ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মেঘ উধাও, 'মনসুন ব্রেক' নিয়ে কেন উদ্বেগ?

পাঞ্জাবের অমৃতসরে তপ্ত দুপুরে তৃষ্ণা নিবারণ করছেন এক পথচারী - ফাইল ছবি
ছবির ক্যাপশান, পাঞ্জাবের অমৃতসরে তপ্ত দুপুরে তৃষ্ণা নিবারণ করছেন এক পথচারী - ফাইল ছবি
    • Author, চন্দন কুমার জাজওয়াড়ে
    • Role, বিবিসি সংবাদদাতা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

পশ্চিমবঙ্গে যখন টানা বৃষ্টি, তখন সারা ভারতে আবহাওয়ার পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, 'মনসুন ব্রেক'-এর কারণে, পশ্চিম-উত্তর এবং মধ্য ভারতে আগামী বহু দিন বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যার জেরে প্রকট হতে পারে খরা পরিস্থিতি।

আবহাওয়ায় এই আচমকা পরিবৰ্তন বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। তার কারণ, এমন সময়ে এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে যখন ভারতে মৌসুমী বৃষ্টিপাত গড়ের চেয়ে এমনিতেই অনেক কম।

আবহাওয়া দফতরের তরফে শনিবার জানানো হয়েছে, আগামী ছয় থেকে সাত দিন বৃষ্টিপাত কম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে উত্তর-পশ্চিম ভারত, পশ্চিম-মধ্য ভারত এবং ভারতের দক্ষিণ উপদ্বীপ অঞ্চলে।

বৃষ্টির মরসুমে এই ধরনের পরিবর্তন কতটা গুরুতর এবং তার কী প্রভাব হতে পারে, তা খুঁটিয়ে দেখা যাক।

'লাইভ ওয়েদার অফ ইন্ডিয়া' নামক একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা নবদীপ দাহিয়া 'এক্স' সমাজমাধ্যমে লেখেন, "জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের স্যাটেলাইট ছবি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।"

ভারতের স্যাটেলাইট ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, "পশ্চিমঘাট পর্বতমালা থেকে শুরু করে দেশের ভিতরের দিকে অবস্থিত 'কোর মনসুন জোন', কোথাও কোনো বৃষ্টিপাত নেই। আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর, উভয় জায়গাতেই মেঘের উপস্থিতি নগণ্য। দৃশ্যটি দেখে মনে হচ্ছে যেন ১২ই জুলাই নয়, বরং ১২ই এপ্রিলের সকাল। ১৮ই জুলাইয়ের আগে পরিস্থিতির উন্নতির কোনো সম্ভাবনা নেই।"

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, আসন্ন দিনে দিল্লি, তার সংলগ্ন জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে এবং দেশের অন্যান্য জায়গায় বৃষ্টিপাত আরো কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আবহাওয়ায় এই পরিবর্তন এসেছে 'মনসুন ব্রেকের' কারণে। যদিও এটি সচরাচর দেখা যায়, তবু এই বছর এটি অস্বাভাবিক।

জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতের স্যাটেলাইট ছবি (নবদীপ দাহিয়ার এক্স হ্যান্ডেল থেকে)
ছবির ক্যাপশান, জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতের স্যাটেলাইট ছবি (নবদীপ দাহিয়ার এক্স হ্যান্ডেল থেকে)

জলবায়ু পরিবর্তন কতটা গুরুতর?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

আবহাওয়াবিদ এবং স্কাইমেট ওয়েদারের প্রধান মহেশ পাহলাওয়াত বিবিসি নিউজ হিন্দিকে জানিয়েছেন ১৯-২০শে জুলাই পর্যন্ত পশ্চিম-উত্তর ও মধ্য ভারতে বৃষ্টিপাতের কোনো সম্ভাবনা নেই।

এর কারণে, দিল্লি এবং তার সংলগ্ন জাতীয় রাজধানী অঞ্চল বা এনসিআর-সহ একাধিক জায়গায় বৃষ্টিপাত মারাত্মক ভাবে প্রভাবিত হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। তার সঙ্গে, দিল্লি এনসিআর অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকতে পারে।

মি. পাহলাওয়াত জানান, 'জুলাই এবং অগাস্ট মাসে মনসুন ব্রেক এক-দুবার হয়ই। গত কয়েক বছর ধরে, মনসুন ব্রেক পুরপুরি হচ্ছে না। এখন উত্তর-পশ্চিম ভারতে এবং মধ্য ভারতে বৃষ্টি নেই, কিন্তু পূর্ব ভারতে বৃষ্টি হচ্ছে।"

কৃষকদের উদ্বেগও ক্রমশ বাড়ছে। কারণ, এখন খরিফ ফসল অর্থাৎ বর্ষাকালের ফসলের মৌসুম। এই সময়ে, কৃষিকাজের একটি বড় অংশই বর্ষার বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল।

মি. পাহলাওয়াতের মতে, এই এলাকাগুলিতে বর্ষা পুনরায় সক্রিয় হওয়ার পরই আবার বৃষ্টি হতে পারে।

উনি জানান, "এই পরিস্থিতিতে পাহাড়ের পাদদেশে ভারী বৃষ্টিপাত হয়, কিন্তু মধ্য ও পশ্চিম ভারতের আবহাওয়া প্রায় পুরোপুরি শুষ্ক হয়ে যায়। এ সময় আপেক্ষিক আর্দ্রতা কমে যায়। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে বৃষ্টি থেমে যায় এবং আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে ওঠে।"

"জুলাইয়ের ১৯-২০ তারিখ এই মনসুন দক্ষিণ দিকে এগোবে। তখন এসব এলাকায় আবার বৃষ্টিপাত শুরু হতে পারে।"

বর্ষাকালে দীর্ঘ বিরতি নিয়ে কৃষকদের উদ্বেগও ক্রমশ বাড়ছে - প্রতীকী ছবি
ছবির ক্যাপশান, বর্ষাকালে দীর্ঘ বিরতি নিয়ে কৃষকদের উদ্বেগও ক্রমশ বাড়ছে - প্রতীকী ছবি

কত বড় চিন্তা মনসুন ব্রেক?

মনসুন ব্রেকের কারণে বিভিন্ন মহলের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সভার সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, "অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আপাতত মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ থমকে গিয়েছে। জুলাই মাসে মৌসুমি বায়ুর এই দুর্বলতা কৃষি, জল নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ মানুষের জীবিকার ওপর ঝুঁকি তৈরি করছে। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কি এ বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে? আমি বিষয়টি সংসদে তুলে ধরব।"

সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন ২০শে জুলাই শুরু হয়ে ১৩ই অগাস্ট পর্যন্ত চলবে। যদিও ততদিনে হয়তো বর্ষার বৃষ্টিপাত আবার শুরু হয়ে যাবে, তবে তা না ঘটলে বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করা হতে পারে।

চলতি বছরের জুন মাসে ভারতে গড়ের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছিল। তবে এরপর থেকে নয়ই জুলাই পর্যন্ত ভালো বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এর ফলে, নয়ই জুলাই নাগাদ বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। তবে মনসুন ব্রেকের কারণে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি আবারও অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

মহেশ পাহলাওয়াত বলেন, "মনসুন ব্রেক নিয়মিত হলেও, এবার এর উপর 'এল নিনোর' প্রভাব কাজ করছে। মৌসুমি বায়ু এমনিতেই দুর্বল এবং এবারের ব্ৰেকটি দীর্ঘস্থায়ী। সাধারণত মনসুন ব্রেক এত দীর্ঘ হয় না।"

"সাধারণত বৃষ্টি চার-পাঁচ দিনের জন্য ওপরের দিকের এলাকায় শিফট হয়ে যায় এবং তারপর আবার নিচে নেমে আসে। কিন্তু এবার এটি দশ দিন ধরে চলবে, যার ফলে একটি লম্বা ব্রেক হয়ে যাবে। এতটা লম্বা ব্রেক হওয়া উচিত নয়।"

তিনি জানিয়েছেন যে, এর ফলে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও কমে যাবে।

এল নিনো একটি জটিল প্রাকৃতিক আবহাওয়া-সংক্রান্ত ঘটনা। প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের সামুদ্রিক জল যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন এল নিনোর সৃষ্টি হয়।

এর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং ট্রেড উইন্ডস দুর্বল হয়ে পড়ে। তার ফলে, বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন আসে।

এল নিনো ভারতীয় উপমহাদেশের বায়ুর চাপের ওপর প্রভাব ফেলে। প্রায়ই দেখা যায় যে, এর প্রভাবে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে যায়, যার জেরে দেশের অনেক অঞ্চলে খরা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বর্ষাকালে পাহাড়ের উপর মেঘ জমে থাকার প্রতীকী ছবি
ছবির ক্যাপশান, যদি ঘূর্ণিঝড়জনিত নিম্নচাপের মতো কোনো নতুন, বেশি প্রভাবশালী ওয়েদার সিস্টেম তৈরি হয়, তবে তা মৌসুমি বায়ুকে দক্ষিণ দিকে টেনে আনে - প্রতীকী ছবি

মনসুন ব্রেক কেন হয়?

মৌসুমি বায়ুর প্রবাহে সাময়িক বিরতি বা 'মনসুন ব্রেক' একটি সাধারণ আবহাওয়া-সংক্রান্ত ঘটনা। বেশি শক্তিশালী বাতাসের প্রভাবে মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ ব্যাহত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

মহেশ পাহলাওয়াত বলেন, "বাতাসের অভিমুখের কারণেই মৌসুমি বায়ুর প্রবাহে এমন বিরতি দেখা দেয়। পশ্চিমা বায়ু প্রবল হয়ে উঠলে তা মনসুন টার্ফকে উত্তর দিকে ঠেলে দেয়।"

মৌসুমি বায়ু ভারতীয় উপমহাদেশের উপর যে বিস্তীর্ণ চাদরের মতো প্রভাব বিস্তার করে, তাকে 'মনসুন টার্ফ' বলে অভিহিত করা হয়।

তিনি আরও জানান, যদি ঘূর্ণিঝড়জনিত নিম্নচাপের মতো কোনো নতুন, বেশি প্রভাবশালী ওয়েদার সিস্টেম তৈরি হয়, তবে তা মৌসুমি বায়ুকে দক্ষিণ দিকে টেনে আনে।

তিনি বলেন, "বঙ্গোপসাগরে যদি কোনও ঘূর্ণিঝড়জনিত আবহাওয়া ব্যবস্থা তৈরি হয় এবং তা স্থলভাগের দিকে এগোয়, সেটি মৌসুমি বায়ুকে টেনে আনবে। এর ফলে আবারও বৃষ্টিপাত শুরু হবে।"

"এই মুহূর্তে মৌসুমি অক্ষরেখার পশ্চিমাংশ পাহাড়ি অঞ্চলের ওপর অবস্থান করছে এবং পূর্বাংশ দক্ষিণে রয়েছে। তাই উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের পূর্ব অংশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। তবে অনেক এলাকায় শুষ্ক আবহাওয়া বজায় থাকবে।"

বৃষ্টির মধ্যে একজন সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে
ছবির ক্যাপশান, এখনও পর্যন্ত চলতি বছরে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের অন্যতম কারণ হিসেবে এল নিনোর প্রভাবকে ধরা হচ্ছে -প্রতীকী ছবি

২০২৭ সাল পর্যন্ত থাকতে পারে এল নিনোর প্রভাব

এখনও পর্যন্ত চলতি বছরে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের অন্যতম কারণ হিসেবে এল নিনোর প্রভাবকে ধরা হচ্ছে।

১১ই জুন প্রকাশিত বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশিয়ানিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) জানিয়েছে, বছরের বাকি সময়ে এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

একাধিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি রেকর্ডে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলির অন্যতম হয়ে উঠতে পারে।

মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে কয়েক দশক ধরে সারা বিশ্বে গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। তার মধ্যে, ২০২৭ সালে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গরম পড়তে পারে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, এর প্রভাব আবহাওয়া, খাদ্য সরবরাহ এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির ওপর পড়বে।

প্রশান্ত মহাসাগরে নিরক্ষরেখা সংলগ্ন উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি হওয়ার পরেই এনওএএ-এর বিজ্ঞানীরা এল নিনোর একটি নতুন পর্যায় শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছিলেন।

বিজ্ঞানীরা বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থারও পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের তুলনায় মধ্য প্রশান্ত অঞ্চলে বায়ুচাপ কম রেকর্ড করা হয়েছে।

জাপান আবহাওয়া সংস্থাও জানিয়েছে, বর্তমানে এল নিনো পরিস্থিতি চলছে।

এনওএএ-র মতে, এই এল নিনো 'অত্যন্ত শক্তিশালী' রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা ৬৩ শতাংশ।

সংস্থাটি জানিয়েছে, তা হলে ১৯৫০ সালের পর থেকে নথিভুক্ত সবচেয়ে বড় এল নিনো ঘটনাগুলির মধ্যে এটি একটি হবে।

অনুমান করা হচ্ছে, এই পরিস্থিতি অন্তত ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত বজায় থাকবে।