বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর নগরীগুলো কেন ভারতে

The India Gate in Delhi with a lot of smog
ছবির ক্যাপশান, ঘন ধোঁয়াশায় ঢেকে গেছে দিল্লির ইন্ডিয়া গেট
Published

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের মুখে জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে- সেখানে কয়েকদিন স্কুল পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। লোকজনকে ঘর থাকতে বলা হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে হাজার হাজার রোগী ভিড় করছে শ্বাসজনিত রোগে।

এসব ঘটছে দূষিত বাতাসের কারণে। দিল্লির বাতাস হচ্ছে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত।

দিল্লিকে এখন বর্ণনা করা হয় 'গ্যাস চেম্বার' বলে। কিন্তু উত্তর ভারতে দিল্লিই একমাত্র নগরী নয় যেখানে বায়ু দূষণ এত মারাত্মক আকার নিয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ছয়টি নগরীর পাঁচটিই উত্তর ভারতে।

গত বছর গ্রীনপীসের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ৩০টি নগরীর ২২টিই ভারতে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে মাত্রার দূষণকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে, ভারতের নগরীগুলোতে দূষণের মাত্র তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি।

বায়ু দূষণের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ৭০ লাখ মানুষ অপরিণত বয়সে মারা যায়।

দিল্লি এখন যে ধোঁয়াশায় ঢেকে আছে তার কারণে সেখানে মানুষের মধ্যে স্ট্রোক, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ফুসফুসের ক্যান্সার এবং আরও অনেক ধরণের ক্রনিক ফুসফুসের রোগ বেশি হারে হচ্ছে।

India's Taj Mahal with a lot of air pollution
ছবির ক্যাপশান, আগ্রায় তাজমহল দেখতে যাওয়া পর্যটকদের বায়ু দূষণ থেকে রক্ষা পেতে মুখোশ পরতে হয়েছে

উত্তর ভারতের এই বায়ু দূষণ, বিশেষ করে গঙ্গার সমতলভূমির এই দূষণের কারণে ভারতের প্রতিবেশি নেপাল এবং বাংলাদেশও ঝুঁকিতে আছে। কারণ পশ্চিম দিক থেকে আসা বাতাসে ভর করে এই ধোঁয়াশা আর ধূলিকণা সেখানে চলে যেতে পারে।

কিন্তু ঠিক কী কারণে ভারতের বায়ু দূষণ এতটা মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে অক্টোবর-নভেম্বরে এসে কেন এতটা অবনতি ঘটে পরিস্থিতির?

ফসল পোড়ানো

দিল্লি আর উত্তর ভারতে বায়ু দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্ণিত করা হচ্ছে বায়ু দূষণকে।

ফসল কাটার পর মাঠে পড়ে থাকে যে ফসলের গোড়া, সেটি পরিস্কার করার সবচেয়ে সহজ উপায় আগুণে পুড়িয়ে দেয়া। কৃষকরা সেই পথই বেছে নেন।

আরও পড়ুন:

A construction site in India
ছবির ক্যাপশান, ভারতের নির্মাণ শিল্প দ্রুত হারে বাড়ছে

পশ্চিমা বাতাসে মাঠে পুড়তে থাকা আগুনের ধোঁয়া দিল্লির দিকে চলে আসে। সেখানে তৈরি করে মারাত্মক দূষণ। সরকার ফসলের ক্ষেতে আগুন দেয়ার এই কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কোন ফল হয়নি।

ভারতের অর্থনীতি এখনো মূলত কৃষি নির্ভর। এই ফসলের গোড়া পোড়ানোর কাজটি চলে এমন ব্যাপক মাত্রায়, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ এবং হরিয়ানায়। দিল্লির খুব কাছে এই দুটি প্রদেশ।

যানবাহনের দূষণ

যেসব উপায়ে ভারত সরকার এই দূষণ ঠেকানোর চেষ্টা করছে তার একটি হচ্ছে গাড়ির দূষণ কমানো।

দিল্লি সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন নগরীর রাস্তায় চলে প্রায় ৩০ লাখ গাড়ি। কাজেই দূষণ কমাতে তারা রাস্তায় গাড়ি চালানোর ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

Crops burning in a field in India
ছবির ক্যাপশান, ভারতে ফসলের মাঠে খড় এবং নাড়া পোড়ানোকেও এই বায়ু দূষণের জন্য দায়ী করা হচ্ছে

প্রাইভেট কারের ক্ষেত্রে নিয়ম করা হয়েছে, জোড় নম্বরের গাড়ি রাস্তায় নামবে একদিন, আর বেজোড় নম্বরের গাড়ি আরেকদিন।

সরকারের দাবি, এর ফলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে।

কিন্তু অন্য কিছু পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেয়া যাকঃ ২০১৬ সালে ভারতের রাস্তায় চলতো প্রায় দুই কোটি গাড়ি। সেই সংখ্যা এখন আরও অনেক বেড়েছে। কাজেই গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়ার কারণে বায়ু দূষণও বেড়েছে। ফসল পোড়ানোর দূষণের চেয়ে এই দূষণ কম নয়।

ভারতের গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ডিজেল বেশ জনপ্রিয়। সেটা একটা সমস্যা। সরকার আরও বেশি ইলেকট্রিক কার চালু করার চেষ্টা করছে, কিন্তু সে চেষ্টায় তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি।

ভারত সরকারের হিসেবে দেশটিতে ২০১৫ সালে বাস-ট্রাকের মতো ভারী যানবাহনের সংখ্যা ছিল এক কোটি নয় লাখ। এছাড়া আরও লাখ লাখ ডিজেল চালিত ট্যাক্সি এবং প্রাইভেট কার চলে।

A traffic jam in India
ছবির ক্যাপশান, দিল্লির রাস্তায় প্রতিদিন চলে লাখ লাখ গাড়ি

বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী নেচার পরিচালিত সমীক্ষায় বলা হয়েছে, রাস্তায় ডিজেল চালিত যানবাহন থেকেই বিশ্বের বায়ু মণ্ডলে ২০ শতাংশ নাইট্রোজেন অক্সাইড ছড়াচ্ছে।

নির্মাণ শিল্প

প্রতিবার যখন দিল্লি নগরীতে বায়ু দূষণ নিয়ে হৈ চৈ শুরু হয়, সরকার এবং আদালত দিল্লি এবং এর আশে-পাশে সবধরণের নির্মান কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

অন্যান্য খবর:

এর ফলে হাজার হাজার নির্মাণাধীন অ্যাপার্টমেন্ট ভবন, সরকারি ভবন, রাস্তা, শপিং মল আর ফ্লাই ওভারের নির্মাণ কাজ থমকে যায়।

নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব নিয়ম-কানুন মানার কথা, সেগুলো মানা হয় না বলেই এটা এত বড় একটা ইস্যু।

এই ধুলো-বালির মধ্যে রাসায়নিকও থাকে, বাতাসে ভেসে তা ঢুকে পড়ে মানুষের শ্বাসযন্ত্রে, এবং সেখানে নানা সমস্য তৈরি করে।

A construction site in India
ছবির ক্যাপশান, নির্মাণ খাতে ধূলোবালি কমাতে যেসব নিয়ম মানার কথা, সেগুলো মানা হয়না।

ভারতের অর্থনীতি খুব দ্রুত বাড়ছে। চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকার জন্য ভারতের মরিয়া চেষ্টায় নির্মাণ খাত বড় ভূমিকা রাখছে।

দু'হাজার বাইশ সাল নাগাদ ভারতের নির্মাণ খাতের ব্যবসা দাঁড়াবে প্রায় ৭৩৮ বিলিয়ন ডলারে। ইস্পাত, রঙ এবং কাঁচ শিল্পে ভারত এখন বিশ্বে নেতৃস্থানীয় অবস্থায় আছে।

এই মূহুর্তে ভারত জুড়ে কী পরিমাণ নির্মাণ কাজ চলছে তার কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে ভারতের যে কোন ছোট শহরে গেলেই দেখা যায় সেখানে সব খাতেই বিরাট নির্মাণ যজ্ঞ চলছে। আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক ভবন থেকে শুরু করে নানা ধরণের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। কাজেই ভারতের নগরীগুলোতে বায়ু দূষণের ক্ষেত্রে এই নির্মাণ খাতেরও রয়েছে বিরাট ভূমিকা।