মক্কা সামরিক জোট: সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের 'ইসলামিক নেটো' কি মুসলিম দেশগুলোকে সুরক্ষা দিতে পারবে?

ছবির উৎস, Reuters
সৌদি আরব, পাকিস্তান আর তুরস্কের মধ্যে হওয়া সাম্প্রতিক সামরিক চুক্তিটি তিন ধরনের সামরিক আর অর্থনৈতিক সক্ষমতা সম্পন্ন দেশের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
এটি একদিকে যেমন কৌশলগতভাবে অর্থবহ, অন্যদিকে এ চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতার প্রতীকী তাৎপর্যও রয়েছে।
প্রতীকীভাবে দেখলে, চুক্তিটির তাৎপর্য হলো এটি স্বাক্ষর করা হয়েছে মুসলিমদের জন্য পবিত্র শহর মক্কায়।
একে এমন একটি জোট হিসেবে দেখা হচ্ছে যেখানে মুসলিম দেশগুলো একত্রিত হচ্ছে।
সামরিক জোটের অংশ হিসেবে মিলিটারি ট্রেনিং, ব্যবস্থাপনা ব্যয় আর গোয়েন্দা তথ্য আদান প্রদানের ক্ষেত্রে কোন দেশ কতটুকু অবদান রাখবে, তা নিয়ে সব দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
কিন্তু চুক্তির মূল বিষয় হলো নেটোর গঠনতন্ত্রের অনুচ্ছেদ ৫ এর মতো একটি শর্ত – কোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে তা সব দেশই নিজেদের ওপর হামলা বলে বিবেচনা করবে।
আর চুক্তির এই শর্তটি নিয়েই বেশি আলোচনা হচ্ছে।
ফলে অনেক বিশ্লেষক একে এমনভাবে দেখছেন যে, এর মাধ্যমে দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি নিরাপত্তার আরেকটি নিশ্চয়তা চাচ্ছে, অনেকটা 'ব্যাকআপ প্ল্যানের' মতো।
কিছুদিন আগে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি আর তেল শোধনাগারের মত স্থাপনায় হামলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট সেসময় হামলার শিকার দেশগুলোকে নিরাপত্তা দিতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।
তাই এ দেশগুলো নিজেদের মধ্যে সামরিক জোট করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা পেতে চাইছেছে, আর তারা বলছে যে এ জোট নির্দিষ্ট কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ও নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ করবে।
পাকিস্তান আর সৌদি আরব গত বছর নিজেদের মধ্যে যে সমারিক চুক্তিটি করেছে, এবারের চুক্তি অনেকটা সেই চুক্তিরই একটি বর্ধিত সংস্করণ।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত মানের, তাদের যুদ্ধবিমান, ড্রোন, মিসাইল সমৃদ্ধ শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের রয়েছে শক্ত আর্থিক সক্ষমতা আর পাকিস্তান পরমাণু শক্তিধর দেশ।
কাজেই এই তিন দেশের জোট স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।

ছবির উৎস, Reuters
এ জোটকে কীভাবে দেখা হচ্ছে?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
প্রশ্ন উঠছে, এই জোট কি একইসাথে ইরান আর ইসরায়েলকে প্রতিরোধের একটি প্রয়াস?
কারণ গাজায় সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে তুরস্কের সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে।
কাজেই দীর্ঘমেয়াদে মানে আগামী ১০ বছর বিবেচনায় নিয়ে হিসেব করলে, তুরস্কের চিন্তা ইসরায়েলের সাথে তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে, আর সৌদি আরবের চিন্তা ততদিনে ইরান সামরিকভাবে কতটা সক্ষমতা অর্জন করবে।
ইরানকে নিয়ে সৌদি আরবের চিন্তার কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থাতেই তারা মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে পাল্টা আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা দেখিয়ে যাচ্ছে।
তাই এ চুক্তিটা আসলে অনেকটা এমন যে, সৌদি আরব নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে অন্য দুই দেশ - তুরস্ক আর পাকিস্তানকে অন্তর্ভূক্ত করেছে। আর সৌদি আরব অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।
সৌদি আরব মুসলিম দেশগুলোতে বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়। আবার তারা তুরস্ক থেকে ড্রোনও আমদানি করে।
আবার ভৌগলিকভাবেও সৌদি আরব সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তাদের দীর্ঘ সৈকতের একপাশে আরব উপসাগর, অন্যদিকে লোহিত সাগর।
তারা এই সব বিষয় কাজে লাগিয়ে ওই অঞ্চলে নতুন একটি সামরিক নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
তবে, অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন যে নেটো'র মত কার্যকর একটি সামরিক ব্যবস্থা তৈরি করতে দীর্ঘসময় প্রয়োজন।

ছবির উৎস, Reuters
সৌদি আরবে হামলার পর পাকিস্তান কেন সাহায্য করলো না?
চুক্তির শর্ত মেনে এক দেশে হামলা হলে অন্য দুই দেশের সেনাবাহিনী যদি তাদের সরাসরি সহায়তা করতে যায়, তাহলে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কারণ একেক দেশ একেক ধরনের নিরাপত্তা জোটের সাথে আগে থেকেই চুক্তিবদ্ধ। যেমন তুরস্ক নেটোভুক্ত দেশ। আবার, পাকিস্তানের বাহিনী চীনা সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে। তাই সব বাহিনীকে একত্রিত করা বেশ জটিলই হবে।
তাই হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের যুদ্ধে পাকিস্তান সৈন্য আর বিমান প্রতিরক্ষার সরঞ্জাম দিলেও তারা সৌদি আরবকে পূর্ণ সেনা সমর্থন দেয়নি।
আবার ইরান যখন সৌদি আরবে হামলা করে, তখনও পাকিস্তান সৌদির সাহায্যে এগিয়ে যায়নি। কারণ ইরানের সাথে পাকিস্তানের সীমান্ত রয়েছে।
তাই এ চুক্তি সম্পর্কে দেশগুলোর নেতারা বলছেন যে, এ জোট মূলতঃ একটি সম্ভাব্য হামলা নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে একটি যৌথ প্রয়াস। এ জোট মূলত শান্তির জন্য, কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়।
এ জোট তৈরি করে দেশগুলো বিশ্বকে একটি বার্তা দিতে চায় যে, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ও জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে তারা গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে।
ভবিষ্যতে হয়তো তারা এ জোটে মিশর বা কাতরের মতো দেশগুলোকেও অন্তর্ভূক্ত করতে চাইবে। যে কারণে অনেকে এটিকে 'মুসলিম নেটো' বলছে।

ছবির উৎস, Reuters
আগেও 'ইসলামিক নেটো' জাতীয় জোট গঠনের চেষ্টা করেছিল সৌদি আরব
বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলছেন, সৌদি আরব এর আগে ২০১৬ সালে 'ইসলামিক নেটো' জাতীয় সামরিক জোট গঠনের চেষ্টা করেছিল।
সেসময় সৌদি আরবের উদ্যোগে ৩০টির বেশি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ মিলে আন্ত:দেশীয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে 'ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেররিজম কোয়ালিশন' গঠনের ঘোষণা দেয়।
বিভিন্ন দেশের বাহিনী একত্রিত হয়ে সৌদি আরবে জাঁকজমকের সাথে 'নর্থ থান্ডার' সামরিক মহড়াও করে।
সেসময় বিশ্লেষকরা ও মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যম এ জোটকে 'ইসলামিক নেটো' বলে অভিহিত করেছিল। কিন্তু ওই জোট গঠনের পর কার্যত সে অর্থে তেমন কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি।
এবারের সামরিক জোট তাৎপর্যপূর্ণ এই হিসেবে যে এটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ নিয়ে গঠিত হয়েছে।
পাকিস্তান কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে, গত বছর তারা আলাদাভাবে সৌদি আরবের সাথে সামরিক চুক্তি করেছে আর তাদের পরমাণু অস্ত্রও আছে।
তুরস্কের সেনাবাহিনী আকারে নেটো দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পর সবচেয়ে বড়।
কিন্তু মক্কায় স্বাক্ষর হওয়া এ চুক্তির দলিলে এমন কোনো শর্তের উল্লেখ নেই যে সৌদি আরবে হামলা হলে পাকিস্তান ও তুরস্ককে সাহায্য করতে আসতেই হবে।
আর সৌদি আরবে এর মধ্যে বেশ কয়েবার হামলা করেছে ইরাকে থাকা ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া আর ইয়েমেনের হুথিরা।
সুতরাং এ চুক্তি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ কী-না, তা সৌদি আরবে হামলা হওয়ার প্রেক্ষিতে এ দুই দেশের পদক্ষেপেই বোঝা যাবে।

ছবির উৎস, Reuters
পাকিস্তান যেভাবে 'ভারসাম্য' রাখার চেষ্টা করছে
চুক্তির অংশ হিসেবে পাকিস্তান এখন কী পদক্ষেপ নেয় সেদিকে অনেক দেশেরই নজর থাকবে।
পাকিস্তান একদিকে ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে, আবার এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে যেটি আপাতদৃষ্টিতে ইরান ও ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যেই তৈরি করা একটি জোট।
পাকিস্তানের ইরানের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত যেমন রয়েছে, তেমনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কও রয়েছে।
তাই তারা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
আবার পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের সাথেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চেয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে।
তারা ওই অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানি করে, আবার সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশুগুলোতে থাকা পাকিস্তানিরা দেশের প্রবাসী আয়ের বড় উৎস।
তাই এ জোটের শীর্ষ নেতারা বারবার একটি বিষয়ে জোর দিচ্ছেন যে এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়, আন্ত:দেশীয় সন্ত্রাসবাদ নির্মূল ও নিরাপত্তার স্বার্থে।
কাজেই এখানে পাকিস্তান কৌশল ও কূটনীতির হিসেবে ভারসাম্য রেখে ভূমিকা নেয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পরিস্থিতির বিবেচনায় তাদের অবস্থান খুব দ্রুত বদলানোর প্রয়োজনও তৈরি হতে পারে।

ছবির উৎস, Reuters
যে কারণে ভারত, চীন আর ইরান নজর রাখছে
মধ্যপ্রাচ্য বাদেও এশিয়ার কয়েকটি অঞ্চলের দেশ এ জোটের গতিবিধির ওপর নজর রাখছে।
পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের মধ্যে গত কয়েকমাসে বেশ কয়েকবার সীমান্তে গুলি বিনিময় হয়েছে। এই পরিস্থিতি চললে পাকিস্তানে হামলা হলে সৌদি আরব বা তুরস্ক কি আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেবে?
আবার পাকিস্তানের সাথে ভারতের মিসাইল বিনিময়ের ঘটনা মাত্র গত বছরেই ঘটেছে। তেমন পরিস্থিতি আবার হলে তুরস্ক আর সৌদি আরব কি পাকিস্তানকে সাহায্য করতে আসবে?
যদিও, সৌদি আরব বা তুরস্কের সেনাবাহিনী সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে অভিযান না চালালেও, পাকিস্তান সৌদি আরব আর তুরস্কের কাছ থেকে ড্রোন ও মিসাইলের মত সামরিক প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক সহায়তা পেতে পারে, যা ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলবে।
এর ফলে সম্প্রতি ভারতের সাথে ইসরায়েলের সামরিক ও কৌশলগত বিষয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের ইস্যুটিও সামনে আসছে। আবার ভারত কিছুদিন আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সামরিক জোটের চুক্তির প্রাথমিক রুপরেখায় স্বাক্ষর করেছে।
আবার চীনের কাছ থেকেও পাকিস্তানের সামরিক পর্যায়ে মিলিটারি জেট, ড্রোন, নজরদারি করার প্রযুক্তির মত সমর্থন পায়।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন কয়েকটি দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।
আবার ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হলে ওয়াশিংটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে নিশ্চিতভাবেই - যা তারা দুই দেশের সবশেষ সংঘাতের সময় করেছে।
কাজেই এ জোট পুরো অঞ্চলের অন্য অনেক দেশকেই - বিশেষ করে জোটভুক্ত দেশগুলোর সাথে শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলো - চিন্তায় ফেলছে।
পাকিস্তানের এ জোটে থাকা যেমন ভারতকে চিন্তায় ফেলছে, ঠিক তেমনি আবার সৌদি আরবের অন্তর্ভূক্তি ইরানের জন্য, আর তুরস্কের জোটে থাকা গ্রীসের জন্য চিন্তার বিষয়।
(এই প্রতিবেদনটির মূল অংশ বিবিসির 'গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স করেসপন্ডেট' আনবারাসান ইথিরাজনের একটি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। 'উইল ইসলামিক নেটো প্রোটেক্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব অ্যান্ড টার্কি' শিরোনামের ঐ পডকাস্টটি বিবিসির গ্লোবাল নিউজ পডকাস্ট অনুষ্ঠানে ১১ই অগাস্ট সম্প্রচারিত হয়।
প্রতিবেদনের 'আগেও ইসলামিক নেটো জাতীয় জোট গঠনের চেষ্টা করেছিল সৌদি আরব' অংশটি বিবিসি'র নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিনিধি ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনারের একটি টিভি সাক্ষাৎকার থেকে ভাষান্তর করা হয়েছে)








