'আমার বাচ্চাটা ফিরবো কি না জানি না'- হামে আক্রান্ত দুই সন্তান নিয়ে ভয় বাবার

- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
দেড় বছরের শিশু নুরুননবির তীব্র জ্বর আর শ্বাসকষ্ট। হাসপাতালের বেডে নেবুলাইজার দিয়ে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পাশেই মায়ের কোলে তার বড় ভাই তিন বছরের শিশু মাহমুদুন্নবী।
ঢাকার মহাখালীতে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত এই দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে নির্ঘুম সময় কাটছে নরসিংদীর শাহিন মিয়া ও তার স্ত্রীর।
প্রায় ১৫ দিন আগে জ্বরে আক্রান্ত হলে দুই সন্তানকে প্রথমে গ্রামের চিকিৎসক দেখিয়েছিলেন মি. শাহিন।
ওষুধ খাওয়ানো পর জ্বর কমেও গিয়েছিল তাদের। কিন্তু তিন দিন না যেতেই আবারও তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয় দুজনই। এরপর থেকেই হাসপাতালে ছুটছেন শাহিন মিয়া ও তার স্ত্রী।
মি. শাহিন জানান, নরসিংদী সদর হাসপাতাল থেকে সন্তানদের হামে আক্রান্তের বিষয়ে নিশ্চিত হন। সেখানে দুইদিন ভর্তি থাকার পর চিকিৎসকের পরামর্শে ঢাকায় আসেন।
"ডাক্তার বললো আপনার বাচ্চার অবস্থা সিরিয়াস, ঢাকার শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসছি," বিবিসি বাংলাকে জানান তিনি।
অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় চিকিৎসা নিতে এসেও বিপাকে পড়েন মি. শাহিন। বাড়তি রোগীর চাপ থাকায় রাতভর তিনটি হাসপাতালে ঘুরতে হয়েছিল তাকে।
অবশেষে ঠাঁই মেলে মহাখালীর ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে, যেটি এখন হাম আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্ধারিত।
"শিশু হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, অনেক রোগীর চাপ। বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে দেখে তাড়াতাড়ি অন্য হাসপাতালে নিলাম, সেখানেও একই অবস্থা। সারারাত ঘুরে এই হাসপাতালে ভর্তি করতে পারছি। আমার বাচ্চাটা ফিরবো কি না জানি না," বলেন মি. শাহিন।
তার দেড় বছরের সন্তান নুরুননবির অবস্থা এখন গুরুতর জানিয়ে এই উদ্বেগের কথা বলছিলেন তিনি।
শনিবার দুপুরে একই হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা আইসিইউ এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক অভিভাবক মোহাম্মদ আনোয়ারের সঙ্গে কথা হয় বিবিসি বাংলার।
করিডোরের এক পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন ঢাকার নতুনবাজার এলাকার এই বাসিন্দা।
হামের উপসর্গ নিয়ে ১২ দিন আগে আইসিইউতে ভর্তি করেছেন আট বছরের মেয়ে ইয়ানুর আক্তারকে।
মি. আনোয়ার জানান, বৃহস্পতিবার রাতে তার মেয়েকে আইসিইউ থেকে সাধারণ বেডে নিতে বলেছিলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু একদিন না যেতেই আবারও তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
"এখন ডাক্তাররা বলতেছে অন্য হাসপাতালে নিতে। আমার মেয়ের নাকি ব্রেনে ইনফেকশন হইছে। এহন আমি কী করমু? আমি তো কিছু বুঝতাছি না," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুুুুন:

'ঢাকায় রোগীর চাপ বাড়ায় ঝুঁকিও বাড়ছে'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
"বাচ্চারে এলাকার হাসপাতালে নিছিলাম, ডাক্তার দেখে বললো সদরে নিতে- আমরা আর দেরি করি নাই, একবারে ঢাকায় আনছি।"
বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রাজবাড়ীর পাংশা এলাকার বাসিন্দা ফয়জুল হক। সপ্তাহখানেক ধরে তার তিন বছরের সন্তান হাম রোগে আক্রান্ত।
তার মতো হামের উপসর্গ থাকা শিশু সন্তানকে নিয়ে চিকিৎসার আশায় ঢাকামুখী হয়েছেন অনেকেই।
আইসিইউ সাপোর্টসহ জরুরি চিকিৎসার সক্ষমতায় ঘাটতি থাকায় কোনো কোনো রোগীকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে রেফারও করা হচ্ছে।
কেউ আতঙ্কে, আবার কেউ ভালো চিকিৎসার আশায়, অথবা চিকিৎসকের পরামর্শে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ছুটছেন।
ঢাকা শিশু হাসপাতাল এবং মহাখালী ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল (যেটি এখন হাম আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্ধারিত) সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ভর্তি রোগীর অধিকাংশই ঢাকার বাইরে থেকে আসা।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের পরিচালক ডা. লতিফা রহমান জানান, বর্তমানে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ওই হাসপাতালটিতে ভর্তি ৪৫৭ জন (শনিবার দুপুর পর্যন্ত) রোগীর বড় অংশই বাইরের জেলার।
তিনি বলছেন, ঢাকার বাইরে চিকিৎসা সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্যানিক হয়ে রোগীর স্বজনরা ঢাকার হাসপাতালগুলো চিকিৎসার জন্য বেছে নিচ্ছেন।
"মফস্বল থেকে অনেক রোগী আসায় আমাদের ওপর চাপ বাড়ছে। হয়ত সেখানেই চিকিৎসা সম্ভব ছিল। কিন্তু বাড়তি রোগী ঢাকায় চলে আসায় বরং ঝুঁকি আরও বাড়ছে," বলেন তিনি।
মিজ রহমান বলছেন, চিকিৎসকদের পাঠানো বা রেফার করা কিছু রোগী যেমন আসছেন, তেমনি 'ঢাকায় গেলেই ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে' এমন চিন্তা থেকেও ঢাকামুখী হচ্ছেন অনেকে।
"হামের চিকিৎসা জটিল কিছু না। প্রাথমিক স্টেজে রোগ শনাক্ত করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থেকে, পুষ্টিকর খাবার খেয়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও আমরা কিন্তু চিকিৎসা নিতে পারি," বলেন তিনি।

সমন্বিত উদ্যোগে ঘাটতির অভিযোগ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ই মার্চ থেকে ১৬ই মে পর্যন্ত দুই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৫৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া, এই সময়ের মধ্যে সারাদেশে ৬০ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৩৭ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৬৯ জন রোগী নতুন করে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের আক্রান্তের সংখ্যা হামের সংক্রমণ কমার বার্তা দিচ্ছে না।
যদিও চলতি মাসেই এ নিয়ে ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। কারণ এই দফায় শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার এক মাস পূর্ণ হবে আগামী ২০শে মে।
সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা কার্যকর করা যাচ্ছে না বলেই হাম রোগের চিকিৎসায় এক ধরনের অব্যবস্থাপনা রয়ে গেছে বলে মনে করেন মি. হোসেন।
তিনি বলছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব শাখা এখনো ঠিকভাবে কাজ করছে না, অনেক বিভাগই চিঠির জন্য বসে থাকে।
"আমরা টিকার ওপর আশা করে বসে আছি। কবে সংক্রমণ কমবে, তারপর রোগীর সংখ্যা কমবে। শিশু মৃত্যুটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করার কথা বলছেন এই বিশেষজ্ঞ। যার জন্য কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, এর সঙ্গে স্থানীয় সরকার, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে যুক্ত করার পরামর্শ তার।
"চাইলেই জরুরি রোগীর চিকিৎসার জন্য আইসিইউ বাড়ানো সম্ভব নয়। যেখানে আইসিইউ আছে সেটা শিশুদের জন্য কনভার্ট করে চালাতে পারবেন। কিন্তু যদি জটিল রোগী বাড়তেই থাকে তাহলে আপনি কীভাবে সামলাবেন?" বলেন মি. হোসেন।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
কোভিড-১৯ মহামারির সময় সারাদেশে যে সমন্বিত পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, একইভাবে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালসহ সব মন্ত্রণালয়কে হাম রোগের চিকিৎসায় তৎপর করার কথা বলছেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
তিনি বলছেন, "করোনার সময় এটা করা গিয়েছিল, তাহলে এখন কেন হবে না? একটি গাইডলাইনের মাধ্যমে কমিউনিটি ইন্টারভেনশন করা গেলে অসুস্থ হওয়া একটি শিশুও জরুরি পর্যায়ে যাওয়ার আগেই তাকে সুস্থ করা যাবে। তাহলে অন্য শিশুদেরও নতুন করে আক্রান্তের হার কমবে।"
এদিকে হামের সঙ্গেই নিউমোনিয়ায় অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, যার ফলে পরিস্থিতি খুব দ্রুতই জটিল হচ্ছে বলে মনে করেন মি. হোসেন।
তিনি বলছেন, "হাম আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কমে যায়, যার ফলে নানা সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। হাম হলে খুব সহজেই শিশুর নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের শঙ্কা থাকে। এসময় ঠিক মতো ম্যানেজ করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক শিশু মারা যাচ্ছে।"
এদিকে হাম রোগীদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে সম্প্রতি দাবি করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, "পৃথিবীর ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ে, এত বিশাল জনসংখ্যার জন্য, ত্বরিত গতিতে এত ভ্যাকসিন আর কোনো দেশ জোগাড় করতে পারেনি, যেটা আমরা করেছি।"








