আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সম্ভাব্য হুমকি মোকাবেলায় নতুন অস্ত্র ব্যবহারের হুঁশিয়ারি ইরানের আইআরজিসির
যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের হুমকি মোকাবেলায় ইরানের সামরিক বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে এবং আরেকটি সংঘাতের ক্ষেত্রে নতুন সমরাস্ত্র ব্যবহার করা হবে বলে হুশিয়ারি দিয়েছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর আইআরজিসি।
একই সময়ে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি জারি করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সফরের নিন্দা জানিয়েছে এবং এ সফরের পরিণাম সম্পর্কে আঞ্চলিক দেশগুলোকে 'সতর্ক' করেছে।
এদিকে, আইআরজিসির তিনজন মহাকাশ প্রতিরক্ষা বিভাগের কমান্ডারের ব্যাপারে তথ্যের জন্য ১৫ মিলিয়ন ডলার পুরষ্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ইয়েমেনি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির একজন মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, ইরান তার সামরিক সক্ষমতা এবং অস্ত্রসম্ভার সমৃদ্ধ করা অব্যাহত রাখবে এবং 'যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে নতুন অস্ত্র ব্যবহারের সূচনা করবে।'
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা 'ইরনা' এই সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছে যে, "ইরান তার প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ও গতিবিধি সম্পর্কে অজ্ঞ নয়, তারাও পর্যবেক্ষণ করছে।"
গত কয়েক দিনে ইরানি সামরিক কর্মকর্তারা সতর্কতামূলক বক্তব্য দিয়ে বলেছিলেন যে, যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে তারা সংঘাতের সীমানা পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
তারা আরও দাবি করেছে যে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে সংঘাতের সময় তারা প্রথমবারের মতো একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের ওপরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন।
এদিকে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা চলমান থাকায় এখনও কার্যত অচল হয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ফলে জ্বালানি আমদানির বিকল্প রুট হিসেবে সিরিয়ার একটি বন্দর থেকে ইরাক জ্বালানি স্থানান্তর শুরু করেছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, শক্তি ও জ্বালানির তীব্র চাহিদা মেটাতে ইরাকি জ্বালানি ট্যাংকারগুলো সিরিয়ার বানিয়াস বন্দরে পেট্রোল লোড করেছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে, যার ফলে দেশগুলো বিকল্প পথ খুঁজে বের করার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে এবং জ্বালানির দামও ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুতকারী অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ শারার অধীনস্থ সিরিয়া এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করেছে।
সেই সাথে অন্যান্য দেশের জন্য বিকল্প পথ হিসেবে বানিয়াস বন্দর উন্মুক্ত করে দিয়েছে দেশটি।এখন আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারগুলোও এ বন্দর ব্যবহার করেছে।
ইরাক গত কয়েক মাসে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলার জন্য বানিয়াস রুট ব্যবহার করে সড়কপথে ফুয়েল ট্রাকের মাধ্যমে বিদেশি বাজারে তেল রপ্তানি করেছে।
এখন ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে তিন মাসের একটি চুক্তির ভিত্তিতে বাগদাদ সিরিয়ার মাধ্যমে পেট্রোল আমদানি শুরু করেছে। এ রুটে ইরাকের আমদানিকৃত পেট্রোলের প্রথম চালান বৃহস্পতিবার ইরাকে পৌঁছেছে।
এদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগ ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের মহাকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর তিনজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডারের ব্যাপারে তথ্যের জন্য ১৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের "রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস" কর্মসূচির মঙ্গলবারের এ ঘোষণায় উল্লেখ করা নামের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ মেহরাবির নাম, যিনি আইআরজিসি এরোস্পেস ফোর্সের জিহাদ গবেষণা সংস্থার প্রধান।
দ্বিতীয় নাম আহমেদ জাফরাবাদী, যাকে আইআরজিসি-র এরোস্পেস ফোর্সের জ্যেষ্ঠ কমান্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি এ ফোর্সের কর্মক্ষম ব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী।
তবে এটি আইআরজিসি-র এরোস্পেস ফোর্সের স্পেস কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী জাফরাবাদীকে নির্দেশ করছে নাকি ঘোষণায় উল্লিখিত অন্য কোনো ব্যক্তিকে, তা স্পষ্ট নয়।
আলী আসগর নওরোজী, যিনি রেভোলিউশনারি গার্ডসের প্রস্তুতি ও সহায়তার ডেপুটি ডিরেক্টর, তিনি এ ঘোষণার তৃতীয় ব্যক্তি যার পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করার মতো তথ্যের জন্য পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে 'যুক্ত' ১০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
এ সনদের তালিকা মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের অফিস অফ ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল ঘোষণা করেছে এবং এর মধ্যে ইরান, মেক্সিকো, চীন ও পাকিস্তানের নাগরিকদের নাম রয়েছে।
ইসলামাবাদ সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর, যা ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির দিকে যাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে, যার মধ্যে ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও রয়েছে।
এদিকে, চলমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ইরানের অর্থনীতি আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
প্রতিদিন মূল্য হারাতে থাকা ইরানি মুদ্রার ক্ষেত্রে একটি নতুন রেকর্ড গড়ে দেশটির বাজারে ডলারের দাম মঙ্গলবার ২ লাখ ৫৪ হাজার তমানে পৌঁছেছে।
একদিকে তেহরান যখন বলছে যে যুদ্ধ শেষ করতে এবং কূটনীতির পথ উন্মুক্ত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় আছে, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং ইরানের সম্পদ মুক্ত করার যেকোনো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন—এমন পরিস্থিতিতেই এই রেকর্ড তৈরি হলো।
ট্রাম্প কি এই নিষেধাজ্ঞাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে তার লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন?
মার্কিন অর্থ বিভাগের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ অফিসের সাবেক সিনিয়র বিশেষজ্ঞ ডেভিড ট্যানেনবাম বিবিসি পার্সিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটির কাউন্সিলের সেক্রেটারি বলেছেন যে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের শর্তাবলী সম্পর্কে অবহিত করেছে, কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প "সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।"
তেহরান সফররত আজারবাইজানের উপপ্রধানমন্ত্রীর সাথে এক বৈঠকে মহসেন রেজাই বলেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট "এমন এক চোরাবালিতে আটকা পড়েছেন যেখানে তিনি না পারছেন আলোচনা করতে, না পারছেন যুদ্ধ করতে।"
রেজাই বলেন, "ইরানের শর্তগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো হয়েছে, কিন্তু ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম এবং সামরিক যুদ্ধে মরিয়া হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আকাশ অবরোধের পথ বেছে নিয়েছে।"
এর কয়েক ঘণ্টা আগে, নিউইয়র্ক থেকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছিলেন যে, এই সফরে তার মিশন ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা সহ ইরানের শর্তাবলী সম্পর্কে অবহিত করা।
মি. আরাঘচি বলেছিলেন যে, "এ বিষয়ে ইরানের একটি পরিকল্পনা রয়েছে, এর শর্তগুলো সম্পূর্ণ ন্যায্য এবং যৌক্তিক, এবং আমেরিকানরা যদি দাবি করে যে তারা কোনো চুক্তি বা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করছে, তবে আমরা এই সমাধানটি সামনে এনেছি।"
ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন যে তিনি ইরানের এই পরিকল্পনার সাথে একমত নন, তবে একই সাথে প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত করে যে ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারীরা তার সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আঞ্চলিক দেশগুলোকে এই সফরের পরিণতি সম্পর্কে "সতর্ক" করে একটি বিবৃতি জারি করেছে।