছিল।

ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে ১৭৯১ সালের ২২শে অগাস্ট এই বিপ্লব শুরু হয়ে ১৮০৪ সালে সাবেক কলোনির স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

এটা ছিল লাতিন আমেরিকার প্রথম স্বাধীন দেশ, যার শাসক কোন ছিলেন একজন অশ্বেতাঙ্গ এবং এক সময়কার দাস।

চিলি ও বলিভিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ

স্পেনের সাবেক উপনিবেশ চিলি স্বাধীনতা ঘোষণা করে ১৮১৮ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি।

যদিও দেশটির নেতা হোসে ডে স্যান মার্টিনের নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয় আরো আট বছর আগে থেকে০ ১৮১০ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর।

আর সেই যুদ্ধের সমাপ্তি হয় ১৮২৬ সালে, যখন স্পেনের রাজকীয় বাহিনী অবশেষে চিলির আর্কিপেলাগোয় তাদের তাকে আত্মসমর্পণ করে।

যদিও স্পেনের স্বীকৃতি পেতে সময় লাগে আরো কয়েক বছর, ১৮৪৪ সাল।

বলিভিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধও শুরু হয় প্রায় একই সময়ে, ১৮০৯ সালে। এটিও ছিল স্পেনের একটি উপনিবেশ।

তবে ১৮২৫ সালে স্প্যানিশ রাজকীয় বাহিনীর জেনারেল পেড্রো অ্যান্তোনিও অলানেতার পরাজয় এবং মৃত্যুর মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয় এবং বলিভিয়া স্বাধীনতা লাভ করে।