পদত্যাগের চাপ বাড়ছে, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

স্যার কিয়ের স্টারমার
ছবির ক্যাপশান, স্যার কিয়ের স্টারমার
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন, কারণ পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার জন্য তার ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে।

তার মন্ত্রিসভার সহযোগী পিটার কাইল বলেছেন যে, গত সপ্তাহে অ্যান্ডি বার্নহামের উপনির্বাচনে জয় তাঁর জন্য লেবার পার্টির নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর পথ খুলে দিয়েছে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী 'রাজনৈতিক বাস্তবতা' বিবেচনা করছেন।

ওই নির্বাচনের ফলাফলের পর সিনিয়র মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীকে নতুন করে আহবান জানিয়েছেন যে, তিনি যেন কার্যত বার্নহামের জন্য পথ ছেড়ে দিতে নিজের পদত্যাগের একটি সময়সূচী ঘোষণা করেন।

সংকটে থাকা লেবার পার্টির নেতার জন্য আরও একটি ধাক্কা আসে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন যে, স্যার কিয়ের 'প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করবেন' এবং একই সঙ্গে তিনি স্টারমারের দায়িত্বকালীন কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, স্যার কিয়ের অভিবাসন ও জ্বালানি নীতিতে 'ভয়াবহভাবে ব্যর্থ' হয়েছেন। পাশাপাশি তিনি আবারও 'নর্থ সি-তে তেল উত্তোলন উন্মুক্ত করার' আহবান জানান।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে যে, দুই নেতা গত সপ্তাহে জি-৭ সম্মেলনে শেষবারের মতো দেখা করেছিলেন, তারা সপ্তাহান্তে আর কোনো কথা বলেননি।

বার্নহামের বিজয়ের পর স্যার কিয়ের জোর দিয়ে বলেন যে, তিনি যে কোনো আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে লড়বেন। এর অর্থ হলো, যদি নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয় তাহলে লেবার পার্টির সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নের সমর্থকদের ভোটের মাধ্যমে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে হবে।

তবে বাণিজ্যমন্ত্রী পিটার কাইল বিবিসির সানডে উইথ লরা কুয়েন্সবার্গ অনুষ্ঠানে বলেছেন যে প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার 'বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা কী- তা নিয়ে চিন্তার জন্য সময় নিচ্ছেন। গত সপ্তাহ বা তার আগের সপ্তাহের পরিস্থিতির তুলনায় এখন পরিস্থিতি কীভাবে বদলেছে সেটিও তিনি বিবেচনা করছেন'।

তিনি আরও বলেন, শুক্রবার তাঁর সঙ্গে স্যার কিয়েরের কথা হয়েছে এবং তিনি নিশ্চিত যে লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী 'আজ যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন', তা দেশের সর্বোত্তম স্বার্থকে সামনে রেখেই নেওয়া হবে।

পিটার কাইল বলেন, তিনি এমন ভান করতে চান না যে 'কোনো প্রক্রিয়া চলছে না' বা 'কোনো শক্তি সক্রিয় নেই', যা স্যার কিয়ের স্টারমারের দলীয় নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে।

স্যার কিয়ের স্টারমার ও অ্যান্ডি বার্নহাম
ছবির ক্যাপশান, স্যার কিয়ের স্টারমার ও অ্যান্ডি বার্নহাম
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তিনি আরও বলেন, নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা "যতটা সম্ভব ভালো" তবে এর সঙ্গে সরকারের কর্তৃত্ব ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয় ভারসাম্য রাখতে হবে।

স্যার কিয়ের স্টারমার লেবার পার্টির নেতা হয়েছিলেন ২০২০ সালের নেতৃত্ব নির্বাচনের সময়। তখন এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ছয় সপ্তাহ লেগেছিল।

এ কারণে কিছু লেবার এমপি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, একই ধরনের আরেকটি নেতৃত্ব প্রতিযোগিতা হলে তার সঙ্গে আসা মতবিরোধ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এমন পরিস্থিতি আর্থিক বাজারে অপ্রয়োজনীয় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটাতে পারে বলেও উদ্বেগ রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহাম রিফর্ম ইউকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জয়ী হন এবং লেবার পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও বাড়াতে সক্ষম হন। এর মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ের লেবার পার্টির ধারাবাহিক নির্বাচনী পরাজয়ের প্রবণতাকে পাল্টে দেন।

ধারণা করা হচ্ছে, এরপর থেকে পরিবহনমন্ত্রী হেইডি অ্যালেক্সান্ডার এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার স্যার কিয়ের স্টারমারকে তাঁর পদত্যাগের সময়সূচী ঘোষণা করার আহ্বান জানান।

এর আগে গত মাসে একাধিক নির্বাচনে লেবার পার্টির হতাশাজনক ফলাফলের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ও জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডও একই ধরনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এছাড়া বহু লেবার এমপি প্রকাশ্যে স্যার কিয়ের স্টারমারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে অথবা পদত্যাগের একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করতে বলেছেন।

বার্নহাম সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে তাঁর আসন গ্রহণ করবেন।

স্যার কিয়ের স্টারমারের সম্ভাব্য তিন চ্যালেঞ্জার- ওয়েস স্ট্রিটিং, অ্যান্ডি বার্নহাম ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেয়নার (মাঝে)
ছবির ক্যাপশান, স্যার কিয়ের স্টারমারের সম্ভাব্য তিন চ্যালেঞ্জার- ওয়েস স্ট্রিটিং, অ্যান্ডি বার্নহাম ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেয়নার (মাঝে)

তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা প্রধানমন্ত্রীকে পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার এবং মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও পরিবারের পরামর্শ শোনার আহ্বান জানিয়েছেন।

বার্নহামের সমর্থকদের মধ্যে ছিলেন লেবার এমপি হেলেন হায়েস। তিনি শিক্ষা বিষয়ক সিলেক্ট কমিটির চেয়ার। বিবিসি রেডিও ফোর এর দ্যা ওয়েস্টমিনিস্টার আওয়ার এর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, "গত সপ্তাহে মেকারফিল্ডে আমরা যে বিজয় দেখেছি, তা সত্যিই অসাধারণ ছিল।"

হেলেন হেইস বলেন, "অ্যান্ডি মনে করেন, মেকারফিল্ডে আমরা যে নির্বাচনটি দেখলাম, তার ভিত্তিতে তিনি দেশের জন্য কী প্রস্তাব দিচ্ছেন সে ব্যাপারে তিনি আত্মবিশ্বাসী। আমার মনে হয়, যদি নেতৃত্বের জন্য কোনো প্রতিযোগিতা হয়, তাহলে তিনি খুব ভালো করবেন।"

তিনি আরও বলেন, "প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা বিপর্যয়করভাবে কমে গেছে। আমাদের পরিবর্তন আনতে হবে।"

সোমবারের বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ব্যাপকভাবে এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, শিগগিরই পরিবর্তন আসতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, স্যার কিয়ের স্টারমার তাঁর পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংকে নেতৃত্বের প্রশ্নে অ্যান্ডি বার্নহামের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি বলেছিলেন, নেতৃত্ব প্রতিযোগিতা হলে তিনি তাতে অংশ নেবেন। তাঁর মতে, দলের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে একটি 'আইডিয়ার লড়াই' হওয়া প্রয়োজন।ু

এর আগে মে মাসের নির্বাচনি ফলাফলের পরপরই পদত্যাগ করা চার মন্ত্রীর একজন জেস ফিলিপস বলেছেন, "মনে হচ্ছে আমরা পথের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি।"

পদত্যাগের চাপ বাড়ছে দলের ভেতর থেকে
ছবির ক্যাপশান, পদত্যাগের চাপ বাড়ছে দলের ভেতর থেকে

তবে সাবেক সুরক্ষা বিষয়ক মন্ত্রী, যিনি স্ট্রিটিংয়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত, বলেন যে তিনি আশা করেন দল এমন একটি উপায় খুঁজে পাবে যার মাধ্যমে 'পরবর্তীতে কী আসছে' তা নিয়ে আলোচনা ও প্রশ্ন তোলা সম্ভব হবে, যদিও সেটি 'পূর্ণমাত্রার নেতৃত্ব প্রতিযোগিতায়' পরিণত নাও হতে পারে।

তিনি লরা কুয়েন্সবার্গকে বলেছেন, "আপনি শুধু এসে নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়ে নিতে পারেন না। অন্তত আপনাকে আপনার ধারণা ও পরিকল্পনাগুলো পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির সামনে উপস্থাপন করতে হবে।"

মেকারফিল্ডে এক মাসব্যাপী নির্বাচনি প্রচারণার সময় অ্যান্ডি বার্নহাম লেবার পার্টির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন যে আয়কর, ভ্যাট এবং জাতীয় বীমা -এর প্রধান হার বৃদ্ধি করা হবে না। একই সঙ্গে তিনি অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভসের নির্ধারিত ঋণ গ্রহণের নীতিমালার প্রতিও সমর্থন জানান।

তিনি জনসেবা খাতের ইউটিলিটি সেবাগুলোর ওপর 'আরও শক্তিশালী সরকারি নিয়ন্ত্রণ' প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং পূর্বের প্রতিশ্রুতি আবারো উল্লেখ করেছেন যে উত্তরাধিকার কর এর পরিবর্তে একটি নতুন 'জাতীয় পরিচর্যা কর'চালু করা হবে।

তবে প্রতিরক্ষা ব্যয়সহ আরও বেশ কিছু নীতিগত বিষয়ে তিনি এখনো তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেননি। অন্যদিকে স্যার কিয়ের স্টারমার সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক খাতে বিনিয়োগের জন্য অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা করতে সরকারি বাজেট পুনর্গঠনের ওপর জোর দিচ্ছেন।

লেবার এমপি টবি পারকিনস আগে স্যার কিয়েরের অধীনে ছায়া মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। লরা কুয়েন্সবার্গকে তিনি বলেন যে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চান না।

তিনি বলেন, যদি স্যার কিয়ের পদত্যাগ করেন, তাহলে গত ১০ বছরে দেশটির সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হবে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও বাড়াবে।

পারকিনসের মতে, স্যার কিয়ের 'আরও কিছু সময় পাওয়ার যোগ্য' এবং তিনি বিশ্বাস করেন না যে সরকার 'স্পষ্টভাবে ব্যর্থ' হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন যে সরকার ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষার সময় কমাতে, নিট অভিবাসন হ্রাস করতে এবং আশ্রয়প্রার্থী আবেদনগুলোর জট কমাতে সক্ষম হয়েছে।