'অবরুদ্ধ' থাকার ৩০ ঘণ্টা পর চুয়েট ভিসি হাসপাতালে, আন্দোলন 'চালিয়ে যাবেন' শিক্ষার্থীরা

    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা চুয়েট-এর নবনিযুক্ত উপাচার্য শেখ শরীফুল আলমকে বের করে এনেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ। তাকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ বলছে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেই উপাচার্যকে তার কার্যালয় থেকে বের করা হয়েছে এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভিসি-বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ২২ দিন ধরে ক্লাস, পরীক্ষাসহ সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

উপাচার্যকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দিলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

নবনিযুক্ত উপাচার্যকে সরিয়ে সদ্য সাবেক উপাচার্যকে ফেরত আনার দাবিতে এখনো অনড় থাকার কথা জানিয়েছেন তারা।

যেভাবে শুরু হলো সংকট

গত ২১শে সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা কুয়েটের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এই আদেশের পরদিন, ২২শে সেপ্টেম্বর থেকেই আন্দোলন শুরু করেন চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে তারা ঘোষণা করেন 'কমপ্লিট শাটডাউন'।

তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে শিক্ষক সমিতি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতিও ঘোষণা করে 'কর্মবিরতি'।

সেই থেকে চুয়েটে কোনো ক্লাস বা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অধ্যাপক সায়েমের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন ও একাডেমিক শৃঙ্খলা ফিরেছিল। তাকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই অপসারণ করা হয়েছে, যা তারা মানেন না।

এই আন্দোলনের কারণে নিয়োগের পর প্রায় তিন সপ্তাহ ক্যাম্পাসে আসতে পারেননি নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম।

আন্দোলন শুরু করার পর থেকেই বিক্ষোভ, নতুন উপাচার্যকে লাল কার্ড প্রদর্শনসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

কিন্তু পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় গত সোমবার সকালে।

আন্দোলনরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দাবি, ২২শে সেপ্টেম্বর থেকেই উপাচার্য ভবনে তালা দিয়ে রাখলেও সোমবার সকালে ছাত্রদল নেতা এবং কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীকে নিয়ে তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করেন নতুন উপাচার্য।

ওই দিন নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে এসেছেন - এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সকাল সাড়ে নয়টা থেকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। উপাচার্যকে ক্যাম্পাস ত্যাগের সময় বেঁধে দেন তারা।

নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলে দুপুর ১২টার দিকে উপাচার্য ভবনের মূল ফটকে আবারও তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। একই সাথে ভবনটির বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়।

ফলে উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম এবং তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

আন্দোলন চলবে

পদত্যাগ না করা পর্যন্ত ভিসিকে তার কার্যালয় থেকে বের হতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।

অন্যদিকে নতুন উপাচার্য জানান যে, সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী তিনি এই পদে যোগদান করেছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই কাজ করবেন। অর্থাৎ পদত্যাগ করার ব্যাপারে তিনি আগ্রহী নন।

প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকার কারণে উপাচার্যের সঙ্গে থাকা বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। নতুন উপাচার্য নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানান।

মঙ্গলবার দুপুরে বিবিসি বাংলাকে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, অসুস্থ হওয়ার পরও তাদের হাসপাতালে যেতে দেওয়া হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলের চিকিৎসকরা তাদেরকে চিকিৎসা দেন।

এমন প্রেক্ষাপটে সংঘাত এড়াতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার।

পরে তাদের উপস্থিতিতে উপাচার্য এবং তার সঙ্গীদের বের হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

"ভিসি মহোদয় খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তার চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি, এটা খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন," বলেন বিবিসি বাংলাকে বলেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।

এদিকে, উপাচার্যকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে যেতে দেওয়া হলেও আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন চুয়েটের শিক্ষার্থীরা।

তাদের দাবি, এই ভিসি যেন আর চুয়েটে প্রবেশ করতে না পারেন।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েই ক্যাম্পাস ছাড়তে হবে নতুন উপাচার্যকে। ভিসি ভবনে অবরুদ্ধ থাকা ব্যক্তিদের জন্য খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও জানান তারা।

"আমরা স্যারকে শুরু থেকেই বলেছি যে, আপনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বের হয়ে যান, কিন্তু তিনি সেটি করেননি। শিক্ষার্থীরা তালা দেওয়ার পরও তিনি রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে তালা ভেঙেছেন, এতে শিক্ষার্থীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়েছেন," বিবিসি বাংলাকে বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরিন্দম দে।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

চুয়েটের আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে আসছে। বিশেষ করে, নতুন উপাচার্য যখন তালা ভেঙে তার কার্যালয়ে প্রবেশ করেন তখন তার সঙ্গে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর থাকার দাবিটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আন্দোলনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে শিক্ষার্থীদের বাসে হামলার ঘটনায়।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন যে, নিজের পদ ধরে রাখতে নবনিযুক্ত উপাচার্য মদুনাঘাট ও বহদ্দারহাট এবং চান্দগাঁও টার্মিনালে শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসে হামলা করিয়েছেন।

যদিও এ বিষয়ে উপাচার্য শেখ শরীফুল আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি, বিবিসি বাংলার প্রশ্নও এড়িয়ে গেছেন তিনি।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এটাও বলছেন, বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। এসব ঘটনার পর তাকে আর উপাচার্য হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন তারা।

এর আগে মঙ্গলবার সকালে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে পদত্যাগের শর্তে মুক্তির প্রস্তাব দেন।

তারা জানান, অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম নিজ হাতে পদত্যাগপত্র লিখে তাদের কাছে হস্তান্তর করলে অথবা সাংবাদিকদের সামনে প্রকাশ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দিলে ভবনের তালা খুলে দেওয়া হবে।

একই সঙ্গে তাকে ও তার সহযোগীদের নিরাপদে ক্যাম্পাস ত্যাগের সুযোগ দেওয়া হবে। অন্যথায়, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তালা খুলবেন না তারা।

চুয়েট এর শিক্ষক ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. মইনুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, সদ্য সাবেক উপাচার্যকে হঠাৎ করে অপসারণ করার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। কিন্তু তালা ভেঙে যেভাবে নতুন উপাচার্য তার কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন তাতে শিক্ষার্থীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

তিনি জানান, চুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও রাজনৈতিক নেতা ও বহিরাগতদের নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশের এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিও নিন্দা জানিয়েছে।

চুয়েটে চলমান আন্দোলন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই শিক্ষক।

"দীর্ঘদিন আন্দোলনের কারণে ক্লাস, পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যায় মঞ্জুরী কমিশন কিংবা সরকারের কেউ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করেননি," বলেন তিনি।

এদিকে, ২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ অচল হয়ে থাকলেও সরকার বা ইউজিসির পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনও দেখা যায়নি।

এই পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার দুপুর চুয়েটের পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান যে, তিনি ঢাকার বাইরে রয়েছেন। নতুন উপাচার্য কাজে যোগ দিতে যাওয়ার বিষয়টি শুনলেও এরপর আর কিছুই জানেন না তিনি।