ইতিহাসের সাক্ষী: কাযাখাস্তানের শেষ যাযাবর পশুপালক

নাযিল খানের স্মরণে ভোজসভায় আসা আত্মীয়-পরিজন
ছবির ক্যাপশান, নাযিল খানের স্মরণে ভোজসভায় আসা আত্মীয়-পরিজন
Published

কাযাখাস্তানের জনবিরল বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে থাকতেন যে কাযাখ পশুপালকরা, রুশ বিপ্লবের পর তারা পালিয়ে গিয়েছিলেন চীনে। কারণ বিপ্লবের পর লেনিন নাকি ঘোষণা করেছিলেন যে যাযাবর পশুপালকদেরও সমবায় খামারে স্থায়ীভাবে থাকতে হবে। ১৯২০ এর দশকে পিতৃপুরুষের ভূমি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া কাযাখ নারীদের একজন ছিলেন নাযিল খা

নাযিল খান পরবর্তীকালে আবার কাযাখাস্তানে ফিরে আসেন। একশো বছর বয়সে যখন তিনি মারা যান, তখন তিনি বিশাল এক পরিবারের প্রধান।

তার মৃত্যুর পর পরিবার স্বজনরা মিলিত হয়েছিলেন এক ভোজসভায়।

এই উৎসবে কয়েকশ আত্মীয়-স্বজন আর মেহমানকে আপ্যায়নের জন্য জবাই করা হয়েছিল একটি ঘোড়া এবং চারটি ভেড়া।

নাযিল খানের পরিবারের এক সদস্য উলান সেখানে অতিথিদের আপ্যায়ন করছিলেন।

"আসুন, আসুন, দয়া করে বসুন। আমার নাম উলান। আমরা আমাদের দাদীর জীবন স্মরণ করছি। গত বছর যখন তিনি মারা যান, তখন তার বয়স হয়েছিল ১০০ বছর‍।"

অতিথি আপ্যায়নের ফাঁকে ফাঁকে উলান বর্ণনা করছিলেন তার দাদী নাযিল খানের জীবন কাহিনী।

"নাযিল খানের জন্ম হয়েছিল এখানে, ঠিক এই জায়গাটায়। কিন্তু সোভিয়েতরা যখন ক্ষমতায় আসলো, তখন তার পরিবারকে সীমান্ত পেরিয়ে চীনে পালাতে হয়েছিল। এটা ১৯২৮ সালের কথা বলছি।"

"ওদের কেন পালাতে হয়েছিল? তখনো পর্যন্ত কোন রুশ আসলে কাযাখাস্তানে আসেনি। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে সোভিয়েতরা সবাইকে কুকুরের মাংস খেতে বাধ্য করবে, আমাদেরকে বলবে আমাদের মুসলিম ধর্মবিশ্বাস পরিত্যাগ করতে।"

যাযাবর কাযাখ পশুপালকদের পালিয়ে যেতে হয়েছিল চীনে
ছবির ক্যাপশান, যাযাবর কাযাখ পশুপালকদের পালিয়ে যেতে হয়েছিল চীনে

এরপর কাযাখ পশুপালকদের কাছে খবর আসলো যে তাদের সব পশুর পাল কেড়ে নেয়া হবে। রুশ বিপ্লবের নেতা লেনিন নাকি সেরকম নির্দেশই জারি করেছেন।

এসব শুনে নাযিল খানের পরিবার তখনই পালানোর সিদ্ধান্ত নিল।

নাযিল খান যে রাতে পালিয়ে এসেছিলেন, সেই রাতের কথা তিনি বর্ণনা করেছিলেন পরবর্তীকালে তার বংশধরদের কাছে।

উলান জানান, নাযিল খান তখন খুবই ছোট। তার বাবা তাকে ঘোড়ার পিঠে সামনে বসিয়ে রওনা দিলেন। তারা তাদের পশুর পাল নিয়ে রাতে নদী পাড়ি দিলেন। চুপিচুপি রাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে গেলেন চীনে।

সীমান্তে তখন রেড আর্মির প্রহরা বসেছে। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা চীনের পশ্চিম প্রান্তের শিনজিয়াং প্রদেশে ঢুকলেন।

উলান জানান, তার দাদী নাযিল খান তাকে বলেছিলেন কীভাবে তাদের সব কিছু ফেলে পালিয়ে আসতে হয়েছিল।

"তাদের অল্প কিছু মূল্যবান সোনা এবং রূপার অলংকার ছিল। তবে তাদের বেশিরভাগ জিনিসপত্র ছিল লোহা এবং তামার। রান্নার হাঁড়িকুড়ি। কার্পেট। তারা এগুলো তাদের শীতকালীন আস্তানায় মাটির নীচে লুকিয়ে রেখেছিল। ভেবেছিল একদিন তারা আবার এখানে ফিরে আসবে। যখন তাদের জীবন আর তাদের ধর্মবিশ্বাসের জন্য কোন হুমকি থাকবে না। সেই সময় কিন্তু একটা চা খাওয়ার সামান্য পাত্র পর্যন্ত তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।"

যেসব যাযাবর পশুপালক কাযাখাস্তানে রয়ে গিয়েছিল, তাদের সমবায় খামারে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এটি তাদের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় নিয়ে এসেছিল।

১৯৩০ এর দশকে ইউক্রেনে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সেটির কথা হয়তো অনেকে জানেন। কিন্তু কাযাখাস্তানেও যে একই রকম দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সেটির কথা খুব লোকই শুনেছে। কারণ এই যাযাবর পশুপালকরা থাকতো বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে, বাস করতো তাবুতে। তারা পেছনে কোন শূন্য গ্রাম ফেলে যায়নি, কোন বাড়ীঘর রেখে যায়নি। কোন নিশানাই আসলে ছিল না। আরেকটি কারণও ছিল। কাযাখরা তখন লিখতে বা পড়তে জানতো না। কাজেই কোন লিখিত বিবরণও খুবই বিরল। তাদের ইতিহাসের গল্প তারা বলে গেছে তাদের সন্তানদের কাছে। সেই সন্তানরা সেই একই কাহিনি বলে গেছে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে।

অনেক কাযাখ পশুপালক চীনে থেকে যান, মিশে যান স্থানীয় উইঘুর মুসলিমদের সঙ্গে
ছবির ক্যাপশান, অনেক কাযাখ পশুপালক চীনে থেকে যান, মিশে যান স্থানীয় উইঘুর মুসলিমদের সঙ্গে

উলান তাদের সম্প্রদায়ের প্রবীনদের কাছ থেকে শুনেছিলেন এই দুর্ভিক্ষের কাহিনী।

"আমাদের প্রবীন লোকদের কাছ থেকে আমি এসব কথা শুনেছি। তারা এই জায়গাটায় থাকতেন। তাদের একজন আমাকে বলেছিলেন, যখন এরকম অস্থিরতা আর দুর্ভিক্ষ চলছে, তখন তার বাবা তাকে নিয়ে শিকারে বেরিয়েছিলেন। যখন তারা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছালেন, যেখান থেকে দেখেছিলেন দূরে এক পাহাড়ের একটা অংশ তুষারে। তখন তিনি বেশ অবাক হয়েছিলেন, গ্রীস্মকালে কেন তুষার পড়ছে? কিন্তু তার বাবা সেখান থেকে ফিরে আসলেন, তিনি সেই জায়গাটা সবসময় এড়িয়ে যেতেন।"

"পরে যখন তিনি বড় হয়েছিলেন, তখন সেই জায়গাটা আমরা দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে আসলে ছিল মানুষের হাড়গোড়, একজনের ওপর ওপর আরেকজনের হাড়গোড়ের স্তুপ। রেড আর্মির লোকজন সেখানে গুলি করে লোকজনকে মেরেছিল। তারপর সেসব দেহ সেখানেই ফেলে রেখেছিল। স্ট্যালিন যতদিন বেঁচেছিল, এদের দেহাবশেষও সেখানে এভাবে পড়েছিল। একেবারে সাদা, তুষারের মতো সাদা। সেখানে ছেলে, মেয়ে, বৃদ্ধ, পুরুষ, নারী, পশু—সবাইকে গুলি করে মারা হয়েছিল।"

নাযিল খান এবং তার পরিবার শিনজিয়াং এ নতুন করে জীবন শুরু করলেন। সেখানে তারা তাদের পশুর পাল, ঘোড়া, উট এবং ভেড়া নিয়ে যাযাবরের মতই জীবন যাপন করতেন, যেমনটি তাদের পূর্বপুরুষরা করেছেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। স্থানীয় উইঘুর এবং মধ্য এশিয়ার অন্যান্য জাতির মানুষের সঙ্গে তারা সহজভাবে মিশে গিয়েছিলেন।

১১ বছর বয়সে নাযিল খানের বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেল। ১৫ বছর বয়সে তার বিয়ে হলো। তিনি তার স্বামীর জন্য রান্না করতেন, দুধ দুইতেন, কাপড় বুনতেন।

তাদের ১৩ টি সন্তান হয়েছিল। নাযিল খান ছিলেন বেশ শক্তসমর্থ, অক্লান্ত পরিশ্রম করতে পারতেন। তবে তার বেশিরভাগ সন্তান মারা গিয়েছিল এক টাইফয়েডের মহামারিতে। শিনজিয়াং ছিল খুবই দরিদ্র এক অঞ্চল। সেই সময় সেখানে খুব রোগের প্রকোপ ছিল।

তারপর নাযিল খানের বয়স যখন ৩৫, তখন সুযোগ আসলো কাযাখাস্তানে ফিরে যাওয়ার।

রুশ বিপ্লবের পর পশুপালকদের যাযাবরের জীবন ছেড়ে সমবায় খামারে স্থায়ী হতে বলা হয়েছিল।
ছবির ক্যাপশান, রুশ বিপ্লবের পর পশুপালকদের যাযাবরের জীবন ছেড়ে সমবায় খামারে স্থায়ী হতে বলা হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্ট্যালিন কাযাখাস্তানে জনবসতি গড়ে তোলার এক বিরাট প্রকল্প হাতে নিলেন। তিনি এবং চীনের নেতা চেয়ারম্যান মাও সিদ্ধান্ত নিলেন, কাযাখদের এবার তাদের নিজ ভূমিতে ফেরত পাঠানোর সময় এসেছে।

উলান জানান, তখন তার দাদী কাযাখাস্তানে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন।

"ওরা বললো, তোমরা ফিরে আসো। আমরা তোমাদের নতুন কাগজপত্র দেব। কেন তোমরা এখান থেকে চলে গিয়েছিলে, সেকথা কেউ জানতে চাইবে না। ওরা বললো, তোমরা ফিরে আসো, এখানে কাজ করো, এখানেই তোমাদের সন্তানদের বড় কর। যখন ১৯২০ এর দশকের শেষে কাযাখরা সীমান্ত পেরিয়ে চলে গিয়েছিল, তখন তাদের চীনের কিছু সরকারি কাগজপত্র দেয়া হয়েছিল। বলা হলো, যাদের কাছে সেসব কাগজ আছে, তারা ফিরে যেতে পারবে । কিন্তু যাদের নেই, বা যারা এসব কাগজ ফেলে দিয়েছে, তারা ফিরে যেতে পারবে না। চীনে যেসব কাযাখ ছিল, তাদের কেউ আসলে এসব কাগজ সংরক্ষণ করেনি।"

শিনজিয়াং এ থেকে যাওয়া এই কাযাখরাই এখন সংবাদ শিরোণাম হয়েছে। কারণ উইঘুর মুসলিমদের মতো তাদেরকেও চীনের রাষ্ট্রীয় বন্দীশিবিরে আটকে রাখা হয়েছে।

তবে নাযিল খান নিরাপদে কাযাখাস্তানের ফিরে আসলেন। তখন তিনি মধ্যবয়সী। প্রায় একশো সদস্যের বিরাট এক পরিবারের প্রধান তিনি।

উলান জানান, প্রতিটি শিশুকে নাযিল খান বলেছিলেন তার কাহিনী।

"আমার দাদীমার স্মরণ শক্তি ছিল খুবই ভালো। তিনি ছিলেন খুবই সংস্কৃতিবান। তিনি যে কত কী জানতেন। তিনি ভালো গান গাইতেন। তিনি অনেক কবিতা বলতে পারতেন। তার ভাষা ছিল খুবই ভালো। সবকিছুতে তিনি আগ্রহী ছিলেন। পুরো পৃথিবীকে তিনি দেখতেন দু চোখ মেলে। আমরা এখন যেভাবে কথা বলি, আমাদের কথা-বার্তা- সবকিছুই কিন্তু আমরা আমাদের দাদীমার কাছ থেকে শিখেছি। যখন তিনি কথা বলতেন, মনে হতো তিনি যেন সুতোয় মালা গেঁথে চলেছেন। তার সঙ্গে আমাদের কোন তুলনাই চলে না।"

"আমার মনে আছে একবার তিনি আমাকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন তার বড় ছেলের কাছে। সেই ছেলে থাকতো টালডো-কোরগান অঞ্চলে। সেই এলাকাটার নাম ছিল আকসু। এখান থেকে প্রায় তিনশো কিলোমিটার দূরে। আমার বয়স তখন ৪ বছর। আমরা বাস ধরলাম…. এটা ছিল এক শহর থেকে আরেক শহরে যায় এরকম একটা দূরপাল্লার বাস। পথে একটি বিভিন্ন জায়গায় থামছিল। তখন দাদীমা আমাকে শাশলিক, কাবাব- এরকম নানা খাবার কিনে দিচ্ছিল। সেই প্রথম আমি গাড়িতে চড়েছিলাম। আমার যে কি খুশি লাগছিল বাসে চড়তে পেরে। আমার ছোট দুনিয়া ছেড়ে বাইরে কোথাও যেতে পেরে। সেই স্মৃতি আমার সারাজীবন মনে থাকবে।"

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন: