মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনায় বারবার আক্রমণ কেন?

    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত হামিদুর রহমানের একটি ভাষ্কর্যে জুতার মালা পরানোর ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহে। গত দুই বছরে এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো এই ভাষ্কর্যটিতে ভাঙচুর বা অবমাননার ঘটনা ঘটলো।

সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও এবং কয়েকটি ছবি সামনে আসার পর ক্ষোভ জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিতে দেখা গেছে অনেককে।

সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে এই কাজের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। অভিযুক্ত ব্যক্তি কেন এই কর্মকাণ্ড করেছে, সেটি জানতে তদন্ত করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মারকগুলো সংরক্ষণের প্রসঙ্গ আবারও সামনে এসেছে।

বিশেষ করে, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভাঙচুরের শিকার মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা ও ভাষ্কর্যের মেরামত, সংস্কার বা রক্ষায় বর্তমান বিএনপি সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে, এই প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।

এসব স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংস্কারে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী।

কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের আট মাসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্থাপনা সংরক্ষণ এবং সংস্কারে বর্তমান সরকারের পদক্ষেপে সন্তুষ্ট নন মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে।

তারা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলো রক্ষা করা এবং সংস্কারের ক্ষেত্রে যে প্রত্যাশা তাদের ছিল, সেটি পূরণ করতে পারেনি বর্তমান সরকার।

ঝিনাইদহে কী ঘটেছে?

ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা পরানোর বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে মঙ্গলবার সকালে।

সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনার একটি ভিডিও ও একাধিক ছবি ভাইরাল হলে দুপুরের দিকে ভাষ্কর্যটি থেকে জুতার মালা সরিয়ে ফেলা হয়।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পরে এ নিয়ে জরুরি বৈঠকও করেন জেলা প্রশাসক।

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ভাষ্কর্যটির মাথায় একটি জুতার মালা রেখে দেওয়া হয়েছে। যার পাশেই একটি সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে- 'স্মৃতিস্তম্ভ এর মেরামত কাজ চলছে'।

সিসিটিভি ফুটেজ পর্যলোচনা করে এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আব্দুর রহমান সম্রাট নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ।

ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানান, এখানে আরও কেউ জড়িত আছেন কি না কিংবা কী উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।

"কেন সে এই কাজটি করেছে সেটি এখনো আন্ডার ইনভেস্টিগেশন। তাকে রিমান্ডে পেলে হয়তো জিজ্ঞাসাবাদ করে পরবর্তীতে জানা যাবে। তবে সেই যে কাজটি করেছে এটি আমরা কনফার্ম," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

স্থানীয় একাধিক গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রেফতার ব্যক্তির কোনো রাজনৈতিক পরিচয় এখন পর্যন্ত জানা যায়নি, তবে তিনি ঝিনাইদহের বাসিন্দা।

এদিকে, ২০১৯ সালের মার্চে ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান এর নামে এই চত্বরের উদ্বোধন করা হয়। জুলাই আন্দোলনে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এই ভাষ্কর্যটি অন্তত চারবার ভাঙচুর কিংবা প্রকাশ্যে অবমাননার ঘটনা ঘটেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে, সবশেষ গত ১৩ই জুলাই একটি চক্র ভাস্কর্যটি ভাঙচুর শুরু করলে নানা সমালোচনার প্রেক্ষাপটে পদক্ষেপ নেয় জেলা প্রশাসন।

কিন্তু একাধিকবার ভাঙচুর ও অবমাননার ঘটনার পরও গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ভাষ্কর্যটি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয়দের অনেকে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, ভাষ্কর্যটি সংস্কারের কথা হলেও দিনের পর দিন সেই কাজ চলমান রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের ভাষ্কর্যে বারবার হামলার পেছনে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাত রয়েছে বলে মনে করেন ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ।

"যে অসাধু চক্র অস্থিরতা তৈরি করছে, তারাই এই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এই ঘটনায় জেলা বিএনপির তৎপর ভূমিকা রয়েছে, একজনকে পুলিশ ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে," বলেন তিনি।

ঘটনাটিকে 'কুচক্রি মহলের ষড়যন্ত্র' হিসেবে দেখছেন জেলা জামায়াতের আমীর ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আলী আজম মো. আবু বকর। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতেই এই ধরনের অপকর্ম করার চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী।

বাকি স্থাপনার কী হাল

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল।

ওই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে একটি পক্ষ এসব ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল।

এরপর থেকেই গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর ও অবমাননা অসংখ্য অভিযোগ সামনে এসেছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষ্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভে ভাঙচুরের পাশাপাশি ভাঙা হয়েছিল বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতিফলক, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও ম্যুরাল।

মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত কত স্থাপনা সেসময় ভাঙচুর বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারিভাবে জানানো না হলেও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারের কাছাকাছি বলে দাবি করা হয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এই ধরনের একাধিক ঘটনা গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল। ওই সময় দায়িত্বে থাকা সরকার মুক্তিযুদ্ধের কিছু স্থাপনা সংস্কারেরও উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু কাজ খুব একটা এগোয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে বলে মনে করা হলেও, এখনো মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর বা অবমাননার ঘটনা ঘটছে।

এছাড়া নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আট মাস পরও, অতীতে ভাঙচুরের শিকার মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্থাপনা মেরামত বা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।

সম্প্রতি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে পানির ফোয়ারা নির্মাণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর এ নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। ভাস্কর্য না বানিয়ে ফোয়ারা কেন- এই প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে।

এছাড়া, মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে ভাঙচুরের ঘটনা সারাদেশে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। কিন্ত ভাঙচুরের দুই বছরেরও বেশি সময় পেরোলেও এটি এখনো সংস্কার করা হয়নি।

বুধবার দুপুর পর্যন্ত মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স-এ কোনো ধরনের সংস্কার কাজ শুরু হয়নি বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন মেহেরপুরের একাধিক গণমাধ্যমকর্মী।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও মুক্তিযোদ্ধা ডা. সারওয়ার আলী বলছেন, ২৪ এর জুলাইয়ে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ভাষ্কর্য ধ্বংস করা হয়েছে, কিন্তু এর কোনো প্রতিকার দেখা যায়নি।

"বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেক প্রত্যাশা আমাদের ছিল। কিছু পদক্ষেপ তারা নিলেও- আমাদের প্রত্যাশা যে, মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনাগুলো রক্ষায় বর্তমান সরকার আরও উদ্যোগি হবেন। যত দ্রুত সম্ভব এগুলো পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নেবেন," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

"হামিদুর রহমান দেশের গৌরবগাঁথার একজন শহীদ সৈনিক," তার এই ধরনের অপমান- অবমাননা মুক্তিযুদ্ধের অপমান বলেও মন্তব্য করেন মি. আলী।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান অবশ্য বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের যেসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল, সেগুলো মেরামতে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো সংস্কারের ব্যাপারে সরকার সুনির্দিষ্ট কী পদক্ষেপ নিয়েছে সে বিষয়ে পরিষ্কার করে কিছু জানাননি মন্ত্রী।

মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স সংস্কারে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এই প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, "আমি একটু খোঁজ নিয়ে দেখি। একটা কথা মনে রাখবেন, এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের আলোকের সরকার।"

"স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যারা ন্যূনতম কর্মকাণ্ড করবে তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই ব্যাপারে আমাদের সরকার সবসময় তৎপর," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।