কুমিল্লায় 'কিশোর গ্যাং' অভিযোগে একরাতে ৬২৪ জনকে গ্রেফতার নিয়ে কী জানা যাচ্ছে

কিশোরদের দলবদ্ধ অপরাধ প্রবণতা বিশ্বজুড়েই বেড়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কিশোরদের দলবদ্ধ অপরাধ প্রবণতা বিশ্বজুড়েই বেড়েছে (প্রতীকী ছবি)
    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের কুমিল্লায় 'কিশোর গ্যাং'-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কয়েক ঘণ্টার অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করে পুলিশ।

পরে বৃহস্পতিবার পুলিশ জানায়, রাতে আটকদের মধ্যে ৪৫১ কিশোরকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এছাড়া মাদকসেবন, নিয়মিত মামলা, মোবাইল কোর্ট, নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম ও গ্রেফতারি পরোয়ানার মামলায় ১৭৩ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।

কুমিল্লার এই ঘটনার মতো অতীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন অভিযানের নজির রয়েছে। তবে কিশোরদের সংঘবদ্ধ অপরাধের প্রবণতা কমছে না বলে রয়েছে অভিযোগও।

মূলত, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সি সন্তান হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়।

এই প্রেক্ষাপটেই সাঁড়াশি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কুমিল্লা জেলা পুলিশ।

কেবল কুমিল্লা নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ কিশোর অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে এমন অভিযান চালাতে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ বলছে, কিশোর অপরাধীদের সঙ্গে জড়িতদের কড়া বার্তা দিতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে নিরপরাধ কেউ যেন এ ধরনের অভিযানে ভুক্তভোগী না হয় এবং অপরাধমূলক কাজে অর্থ ও সমর্থন দিয়ে যারা কিশোরদের ভুল পথে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশ লেখা শিল্ড, হেলমেট ও লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন পুলিশ সদস্য

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সারা দেশেই এ ধরনের অভিযান চালাতে সংঘবদ্ধ কিশোর অপরাধ চক্রের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে

কুমিল্লায় যা ঘটেছে

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষকের সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম।

এর একদিন পর, অর্থাৎ গত ১৯শে সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশেই একটি জঙ্গল থেকে সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

১৩ বছর বয়সি কিশোরকে হত্যার এই ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা জন্ম দিয়েছিল, যার রেশ এখনো কাটেনি।

এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখন পর্যন্ত পুলিশের তদন্তে যে তথ্য উঠে এসেছে কিংবা যাদের জড়িত সন্দেহে আটক করা হয়েছে, তার পুরোটাই কিশোর অপরাধ তথা কিশোর গ্যাং এর দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কুমিল্লার স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা এবং কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, গত কয়েক বছরে জেলায় ছিনতাই, মাদকসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর অপরাধীরা। এমনকি 'কিশোর গ্যাং' পরিচয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া কিংবা ছিনতাইয়ের একাধিক ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাটে বুধবার রাতে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে পুলিশ।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলছেন, গ্যাংয়ে সম্পৃক্ততার অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একরাতে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়।

"আটকদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। এছাড়া মাদকসেবী বা ওয়ারেন্টের আসামিও এখানে রয়েছে। কাউকে হয়রানি করা আমাদের লক্ষ্য নয়। মূলত কিশোর বয়সের অপরাধীদের কড়া বার্তা দিতে চাই আমরা," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মি. রহমান বলছেন, আটকদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে এবং মাদকসহ আটক হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাকিদের মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

কিশোর অপরাধ কমাতে এই ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখা হবে বলেও বিবিসি বাংলাকে জানান তিনি।

মি. রহমান বলছেন, "সন্ধ্যার পরে বখাটেদের উৎপাত বেড়ে যাচ্ছে এমন অসংখ্য অভিযোগের প্রেক্ষিতেই জেলা পুলিশ অভিযানটা চালিয়েছে। আমরা এই ধরনের অভিযান নিয়মিত করবো, যদি জনসমর্থন থাকে।"

এদিকে, বুধবার রাতে আটকদের মধ্যে ১৭ জন কুমিল্লার দাউদকান্দি মডেল থানার কক্ষের দরজা ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে।

যদিও পুলিশ বলছে, একসাথে অনেককে আটক করায় সাধারণ মানুষ থানায় ভিড় করে কারণ জানতে চায় এবং হট্টগোল তৈরি হওয়ার সুযোগে এমন ঘটনা ঘটে। পরে তাদের আবারও আটক করা হয়।

আটক কিশোরদের ছবি, তাদের মুখ ঘোলা করে দেওয়া

ছবির উৎস, JIBON

ছবির ক্যাপশান, অপরাধ চক্রে কিশোরদের কারা যুক্ত করছে সেটিও খতিয়ে দেখার কথা বলা হচ্ছে

কেন বাড়ছে, সমাধান কী?

বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন ধরনের অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ সামনে আসছে। মাদক, দলবদ্ধভাবে সংঘাত কিংবা চুরি-ছিনতাইয়ের মতো কর্মকাণ্ডে কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা আহরহই সংবাদ মাধ্যমে আসছে।

সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিশোর গ্যাং নিয়ে যে হিসাব দিয়েছে, সেখানে ঢাকাসহ সারা দেশে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং বিভিন্ন নামে সক্রিয় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

কিশোরদের গ্যাং সংস্কৃতি এমন একটি পর্যায়ে গেছে যে বিষয়টিকে 'সামাজিক ব্যাধি' বলা যায় বলে উল্লেখ করেছেন সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, মাদকের সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ায় দেশে কিশোর অপরাধ বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বলছেন, কেবল বাংলাদেশে নয়, সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত নানা কারণে বিশ্বজুড়েই কিশোর অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে।

"স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা শিখছে আমাদের শিশুরা। এছাড়া সময়ের সাথে বাচ্চাদের মেনটাল বা ইমোশনাল চাহিদাতেও যে পরিবর্তন আসছে সেগুলো তারা কীভাবে, কোন সোর্স থেকে পূরণ করছে, এটিও অনেক সময় বোঝা যাচ্ছে না," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

মিজ আক্তারের মতে, অর্থ, ক্ষমতা, স্বীকৃতি এবং টাইমপাস- মূলত এই চারটি কারণে শিশুরা ভিন্ন পথে ধাবিত হচ্ছে।

"সমাজে যখন সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করবে না, একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে তখন অপরাধ প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। এছাড়া, আমাদের ফ্যামিলিগুলো ভেঙে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক ইস্যু প্রচুর। সামাজিক মাধ্যমের অবাধ বিচরণ। সব মিলিয়ে আমাদের শিশুদের সামাজিকীকরণ ঠিক মতো হচ্ছে না," বলেন তিনি।

তার মতে, এই বয়সের শিশু তাদের প্রতিই আকৃষ্ট হচ্ছে, যাদের অর্থ ও ক্ষমতা রয়েছে। শুরুতে অন্য যেকোনোভাবে যুক্ত হলেও ধীরে ধীরে সেটি মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধের দিকেই চলে যায়।

কিশোরদের দলবদ্ধ অপরাধের পেছনে রাজনৈতিকভাবে তৈরি হওয়া 'বড়ভাই' সংস্কৃতিকেও দুষছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, পাড়া-মহল্লায় একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা বা মাদক ব্যবসায়ীরা কিশোরদের নানামুখী অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করছেন।

একজনের দুটি হাতে হাতকড়া পড়ানো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অনেক ক্ষেত্রে বিচার না হওয়ায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা (প্রতীকী ছবি)

কিশোর গ্যাং-এর বিস্তৃতি এবং তাদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুক।

তিনি বলছেন, কিশোরদের সংঘবদ্ধ উপস্থিতি বা চলাচল নতুন কিছু নয়। কিন্তু ৯০ এর দশক থেকে বাংলাদেশে কিশোরদের গ্যাং সংস্কৃতি বা সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রবণতা বাড়তে থাকে, যা বর্তমানে অস্ত্র ও মাদকের সহজলভ্যতার কারণে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বৃদ্ধির পেছনে দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আইনের দুর্বলতাইও দায়ী বলে মনে করেন এই অপরাধ বিশ্লেষক।

বাংলাদেশের শিশু আইন অনুযায়ী, নয় থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কিশোর অপরাধের আওতায় পড়ে। যেখানে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সর্বনিম্ন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত আটকাদেশ বা বিশেষ কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

মি. ফারুক বলছেন, কিশোরদেরকে নানাভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনের বিষয়টি বড় ভূমিকা রাখছে।

"একজন কিশোর অপরাধীকে তার অপরাধের জন্য প্রচলিত জেলখানায় নেওয়া হয় না। শিশু আইন অনুযায়ী কিশোরদের অপরাধের শাস্তির ধরণ এবং মাত্রাও ভিন্ন। ফলে এই সুযোগটা অনেক সংঘবদ্ধ অপরাধী সূক্ষ্মভাবে কাজে লাগাচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

এই বিশ্লেষক এর মতে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার সংস্কৃতি পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত কিশোরদের সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রবণতা বাড়তেই থাকবে।

"কিশোরদেরকে অপরাধ জগতে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে," বলেই মনে করেন এই বিশ্লেষক।

এক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় শাস্তির বিষয়ে বাংলাদেশের শিশু আইনে কিছু পরিবর্তন আনার কথা বলছেন মি. ফারুক। এছাড়া কিশোরদের অপরাধমূলক কাজে জড়িত করার বিষয়ে যে প্রভাবশালীরা জড়িত তাদেরও আইনের আওতায় আনার কথা বলছেন তিনি।

"কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড বা অন্য কোনো অপরাধে কেবল কিশোররাই ধরা পড়েছে। কিন্তু এদের যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, লালন-পালন করছে, তারা কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।