জার্মানি নামিবিয়ার কাছে অতীতের গণহত্যার দায় স্বীকার করে কী ক্ষতিপূরণ দেবে?

সোয়াকপমুন্ড
ছবির ক্যাপশান, সোয়াকপমুন্ড-এর অভিজাত এলাকায় এখনও থাকেন জার্মান ঔপনিবেশিক শাসকদের বংশধররা
    • Author, টিম হোয়েওয়েল
    • Role, বিবিসি নিউজ, নামিবিয়া
  • Published

জার্মানি ও নামিবিয়ার মধ্যে অতীত গণহত্যার ক্ষতিপূরণ নিয়ে যে চুক্তি হচ্ছে তা ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাবেক উপনিবেশগুলোর ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে একটা নজির তৈরি করতে চলেছে। জার্মানির ঔপনিবেশিক বাহিনী নামিবিয়ানদের গণহত্যা করেছিল বলে যা এখন ব্যাপকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে তার ক্ষত সারাতেই এই চুক্তি হচ্ছে।

কিন্তু যে হত্যাযজ্ঞ একটা গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, তার মূল্য কী হওয়া উচিত? নামিবিয়ায় নিহতদের স্বজনরা এবং তাদের সাবেক ঔপনিবেশিক শাসকদের মধ্যে এ নিয়েই এখন চলছে তীব্র দর-কষাকষি।

''এই গোটা সমুদ্র সৈকত জুড়ে তখন বসানো হয়েছিল একটি বন্দী শিবির,'' বলছেন লেইডলো পেরিনগান্ডা।" এখন যেখানে গাড়ি পার্ক করার জায়গা - সেটা ঘেরা ছিল কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে।''

শিল্পী ও সমাজকর্মী লেইডলো পেরিনগান্ডা নামিবিয়ার প্রধান সৈকত শহর সোয়কপমুন্ড-এর সমুদ্রসৈকতে কয়েক সারি কাফে আর শিশুদের খেলার জায়গা দেখাচ্ছিলেন।

সেখানে নামিব মরুভূমির বালুর ওপর আছড়ে পড়ছে আটলান্টিকের ঢেউ।

সোয়াকপমুন্ড
ছবির ক্যাপশান, সোয়াকপমুন্ড

"আমার প্রপিতামহী আমাকে বলেছেন আমাদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল, কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তারা এখানেই মারা যায়।"

সময়টা ছিল ১৯০৪ থেকে ১৯০৮ পর্যন্ত। আজকের নামিবিয়া তখন দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকায় জার্মানির উপনিবেশ ছিল।

নামিবিয়ার প্রধান দুই জাতিগোষ্ঠী হেরেরো এবং নামা-দের অভ্যুত্থান নির্মমভাবে দমন করেছিল জার্মান ঔপনিবেশিক বাহিনী এবং তাদের হাতে মারা গিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। বাকিরা দেশের পূর্বাঞ্চলে মরুভূমিতে পালিয়ে গিয়েছিল। সেখানে অনাহারে তাদের মৃত্যু ঘটে।

যারা প্রাণে বেঁচেছিল, তাদের ঢোকানো হয়েছিল বন্দী শিবিরে, সেখানে তারা ক্রীতদাসের কাজ করত। তাদের মৃত্যু ঘটে ঠাণ্ডায়, অপুষ্টিতে ভুগে, চরম ক্লান্তি, ক্ষুধা আর সহিংসতার শিকার হয়ে।

ঔপনিবেশিক শাসনের শুরুতে জার্মান শাসনাধীন দক্ষিণ পশ্চিম আফ্রিকায় ৮০ হাজার হেরেরো জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ৬৫ হাজার এবং বিশ হাজার নামা গোষ্ঠীর মধ্যে ১০ হাজারেরই মৃত্যু ঘটেছিল বলে অনুমান করা হয়।

জার্মানি ২০১৫ সালে ওই নৃশংসতাকে গণহত্যা হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয় এবং এর ন্যায় বিচার হিসাবে নামিবিয়াকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য চুক্তি করতে আলোচনা শুরু করে।

এই চুক্তি সারা বিশ্বের জন্য একটা নজির সৃষ্টি করবে, কারণ এর আগে কোন সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের অতীত আচরণের জন্য ক্ষতিপূরণের অঙ্ক স্থির করতে তাদের সাবেক উপনিবেশ রাষ্ট্রের সাথে আলোচনাসাপেক্ষে একটা সার্বিক চুক্তি করেনি।

জার্মানি বলেছে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নামিবিয়ার কাছে ক্ষমাও চাইবে। কিন্তু সেই ক্ষমা প্রার্থনার ভাষা কী হবে তা এখনও ঠিক করা হয়নি।

কিন্তু নামিবিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল আর্থিক ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বা ধরণটা কী দাঁড়াবে?

আরও পড়তে পারেন:

কনেসেনট্রেশন ক্যাম্প বা বন্দী শিবিরে নিহতদের গণকবরে লেইডলো পেরিনগান্ডা
ছবির ক্যাপশান, কনেসেনট্রেশন ক্যাম্প বা বন্দী শিবিরে নিহতদের গণকবরে লেইডলো পেরিনগান্ডা

লেইডলো পেরিনগান্ডা, যিনি নিজে হেরেরো সম্প্রদায়ভুক্ত, এই চুক্তি থেকে তারা কী চান তা তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন। তারা চান একটা বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ যা হেরেরোদের গণহত্যা পূববর্তী সমৃদ্ধি ফিরিয়ে দেবে।

জার্মানরা গণহত্যায় এই জাতিগোষ্ঠীকে প্রায় নিশ্চিহ্ণ করে দেবার আগে হেরেরোরা মূলত পশুপালন করতেন, তারা ছিলেন সচ্ছল।

গণহত্যার পর তাদের বেশিরভাগ জমিজমা ভাগাভাগি করে নেয় জার্মান বসতি স্থাপনকারীরা, তারাই এসব জায়গাজমির বেসরকারি মালিক হয়ে বসে।

বর্তমানে হেরেরো এবং নামা গোষ্ঠীর বেশিরভাগ মানুষ বাস করেন হয় পরবর্তীকালে তাদের জন্য বন্টন করে দেয়া একফালি ছোট্ট জমিতে।

তাদেরই বাপদাদার জমি টুকরো টুকরো করে তাদের দেয়া হয়েছিল।

সোয়াকপমুন্ডের ঘিঞ্জি বস্তি
ছবির ক্যাপশান, সোয়াকপমুন্ডের ঘিঞ্জি বস্তির বসিন্দা মূলত নামিবিয়ার হেরেরো সম্প্রদায়ের মানুষ

বাকিরা থাকেন শহরের ঘিঞ্জি অস্থায়ী বস্তিতে। নামিবিয়ার ৪০% মানুষই এখন বস্তির বাসিন্দা।

সোয়াকপমুন্ড সৈকত শহরে অভিজাত এলাকায় ঔপনিবেশিক আমলের বিশাল সুদৃশ্য বাড়িগুলোতে এখনও বাস করেন সেই ঔপনিবেশিক শাসকদের বংশধররা।

আর শহরের আরও উত্তর দিকে কাঠ আর ধাতুর জোড়াতালি দিয়ে তৈরি জীর্ণ চেহারার যেসব বসতবাড়িতে দারিদ্রের ছাপ প্রকট, সেখানে থাকেন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ।

তাদের বাথরুমে টয়লেট ফ্লাশ করার বা পানীয় জলের কোন ব্যবস্থা নেই, তাদের বিদ্যুত নেই," লেইডলো বলছেন।

"এখানে যারা থাকেন - তাদের অনেকেই কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বন্দীদের বংশধর। এটা তাদের প্রতি খুবই অন্যায় আচরণ।''

বন্দী শিবিরে নেয়া হচ্ছে বন্দীদের
ছবির ক্যাপশান, জার্মান শাসনকালে বন্দী শিবিরে (কনসেনট্রেশন ক্যাম্প) রাখা হয় হাজার হাজার হেরেরো ও নামা বন্দীদের

লেইডলো বলেন: "জার্মানির উচিত আমাদের পূর্বপুরুষের যেসব জমি তারা কেড়ে নিয়েছিল, সেগুলোর জন্য দাম পরিশোধ করে দেয়া।"

নামিবিয়ানদের দাবি এবং আশা, জার্মান সরকার একটা ভূমি সংস্কার কর্মসূচির জন্য অর্থ দেবে, যা দিয়ে জার্মান নামিবিয়ান কৃষকদের কাছ থেকে জমি কিনে নিয়ে সেগুলো নামিবিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হেরেরো এবং নামা জনগোষ্ঠীর মানুষকে ফিরিয়ে দেয়া হবে।

নামিবিয়ার কৃষিজমির প্রায় ৭০ শতাংশের মালিক শ্বেতাঙ্গ কৃষকরা - যাদের অধিকাংশই জার্মান নামিবিয়ান।

নামিবিয়ার পক্ষে আলোচনাকারী দলের প্রধান ড. জেড এঙ্গাভিরু বলছেন - জার্মানি "স্বীকার করেছে যে আমাদের সমাজ পুর্নগঠনে তাদের সহায়তা করা উচিত" এবং যারা তাদের জমি বিক্রি করতে ইচ্ছুক, সার্বিক চুক্তির অংশ হিসাবে তাদের কাছ থেকে আমাদের জমি কিনে নেবার অর্থ দিতে তারা সম্মত হয়েছে।

তবে মি. এঙ্গাভিরু বলেছেন: "শুধু আমাদের জমির সমস্যা জার্মানি সমাধান করে দিলেই যে দায়মুক্তি ঘটবে সেটা ভাবা বোকামি হবে। কারণ শুধু জার্মানির ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ই যে আমরা ভূমিহীন হয়েছি তা নয়।"

প্রধান আলোচক জেড এঙ্গোভিরু
ছবির ক্যাপশান, প্রধান আলোচক জেড এঙ্গোভিরু

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি তাদের এই উপনিবেশ হারানোর পর বহু শ্বেতাঙ্গ বসতিস্থাপনকারী নামিবিয়ায় এসেছে। পরবর্তীকালে দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা শাসন করেছে।

মি. এঙ্গাভিরু বলছেন জার্মানি "ভুলের প্রতিকার" শব্দটা ব্যবহার করতে অনাগ্রহী, তবে নামিবিয়ার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন এবং পানি লবণ-মুক্ত করার বিভিন্ন প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।

আলোচনার এই পর্যায়ে ক্ষতি বাবদ কোন অর্থমূল্যের উল্লেখ করা তিনি সমীচিন মনে করছেন না।

জার্মানিও আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু বলতে অস্বীকার করেছে।

তবে ছয় বছর ধরে চলা এই আলোচনায় কোন নিষ্পত্তি নাা হওয়ায় লেইডলোর মত হেরেরো ও নামা সম্প্রদায়ের মানুষ অধৈর্য হয়ে পড়ছেন।

তিনি বলছেন জার্মান সরকারের উচিত হেরেরো এবং নামা গোষ্ঠীর নেতাদের এই আলোচনায় অর্ন্তভুক্ত করা।

Short presentational grey line
১৯০৪ সালের যুদ্ধে জার্মান মেশিনগান
ছবির ক্যাপশান, ১৯০৪ সালে জার্মানির ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল হেরেরো জনগোষ্ঠী, কিন্তু ওয়াটারবার্গের লড়াইয়ে জার্মানরা তাদের বিদ্রোহ গুঁড়িয়ে দেয়

জার্মানির ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯০৪ সালে হেরেরো জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহ জার্মান শাসকরা কঠোরভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল।

হেরেরো জনগোষ্ঠীর প্রধান ভেকুই রুকরো জার্মানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করে আমেরিকান আদালতে মামলা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি।

হেরেরো গোষ্ঠীর আশংকা দুই সরকারের মধ্যে একটা চুক্তি হলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ভাগে হয়ত তার সামান্য অংশই জুটবে, লাভবান হবে বর্তমানে নামিবিয়ার বৃহত্তম জনগোষ্ঠী ওভাম্বো, ওই গণহত্যার আঁচ যাদের গায়ে কখনই লাগেনি।

মি. রুকরোর একজন উপদেষ্টা বলেছেন, তাদের আশংকা সরকার এই অর্থ হাতে পেলে তা সরকারের নিজস্ব প্রকল্পে ব্যয় করা হবে যেসব প্রকল্পের জন্য তাদের হাতে অর্থ নেই। তবে সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, জার্মান সরকার যে অর্থ দেবে তা ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের হাতেই পরিচালনার জন্য তুলে দেয়া হবে।

১৯০৪ সালে শেকল দিয়ে বাঁধা হেরেরো বন্দীরা
ছবির ক্যাপশান, ১৯০৪ সালে শেকল দিয়ে বাঁধা হেরেরো বন্দীরা

তবে জার্মান-নামিবিয়ান শিক্ষাবিদ হেনিং মেলবার, যিনি এই আলোচনার প্রেক্ষাপট নিয়ে গবেষণা করেছেন, তিনি বলছেন ইউরোপের অন্যান্য ঔপনিবেশিক শাসক দেশগুলো এই আলোচনা নিয়ে জার্মানির কাছে ব্যক্তিগত পর্যায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে নামিবিয়ার সাথে তাদের একটা সফল চুক্তি হলে আফ্রিকা, এশিয়া সহ বিশ্বের যেসব দেশে ঔপনিবেশিক শাসকরা অতীতে রাজত্ব করেছে, তাদের দিক থেকে দাবিদাওয়ার একটা স্রোত শুরু হবে।

আফ্রিকায় জার্মানির আরেকটি সাবেক উপনিবেশ তানজানিয়া ( ঔপনিবেশিক নাম টাঙ্গানাইকা) ইতোমধ্যেই জার্মানিকে তাদের দেশে চালানো অতীত নৃশংসতার মাশুল দেবার দাবি তুলেছে। লাইনে আছে সম্ভাব্য আরও অনেক দেশ।

মি. মেলবার বলছেন: "আমার ধারণা জার্মানি তাদের অতীত ভূমিকার মূল্য হিসাবে একটা অঙ্ক ধরে দিতে রাজি হবে, যদি তার বিনিময়ে ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়ে চিরতরের জন্য যবনিকা টানা যায়।"

তবে রাজনীতির খেলায় শেষ পর্যন্ত নামিবিয়া কী হাতে পায় আর সোয়াকপমুন্ডের ঘিঞ্জি বস্তির যেসব হেরেরো বাসিন্দা এখনও ন্যূনতম বেতনে জার্মান বংশধরের জন্য দিনমজুরি খেটে দিন গুজরান করে, তাদের ভাগ্য এর ফলে কতটা বদলায়, তার ওপরই নির্ভর করবে ইতিহাসের এই অধ্যায়কে অর্থের বিনিময়ে চাপা দেবার প্রক্রিয়া দীর্ঘ মেয়াদে কতটা কার্যকর হবে।