বিক্ষোভকারীদের ওপরে গুলিতে তিন জন নিহতের ঘটনায় উত্তাপ মণিপুরে

মণিপুরে হিংসার বিরুদ্ধে মশাল মিছিল করছেন নারী বিক্ষোভকারীরা - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মণিপুরে হিংসার বিরুদ্ধে পথে বিক্ষোভকারীরা - ফাইল ছবি
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় মণিপুরে এক বিক্ষোভ সমাবেশে নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো গুলির আঘাতে মৃত্যু হয়েছে তিন জনের। এর আগে এক রকেট হামলায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়। সেই ঘটনাকে ঘিরে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এই রাজ্য। রাস্তায় নেমেছেন বিক্ষোভকারীরা।

বিষ্ণুপুরে এমনই একটি বিক্ষোভে গুলি চালায় পুলিশ। মণিপুর পুলিশ ফেসবুকে পোস্ট করে জানিয়েছে, বিষ্ণুপুরের ওই বিক্ষোভ জমায়েতে গুলি চালানোয় মৃত্যু হয়েছে তিনজন বিক্ষোভকারী ও আহত হয়েছেন ৩০ জন।

অন্যদিকে মণিপুর পুলিশের বক্তব্য, সাতই এপ্রিল ৫০০ জন বিক্ষোভকারীদের দলটি মোইরাং থানার অন্তর্গত গেলমোল গ্রামে একটি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর ক্যাম্পে হানা দেওয়ার চেষ্টা করে।

কেন্দ্রীয় বাহিনী জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও তারা বাহিনীর গাড়িগুলোতে আগুন লাগানো শুরু করে। এর পর বাহিনীর সংরক্ষিত অঞ্চলে প্রবেশ করার চেষ্টা করে তারা। তখনই গুলি চালায় বাহিনী, যাতে মৃত্যু হয় তিন জনের।

'মণিপুর এখন শান্ত', সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রীয় সরকারের এই বয়নের দুই মাসও পূর্ণ হয়নি, তারই মধ্যে ফের অশান্তির আগুন জ্বলে উঠল এই রাজ্যটিতে।

এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে বিষ্ণুপুর জেলার মোইরাং জেলায় অতর্কিতে ঘটা একটি 'রকেট হামলা' যার জেরে প্রাণ যায় দুজন শিশুর। এর পরেই মণিপুরের পাঁচটি জেলাজুড়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট পরিষেবা।

রাজধানী ইম্ফলের একটি বাস জ্বালিয়ে দেওয়া হয় গতবছর

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০২৫ সালে ইম্ফলে সহিংসতার ছবি

বিষ্ণুপুরে 'রকেট হামলায়' দুই শিশুর মৃত্য

সাতই এপ্রিল রাত একটা নাগাদ একটি রকেট হামলা হয় বিষ্ণুপুর জেলার মোইরাং থানার অন্তর্গত ত্রোংলাওবি আওয়াং লেইকাই অঞ্চলের একটি বাড়িতে। বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় দুটি শিশুর। এই ঘটনার পরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মণিপুর।

পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘটনায় তিনজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতরা সবাই ইউনাইটেড কুকি ন্যাশনাল আর্মি বা ইউকেএনএ-এর সদস্য। তাদের কাছ থেকে বহু অস্ত্রশস্ত্র ও গোলবারুদও বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ।

মণিপুর পুলিশের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, ধৃত তিন জনের কাছ থেকে ম্যাগাজিন ও ২৫ রাউন্ড গুলিসহ একটি একে ৪৭ রাইফেল, ১৫ রাউন্ড গুলিসহ একটি পিস্তল, মোট ২১.১৯ কিলো ওজনের দুটি কাঁচা আফিমের বস্তা ও ভারতীয় মুদ্রায় নগদ ২০ হাজার ১০০ টাকা পাওয়া গিয়েছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রাস্তা দিয়ে মার্চ করছেন - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, ARUN SANKAR/AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০২৩ সালে জাতিগত সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকেই বিপুল সংখ্যায় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে মণিপুরে - ফাইল ছবি

কাঠগোড়ায় প্রশাসন

গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, মণিপুরে শান্তি ফিরে আসছে। মানুষজন সাধারণভাবে রাজ্যে ঘোরাফেরা করতে পারছেন।

যদিও একাধিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে দেখা গিয়েছিল মেইতেই গোষ্ঠীর মানুষদের কুকিপ্রধান অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়া ও কুকি জনগোষ্ঠীর মানুষদের মেইতেই-প্রধান অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো বহু বাধা রয়েছে।

রকেট হামলায় দুটি শিশুর মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অ্যাক্টিভিস্ট লিসিপ্রিয়া কাঙ্গুজাম। সেই ভিডিওতে তিনি বলেন, "ইন্ডিয়ান আর্মি ক্যাম্প থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে কী ভাবে এই রকেট হামলা হতে পারে? সেনা কি ঘুমাচ্ছে?"

সরকারের তরফে এই অভিযোগের কোনো উত্তর না এলেও এই ভিডিওটি এখন দেশজুড়ে ঝড়ের গতিতে শেয়ার হচ্ছে।

দিল্লির যন্তরমন্তরে কুকি সংগঠনের বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Raj K Raj/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির যন্তরমন্তরে কুকি সংগঠনের বিক্ষোভ

কেন মণিপুরে বার বার জাতিগত সহিংসতা?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মণিপুরে কুকি ও মেইতেই দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষের মূলে রয়েছে সংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক সংঘাত। মণিপুরের সংখ্যাগুরু মেইতেই গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস মূলত রাজ্যের সমতল উপত্যকা অঞ্চলগুলোতে, যা রাজ্যের মোট এলাকার ১০ শতাংশ।

অন্যদিকে কুকি জনগোষ্ঠীর মানুষরা মূলত, পাহাড় অঞ্চলে বসবাস করেন। পাহাড় অঞ্চলে বসবাসের অধিকার শুধু তপশীলি জাতির জন্য সংরক্ষিত।

মেইতেই গোষ্ঠীর মানুষরা আগে তপশীলি জাতিদের তালিকাভুক্ত ছিলেন না। তবে ২০২৩ সালের ২৭শে মার্চ মণিপুর হাইকোর্ট জানায় মেইতেইরাও তপশীলি জাতির আওতায় আসতে পারেন। এই বিচার ভালভাবে নেননি কুকি জনগোষ্ঠীর মানুষ।

তাদের বক্তব্য ছিল, এই রায় বাস্তবায়িত হলে সংরক্ষিত পাহাড় ও বণাঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে পারবেন মেইতেইরা, যা কুকিদের অধিকার খর্ব করবে।

যদিও ২০২৪ সালে মণিপুর হাইকোর্ট এই রায়টি পুনর্বিবেচনা করে কিন্তু তার আগেই ২০২৩ সালের তেসরা মে থেকে অশান্তির আগুন ছড়িয়ে পড়ে মণিপুরে।

কুকি ও মেইতেই, উভয় গোষ্ঠীর নিষিদ্ধ সশস্ত্র সংগঠনগুলি মণিপুর জুড়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। যার জেরে ঘরছাড়া হন কমপক্ষে ৬০ হাজার মানুষ। সরকারি খাতায় মৃত্যুর সংখ্যা দাখিল হয় কমপক্ষে ২৬০।

মণিপুরের সেনাপতি জেলায় জ্বালিয়ে দেওয়া ঘরবাড়ি পরিদর্শন করছেন ভারতীয় সেনা সদস্যরা - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, ARUN SANKAR/AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০২৩ সালের মে মাসের গোড়া থেকে মণিপুরে শুরু হয় জাতিগত সহিংসতা - ফাইল ছবি

এই হিংসার ভয়াবহতা চমকে দিয়েছিল গোটা দেশকে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এন বীরেন সিংয়ের সরকারকে সরিয়ে মণিপুরে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়।

এই সব কারণ ছাড়াও মণিপুরে গত রাজ্য সরকারের আফিম চাষ বিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে রাজ্যে অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। রাজ্য প্রশাসন জানায়, কুকি গোষ্ঠীর মানুষরা বেআইনি আফিম চাষের সঙ্গে যুক্ত ও মিয়ানমার থেকেও কুকি জাতির অনুপ্রবেশকারীরা রাজ্যে ঢুকছে।

রাজ্য সরকারের এই অভিযোগের ফলে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় কুকি সংগঠনগুলো। মণিপুরে মেইতেইদের অবৈধ ও অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ আনে তারা।

সাতই এপ্রিলের রকেট হামলা কী কারণে হয়েছিল সেই উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনও কিছু জানা যায়নি। তবে এটা পরিষ্কার যে এই রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অশান্তির আগুন ফের জ্বলতে শুরু করেছে।