ডে কেয়ার সেন্টারে এক শিশু আরেক শিশুকে মারধর করছে, ভিডিওটি সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ

ছবির উৎস, Screen Grab

ছবির ক্যাপশান, ভারতের মহারাষ্ট্রে একটি প্রি-স্কুলের এক কক্ষে এক শিশুর আরেক শিশুকে ব্যাপক মারধরের ভিডিওতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে
    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

(সতর্কতা: এই প্রতিবেদনের কিছু অংশের বর্ণনা পাঠকের অস্বস্তির কারণ হতে পারে)

একটি কক্ষে এক শিশু আরেক শিশুকে অসংখ্যবার চড়, থাপ্পড় ও কামড়ে দিচ্ছে, সেখানে থাকা তৃতীয় আরেক শিশু বিষয়টি সমাধানে এগিয়ে গেলে নিজেও মারধরের শিকার হচ্ছে। ওইসময় কক্ষটিতে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন না। এমন একটি ভিডিও গত কয়েকদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের ফিডে ঘুরছে।

এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশে অনেককেই ভিডিওটি ফেসবুকে শেয়ার করতে দেখা গেছে। তারা ভাবছেন ঘটনাটি বাংলাদেশেরই কোনো একটি ডে-কেয়ার সেন্টারের ভিডিও।

আবার একই ভিডিও নেপালেও ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি সেখানকারই বলে মনে করেন তারা।

কিন্তু, পরে জানা গেছে, এই ভিডিওর ঘটনাটি ভারতের মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের সিডকো এলাকার ফার্স্টক্রাই ইন্টেলিটটস প্রি-স্কুলের।

বিবিসি মারাঠি ভিডিওটি মহারাষ্ট্রের ওই প্রি-স্কুলের বলে নিশ্চিত করেছে।

সেখানকার এমআইডিসি সিডকো থানার পুলিশ পরিদর্শক শিবাজী তাওয়ারে বিবিসি মারাঠিকে বলেছেন, শিশুটির অভিভাবকেরা থানায় অভিযোগ দায়েরের পর, ওই কক্ষে সেসময় থাকা নারী সাহায্যকারী এবং স্কুলের পুরো প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

এদিকে, স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার পর দুইজন কর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।

মহারাষ্ট্রের পুলিশ নিশ্চিত করেছে, ২২শে জুন এই ঘটনা ঘটেছে।

ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজের সময় অনুযায়ী, ২২শে জুন সকাল ১১টা ২০ মিনিট থেকে ১১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে ওই মারধরের ঘটনা ঘটে।

প্রি-স্কুলের ওই কক্ষটিতে ওই সময় কোন শিক্ষক বা কর্মচারী ছিল না।

ভিডিওটি শুরুর প্রথম দুই সেকেন্ডের মধ্যেই লাল-সাদা শাড়ি পরিহিত ওই নারীকে একজন শিশুকে নিয়ে কক্ষটি থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়।

ছবির উৎস, Screen Grab

ছবির ক্যাপশান, লাল-সাদা শাড়ি পরিহিত এই নারীকে কক্ষের একজন শিশুকে নিয়ে বের হয়ে যেতে দেখা যায়

ভিডিওটিতে যা দেখা যাচ্ছে

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

প্রায় ১৩ মিনিট ২৯ সেকেন্ডের সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ভিডিও মূলত ভাইরাল হয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২২শে জুন সকাল সাড়ে দশটার দিকে একজন আইনজীবী মা তার ২৩ মাস বয়সী ছেলে শিশুকে ওই ডে-কেয়ারে রেখে যান।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, ছোট্ট ওই কক্ষটিতে প্রথমে চারজন শিশু ও একজন নারী ছিলেন। পুরো কক্ষটিতে এদিক-সেদিক শিশুদের খেলনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়।

ভিডিওটি শুরুর প্রথম দুই সেকেন্ডের মধ্যেই লাল-সাদা শাড়ি পরিহিত ওই নারীকে একজন শিশুকে নিয়ে কক্ষটি থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়।

দরজাটি বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই সেখানে থাকা তিন শিশুর মধ্যে সাদা টি-শার্ট পরিহিত এক শিশুকে কালো টি-শার্ট পরিহিত আরেক শিশুর কাছে গিয়ে তাকে চড়-থাপ্পড় মারতে দেখা যায়।

এ সময় কক্ষে থাকা কমলা টি-শার্ট পরিহিত তৃতীয় শিশুটিকে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়।

মার খাওয়া শিশুটি তখন চোখে হাত দিয়ে কাঁদছিল।

ক্ষণিক বিরতি দিয়ে আঘাতকারী শিশুটি আবার ওই শিশুটিকে মারতে শুরু করে।

একপর্যায়ে কালো টি-শার্ট পরিহিত শিশুটি বসে পড়লে তাকে সেই অবস্থাতেই অপর শিশুটিকে মারতে দেখা যায়।

ক্রন্দনরত শিশুটিকে উপর্যুপরি পিঠে ও গালে চড় মারতে দেখা যাচ্ছে ভিডিওটিতে।

পুরোটা সময়ই মার খেতে খেতে কাঁদছিল কালো টি-শার্ট পরিহিত শিশুটি।

মার দেওয়ার সময় বেশ কয়েকবার সাদা টি-শার্ট পরিহিত শিশুটিকে ওই কক্ষের দরজার দিকে তাকাতে দেখা যাচ্ছে।

ঠিক এই সময়ই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা তৃতীয় শিশুটি, ম্যাট্রেসের ওপর পড়ে থাকা একটি খেলনা তুলে আঘাতকারী শিশুটিকে মারতে দেখা যায়।

তবে, এতে দমে যায়নি আঘাতকারী শিশুটি। বরং সে বারবারই কালো টি-শার্ট পরিহিত শিশুটিকে মারার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলো।

একপর্যায়ে সে দাঁড়িয়ে উঠে, তাকে থামাতে চাওয়া কমলা টি-শার্ট পরিহিত শিশুটির গালে দুইটি চড় দেয়।

পরে আবারো সে মারতে শুরু করে নিচে সবুজ ম্যাট্রেসে শুয়ে কাঁদতে থাকা কালো টি-শার্টের শিশুটিকে।

এভাবে একটু পরপর কালো টি-শার্ট পরা শিশুটিকে মারছিল সাদা টি-শার্ট পরা শিশুটি। মাঝে কয়েকবার কমলা টি-শার্ট পরা শিশুটিকেও মারতে দেখা যায়।

এই পুরোটা সময় মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে শিশুটি আন্টি, আন্টি বলে চিৎকার করছিল বলে ভিডিওটিতে শোনা যায়। কিন্তু পাশের রুম থেকে কেউ আসেনি।

প্রি-স্কুলের এই কক্ষটিতে শিশুদের অনেক খেলনা রয়েছে

ছবির উৎস, Screen Grab

ছবির ক্যাপশান, প্রায় দশ মিনিট ধরে চলমান ওই মারধরের সময় অন্তত ২৫ বার ওই শিশুটিকে কামড় দিয়েছে আঘাতকারী শিশুটি

এই দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখছিলো কক্ষে থাকা কমলা টি-শার্ট পরিহিত শিশুটি। এই সময় তাকে আন্টি, আন্টি বলে চিৎকার করতে শোনা যায়।

মার খেয়ে কালো টি-শার্ট পরিহিত ছেলেটি উঠে গেলে আঘাতকারী শিশুটিও উঠে তাকে আবারো মারধর করে।

এ সময় কমলা টি-শার্ট পরিহিত শিশুটি আবারো আন্টি বলে চিৎকার করলে এ সময় তাকেও আবার গালে চড় দিতে দেখা যায় সাদা টি-শার্ট পরিহিত আঘাতকারী শিশুটিকে।

একপর্যায়ে আবার দেয়ালের বাম দিকে আগের স্থানে শুরুতে যেখানে মারধর করা হয়েছিল, সেখানেই কালো টি-শার্ট পরিহিত শিশুটিকে অনবরত মারধর ও কামড়ে ধরে রাখে সাদা টি-শার্ট পরিহিত শিশুটি।

সিসিটিভি ফুটেজটির ১০ মিনিট ধরে এই মারধরের দৃশ্য দেখা যায়।

ভিডিওটির ১০ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে দেখা যায়, ওই কক্ষের দরজা খুলে যে ভিডিওর প্রথমে যে নারীকে বের হয়ে যেতে দেখা গেছে তিনি আবার ভেতরে প্রবেশ করছেন।

এ সময় কমলা টি-শার্ট পরিহিত শিশুটি তাকে জড়িয়ে ধরেন।

একইসঙ্গে, কালো টি-শার্ট পরিহিত যে শিশুটি ১০ মিনিট ধরে মারধরের শিকার হয়েছে সেই শিশুটিও কাঁদতে কাঁদতে ওই নারীর কাছে গিয়ে তার হাত ধরেন।

ওই নারীকে এ সময় কিছু বলতে বলতে মারধরের শিকার শিশুর মুখে পরীক্ষা করতে দেখা যায়। এ সময় আরেকজন নারী কক্ষটির দরজা খুলে তার সাথে কথা বলেন।

এরপরই কক্ষে থাকা ওই নারীকে কমলা টি-শার্ট পরিহিত শিশু ও মারধরের শিকার শিশুটিকে নিয়ে কক্ষটি থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়।

সিসিটিভি ফুটেজের শেষের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সাদা টি-শার্ট পরিহিত যে শিশুটি মারধর করেছিল সে একাই কক্ষটিতে অবস্থান করছে, খেলাধুলা করছে।

ফুটেজটির ১২ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের দিকে দেখা যায়, সাদা-কমলা রঙের শাড়ি পরিহিত ওই নারী কক্ষের দরজা খুলে দাঁড়ান, ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পেছনে তাকিয়ে কারো সাথে কথা বলতে শোনা যায় তাকে, মারধরের শিকার শিশুটিকেও পাশে দেখা যায়।

শেষের দিকে কামিজ পরিহিত আরেকজন নারীকে দরজার সামনে থেকেই কক্ষের ভেতরে উঁকি দিয়ে ওই নারীর সাথে কথা বলতে দেখা যায়। এ পর্যায়ে তারা দুইজনই সেখান থেকে সরে যান এবং সাদা টি-শার্ট পরিহিত শিশুটিকেও দরজা দিয়ে বের হয়ে যেতে দেখা যায়।

নির্যাতনের প্রতীকী ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নির্যাতনের প্রতীকী ছবি

কী বলছে পুলিশ এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ?

বিষয়টি নিয়ে বিবিসি মারাঠি মহারাষ্ট্রের পুলিশ এবং ওই প্রিস্কুলের কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছে।

স্থানীয় এমআইডিসি সিডকো থানার পুলিশ পরিদর্শক শিবাজী তাওয়ারে বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন, ঘটনাটি ঘটেছিল ২২ জুন।

"স্কুলের একজন নারী সাহায্যকর্মী (হেল্পার) শিশুরা যাতে বাইরে চলে না যায়, সেজন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এ সময়ের মধ্যে, একটি দুই বছরের শিশু অন্য একটি দুই বছরের শিশুকে আক্রমণ করে এবং তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কামড়ে দেয়।"

"(মার খাওয়া শিশুটির) অভিভাবকেরা অভিযোগ দায়ের করার পর, ওই নারী সাহায্যকারী এবং স্কুলের পুরো প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।"

এদিকে, বিবিসি মারাঠি-র প্রশ্নের জবাবে স্কুল প্রশাসন জানিয়েছে, "ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা কেন্দ্র প্রধান এবং ওই শিক্ষাকর্মীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে।"

তবে, সংক্ষিপ্ত জবাবের বাইরে স্কুল প্রশাসন এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এদিকে, ভারতীয় গণমাধ্যম তথ্য অনুযায়ী, মারধরের ঘটনায় শিশুটির মুখ, নাক, ঠোঁট, বুক, পিঠ এবং পায়ে আঘাত লেগেছিল এবং তাকে চিকিৎসার জন্য কাছের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সকালের দিকে এই মারধরের ঘটনা ঘটলেও দুপুর দুইটা পর্যন্ত এই ঘটনার বিষয়ে ওই শিশুটির অভিভাবকদের কিছু জানায়নি স্কুলের কর্তৃপক্ষ।

যখন শিশুটির অভিভাবক তাকে নিয়ে আসে, তখন স্কুলের প্রিন্সিপাল তাদের জানান যে, শিশুটির গায়ে কিছু আঁচড় লেগেছে।

কিন্তু শিশুটির বাবা-মা যখন তার শরীরের কাপড় খুলে পরীক্ষা করেন, তখন তার সারা শরীরজুড়ে আঘাতের ধরন দেখে তারা হতভম্ব হয়ে পড়েন। এরপরে তারা শিশুটি একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন।

এরপরে তারা নিকটবর্তী থানায় ওই প্রি-স্কুলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও, অধ্যক্ষ, দুইজন ব্যবস্থাপক এবং শিশুদের অরক্ষিত অবস্থায় রেখে যেতে দেখা যাওয়া কর্মীসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে।

এনডিটিভি জানিয়েছে, শিশুটির অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন যে, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের মামলা না করার জন্য ১০ লাখ রুপি টাকা দেওয়া এবং তিন বছর পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়াশোনা করানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

স্কুলের লোকজন বলেছে, ''তোমরা আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না,'' শিশুটির অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন।

ওই ঘটনার পর মহারাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগ স্কুলটির বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে।