মৃত শাবক নিয়ে ঘুরছিল মাদি হাতি, প্রাণীদের শোকের বিরল আচরণ

একটি আফ্রিকান মাদী হাতি ধুলোমাখা ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, যার দাঁত ও শুঁড় থেকে একটি ছোট শাবক এক পায়ে ঝুলছে।
ছবির ক্যাপশান, নামিবিয়ায় একটি মৃত শাবক বহনকারী মাদী হাতির মুখোমুখি হয়েছিলেন ফেদেরিকো ভেরোনেসি
    • Author, ইসাবেল্লে গেরেটসেন
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

নামিবিয়ার মরুভূমিতে একটি শুকনো নদীখাত ধরে হেঁটে চলা একদল হাতিকে অনুসরণ করার সময় ফটোগ্রাফার ফেদেরিকো ভেরোনেসি এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হন। ঘটনাটি ছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে।

তার সামনে পড়লো একটি মাদি হাতি, যেটি একটি মৃত শাবককে নিয়ে যাচ্ছিল; শাবকটির ছোট্ট পা দুটি তার শুঁড়ে জড়ানো ছিল এবং নিস্তেজ দেহটি বাতাসে ঝুলছিল।

"এটি ছিল এক অন্তরঙ্গ মুহূর্ত, প্রায় আধ্যাত্মিক," ভেরোনেসি স্মরণ করেন।

"শিশুটির শরীর তখনও সম্পূর্ণ অক্ষত ও নরম ছিল। এটি তখনও শক্ত হয়ে যায়নি, তাই এটা স্পষ্ট যে তার জন্ম রাতে, বা হয়তো মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই হয়েছিল।"

প্রথম দর্শনে, মর্মস্পর্শী দৃশ্যটি একজন মায়ের শোক প্রকাশ বলে মনে হয়েছিল।

কিন্তু ভেরোনেসি পরে জানতে পারেন যে, তিনি যে বিরল আচরণটি দেখছিলেন তার মধ্যে একটি আশ্চর্যজনক মোড় ছিল। প্রথম দেখায় যেমনটি মনে হয়েছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল এক সংবেদনশীলতা প্রকাশ করে দৃশ্যটি।

ভেরোনেসি বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে হাতির পালটিকে অনুসরণ করেন এবং কিছু অসাধারণ সুন্দর ছবি তোলেন, যার মধ্যে একটি (নিচের ছবিটি দেখুন) লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম কর্তৃক আয়োজিত ২০২৬ সালের ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অফ দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় প্রধান পুরস্কার জয় করেছে।

তিনি হাতির এমন এক বিরল আচরণ ক্যামেরায় ধারণ করেছেন, যা তাদের আবেগপূর্ণ জীবনের জটিলতাকে তুলে ধরে।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ভেরোনেসি বলেন, "মা হাতিটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বাচ্চাটিকে বয়ে বেড়াচ্ছিল, মাঝে মাঝে তাকে খাওয়ানোর বা পানি পান করানোর জন্য নিচে নামাচ্ছিল, তারপর আবার তুলে নিয়ে হুয়াব নদী বরাবর তার যাত্রা অব্যাহত রাখছিল। আমি ভাবলাম, 'এটা খুবই দুঃখজনক একটি দৃশ্য, কিন্তু মানুষের এটা দেখা প্রয়োজন'। এই ছবিটি স্পষ্ট করে দেয় যে এই হাতিগুলো কতটা কষ্ট পায়, তাদের কতটা জটিল অনুভূতি রয়েছে, যা মানুষ হয়তো পশুদের সঙ্গে মেলাতে পারে না।"

ভেরোনেসি অবশেষে জানতে পারলেন যে হাতিটি তার নিজের মৃত শাবকটিকে বহন করছিল না।

নামিবিয়ার মরুভূমির হাতিদের সুরক্ষায় কর্মরত একটি অলাভজনক সংস্থা এলিফ্যান্ট হিউম্যান রিলেশনস এইড (ইএইচআরএ)-এর সংরক্ষণ কর্মসূচি পরিচালক ক্রিস্টিন উইন্টার বলেন, “সে (শাবক বহনকারী ওই হাতিটি) মা নয়”।

উইন্টার বলেন, বর্তমানে ১৪ বছর বয়সী এই মাদি হাতিটি দুই বছর আগে তার নিজের শাবককে হারায়। এরপর থেকে তাকে চারবার অন্য হাতির মৃত শাবক বহন করতে দেখা গেছে।

তিনি আরও যোগ করেন, এই এলাকায় এই ধরনের আচরণ এই প্রথম নথিভুক্ত করা হলো।

ভেরোনেসি বলেন, “এই উদ্ঘাটন ‘নিঃসন্দেহে এই প্রাণীগুলোর আবেগের গভীরতায় আরেকটি মাত্রা যোগ করে’।”

“এটা আরও বেশি মর্মস্পর্শী যে, এই মাদি প্রাণীটি তার ক্ষতির পর এমন আচরণ করছে, যেন সে তার নিজের শাবকের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে এবং বহু বছর পরেও সেই ক্ষতিকে ভুলতে পারেনি।”

হাতির আবেগ

হাতিটি কেন এতক্ষণ ধরে শাবকটিকে বয়ে বেড়াচ্ছিল, তা নিয়ে কয়েকটি তত্ত্ব রয়েছে। উইন্টার বলেন, এই আচরণটি এক ধরনের 'আবেগীয় প্রক্রিয়াকরণ' হতে পারে।

"হয়তো এটা ছিল তার মৃত্যুশোক সামলে ওঠার একটা উপায়, কারণ সে এখনো শোকটা ছাড়তে পারছে না। হয়তো বাচ্চা হারিয়ে সে মানসিকভাবে এতটাই আঘাত পেয়েছিল যে, যখনই কোনো শাবক মারা যায়, সে হঠাৎ করে এমন আচরণ করে বসে।"

উইন্টার আরও যোগ করেন, সে হয়তো শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে ছোটো দেহটিকে রক্ষা করারও চেষ্টা করছিল।

একটি আফ্রিকান হাতি একটি ছোট হাতির বাচ্চাকে ধরে শুষ্ক, ধুলোময় এক প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে।
ছবির ক্যাপশান, ফেদেরিকো ভেরোনেসির তোলা এই ছবিটি ২০২৬ সালের 'ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অফ দ্য ইয়ার' প্রতিযোগিতায় গ্র্যান্ড টাইটেল পুরস্কার জিতেছে

ভেরোনেসীর তোলা ছবিগুলো নামিবিয়ার ১৫০টি সহনশীল মরু হাতির জীবনযাত্রার এক ঝলক তুলে ধরে, যারা নামিব মরুভূমির পাঁচটি নদীখাত বরাবর বাস করে এবং খাদ্য এবং পানির সন্ধানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। এরা আনা গাছের (ফেইডারবিয়া আলবিডা) বীজকোষ অথবা প্লাবনভূমির ঘাস খেয়ে জীবনধারণ করে।

তারা হাতির কোনো স্বতন্ত্র প্রজাতি নয়, বরং একটি বাস্তুতান্ত্রিক গোষ্ঠী; এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা জিনগত অভিযোজনের পরিবর্তে অর্জিত আচরণের মাধ্যমে শুষ্ক পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে, অনেকটা নামিবিয়ার স্কেলেটন কোস্ট বরাবর বসবাসকারী মরু সিংহের মতো।

উইন্টার বলেন, "তাদের এই জ্ঞানই তাদের সত্যিই বিশেষ এবং একই সঙ্গে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে, কারণ একবার সেই জ্ঞান হারিয়ে গেলে তা সহজে প্রতিস্থাপন করা যায় না।"

হ্রাসমান প্রজাতি

উইন্টার বলেন, গত ২০ বছর ধরে এই হাতিদের জনসংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।

উইন্টারের মতে, এর আংশিক কারণ পরিবেশগত চাপ, বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে চলা খরা। তবে প্রধান কারণ হলো মানুষের সঙ্গে সংঘাত বৃদ্ধি।

"এই সংঘাতের মূল কারণ হলো পানি", হাতিরা খামারে ঢুকে পানির ট্যাংক উল্টে দেয়, পাইপ ছিঁড়ে ফেলে এবং পাম্প ভেঙে দেয়, "তাই হাতির উপস্থিতির প্রতি মানুষের সহনশীলতা খুব একটা বেশি নয়", তিনি বলেন।

"এই গল্পগুলো মানুষের মনে গভীরভাবে প্রোথিত এবং দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকে।"

নবজাতক হাতির মৃত্যুহার একটি বড় উদ্বেগের বিষয়, বলেন উইন্টার।

“এই হার অত্যন্ত বেশি এবং খুবই ভীতিকর,” তিনি জানান, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মোট ১৬টি শাবকের মধ্যে মাত্র দুটি বেঁচে ছিল।

উইন্টার বলেন, মরুহাতির এত বেশি শাবক মারা যাওয়ার একটি তত্ত্ব হলো, তারা অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়, “কারণ মা হাতিরা তাদের পূর্ণকাল গর্ভে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট সক্ষম থাকে না”।

তিনি আরও বলেন, মানুষের সঙ্গে সংঘাত থেকে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণেও এমনটা হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষের সঙ্গে সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় হাতিরা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে (পিটিএসডি) ভুগতে পারে।

উইন্টার আরও বলেন, যখনই ইএইচআরএ টিম কোনো মৃত শাবকের সন্ধান পায়, সেগুলো খুব ছোট হয়।

তিনি বলেন, সাধারণত একটি সুস্থ নবজাতক হাতির ওজন ১০০ থেকে ১২০ কেজি (২২০-২৬৫ পাউন্ড) হয়। অন্যদিকে, মৃত শাবকগুলোর ওজন হয় প্রায় ৬০-৬৫ কেজি (১৩২-১৪৩ পাউন্ড)।

পরিবেশগত কারণ এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ নামিবিয়ার মরু হাতিদের কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা বিশ্লেষণ করার জন্য ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের হাতি বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ড্যানিয়েলা চুসিডের সাথে কাজ করছে ইএইচআরএ।

২০২৮ সাল পর্যন্ত চলমান একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে, তারা বর্তমানে ভারী ধাতু, স্থায়ী রাসায়নিক (যেমন পিএফএএস) পরীক্ষার জন্য হাতির মলের নমুনা সংগ্রহ করছে এবং হাতিদের থাইরয়েড ও কর্টিসল হরমোন পরীক্ষা করছে।

চুসিড বলেন, "আমরা হাতির অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তঃপ্রজননের মাত্রা এবং বেঁচে থাকা শাবকগুলোর পূর্বপুরুষের বংশপরিচয় মৃতগুলোর থেকে আলাদা কি না, তাও নির্ধারণ করতে চাই।"

তিনটি পূর্ণবয়স্ক আফ্রিকান হাতি একটি হাতির বাচ্চার পাশ দিয়ে ঘাসযুক্ত ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সামনের হাতিটির ডান দাঁত থেকে একটি ছোট মৃত শাবক ঝুলছে, যার দেহটি নিচের দিকে ঝুলে আছে।
ছবির ক্যাপশান, নামিবিয়ার মরু হাতির সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে

আফ্রিকান সাভানা হাতির একজন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংরক্ষণমূলক অলাভজনক সংস্থা ‘এলিফ্যান্ট ভয়েসেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা জয়েস পুল, ভেরোনেসির ছবিগুলোকে "সত্যিই মর্মান্তিক" বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি কেনিয়ায় একটি মা হাতির তার মৃত শাবকের প্রতি একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখেছেন।

"সে ওটা বহন করেনি, বরং তোলার চেষ্টা করেছিল এবং তারপর দুদিন ধরে দাঁড়িয়ে সেটাই করছিল," পুল বলেন।

তিনি আশা করেন যে, ছবিগুলো মানুষকে উপলব্ধি করাবে যে "হাতিরাও শোক ও কষ্ট পেতে পারে"।

সঙ্গী মারা গেলে হাতিরা শোক প্রকাশ করে বলে মনে হয়। তাদের পরিবারের সদস্য এবং অপরিচিত ব্যক্তি উভয়েরই মৃতদেহের কাছে যেতে, তাদের হাড় স্পর্শ করতে এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে শোকসভার মতো মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

"শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই নয়, নামিবিয়া সরকারের দেওয়া শিকারের অনুমতির কারণেও মরুভূমির হাতিরা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে," পুল বলেন, "তাদের এই মানসিক আঘাত প্রতিরোধ করতে আমাদের আরও কিছু করা দরকার।"

ভেরোনেনির কাছে, মা হাতি এবং মৃত শাবকের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়াটি ছিল "প্রায় মানবিক আচরণ"।

“এ কারণেই আমার কাছে এটি দেখার মতো এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত বলে মনে হয়েছিল,” তিনি বলেন, “আমার বার্তা হলো, প্রতিটি হাতিই এমন এক প্রাণী যাকে বোঝা এবং সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। আমাদের শুধু প্রজাতিটিকেই নয়, বরং প্রতিটি হাতির মঙ্গলকেও সংরক্ষণ করতে হবে।”

আলোকচিত্রী আশা করেন যে তার ছবিগুলো হাতির আত্মার এবং তাদের অনুভূতির গভীরতার একটি ক্ষুদ্র জানালা উন্মোচন করবে।

‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অফ দ্য ইয়ার’ অনুষ্ঠানটি লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আয়োজিত ও প্রযোজিত এবং এর প্রদর্শনীটি ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত খোলা থাকবে।