যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হতে পারিবারিক নির্যাতনের ভুয়া অভিযোগ অভিবাসীদের, বিবিসির অনুসন্ধান

- Author, বিলি কেনবার, রাজনীতি বিষয়ক তদন্ত প্রতিবেদক এবং ফিল কেম্প, রাজনীতি বিষয়ক প্রতিবেদক
- পড়ার সময়: ১১ মিনিট
যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেতে 'পারিবারিক সহিংসতার' শিকার হওয়ার মিথ্যা দাবি তুলছেন একদল অভিবাসী, বিবিসির বিশেষ অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে এমন তথ্য।
প্রকৃতপক্ষে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন- এমন ব্যক্তিদের দ্রুত স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দিতে ব্রিটিশ মন্ত্রীরা কিছু বিশেষ নিয়ম চালু করেছিলেন। যে নিয়মগুলোই এখন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে জালিয়াত চক্র।
রাজনৈতিক আশ্রয়ের মতো দীর্ঘ প্রক্রিয়ার চেয়ে এসব পথে দ্রুত বৈধতা পাওয়া যায় বলে এটি এখন প্রতারণার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
আইনজীবীদের মতে, ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা হোম অফিসের অপর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে সামান্য প্রমাণের ভিত্তিতেই অনেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, এসব মিথ্যা অভিযোগের কারণে নষ্ট হচ্ছে অনেক নিরপরাধ ব্রিটিশ নাগরিকের জীবন, যারা অজান্তেই প্রতারক অভিবাসীদের সঙ্গে সম্পর্কে বা বিয়েতে জড়িয়েছিলেন।
'পারিবারিক নির্যাতনের ভুক্তভোগী অভিবাসীদের ছাড়' নামে পরিচিত এই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো কীভাবে অপব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগগুলোই অভিবাসন ব্যবস্থা নিয়ে বিবিসির একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
আজ আমরা জানাবো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একদল অভিবাসী প্রথমে ব্রিটিশ নাগরিকদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলছেন বা বিয়ে করছেন। এরপর যুক্তরাজ্যে আসার পরে স্থায়ী বসবাসের পথ সুগম করতে সঙ্গীর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন।
পাশাপাশি, অনলাইনে সক্রিয় কিছু অসাধু আইনি পরামর্শক অভিবাসীদের নানা ধরনের মিথ্যা অভিযোগ তুলতে উৎসাহিত করছেন।
বিবিসির একজন সাংবাদিক এমন একজন আইনি পরামর্শকের সঙ্গে দেখা করেছেন, যিনি তাকে সরাসরি পারিবারিক সহিংসতার মিথ্যা নাটক সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, অভিবাসন ব্যবস্থার ফাঁকফোকর নিয়ে বিবিসির ধারাবাহিক অনুসন্ধানের তৃতীয় অংশ এটি।
দ্বিতীয় পর্বে: ভুয়া ওয়েবসাইট এবং নাস্তিক সেজে জালিয়াতির চিত্র।
পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে দ্রুত স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীর সংখ্যা এখন বছরে পাঁচ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি যা মাত্র তিন বছরে ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
একটি ঘটনায় দেখা গেছে, এক ব্রিটিশ নারী তার পুরুষ সঙ্গীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে তাকে ছেড়ে যাওয়ার পর, ওই পুরুষ সঙ্গী উল্টো তার বিরুদ্ধেই নির্যাতনের অভিযোগ তোলে। ওই নারীর দাবি, অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ওই ব্যক্তি যুক্তরাজ্যে থেকে যাওয়ার জন্যই তা করেছিল।
এই অভিযোগগুলো কখনোই প্রমাণিত হয়নি, তবে সেগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ওই ব্যক্তি পাকিস্তানে ফেরত যাওয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করতে ৯০০ পাউন্ড
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে লন্ডনের সেন্ট প্যানক্রাস এলাকার একটি হোটেলের লাউঞ্জে ফিটফাট পোশাক পরা একজন তরুণ অভিবাসন পরামর্শদাতা তার এক ক্লায়েন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এর কয়েক দিন আগে পাকিস্তান থেকে আসা এক নতুন ক্লায়েন্ট তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তিনি জানান, তার একটি সমস্যা আছে। সেটি হলো তিনি তার ব্রিটিশ স্ত্রীকে ছেড়ে নিজের প্রেমিকার সঙ্গে থাকতে চান। কিন্তু তিনি ভিসা পেয়েছেন বিয়ের মাধ্যমে। যদি তিনি স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ করেন, তাহলে তাকে দেশ ছেড়ে যেতে হবে।
প্রাথমিক ফোনকলেই অভিবাসন পরামর্শদাতা এলি সিসওয়াকা দ্রুতই একটি সমাধানের ইঙ্গিত দেন। তিনি নিজে থেকেই সম্ভাব্য ক্লায়েন্টকে পরামর্শ দেন যে তিনি যেন পরিবারে নির্যাতনের শিকার এমন ভান করেন।
এবার তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ৯০০ পাউন্ডের বিনিময়ে তিনি একটি ভুয়া অভিযোগ তৈরি করবেন এবং হোম অফিসে দেওয়ার জন্য একটি গল্প সাজিয়ে দেবেন, যাতে তার ক্লায়েন্ট যুক্তরাজ্যে বৈধ অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে।
কিন্তু এই পরামর্শদাতা যা জানেন না, তা হলো তার 'ক্লায়েন্ট' আসলে আন্ডারকভার বা ছদ্মবেশে থাকা বিবিসির একজন প্রতিবেদক, যিনি তদন্ত করছেন কীভাবে কিছু আইনজীবী ও অভিবাসন পরামর্শদাতা অভিবাসীদের জন্য মিথ্যা গল্প তৈরি করে আইন ভাঙতে সাহায্য করছেন, যাতে তারা যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে পারে।
যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের (নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিষয়সহ যারা অভিবাসনের বিষয়গুলোও দেখে) নিয়ম অনুযায়ী, যেসব অভিবাসী যুক্তরাজ্যে অস্থায়ী ভিসায় ব্রিটিশ নাগরিকদের স্বামী বা স্ত্রী বা পার্টনার হিসেবে অবস্থান করছে এবং পারিবারিক নির্যাতনের শিকার, তারা সে দেশে স্থায়ী হতে একটি বিশেষ ছাড়ের জন্য আবেদন করতে পারে।
যেহেতু এসব অভিবাসী তাদের ভিসার পাশাপাশি খাদ্য ও বাসস্থানের জন্যও অনেক সময় সঙ্গীর ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাই এই সুবিধাটি দেওয়া হয় তাদের জন্য, যাদের সম্পর্ক সহিংসতা বা নির্যাতনের কারণে ভেঙে গেছে।

যদি আবেদনটি সফল হয়, তবে তাদের যুক্তরাজ্যে তিন মাস থাকার অনুমতি দেওয়া হয় এবং তারা সরকারি সুবিধা পাওয়ারও অধিকারী হন।
এই তিন মাসের মধ্যে তারা যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারেন। এটি পেলে বিদেশি নাগরিকরা কোনো সময়সীমা ছাড়াই যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস, কাজ ও পড়াশোনার অধিকার পান।
স্থায়ী বসবাসের অনুমতির এ পন্থা অ্যাসাইলামের মতো অন্য পন্থাগুলোর তুলনায় অনেক দ্রুততার সাথে হয়।
ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস এবং কাজ করছেন এমন ব্যক্তি সাধারণত অন্তত পাঁচ বছর অপেক্ষা করার পরই স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই নিয়মগুলো অপব্যবহারের ঝুঁকিতে থাকায় তারা উদ্বিগ্ন।
এই কারণেই বিবিসি বিষয়টি তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

করপোরেট ইমিগ্রেশন ইউকে নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন সিসওয়াকা। তিনি নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পারিবারিক নির্যাতন সংক্রান্ত এই ছাড় নিয়ে পোস্ট করেন এবং এই পন্থা ব্যবহার করে ক্লায়েন্টদের জন্য পাওয়া সফলতার কথাও প্রকাশ করেন।
সেন্ট প্যানক্রাসের হোটেলে তার সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি হোম অফিসকে কীভাবে রাজি করাবেন, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।
আমাদের প্রতিবেদক সিসওয়াকাকে জিজ্ঞেস করেন, "আপনি কী ধরনের প্রমাণ ব্যবহার করবেন? কারণ সে আমাকে মারধর করে না বা এমন কিছু করে না, তাই পারিবারিক সহিংসতার কোনো প্রমাণ নেই"।
সিসওয়াকা জবাবে বলেন, "মৌখিকভাবে"।
"তোমরা দুজন ঝগড়া করেছ, আর সে তোমাকে এমন কথা বলেছে- যেমন 'মনে রেখো, আমিই তোমাকে এখানে এনেছি'- এই ধরনের কথা"।
পরে কথোপকথনের পরবর্তী অংশে তিনি তার পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, বিষয়টি 'মানসিক নির্যাতন' হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। যেমন, "যখন কেউ আপনাকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করছে বা আপনার মনের সঙ্গে খেলছে"।
তিনি প্রতিবেদককে আশ্বস্ত করেন যে চিন্তার কিছু নেই। তিনি একটি গল্প তৈরি করে দেবেন। তিনি বলেন, এ ধরনের অন্যান্য মামলায় তার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বিবিসিরি প্রতিবেদক জানতে চান, "এর কতগুলো সফল হয়েছে?"
সিসওয়াকা জবাব দেন, "সবগুলোই"।
বিষয়টি প্রমাণ করতে তিনি প্রতিবেদককে হোম অফিসের একটি চিঠি দেখান, যা তার একজন ক্লায়েন্টের জন্য পাঠানো হয়েছিল। সেখানে বলা হয় তাদের আবেদন সফল হয়েছে। যদিও এটি স্পষ্ট ছিল না যে সেটি সত্যিকারের নির্যাতনের অভিযোগের ভিত্তিতে ছিল কি না।
সিসওয়াকা নিবন্ধিত সলিসিটর নন কিংবা অভিবাসন পরামর্শদাতাও নন, যার অর্থ তার পক্ষে অভিবাসন সংক্রান্ত পরামর্শ বা সেবা দেওয়া আইনত অবৈধ।
তবুও ওই চিঠি থেকে বোঝা যায়, হোম অফিস তার পরিচয়পত্র যাচাই না করেই অর্থ প্রদানকারী গ্রাহকদের বিষয়ে তার সাথে দাপ্তরিক চিঠিপত্র আদান-প্রদান করছিল।
সিসওয়াকা এরপর এই প্রতিবেদককে জানান পরবর্তী ধাপে কী হবে।
তিনি বলেন, আবেদন জমা দিলে তিন মাসের সীমিত সময়ের জন্য যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি পাওয়া যাবে এবং সেই সময় তিনি তার প্রেমিকার সঙ্গে আলাদা হয়ে থাকতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, ওই তিন মাসের মধ্যেই স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে।
তিনি প্রতিবেদককে আশ্বস্ত করেন যে স্ত্রীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করার ফলে তার ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। তিনি বলেন, "তাকে (ক্লায়েন্টের স্ত্রী) জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না বা ডাকা হবে না, কারণ এখানে কোনো অপরাধ নেই"।
মন্তব্যের জন্য লিখিত অনুরোধে সিসওয়াকা কোনো সাড়া দেননি। কিন্তু আমাদের তদন্তের বিষয়ে জানাতে করা এক ফোনকলে তিনি অস্বীকার করেন যে, পরিচয় গোপন করা ওই প্রতিবেদক পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন এমন একটি গল্প বানিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি।
এই খাতটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইস অথরিটি বলেছে, তারা অন্যায়ের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে "তদন্ত করবে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেবে"।
ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস কমিশনার গাওন হার্ট বলেছেন, "জনসাধারণের প্রতি আমাদের বার্তা স্পষ্ট - শুধু নিবন্ধিত উপদেষ্টাদেরই সাহায্য নিন, অন্যথায় আপনি গুরুতর ঝুঁকিতে পরবেন"।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

"কালো টাকা"
ফ্রিডম অব ইনফরমেশন অ্যাক্ট বা তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে বিবিসি নিউজের পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত আগের ১২ মাসে মোট পাঁচ হাজার ৫৯৬ জন অভিবাসী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হিসেবে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে। এটিই সর্বশেষ সময়কাল যার তথ্য পাওয়া গেছে।
আবেদনগুলোর প্রায় এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ এক হাজার ৪২৪টি অভিযোগ পুরুষেরা করেছে, যা দুই বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ৬৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, নারীদের করা আবেদনের সংখ্যা ৪৭ শতাংশ বেড়েছে।
এর ফলে অনেকেই উদ্বিগ্ন যে, পুরুষ ও নারী অভিবাসীরা মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করে এই নিয়মের অপব্যবহার করছে।
মিথ্যা অভিযোগের শিকার ব্যক্তিরা অভিযোগ করেছেন যে তাদের সঙ্গীরা পুলিশের কাছে ভুয়া রিপোর্ট করেছে, যার ফলে অপরাধের একটি রেফারেন্স তৈরি হয় এবং সেটিই পরে হোম অফিসকে প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, যদিও পুলিশ তদন্তে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
হোম অফিস বলছে, শুধু একটি ক্রাইম রেফারেন্স নম্বর থাকলেই সেটিকে পারিবারিক নির্যাতনের প্রমাণ হিসেবে ধরা হয় না।
কিছু ভুক্তভোগী তাদের নির্যাতনের বিষয়টি পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ক চ্যারিটিগুলোর কাছে রিপোর্ট করেছেন এবং সেটিকেও প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন, অথবা আদালতের মাধ্যমে 'নন-মলেস্টেশন অর্ডার' নিয়েছেন, যা 'এক্স পার্টে' প্রক্রিয়ায় (সঙ্গীকে না জানিয়ে) পাওয়া যায়।
এক দশকেরও বেশি সময় আগে, ২০১৪ সালে, হোম অফিসের একটি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে বলা হয়েছিল যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার এই পন্থাটি অপব্যবহারের ঝুঁকিতে পরতে পারে।
এক বছর পর, ইন্ডিপেনডেন্ট চিফ ইন্সপেক্টর অফ বর্ডার অ্যান্ড ইমিগ্রেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগের বিষয়ে কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইয়ে সমস্যা ছিল এবং সহায়তা সংস্থাগুলোর চিঠির মতো 'অযাচাইকৃত প্রমাণ'কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল, যেগুলোতে কেবল কথিত ভুক্তভোগীর নিজের বলা ঘটনার বিবরণই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল।
হোম অফিসের সেফগার্ডিং বিষয়ক মন্ত্রী জেস ফিলিপস বলেন, "প্রকৃত নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের রক্ষার জন্য তৈরি করা এই পন্থার অপব্যবহার অত্যন্ত লজ্জাজনক। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ধরনের হীন কৌশলের শোচনীয় প্রভাব দেখেছি।"
তিনি আরও বলেন, স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে যে যুক্তরাজ্যে থাকার জন্য ব্রিটিশ জনগণকে প্রতারণা করার চেষ্টা করলে আবেদন বাতিল করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ব্রিটেন থেকে বহিষ্কার করা হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, "ভুয়া আইনজীবী যারা এই ধরনের প্রতারণামূলক পরামর্শ দেয়, তাদের কারাগারে পাঠানো হবে এবং তাদের অবৈধ অর্থ বাজেয়াপ্ত করে সেই অর্থ তারা যে ধরনের অপরাধ করেছে সেগুলো দমনে ব্যবহার করা হবে"।

'প্রতিশ্রুতি ছিল অনেক'
এই বিষয়টি ফিলিপের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ তার নিজের এলাকারই একজন বাসিন্দা তাকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।
যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা আয়েশা (ছদ্মনাম) বলেন, বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে, কারণ তার স্বামী এই দেশে তাদের একটি সন্তান চাচ্ছিলেন।
আয়েশা বলেন, তিনি মহামারির সময় একটি ডেটিং অ্যাপে তার সাবেক স্বামীর সঙ্গে পরিচিত হন এবং খুব দ্রুত একটি প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
"সে আমাকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিত, অতিরিক্ত ভালোবাসা দেখাত এবং আমাকে নানা জিনিসও কিনে দিত, যাতে আমি খুব দ্রুত তার প্রেমে পরি," তিনি বলেন।
আয়েশা বলেন, ইসলামিক রীতিতে প্রথমে তাদের বিয়ে হয়। পরে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। এরপর সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে।
পরে আয়েশা জানতে পারেন যে তার স্বামীর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নেই, যদিও শুরুতে সে নিজেকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। আসলে সে একজন পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে নিজের ভিসার জন্য আয়েশার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
আয়েশা আরও বলেন, তার স্বামী তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতো এবং অত্যন্ত নির্যাতনমূলক আচরণ শুরু করেছিল। একপর্যায়ে তার স্বামী সে দেশে (যুক্তরাজ্যে) তাদের একটি সন্তান জন্মদানের জন্য তাকে জোর করতে থাকে।
তিনি বলেন, তার স্বামীকে "তার বন্ধুরা পরামর্শ দিচ্ছিল যে এখানে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে একটি সন্তান নেওয়া উচিত। তাই সে আমাকে অন্তঃসত্ত্বা হতে খুব চাপ দিচ্ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাকে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছিল"।
বিয়ের পর যে বাসায় আয়েশা ছিলেন সেটি এরপর তিনি ছেড়ে দেন এবং ঘটনাটি পুলিশ ও হোম অফিস উভয়ের কাছেই জানান।
এর পর কর্মকর্তারা তার স্বামীকে চিঠি দিয়ে জানান, স্ত্রীর সমর্থন ছাড়া তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
"আমার মনে হয়, সেই চিঠি পাওয়ার পর সে (তার স্বামী) বুঝতে পারে যে তার আর কোনো উপায় নেই। তাকে দেশ ছাড়তে বলা হচ্ছে, তাই কিছু একটা করতে হবে"।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
ভুক্তভোগী থেকে অপরাধী
আয়েশা বলেন, এর জবাবে তার স্বামী পুলিশের কাছে গিয়ে জানায় যে, সে নিজেই পারিবারিক সহিংসতার শিকার, তার স্ত্রী (আয়েশা) নয়।
সে পুলিশ কর্মকর্তাদের জানায় যে, আয়েশা ও তার পরিবার তার ওপর জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দিয়েছিল এবং তার স্ত্রী নির্যাতনও করতো।
আয়েশার ভাষ্য অনুযায়ী, "আমার বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করার ঠিক আগে সে বলেছিলো, 'ওহ, চিন্তা করো না, আমার এখানে থাকার একাধিক উপায় আছে। তোমার দেশে থাকার জন্য তোমোকে কোনো প্রয়োজন নেই'।"
"আমার বিরুদ্ধে তাকে নির্যাতনের অভিযোগ তোলার অনেক আগে থেকেই আমি কর্তৃপক্ষ এবং পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধকারী সংস্থাগুলোর সমর্থন পাচ্ছিলাম। আর ঘটনাটা ঘুরিয়ে দিয়ে আমাকেই অপরাধী বলাটা ছিল হৃদয়বিদারক"।
আয়েশা বলেন, তার সাবেক স্বামীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তার বিরুদ্ধে কখনোই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
অন্যদিকে, তার সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধেও ধর্ষণের অভিযোগে কোনো মামলা হয়নি। কারণ আয়েশা পরে মামলা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে মত পরিবর্তন করেন।
তবে ক্রিমিনাল ইনজুরিজ কমপেনসেশন অথরিটির মাধ্যমে আয়েশা ১৭ হাজার পাউন্ডের বেশি ক্ষতিপূরণ পান, যা থেকে বোঝা যায় তারা (ওই কর্তৃপক্ষ) মনে করেছে যে আয়েশার উত্থাপিত যৌন নিপীড়নের ঘটনাটি ঘটেছে বলেই সম্ভবত তারা মনে করেছে।
আয়েশা বলেন, তার বিরুদ্ধে সাবেক স্বামীর এই প্রতারণা এখানেই শেষ হয়নি।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে, তার সাবেক স্বামীর আরেকটি অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
আয়েশা বলেন, ওই ঘটনার জন্য তিনি তার শিশুসন্তানের কাছ থেকে মোট আট ঘণ্টা দূরে থাকতে বাধ্য হোন। শিশুটিকে তখনও বুকের দুধ খেতো। তার মেয়ের ফর্মুলা দুধে অ্যালার্জি ছিল।
তিনি বলেন, "যখন আমার বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়েছিলাম তখনই আমাকে বেরিয়ে যেতে হয় এবং যখন আমি বাড়ি ফিরলাম তখন আমার শুধু নিজের জীবনটা শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছিল"।
এমপি জেস ফিলিপস সেদিনই কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি লিখে বলেন, "আমার মনে হয়, আয়েশা ও তার সাবেক সঙ্গীর মধ্যে আগের ঘটনাগুলো সম্পর্কে (পুলিশ) জানলে তাকে গ্রেফতার করা হতো না"।
বার্মিংহাম ইয়ার্ডলি আসনের এই এমপি বিষয়টি নিয়ে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখেন এবং পরে হোম অফিসের মন্ত্রী হওয়ার পর আয়েশাকে পরামর্শ দেন, তার কাছে থাকা যেকোনো প্রমাণ হোম অফিসে পাঠাতে। তিনি নিজে বিষয়টি দেখবেন বলেও জানান।
"হোম অফিসই এটি ঘটতে দিচ্ছে"- এমনটি বিবিসিকে বলেন আয়েশা।
তিনি আরও বলেন, "তারা তাকে (তার সাবেক স্বামী) এই আচরণ চালিয়ে যেতে দিয়েছে। হোম অফিসের কারণে আমি চার বছর ধরে এক দুঃসহ সময় পার করেছি"।

ছবির উৎস, In pictures via Getty Images
সম্পূর্ণ ওলট-পালট হয়ে যাওয়া
ব্র্যাডফোর্ডের ফৌজদারি আইনজীবী জাবরান হুসেইন বলেন, শুধু আয়েশার সাথে এমন ঘটেছে তা ভাবার কারণ নেই।
তিনি এমন আরও অনেক ব্রিটিশ নাগরিকের সঙ্গে কাজ করেছেন, যাদের বিরুদ্ধে তাদের অভিবাসী সঙ্গীরা ভিসা সংক্রান্ত কারণে মিথ্যা নির্যাতনের অভিযোগ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, তার কিছু ক্লায়েন্টের জীবন "পুরোপুরি ওলট-পালট" হয়ে গেছে। অথচ যারা এসব অভিযোগ করছে, "তারা এখনো স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেতে পারে, কারণ অভিবাসন আইনে অভিযোগের রায় আসা বাধ্যতামূলক নয়"।
তিনি বলেন, অভিবাসী স্বামী বা স্ত্রীদের অনির্দিষ্টকালের জন্য বসবাসের অনুমতি পেতে সাধারণত বেশ কিছু কঠিন শর্ত থাকে, যেমন ইংরেজি ভাষার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং ফি প্রদান করা। কিন্তু পারিবারিক সহিংসতা সংক্রান্ত ক্ষেত্রে সেই নিয়মগুলো প্রযোজ্য নয়।
হুসেন আরও বলেন, "এই পন্থা সদিচ্ছা নিয়েই তৈরি করা হয়েছিল এবং এটি সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশ, অর্থাৎ পারিবারিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই ছিল"।
তবে আমার মনে হয় কিছু মানুষ আছে যারা নিজেদের স্বার্থে কিংবা স্থায়ী বসবাসের দ্রুত অনুমতি পেতে এই ব্যবস্থার অপব্যবহারকে ঠিক কাজ বলে মনে করে"।
এই নিয়মের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ পার্লামেন্টেও তোলা হয়েছে।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের কনজারভেটিভ এমপি রোবি মুর বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে এসে তার এলাকায় কিসলিতে বসবাসকারী কিছু স্বামী বা স্ত্রী তাদের সঙ্গীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছে- এ ধরনের 'উদ্বেগজনক' একটি প্রবণতা তিনি দেখছেন।
তিনি এমপিদের জানান, "কিছু কিছু পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ এখন যুক্তরাজ্যে আসার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই করা হচ্ছে এবং এসব দাবি করছেন নারী ও পুরুষ উভয়েই"।
"স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা দ্রুত পাওয়ার জন্য কিংবা স্থায়ী বসবাস/ভিসা নবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ এড়ানোর উদ্দেশ্যে পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ করার সুযোগটি ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্কে থাকা কিছু ব্যক্তি অপপ্রয়োগ করছে বলে আমার আশঙ্কা হয়।"









