ইরান: কীভাবে সম্পূর্ণ ভিন্নরকম একটি ব্যবস্থায় দেশ চলে

ইরানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনেকগুলো কেন্দ্র রয়েছে, তবে শীর্ষ ধর্মীয় নেতা (বর্তমানে আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি) সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী
ছবির ক্যাপশান, ইরানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনেকগুলো কেন্দ্র রয়েছে, তবে শীর্ষ ধর্মীয় নেতা (বর্তমানে আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি) সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী
Published

ইরানে কীভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থা চলে? কোন ক্ষমতার ছড়ি কার হাতে ? নিচে সংক্ষেপে সেই ধারণা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে :

শীর্ষ নেতা

শীর্ষ ধর্মীয় নেতা ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে দুইজন সেই চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন।

প্রথম, ইসলামি ইরানের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতোল্লাহ রুহুল্লা খোমেনি যিনি শাহ রেজা পাহলভির ক্ষমতাচ্যুতির পর ক্ষমতা নেন। আর দ্বিতীয়জন হলেন, মি. খোমেনির উত্তরসূরি আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি যিনি এখন ইরানের শীর্ষ ক্ষমতায়।

১৯৮৯ সালে আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি শীর্ষ নেতা নির্বাচিত হন এবং তখন থেকে দেশের শাসনক্ষমতার ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ রেখে চলেছেন তিনি।
ছবির ক্যাপশান, ১৯৮৯ সালে আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি শীর্ষ নেতা নির্বাচিত হন এবং তখন থেকে দেশের শাসনক্ষমতার ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ রেখে চলেছেন তিনি।

শীর্ষ নেতা ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান এবং দেশের সবগুলো নিরাপত্তা বাহিনী তার নিয়ন্ত্রণে। দেশের বিচার বিভাগের প্রধান তিনি নিয়োগ দেন, এবং সেই সাথে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র অর্থাৎ টিভি এবং রেডিও তার নিয়ন্ত্রণে।

এছাড়া, শত শত কোটি ডলারের অনেকগুলো জাতীয় দাতব্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলোর দায়িত্বও শীর্ষ নেতার হাতে। এসব দাতব্য প্রতিষ্ঠান ইরানের অর্থনীতির বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

১৯৮৯ সালে আয়াতোল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি শীর্ষ নেতা নির্বাচিত হন এবং তখন থেকে দেশের শাসনক্ষমতার ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ রেখে চলেছেন তিনি। কর্তৃত্বের ওপর কোনো চ্যালেঞ্জ তিনি সহ্য করেন না।

বিবিসি বাংলার আরও খবর:

প্রেসিডেন্ট

ইরানে প্রেসিডেন্টকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে হয় এবং তার ক্ষমতার মেয়াদ চার বছর। একজন প্রেসিডেন্ট পরপর দুবারের বেশি নির্বাচন করতে পারেননা।

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তিনি সরকারের প্রধান এবং সংবিধানের বাস্তবায়ন তার দায়িত্ব। অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নীতি এবং পররাষ্ট্র নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে প্রেসিডেন্টের হাতে অনেক ক্ষমতা।

তবে রাষ্ট্রের যে কোনো ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা শীর্ষ নেতার হাতে।

ইরানের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি
ছবির ক্যাপশান, ইরানের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি

প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির উত্তরসূরি নির্বাচন করতে ইরানে আজ শুক্রবার ভোট হচ্ছে। মি. রুহানি একজন মোটামুটি উদারপন্থী ধর্মীয় নেতা। গত দুটো নির্বাচনে কট্টরপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীদের বড় ব্যবধানে তিনি হারিয়েছেন। দুবারই প্রথম দফার ভোটেই তিনি ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছেন, ফলে দ্বিতীয় দফার ভোট করতে হয়নি।

তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে প্রার্থী হতে পারবেন তা অনুমোদন করে ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল (অভিভাবক পরিষদ)। ১২ সদস্যের এই কাউন্সিলে থাকেন ধর্মতত্ত্ববিদ এবং আইন বিশেষজ্ঞ।

শুক্রবারের নির্বাচনে ৫৯০ জন প্রার্থী হওয়ার আবেদন করেছিলেন, কিন্তু এই পরিষদ মাত্র সাতজনকে প্রার্থী হওয়ার অনুমোদন দেয়। শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হয়েছেন মাত্র চারজন। কোনো নারী প্রার্থীকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

পার্লামেন্ট

ইরানের পার্লামেন্টের নাম মজলিস। এর আসন সংখ্যা ২৯০। প্রতি চার বছর অন্তর মজলিসের নির্বাচন হয়।

আইন তৈরির এবং জাতীয় বাজেট অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা রয়েছে পার্লামেন্টের। সেই সাথে পার্লামেন্ট সরকারের মন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করতে পারে অর্থাৎ তাদের ক্ষমতা থেকে সরাতে পার্লামেন্টে বিচারের মুখে দাঁড় করাতে পারে।

ইরানের পার্লামেন্ট মজলিস-এর একটি অধিবেশন
ছবির ক্যাপশান, ইরানের পার্লামেন্ট মজলিস-এর একটি অধিবেশন। প্রতি চার বছর অন্তর মজলিসের নির্বাচন হয়। আইন তৈরির এবং জাতীয় বাজেট অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা রয়েছে পার্লামেন্টের

কিন্তু পার্লামেন্টে পাশ করা আইন আবার গার্ডিয়ান কাউন্সিলকে অনুমোদন করতে হয়। ২০২০ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ধর্মীয় রক্ষণশীল প্রার্থীরা অনেক ভালো ফল করেছিলেন, কারণ গার্ডিয়ান কাউন্সিল সাত হাজারেরও বেশি সম্ভাব্য প্রার্থীকে ভোটে দাঁড়ানোর অনুমতি দেয়নি এবং প্রত্যাখ্যাতদের সিংহভাগই ছিলেন উদারপন্থী এবং সংস্কার-বাদী।

গার্ডিয়ান কাউন্সিল

ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গার্ডিয়ান কাউন্সিল। পার্লামেন্টে পাশ করা সব বিলে এই কাউন্সিলের অনুমোদন লাগে। চাইলে তারা যে কোনো বিলে ভেটো দিতে পারে। পার্লামেন্ট বা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে প্রার্থী হবেন বা হবেন না তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই কাউন্সিলের হাতে।

বারো সদস্যের গার্ডিয়ান কাউন্সিলে থাকেন ছয়জন ধর্মীয় তাত্ত্বিক যাদের নিয়োগ করেন শীর্ষ নেতা। বাকি ছয়জন হলেন আইন বিশেষজ্ঞ যাদের নাম প্রস্তাব করে আইন বিভাগ যদিও এই ছয়জনের চূড়ান্ত নিয়োগ পেতে পার্লামেন্টের অনুমোদন লাগে।

ছয় বছরের জন্য তারা নিয়োগ পান। বর্তমান গার্ডিয়ান কাউন্সিল কট্টরপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে। এমনকি কাউন্সিলের বর্তমান চেয়ারম্যান আয়াতোল্লাহ আহমাদ জান্নাতি নিজেও একজন কট্টরপন্থী হিসাবে পরিচিত।

গার্ডিয়ান কাউন্সিলের বর্তমান চেয়ারম্যান আয়াতোল্লাহ আহমাদ জান্নাতি
ছবির ক্যাপশান, গার্ডিয়ান কাউন্সিলের বর্তমান চেয়ারম্যান আয়াতোল্লাহ আহমাদ জান্নাতি

আরও পড়ুন:

অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ

অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ। এতে থাকেন ইসলাম বিশেষজ্ঞ এবং ধর্মীয় নেতা।

শীর্ষ নেতার নিয়োগ এবং তার পারফরমেন্সের ওপর নজরদারির ক্ষমতা রয়েছে এই পরিষদের হাতে। এই পরিষদ যদি মনে করে শীর্ষ নেতা তার দায়িত্ব ঠিকমত পালন করতে পারছেন না, তাহলে তারা তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারেন।

অবশ্য শীর্ষ নেতার কোনো সিদ্ধান্তকে বিশেষজ্ঞ পরিষদ চ্যালেঞ্জ করেছে তার কোনো নজির এখন পর্যন্ত নেই।

তবে ৮২ বছরের আয়াতোল্লাহ আলি খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় এই পরিষদের গুরুত্ব বাড়ছে।

আয়াতোল্লাহ খামেনি যদি কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন বা মারা যান, গোপন ভোটে নতুন একজন শীর্ষ নেতা নির্বাচিত করবে ৮৮ সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ পরিষদ।

এই বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য নির্বাচনে প্রতি আট বছর অন্তর ভোট হয়। শেষবার ভোট হয়েছিল ২০১৬ সালে। তখন উদারপন্থী এবং সংস্কারপন্থীরা ৬০ শতাংশ আসনে জেতেন।

তবে বিশেষজ্ঞ পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আয়াতোল্লাহ আহমাদ জান্নাতি একজন ধর্মীয় কট্টরপন্থী হিসাবে পরিচিত। তিনি একইসাথে গার্ডিয়ান কাউন্সিলেরও প্রধান।

এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল

এই পরিষদের অন্যতম দায়িত্ব বিভিন্ন বিষয়ে শীর্ষ নেতাকে পরামর্শ দেওয়া। তাছাড়া, কোনো আইন নিয়ে পার্লামেন্ট এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে মতবিরোধে মধ্যস্থতা করে এই পরিষদ।

শীর্ষ নেতা ৪৫ সদস্যের পরিষদের সদস্যদের নিয়োগ দেন। সুপরিচিত ধর্মীয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাই এর সদস্য হন।

বর্তমানে এই পরিষদের চেয়ারম্যান আয়াতোল্লাহ আমোলি লারিজানি। তিনি একসময় বিচার বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং কট্টরপন্থী হিসাবে পরিচিত।

বর্তমান প্রধান বিচারপতি ইব্রাহিমি রাইসি
ছবির ক্যাপশান, বর্তমান প্রধান বিচারপতি ইব্রাহিমি রাইসি একজন কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা। তিনি এবার প্রেসিডেন্ট পদপার্থী

প্রধান বিচারপতি

ইরানের প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেন শীর্ষ নেতা। প্রধান বিচারপতি দেশের বিচার বিভাগেরও প্রধান। ইসলামি আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা তার দায়িত্ব।

বর্তমান প্রধান বিচারপতি ইব্রাহিমি রাইসি একজন কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা। তিনি এবার প্রেসিডেন্ট পদপার্থী এবং জনমত জরীপ অনুযায়ী এক নম্বর ফেভারিট।

ভোটার

ইরানে ৮ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ভোটার সংখ্যা ৫কোটি ৮০ লাখ। ১৮ বা তার বেশি বয়সীরা ভোট দিতে পারেন। ইরানের জনসংখ্যার অর্ধেকেরই বয়স তিরিশের নিচে। ফলে ভোটারদের বিরাট একটি অংশ তরুণ-যুবক।

ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ভোটার উপস্থিতির হার ৫০ শতাংশের ওপর। ব্যতিক্রম ছিল ২০২০ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচন। কট্টরপন্থীদের ব্যাপারে বিরক্তি এবং অর্থনৈতিক দুর্দশা নিয়ে অসন্তোষের কারণে বহু মানুষ ভোট দিতে যাননি।

সেনাবাহিনী

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইরানের সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইরানের সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ
ছবির ক্যাপশান, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইরানের সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ

ইসলামি বিপ্লবের পরপরই ইসলামি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এবং নিয়মিত সেনাবাহিনীর ক্ষমতায় ভারসাম্য নিশ্চিত করতে আইআরজিসি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এই বাহিনীর সাথে শীর্ষ নেতার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ এবং তারা এখন ইরানের সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।আইআরজিসির নিজস্ব স্থল, নৌ এবং বিমান বাহিনী রয়েছে। ইরানের কৌশলগত অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে।

প্রধানত সরকার বিরোধী অসন্তোষ সামাল দেওয়ার জন্য বাসিজ নামে যে আধাসামরিক বাহিনী ইরানে রয়েছে তার নিয়ন্ত্রণও আইআরজিসির হাতে।

আইআরজিসি এবং নিয়মিত সেনাবাহিনীর সিনিয়র কম্যান্ডারদের নিয়োগ দেন শীর্ষ নেতা। তার কাছেই সেনা কম্যান্ডারদের জবাবদিহি করতে হয়।

মন্ত্রিসভা

মন্ত্রীসভা গঠন করেন প্রেসিডেন্ট। তবে তার জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন লাগে। পার্লামেন্ট যে কোনো মন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টকেও ইমপিচ করতে পারে।