ভারতের বড় শহরগুলো শুকিয়ে যাবে পরের বছরেই?

চেন্নাইতে একটি কুয়ো থেকে জল সংগ্রহের ভিড়
ছবির ক্যাপশান, চেন্নাইতে একটি কুয়ো থেকে জল সংগ্রহের ভিড়
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
  • Published

দিল্লি-চেন্নাই-হায়দ্রাবাদ সহ ভারতের অন্তত ২১টি বড় শহর আর মাত্র দেড় বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ জলশূন্য হয়ে পড়তে পারে বলে সরকারের পরিকল্পনা সংস্থার এক সাম্প্রতিক রিপোর্টে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়েছে।

'নীতি আয়োগে'র ওই প্রতিবেদনকে ঘিরে এ সপ্তাহে পার্লামেন্টেও সদস্যরা তীব্র উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন।

এই মুহুর্তে চেন্নাই শহরে তীব্র জলকষ্ট চলছে, মহারাষ্ট্র-কর্নাটক-তেলেঙ্গানা সহ ভারতের এক বিস্তীর্ণ অংশ খরার কবলে।

তার ওপর মৌসুমি বৃষ্টিও ঢুকছে অনেক দেরি করে, পরিমাণেও তা অনেক কম।

পুনের কাছে খড়কভাসলা জলাধার প্রায় শুকিয়ে গেছে
ছবির ক্যাপশান, পুনের কাছে খড়কভাসলা জলাধার প্রায় শুকিয়ে গেছে

কিন্তু কেন ভারতের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক অংশ স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন জল সঙ্কটে পড়েছেন বা পড়তে চলেছেন?

ভারতের অন্যতম প্রধান মহানগর চেন্নাইতে গত বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে জলের জন্য কার্যত হাহাকার চলছে।

গরিব বস্তিবাসী থেকে শুরু করে বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যবিত্ত, সকলকেই বেসরকারি ট্যাঙ্কার থেকে পানীয় জল কিনতে হচ্ছে চড়া দামে।

সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে আইটি করিডরের বাসিন্দা এক গৃহবধূ বিবিসিকে বলছিলেন, "তৃষ্ণা সবারই সমান - অথচ মুখ্যমন্ত্রী আমাদের জলের প্রয়োজনের দিকে নজরই দিচ্ছেন না।"

দিল্লির বহু স্থানেও জল সরবরাহ করতে হচ্ছে ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে
ছবির ক্যাপশান, দিল্লির বহু স্থানেও জল সরবরাহ করতে হচ্ছে ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে

"অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের বলা হচ্ছে অনলাইনে ট্যাঙ্কার বুক করে নিতে, সেটাও এক সপ্তাহের আগে পাচ্ছি না।"

"এদিকে জল না-আসায় রান্নাঘরে, বাথরুমে অবস্থা অসহনীয় হয়ে উঠছে।"

জলাভাবে শহরের বহু হোটেল গ্রাহকদের ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে, তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কর্মীদের বলছে অফিসে না-এসে বাড়ি থেকেই কাজ করতে।

চারজনের একটা মধ্যবিত্ত পরিবারকে সপ্তাহে জলের জন্য খরচ করতে হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার রুপি।

বিবিসি বাংলায় আরো খবর:

নীতি আয়োগের ডেপুটি চেয়ারম্যান রাজীব কুমার
ছবির ক্যাপশান, নীতি আয়োগের ডেপুটি চেয়ারম্যান রাজীব কুমার

এদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি আয়োগ বলছে, আজ চেন্নাইয়ের যা পরিস্থিতি - আর মাত্র দেড় বছরের মধ্যে ভারতের অন্তত ২১টি বড় শহরও সেভাবেই জলশূন্য হয়ে পড়তে পারে।

নীতি আয়োগের ডেপুটি চেয়ারম্যান রাজীব কুমার জানাচ্ছেন, "ইতিহাস সম্ভবত এই প্রথমবার টানা ছ'বছর ধরে ভারতে মৌসুমি বৃষ্টিপাতে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।"

"সাধারণত দু'তিনবছর কম বৃষ্টি হলেও পরের বার তা পুষিয়ে যায়, কিন্তু একটানা এই অনাবৃষ্টি নজিরবিহীন। তার ওপর ভারত মোট যে পরিমাণ বৃষ্টির জল পেয়ে থাকে, তার অর্ধেকটাই স্রেফ নষ্ট হয়।"

কিন্তু শুধু মৌসুমি বৃষ্টিপাত কম হওয়াটাই দেশে এই জল সঙ্কটের একমাত্র কারণ বলে মনে করছেন না এশিয়া প্যাসিফিক ওয়াটার ফোরামের রবি নারায়ণন।

জলের চিহ্ন নেই চেন্নাইয়ের কাছে পুজহাল জলাধারেও
ছবির ক্যাপশান, জলের চিহ্ন নেই চেন্নাইয়ের কাছে পুজহাল জলাধারেও

তিনি বলছিলেন, "ভারত যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহার করে থাকে - তা কিন্তু আমেরিকা ও চীনের মোট ব্যবহার্য পরিমাণের চেয়েও বেশি।"

"এ থেকেই আন্দাজ করা যায় সমস্যাটা কত ব্যাপক।"

"অথচ মাটির নিচের শিলাস্তরে কোথায় কতটা জল আছে, সেই অ্যাকুইফার বা ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলোর কোনও নির্ভরযোগ্য মানচিত্রও আমাদের নেই।"

"এই ওয়াটার সিকি‌উরিটি প্ল্যানটা তৈরি করাই হওয়া উচিত প্রথম পদক্ষেপ।"

জলের দাবিতে প্লাস্টিকের খালি কলসী নিয়ে চেন্নাইয়ের বাসিন্দাদের প্রতিবাদ
ছবির ক্যাপশান, জলের দাবিতে প্লাস্টিকের খালি কলসী নিয়ে চেন্নাইয়ের বাসিন্দাদের প্রতিবাদ

জলসম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও লেখালেখি করছেন পরিবেশবিদ জয়া মিত্র।

তিনিও বিবিসিকে বলছিলেন, রেনওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের চিরাচরিত পদ্ধতিগুলো হারিয়ে ফেলাতেই ভারত আজ এই চরম সঙ্কটের মুখোমুখি।

তার কথায়, "বৃষ্টির জল হচ্ছে পৃথিবীর সব মিঠে জলের উৎস। অথচ আধুনিকীকরণের নামে সেই বৃষ্টির জল সংরক্ষণের বহু প্রাচীন পন্থাগুলো আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি।"

"অথচ দেখুন, ভারতের যেখানে সবচেয়ে কম বৃষ্টি পড়ে - বছরে মাত্র ১৩০ মিলিমিটার বা তারও কম - সেই পশ্চিম রাজস্থান কিন্তু জলের কষ্টে ভোগে না। কারণ তারা প্রতিটা ফোঁটা বৃষ্টির জল জমা করে রাখতে জানে।"

পরিবেশবিদ জয়া মিত্র
ছবির ক্যাপশান, পরিবেশবিদ জয়া মিত্র

"মাটির তলায় গর্ত করে, ছাদের পুরো জলটা সেখানে জমা করে সারা বছর তারা ওই জল ব্যবহার করতে পারে।"

কলকাতা বা গাঙ্গেয় অববাহিকায় হয়তো মাটির তলায় গর্ত করে জল জমা রাখা সম্ভব নয় - কিন্তু সেখানে যেটা সম্ভব তা হল পুকুর-দীঘি-জলাশয় খোঁড়া।

জয়া মিত্র এগুলোরই নাম দিয়েছেন 'মাটির গামলা' বা 'মাটির বাসন'।

তিনি বলছিলেন, "মাটি খুঁড়ে যদি বিভিন্ন সাইজের, ছোট পুকুর বড় পুকুর এগুলো তৈরি করা যায় - তাহলে সেটাকে তুলনা করতে পারি মাটির গামলা-বালতি-বাসনের সঙ্গে, যাতে জল জমা রাখা যায়।"

এলাহাবাদের কাছে পানীয় জল নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন গ্রামবাসীরা
ছবির ক্যাপশান, এলাহাবাদের কাছে পানীয় জল নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন গ্রামবাসীরা

"সেই জল শুধু যে আমরা ব্যবহার করতে পারি তা-ই নয়, তার একটা বিপুল অংশ মাটির তলায় ধীরে ধীরে টেনে যেতে থাকে। ফলে গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জিংও হতে থাকে আপনা থেকেই।"

তিনি আরও জানাচ্ছেন, কৃষিতে সেচের কাজেই এখন ভারতের ৭৩ শতাংশ জলসম্পদ খরচ হয় ।

আর দেশে যে ধরনের উচ্চফলনশীল প্রজাতির চাষ হচ্ছে, তাতে মাত্র এক কিলো ধান উৎপাদনেই লেগে যাচ্ছে তিন থেকে চার হাজার লিটার জল।

ফলে বৃষ্টির জল বাঁচিয়ে রাখার চরম ব্যর্থতা আর ভূগর্ভস্থ জলের অপরিকল্পিত ব্যবহারই আসলে ভারতকে দ্রুত ঠেলে দিচ্ছে এক ভয়াবহ জলশূন্যতার দিকে।

আরো পড়তে পারেন: