আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
কিছু নারী কেন এমন কোনও রং দেখতে পান, যা অন্য অনেকে দেখতে পায় না?
- Author, ডেইজি স্টিফেন্স
- Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
- Published
- পড়ার সময়: ৮ মিনিট
চারুকলা শিল্পী কনসেত্তা আন্তিকো বলছিলেন, যে মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারলেন, যে রংগুলো তিনি দেখতে পাচ্ছেন, অথচ সেই সব রং তার ছাত্রছাত্রীরা দেখতে পাচ্ছে না, ব্যাপারটা জেনে তিনি রীতিমতো চমকে উঠেছিলেন।
মিজ. আন্তিকো বলছিলেন, দৈনন্দিন জীবনের নানা সাধারণ বিষয়, যেমন ধরা যাক একটা ছায়া, তার মধ্যেও তিনি নানা রঙের ছটা দেখতে পান, অথচ বেশিরভাগ মানুষই সেটিকে দেখেন একটি ছায়া মাত্র হিসাবেই।
তার ধারণা ছিল, তিনি যেভাবে পৃথিবীটাকে দেখেন, অন্যরাও ঠিক তার মতো করেই দেখে। কিন্তু পরে, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি বুঝলেন যে ব্যাপারটা মোটেই তা নয়।
"আমি পরে একজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, যে আমাকে এই কথাটা আগে কখনো বলো নি কেন? তখন সে জানায় 'আপনি আমাদের শিক্ষিকা। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম যে আপনি শৈল্পিক একটা কিছু করছেন," জানাচ্ছিলেন মিজ. আন্তিকো।
পরবর্তী কালে জিনগত পরীক্ষার মাধ্যমে মিজ. আন্তিকো জানতে পারেন যে, তার শরীরে টেট্রাক্রোমেসি তৈরি হওয়ার মতো জৈবিক সম্ভাবনা আছে।
টেট্রাকোমেসি একধরণের বাড়তি দৃষ্টিশক্তি, যার ফলে একজন ব্যক্তি এমন সব রং দেখতে পান, যেগুলো অন্যদের চোখে ধরা পড়ে না।
চোখে অতিরিক্ত এক প্রকার কোষ
বেশিরভাগ মানুষের চোখে তিন ধরনের বিশেষ কোষ থাকে - যার নাম 'কোণ'।
এই প্রতিটি 'কোণ' কোষ ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা মূলত লাল, সবুজ এবং নীল রং বোঝায়।
এই 'কোণ' কোষগুলো সক্রিয় হয়ে উঠে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। বিভিন্ন 'কোণ' কোষ থেকে মস্তিষ্কে আসা সংকেত মিলে মিশেই স্থির করে যে আমরা কী রং দেখছি।
তবে কিছু কিছু মানুষের চোখে এই তিন ধরনের 'কোণ' কোষ ছাড়াও চতুর্থ আরেক ধরনের 'কোণ' কোষ থাকতে পারে।
তত্বগত ভাবে, এর অর্থ হলো, এই ধরনের মানুষের মস্তিষ্ক আরও বেশি, আরও নানা ধরনের সংকেত পায়, যার ফলে তাদের চোখে ধরা পড়া আলোর ছটা আরও বর্ণিল, আরও বেশি রঙিন হয়ে ওঠে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
দুই ভিন্ন ধরনের জিন
লাল ও সবুজ রঙে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে যে 'কোণ' কোষগুলি, সেগুলির জিন থাকে 'এক্স' ক্রোমোজোমে। কোনো ব্যক্তি টেট্রাক্রোম্যাটিক কিনা, তা নির্ভর করে তার শরীরে এই জিন দুটির যে কোনো একটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকারভেদে সক্রিয় আছে, কিনা, তার ওপরে।
যেহেতু নারীদের দুটি এক্স ক্রোমোজোম এবং পুরুষদের একটি এক্স ক্রোমোজোম থাকে, তাই সাধারণত কেবল জৈবিকভাবে যা নারী, তারাই টেট্রাক্রোম্যাটিক হতে পারেন।
পুরুষদের ক্ষেত্রে আবার ওই একই জিনের প্রকারভেদের ফলে তাদের কয়েক ধরনের বর্ণান্ধতার কারন হয়ে উঠতে পারে।
চতুর্থ প্রকারের 'কোন' কোষ থাকলে তাকে রেটিনাল টেট্রাক্রোমেসি বলা হয়।
জিন পরীক্ষা করে এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায় যাদের মধ্যে চার ধরনের 'কোণ' কোষ গঠনকারী জিন রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের নিউকাসল ইউনিভার্সিটির টেট্রাক্রোমেসি প্রজেক্টের গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ১২ শতাংশ নারীর এই বিশেষ জিনগত ক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে গবেষণা থেকে এও জানা যাচ্ছে যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই শতাংশের হারের তফাৎ হতে পারে।
শুধুমাত্র একটা অতিরিক্ত 'কোণ' কোষ থাকলেই যে একজন ব্যক্তির রং দেখার শক্তি বেড়ে যাবে তা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউসি আরভাইন ব্রানসন সেন্টার ফর ট্রান্সলেশনাল ভিশন রিসার্চ-এর ড. কিম্বার্লি এ. জেমসনের মতে, যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে রং দেখার ক্ষমতা সত্যিই বেশি থাকে, তবে তাকে ফাংশনাল টেট্রাক্রোমেসি বলা হয়। কিন্তু এটি প্রমাণ করা সহজ নয়।
যদিও এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে যে জিনের কারনে বাড়তি রং দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ড. জেমসনের একটি গবেষণায় এমন নারীদেরও খোঁজ পেয়েছেন, যাদের চোখে চার ধরনের 'কোণ' কোষ আছে, তারা রঙের বর্ণালীকে আরও স্পষ্ট ভাবে আলাদা আলাদা শেডে দেখতে পান।
এ থেকে বোঝা যায় ট্রাইক্রোম্যাট, মানে যাদের চোখে তিন ধরনের 'কোণ' কোষ রয়েছে তাদের চেয়ে এই সব নারীদের রং চিনতে পারার ক্ষমতা বেশি।
পশু-পাখিদের মধ্যেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
'নিউ ওয়ার্ল্ড' বানরের কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে, পুরুষ বানরেরা ডাইক্রোম্যাট হয়, অর্থাৎ তাদের চোখে দুই ধরনের 'কোণ' কোষ থাকে, আর স্ত্রী বানরেরা ট্রাইক্রোম্যাট হয়, তাদের চোখে তিন ধরনের' কোণ' কোষ থাকে।
বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করে দেখেছেন যে ট্রাইক্রোম্যাট স্ত্রী বানরেরা ডাইক্রোম্যাট পুরুষদের চেয়ে লাল ফল অনেক তাড়াতাড়ি খুঁজে খেতে পারে। এর থেকে বোঝা যায় যে লাল ফল তাদের নজরেও বেশি পড়ে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ সাসেক্সের দৃষ্টি সংক্রান্ত স্নায়ুতন্ত্র বিশেষজ্ঞ ড. জেনি বোস্টেনের মতে, যদি একই পদ্ধতি টেট্রাক্রোম্যাটিক মানুষের ওপরেও প্রয়োগ করা হয়, তাহলে অতিরিক্ত 'কোণ' কোষযুক্ত নারীদের চোখে ভিন্নভাবে রঙের ছটা ধরা পড়বে।
তবে, এই অভিজ্ঞতাটি আসলে কেমন হবে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও মতভেদ রয়েছে।
যে রংগুলো বর্ণনা করা কঠিন
অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটির দার্শনিক ড. মাইকেল নেওয়াল একটি গবেষণাপত্র লিখেছেন যার বিষয়বস্তু, 'টেট্রাক্রোম্যাটরা কী দেখে?'।
তিনি বলেন, "একটি প্রচলিত ধারণা হলো, যদি কোনো ব্যক্তির একটি অতিরিক্ত রং দেখার ক্ষমতা থাকে তবে তিনি এমন সব রং দেখতে পারেন যা বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব।"
তার মতে, "ঠিক যেমন লাল-সবুজ রং ঠিক কেমন, সেটা বুঝতে পারেন না এমন কোনো বর্ণান্ধ ব্যক্তি, এটা অনেকটা সেরকম। আরেকটি সম্ভবনা হলো, তারা হয়তো সাধারণ রংগুলোর মধ্যেকার অতি সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো আরও স্পষ্টভাবে দেখতে পারেন।"
একজন ব্যক্তি আসলে কী কী রং দেখতে পান, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন।
"এমনকি একজন সাধারণ ট্রাইক্রোম্যাটেরও রং দেখার বাস্তব অভিজ্ঞতাটা ঠিক কেমন, সেটা পরিমাপ করা অসম্ভব," দাবি ডক্টর জেনি বোস্টেনের।
ড. কিম্বার্লি এ. জেমিসনের মতে, "এই বিষয়টি আরও জটিল, কারণ টেট্রাক্রোমেসির বিভিন্ন প্রকারভেদ থাকতে পারে। অতিরিক্ত 'কোণ' কোষটি কতটা সংবেদনশীল, তার উপর নির্ভর করে প্রতিটা মানুষের রং দেখার ক্ষমতা আলাদা হতে পারে।"
তবে, ড. বোস্টেনের মতে, মানুষ কতটা ভালোভাবে রঙের মধ্যে পার্থক্য করতে পারছে বা বিভিন্ন আভা কতটা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে সেই ধরনের পরীক্ষাগুলোই গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করতে পারে যে বিভিন্ন মানুষ আসলে কীভাবে রং চিনতে পারে।
টেট্রাক্রোম্যাট কীভাবে শনাক্ত করবেন
ইন্টারনেটে খুঁজলে টেট্রাক্রোম্যাসি নির্ণয়ের জন্য বেশ কিছু অনলাইন পরীক্ষার সন্ধান পাওয়া যাবে, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে টেট্রাক্রোম্যাট হিসেবে শনাক্ত করা যায় না।
বেশিরভাগ আধুনিক স্ক্রিনে কেবল তিনটি রঙের চ্যানেল ব্যবহৃত হয়: লাল, সবুজ এবং নীল। তাই, টেট্রাক্রোম্যাটরা যদি সত্যিই নতুন কোনও রং দেখতে পান যা অন্যরা দেখতে পায় না, সেই রঙগুলো স্ক্রিনে নাও দেখা যেতে পারে।
ড. নিউঅলের মতে, এই কারণেই বিষয়টি নির্ধারণ করা কঠিন। যদি কোনো ব্যক্তি বাস্তবে কোনও রঙকে স্ক্রিনে দেখা রঙের চেয়ে আলাদা করতে পারেন তবে তা টেট্রাক্রোম্যাসির একটি লক্ষণ হতে পারে। তবে, এটি কী প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে তার ওপরেও নির্ভরশীল।
ড, জেমসন বলছেন, আরেকটি লক্ষণ এও হতে পারে যে, কেউ সবসময় অনুভব করেন যে তিনি অন্যদের থেকে আলাদা ভাবে রং দেখছেন।
তিনি বলেন, "এই ধরনের মানুষদের অনুভূতি শৈশব থেকেই গভীর। রং চেনার ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি প্রখর এবং সংবেদনশীল।"
আরেকটি আকর্ষণীয় লক্ষণ, কোনো ব্যক্তির উজ্জ্বল এলইডি আলোতে অস্বস্তি বোধ হতে পারে, তার জন্য হয়তো উষ্ণ আলো বেশি আরামদায়ক হতে পারে।
ড. জেমসন বলেন, "টেট্রাক্রোম্যাটিক নারীরা পযার্প্ত দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ নেই এমন আলো সহ্য করতে পারেন না।
তারা প্রায়শই তাদের পরিবারের সদস্যদের বলেন, 'এই আলোটা আমার একদমই পছন্দ নয়। এই ধরনের ফ্লুরোসেন্ট টিউবগুলো আমি সহ্য করতে পারি না। আমার অস্বস্তি হয়। আমি অসুস্থ বোধ করি।'"
যাদের বাবারা মৃদু বর্ণান্ধতার শিকার, তাদের টেট্রাক্রোম্যাট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হয়।
তবে, এগুলো কেবল সম্ভাব্য ইঙ্গিত। জিনগত এবং পরীক্ষাগারের পরীক্ষাকে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হয়।
রেটিনাল থেকে শুরু করে ফাংশনাল টেট্রাক্রোম্যাসি
গবেষকরা এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেননি যে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে রেটিনাল টেট্রাক্রোম্যাসি কার্যকরী টেট্রাক্রোম্যাসিতে পরিণত হয়।
ড. বোস্টেনের প্রশ্ন, "এর জন্য কি এক বিশেষ ধরনের অতিরিক্ত 'কোণ' কোষের প্রয়োজন হয়? নাকি এটি নির্ভর করে সেই ব্যক্তি কী ভাবে সেই সংকেতগুলো ব্যবহার করতে শিখেছে তার ওপর?"
তিনি আরও বিশ্বাস করেন যে এটি দৃষ্টিশক্তির জন্য যে ব্যবস্থা তার অন্যান্য অংশের নমনীয়তার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
তিনি যোগ করেন, "আরেকটি সম্ভাবনা হলো, যদি এই রঙের সংকেতগুলোর কোনো ব্যক্তির জীবনে কোনো ব্যবহারিক উপযোগিতা থাকে, তবে তিনি সেগুলো আলাদা করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারেন।"
চিত্রশিল্পী কনসেত্তা আন্তিকো মনে করেন যে তার সঙ্গে এমনটাই ঘটেছে।
তিনি বলেন, "রং সম্পর্কে আমার ধারণা তৈরি হয়েছে। এটা পেশী ব্যবহারের মতো।"
তিনি আরও বলেন, "আমি ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকছি। যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে রং মেশাচ্ছি। আমি এটা প্রতিদিন, একটানা করি।"
একটি সাহসী দাবি
ফাংশনাল টেট্রাক্রোম্যাসি বলে কি আদৌ কিছু আছে, বিতর্ক রয়েছে।
ড. বোস্টেন বলেন, কিছু মানুষের অতিরিক্ত রং দেখার ক্ষমতা রয়েছে—এটি "একটি দুঃসাহসিক দাবি"।
তবে তিনি এও বলেন যে, "যতক্ষণ না একটি নিখুঁত পরীক্ষা করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন পরীক্ষা এবং বিভিন্ন কেস স্টাডি থেকে যতটা সম্ভব তথ্য সম্বলিত করার চেষ্টা করা হয়।"
"তারপর, সমস্ত প্রমাণ যদি একই দিকে ইঙ্গিত করে, তবে বলা যেতেই পারে যে এ কথার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।"
কনসেত্তা আন্তিকো অন্যদের সন্দেহে দমে যাননি। তিনি বলেন, এই জিনগত মিউটেশনের অধিকারী হয়ে তিনি নিজেকে "ভাগ্যবান" মনে করছেন।
তিনি বলেন, "এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে আমি এমন জিনিস দেখতে পাই যা অন্যেরা দেখতে পায় না।"
তিনি আরও বলেন, "এটি আমার জীবনকে আরও সুন্দর করে তুলেছে।"