মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ইরানের ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল?

    • Author, শাহাব মিরজায়ি
    • Role, বিবিসি
  • Published
  • পড়ার সময়: ১২ মিনিট

নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর একটি 'সাহসী' পরিকল্পনা ছিল, তারা যেটার নাম দিয়েছিল 'অপারেশন আজাদি', যার লক্ষ্য ছিল মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে 'গৃহবন্দিত্ব থেকে' মুক্ত করা এবং সাবেক এই প্রেসিডেন্টের সহায়তায় ইরানে 'শাসন পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সহজ করা'।

ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম দিনেই মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বাড়িতে হামলা হয় এবং গুজব ছড়ায় যে তিনি নিহত হয়েছেন।

ইরান সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট 'দ্য ইরান' পত্রিকা ওই দিন তাদের এক্স অ্যাকাউন্টে জানায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বাড়িতে হামলায় তার তিনজন দেহরক্ষী নিহত হয়েছেন। তবে পত্রিকাটি আহমাদিনেজাদের বিষয়ে কিছু জানায়নি।

এই ঘটনার প্রায় তিন মাস পর, মার্কিন পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস একটি প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, আহমাদিনেজাদের বাড়িতে ওই হামলার উদ্দেশ্য ছিল আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলে তাকে ক্ষমতা দখলের সুযোগ করে দেওয়া।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস 'অবগত মার্কিন কর্মকর্তাদের' উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেছে, "ইসরায়েল এই সাহসী পরিকল্পনা তৈরি করেছিল, কিন্তু তা দ্রুতই ভেস্তে যায়"।

পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী, মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সঙ্গেও পরামর্শ করা হয়েছিল, কিন্তু হামলায় আহত হওয়ার পর তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করেন।

পত্রিকাটি আরও উল্লেখ করে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন ইরানের ভেতর থেকেই "কারও" ক্ষমতা নেওয়া ভালো হতে পারে।

সে সময় ওই ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে নানা জল্পনা ছিল এবং মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও হাসান রুহানির নামও উঠে আসে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস উপসংহারে বলে, "এখন স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল খুবই স্পষ্ট এবং বিস্ময়কর একটি পছন্দ নিয়ে সংঘাতে প্রবেশ করেছিল- মাহমুদ আহমাদিনেজাদ"।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মাহমুদ আহমাদিনেজাদ কখনও শিরোনামে, আবার কখনও নীরবতায় থাকছেন। কখনও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সতর্কতা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করে অযোগ্য ঘোষণা হয়েছেন, আবার কখনও দেশের ভেতর ও বৈদেশিক নীতিকে নিয়ে বিতর্কিত ও কঠোর বক্তব্য দিয়ে সরকারকে সমালোচনা করেছেন।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটি আহমাদিনেজাদের অধীনে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে ইসরায়েলের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করে।

যদিও প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তিনি বারবার হলোকাস্টকে "মিথ" এবং ইসরায়েলি সরকারকে "বর্ণবাদী ও ভুয়া" সরকার বলে বর্ণনা করেছিলেন। তেহরানের এক সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, "ইসরায়েল না থাকলে বিশ্ব আরও নিরাপদ হতো"।

২০০৯ সালের মে মাসে জাতিসংঘে তার বিতর্কিত বক্তব্য এবং ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন নিয়ে তার অবস্থান ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।

এর আগে, জাতিসংঘের দ্বিতীয় বর্ণবাদ বিরোধী সম্মেলনে তার ভাষণ সংস্থাটির মহাসচিব এবং পশ্চিমা রাষ্ট্রপ্রধানদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।

ওই ভাষণে ইসরায়েল সম্পর্কে তিনি বলেন, "হলোকাস্টের অজুহাতে তারা আগ্রাসনের মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীকে উৎখাত করেছে; আমেরিকা, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশ থেকে কিছু মানুষকে সেই ভূখণ্ডে স্থানান্তর করেছে, একটি ভুয়া সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সবচেয়ে সহিংস বর্ণবাদীদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে অন্য একটি জায়গায় - অর্থাৎ ফিলিস্তিনে।"

যুদ্ধের সময় এবং পরবর্তীকালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায়নি।

২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তার বোনের জানাজা থেকে প্রচারিত একটি ভিডিওতে একজন প্রতিবেদক তাকে 'জাতীয় ঐক্য' সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তার এক দেহরক্ষীর মতো দেখতে ব্যক্তি বলেন, "সাক্ষাৎকার না নেওয়াই ভালো"।

বারবার প্রশ্নের জবাবে আহমাদিনেজাদ বলেন, "ওরা যা বলেছে তা কি শুনেছেন?" ভিডিওটি প্রকাশের পর তার রাজনৈতিক কার্যক্রম ও মতপ্রকাশের ওপর সীমাবদ্ধতা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়।

আলী খামেনেই হত্যার পর তিনি, অন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি ও হাসান রুহানির মতো, মোজতবা খামেনিকে নেতৃত্ব পাওয়ার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা দেন। সেখানে তিনি লিখেন, "মহামান্য আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা হোসেইনি খামেনি বিশেষজ্ঞ পরিষদের সম্মানিত সদস্যদের মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি এবং আল্লাহর কাছে আপনার অব্যাহত সাফল্য কামনা করছি"।

'চিৎকার আর শোরগোল' থেকে বিস্মৃতিতে

মাকু ও খোইয়ের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর, প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানির শাসনামলে মাহমুদ আহমাদিনেজাদ আরদাবিলের গভর্নর হন।

সরকার কাঠামোয় প্রবেশের আগে তিনি 'অফিস ফর দ্য কনসলিডেশন অব ইউনিটি'র সদস্য ছিলেন এবং সেই আন্দোলনের একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করতেন যারা বামপন্থা বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করত।

যেমন, যখন 'ইমামের অনুগামী' ছাত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখলের দাবি জানাচ্ছিল, তখন তিনি একই সঙ্গে তেহরানে সোভিয়েত দূতাবাস দখলের কথাও বলেছিলেন এবং রুহুল্লাহ খোমেনির "না পূর্ব, না পশ্চিম" স্লোগানের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

সে সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ও তার সহচররা 'জিঘ ও দাদ' নামে ছাত্রদের জন্য একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন, যা অনেকের মতে তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক উপস্থিতির প্রতিফলন ছিল।

আরদাবিলের গভর্নর থাকাকালে ভূমিকম্প-পীড়িত এলাকায় দ্রুত পুনর্গঠনের জন্য রাফসানজানির সরকার তাকে বছরের সেরা গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত করে।

রাফসানজানি যখন ক্ষমতার শীর্ষে, সে সময়ে আহমাদিনেজাদ তার প্রশংসা করে বলেছিলেন, "তার নাম ইসলামী বিপ্লবের গৌরবময় ইতিহাসে উজ্জ্বলভাবে লিপিবদ্ধ থাকবে"।

এক দশক পর, ২০০৫ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় সেই প্রশংসা পরিণত হয় অবাধ্যতা ও কৃতঘ্নতায়।

তিনি একসময় যেভাবে সংস্কারপন্থিদের সমালোচনা করেছিলেন, সেই একই পদ্ধতি তিনি প্রয়োগ করে বলেন, "তাদের ধ্বংসযজ্ঞের বাহিনী ও প্রচারযন্ত্র আক্রমণ শুরু করেছে এবং যে ব্যক্তিকে কয়েক মাস আগেও 'নির্মাণ যুগের মহান আমির' বলা হতো, এমনকি যার মেয়াদ বাড়াতে সংবিধান পরিবর্তনের কথাও উঠেছিল- তাকে সবচেয়ে কাপুরুষোচিত ও জটিল প্রচারণার মাধ্যমে আক্রমণ করা হচ্ছে।"

এই পরিবর্তন তার ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে- ক্ষমতায় উচ্চস্থানে থাকা ব্যক্তিদের প্রশংসা করা এবং পরে তাদের সমালোচনা ও বিদ্রূপ করা।

তেহরানের মেয়র

মাহমুদ আহমাদিনেজাদের রাজনৈতিক জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় ২০০৩ সালে তেহরানের মেয়র হিসেবে নিয়োগের মধ্য দিয়ে।

তিনি মেয়র থাকাকালে তেহরানে অনেক বিতর্কিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। থিয়েটার হাউস, থিয়েটার বিভাগ এবং ভাস্কর্য বিদ্যালয়সহ বহু সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও বক্তৃতা বন্ধ করে তার পরিবর্তে কুরআন তেলাওয়াত, নাহজুল ( ইসলামের খলিফা আলীর ধর্মোপদেশ, চিঠি ও উক্তির সংকলন) পাঠ এবং সূচিকর্মের ক্লাস চালু করা হয়।

তিনি বারবার এবং স্পষ্টভাবে "সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো দুর্নীতি ও অশুভের আখড়া" বলে অভিহিত করেছেন এবং তেহরান পৌরসভার বাজেটের একটি অংশ এসব কেন্দ্রের পেছনে ব্যয় হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

তার নেতৃত্বাধীন পৌরসভা ৩০০ বিলিয়ন তোমানের (ইরানে প্রচলিত একটি মুদ্রা) একটি অনিয়মের মামলার মুখোমুখিও হয়েছিল।

আহমাদিনেজাদ মেয়র থাকার সময় তেহরানের মহাসড়কগুলোতে চত্বর ও সিগন্যাল তুলে দিয়ে তার পরিবর্তে গোলচত্বর স্থাপনের পরিকল্পনা নগর বিশেষজ্ঞদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।

ঘনিষ্টতা, এরপর গালাগালি

মাহমুদ আহমাদিনেজাদ তেহরানের মেয়র হওয়ার দুই বছরও পার হয়নি, যখন তিনি ২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রক্ষণশীলদের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন।

আকবর হাশেমি রাফসানজানি, মেহদি কাররুবি এবং মোস্তফা মইনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভোট বিভক্ত হয়ে পড়ায় নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়ায় এবং তিনি নিজের আগের আদর্শ ও তখনকার প্রতিদ্বন্দ্বী হাশেমিকে পরাজিত করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন।

এই নির্বাচনের ফলাফল রাফসানজানি ও কাররুবির বিরোধিতার মুখে পড়ে; বিশেষ করে প্রথম দফায় ভোট কারচুপির অভিযোগে তারা আপত্তি জানান।

মাহমুদ আহমাদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে আয়াতুল্লাহ খামেনি যেন তার দীর্ঘদিনের একটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সক্ষম হন - এমন একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, যিনি দেশের শাসনব্যবস্থায় তার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবেন এবং নির্বাহী শাখার প্রধান হিসেবে "অপরিচিত ও নিরীহ নির্বাহী"র ভূমিকা পালন করবেন।

পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরবর্তী ঘটনাগুলোর সময়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে, ইরানের এই নেতা প্রকাশ্যে তাকে সমর্থন জানান। তিনি বলেন, হাশেমি রাফসানজানির সঙ্গে তার ৫০ বছরের বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও পররাষ্ট্রনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোতে তার অবস্থান আহমাদিনেজাদের কাছাকাছি।

মাহমুদ আহমাদিনেজাদের প্রেসিডেন্ট মেয়াদে সরকার ও সমাজের সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ নেতা ও বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

এই সময়ে, একদিকে যেমন রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠদের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিতে শুরু করেন, অন্যদিকে আহমাদিনেজাদও সংস্কারপন্থি সময়ের মন্ত্রীরা এবং পরিচিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের কর্মসূচি মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থা থেকে সরিয়ে দিতে থাকেন।

তবে বিপ্লবের প্রথম দশকের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিরোধিতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০০৯ সালের নির্বাচনে। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের আক্রমণ শুরু করেন; তবে তার আক্রমণ তখন রক্ষণশীলদের কাছে সন্তোষজনক ছিল।

কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা যায়, পুরনো বন্ধুদের বিরুদ্ধে যে তলোয়ার আহমাদিনেজাদ তুলেছিলেন, তার আঘাত তাদের ওপরও পড়তে শুরু করে এবং তা চলতে থাকে "নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাতে" পৌঁছানো পর্যন্ত।

সম্ভবত এই পরিবর্তনের প্রথম লক্ষণ দেখা যায় ২০০৯ সালের "রক্তাক্ত ও সহিংসভাবে বিক্ষোভ দমন"–এর সময় এক বিপ্লবী গার্ড কমান্ডারের সঙ্গে তার তর্কের পর, যখন তিনি প্রতিবাদকারীদের "মল ও ধূলা" বলে আখ্যায়িত করেন এবং ওই বছর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আলি খামেনির হাতের বদলে তার কাঁধে চুম্বন করেন।

দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আলি খামেনি ও মাহমুদ আহমাদিনেজাদের মধ্যে মতপার্থক্য শুরু হয়। এই বিভাজন প্রকাশ্যে আসে যখন খামেনি উপ-রাষ্ট্রপতি এসফানদিয়ার রহিম মাশাইয়ের বিরোধিতা করেন। তখন প্রেসিডেন্ট অনড় থাকেন, যতক্ষণ না ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর থেকে রহিম মাশাইয়ের অযোগ্যতার কথা উল্লেখ করে বিবৃতি দেওয়া হয়।

এই দ্বন্দ্বের পর এবং গোয়েন্দামন্ত্রী হেইদার মোসলেহিকে পরিবর্তনের দাবি ও খামেনির তা প্রত্যাখ্যানের প্রেক্ষাপটে, আহমাদিনেজাদ ১৪ দিন নিজের বাসায় অবস্থান করেন।

আহমাদিনেজাদ এরপরে দায়িত্ব পালনে ফিরে এলেও ততদিনে রক্ষণশীল ও অন্যপক্ষের সমর্থকেরা তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং আলী খামেনির নীতির প্রতি তার বিরোধিতা লক্ষ্য করেন।

তার বহু সহযোগীও তার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেন।

আবদোলরেজা দাভারি, যিনি একসময় আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ সমর্থক ও উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি অভিযোগ করেন যে আহমাদিনেজাদ "ইরানে শাসনব্যবস্থা উৎখাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হামলার অপেক্ষায় আছেন"।

পশ্চিমের সঙ্গে ইরানের দ্বন্দ্বের প্রতীক ও ১৮০ ডিগ্রি মোড়

ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি যখন বিকশিত হচ্ছিলো, সেই সময় প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ পশ্চিমের সঙ্গে ইরানের দ্বন্দ্বের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হন।

তার সহজ পোশাক এবং আবেগঘন ও ধর্মীয় বক্তব্য, যার সঙ্গে কোরআনের আয়াত ও হাদিস পাঠ যুক্ত থাকত, বিশ্বের বহু মুসলমানের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

তৎকালীন এই প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে বারবার ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিগুলোকে উপহাস করেছেন, জোর দিয়ে বলেছেন যে এসব নিষেধাজ্ঞার কোনো প্রভাব ইরানের রাজনীতি, অর্থনীতি বা জনগণের জীবনে পড়েনি।

তিনি এমনকি ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার উল্টো প্রভাবের কথাও উল্লেখ করে বলেন, "যদি নিষেধাজ্ঞার ফল হয় যে গত তিন বছরে আমরা দেশে এমন উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছি, যা আগের ৫০ বছরের সমান, তবে এই নিষেধাজ্ঞা আমাদের জন্য উপকারী হয়েছে এবং আমরা তা স্বাগত জানাই।"

কিন্তু ক্ষমতা ছাড়ার পর তার বহু বিতর্কিত বক্তব্য ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়।

একেবারে ১৮০ ডিগ্রি মোড় নিয়ে তিনি ইরানের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে বিশ্বের সঙ্গে সংলাপ ও সম্পৃক্ততার আহ্বান জানান এবং পরে তিনি আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের উদ্দেশে একের পর এক উত্তরবিহীন চিঠি লিখতে থাকেন।

তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলে, বহু রাজনীতিক, বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষ তার এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের সমালোচনা করেন এবং তার অতীত কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যা সেই সময়ের তার বক্তব্যের সঙ্গে কোনো মিল রাখেনি।

অযোগ্য ঘোষণা থেকে যুদ্ধের সতর্কতা

আট বছর ইরানের প্রেসিডেন্ট পদে থাকা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ২০১৭, ২০১৯ এবং ২০২৪ সালে তিনবার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং প্রতিবারই গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাকে প্রত্যাখ্যান করে।

এর মধ্যে সর্বশেষটি ছিল ইব্রাহিম রাইসির আকস্মিক মৃত্যুর পর। ইব্রাহিম রাইসির শোকানুষ্ঠানে আহমাদিনেজাদ অনুপস্থিত ছিলেন এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে তার সাদা শার্ট কিছু রক্ষণশীলের সমালোচনার কারণ হয়।

ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সর্বশেষ দফায় তার প্রার্থিতা ঘোষণার সময় কয়েকজন সমর্থকের উপস্থিতি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাচনী কার্যালয়ে মাইক্রোফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও আবার তার নামকে আলোচনায় নিয়ে আসে।

নিজের প্রার্থিতা ঘোষণার আগে তিনি বলেছিলেন, "আমি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছি এবং দেশের ও জনগণের স্বার্থে এবং বর্তমান ইরানের সর্বোত্তম স্বার্থে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত তা মূল্যায়ন করছি"।

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি বারবার তাকে নির্বাচনে অংশ না নিতে বলার পরও আহমাদিনেজাদ পুনরায় প্রার্থিতা ঘোষণা করেন।

২০১৬ সালে আলী খামেনিই বলেন, "ব্যক্তিগত কল্যাণ এবং দেশের স্বার্থ বিবেচনায়" তিনি আহাদিনেজাদকে নির্বাচনে অংশ না নিতে বলেছিলেন।

এই বছরগুলোয় মাহমুদ আহমাদিনেজাদ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির উদ্দেশে এক চিঠিতে অঞ্চলে "আসন্ন যুদ্ধ" সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং দেশের কর্মকর্তাদের "জরুরিভাবে" যুদ্ধের সূচনা ঠেকাতে আহ্বান জানান।

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওই চিঠিতে লিখেছিলেন, "মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরের সংবেদনশীল অঞ্চলে একটি নতুন ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং তা শিগগির বাস্তবায়নের পথে রয়েছে"।

এর আগেও তিনি তার প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশেষ করে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর হামলার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।

ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের ভূখণ্ডে সামরিক হামলার সম্ভাবনায় তেহরানের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে- এ বিষয়ে তিনি বলেন, "আমাদের বিকল্পের কোনো সীমা থাকবে না এবং তা পুরো বিশ্বের বিস্তৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করবে"।

২০১০ সালের আগস্টে এক সাক্ষাৎকারে আহমাদিনেজাদ বলেন, "আমার মনে হয় কেউ কেউ ইরানে হামলার কথা ভাবছে, বিশেষ করে জায়োনিস্ট শাসনের অভ্যন্তরে থাকা ব্যক্তিরা। কিন্তু তারা জানে ইরান একটি শক্তিশালী দুর্গ এবং আমি মনে করি না তাদের আমেরিকান প্রভুরা তাদের তা করার অনুমতি দেবে"।

বিতর্কিত সফর এবং নজরদারির অভিযোগ

মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যেই প্রতিবাদ ও সমালোচনা থেকে শুরু করে অবস্থান ধর্মঘট ও কড়া ভাষায় সাক্ষাৎকার- সব ধরনের কৌশল ও বিতর্ক দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন।

২০১৮ সালে এক ভিডিও বার্তায়, তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতার নাম উল্লেখ না করে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রেড লাইন অতিক্রম করে দেশের পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। গোটা ব্যবস্থার প্রতি জনবিশ্বাস প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। অসন্তোষ চরমে। দারিদ্র্য ব্যাপক… এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? দেশের সব কর্মকর্তা, তিনটি শাখাই। সবার চেয়ে বেশি, জনাব রুহানি"।

তবে মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে মোহাম্মদ খাতামি বা হাসান রুহানির মতো এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সদস্যপদ থেকে সরানো হয়নি, আবার ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পরবর্তী বছরগুলোতে মির হোসেন মুসাভির মতো কাউন্সিলের বৈঠকেও অনুপস্থিত থাকেননি।

২০১৯ সালের বিক্ষোভের সময় তিনি কয়েকবার বিক্ষোভকারীদের দমন নিয়ে সরকারের আচরণের সমালোচনা করেন, তবে "নারী, জীবন, স্বাধীনতা" আন্দোলনের সময় তিনি কোনো বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানাননি।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি টেলিগ্রাম চ্যানেল পূর্ব তেহরানে তার বাড়ির ওপর "গোয়েন্দা নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ" চালানোর অভিযোগে গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়কে অভিযুক্ত করে।

ওই ঘোষণায় বলা হয়, কিছু সময় ধরে ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় "তার বাড়ির পাশের স্কুলের ছাদ, গলি ও জনসমাবেশের স্থানগুলোতে উন্নত ক্যামেরা বসিয়ে আহমাদিনেজাদের কর্মসূচি, চলাফেরা, যানবাহন ও দেহরক্ষীদের নজরদারি করছে"।

২০১১ সালে এক বিতর্কিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "ইসরায়েল বিষয়ক দায়িত্বে থাকা গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিজেই একজন ইসরায়েলি গুপ্তচর ছিলেন"। ওই সাক্ষাৎকারের বিষয় ছিল পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা এবং ইরানের পারমাণবিক নথি চুরি।

এই সময়ে আহমাদিনেজাদ বিদেশে একাধিক সফরও করেন, যা কখনো কখনো বিতর্কও সৃষ্টি করে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে, ইমাম খোমেনি বিমানবন্দরে সাত ঘণ্টার অচলাবস্থার পর সাবেক এই প্রেসিডেন্ট বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিজের পাসপোর্ট পুনরুদ্ধার করেন এবং গুয়াতেমালার উদ্দেশে তেহরান ত্যাগ করেন।

এই সফরের প্রসঙ্গে নিউ ইয়র্ক টাইমস উল্লেখ করে যে, গুয়াতেমালার সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে; তবে প্রতিবেদনের লেখকেরা সফর সম্পর্কে অতিরিক্ত কোনো তথ্য দেননি।

গুয়াতেমালা সিটির পরিবেশ সম্মেলনে তিনি বৈশ্বিক পানি সংকট নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

তার প্রেসিডেন্ট আমল নিয়ে সমালোচনার মধ্যে রয়েছে- নিষিদ্ধ সমতলে হাজার হাজার অবৈধ কূপ খনন, ভূগর্ভস্থ পানির সম্পদের অযাচিত উত্তোলন, উর্মিয়া হ্রদের শুকিয়ে যাওয়ার সূচনা, মিয়ানকালেহ জলাভূমির কাছে রিফাইনারি ও পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনের অনুমতি এবং গোটভান্দ বাঁধের উদ্বোধন; যা কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, কারুন নদী এবং এই গুরুত্বপূর্ণ ইরানি নদীর আশপাশের মানুষের জীবন ও কৃষিতে অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

মাহমুদ আহমাদিনেজাদ, তার আগের সব প্রেসিডেন্টদের মতোই, বহু বছর ধরে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে রয়েছেন। অন্যদিকে, যদি নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটি সঠিক হয়, তাহলে তা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারে তার প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত দিতে পারে।

কিছু ধারণা অনুযায়ী, তিনি এখনো জনসংখ্যার একটি অংশের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে জনপ্রিয়। তিনি এমন এক রাজনীতিক, যিনি সমালোচনা ও বিরোধিতার মাঝেও বিপ্লব ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সরকার থেকে উঠে এসে এই ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছেন।

ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সাবেক নেতার হত্যাকাণ্ডের পর, তার উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেন, "আমার মনে হয়, এমন কেউ যিনি অভ্যন্তরীণভাবে গ্রহণযোগ্য এবং জনসমর্থিত, তিনি বেশি উপযুক্ত হবেন- যদি এমন কেউ থাকেন। আমাদের মনে কয়েকজন আছেন, যারা আমার মতে ভালো কাজ করতে পারবেন।"

তিনি আরও বলেন, তিনি এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন, যাতে তার তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা যুদ্ধের সময়ও বেঁচে থাকতে পারেন।

এসব বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের নেতৃত্বের জন্য তিনি যাকে বিবেচনায় এনেছিলেন, তা ইরানের কিছু ধারণার বিপরীত ছিল।