সিনহা হত্যা: পুলিশ বাহিনী কি নিজেদের ভাবমূর্তির প্রশ্নে উদ্বিগ্ন

সিনহা হত্যা, পুলিশ, কক্সবাজার, বাংলাদেশ।
ছবির ক্যাপশান, পুলিশ বলেছে, সিনহা মো: রাশেদ হত্যার ঘটনা কোন ব্যক্তির হতে পারে, এর দায় কোন প্রতিষ্ঠানের নয়।
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

বাংলাদেশে পুলিশের কর্মকর্তারা বলেছেন, কক্সবাজারে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো: রাশেদের হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলা হচ্ছে। সেজন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের অ্যাসোসিয়েশন বিবৃতি দিয়ে বাহিনীটির অবস্থান তুলে ধরেছে বলে কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন।

পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতি দিয়ে বলেছে, স্বার্থন্বেষী মহল ঘটনাটিকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, ক্রসফায়ার, গুমসহ নানা ধরণের অভিযোগ নিয়ে অনেক মানুষ এখন পুলিশের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

গত ৩১শে জুলাই পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো: রাশেদ নিহত হয়।

পুলিশের গুলিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তার হত্যার ঘটনার পর ক্রসফায়ার এবং গুমের ইস্যু নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হচ্ছে।

সেই প্রেক্ষাপটে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটির দুই সপ্তাহ পর পুলিশ কর্মকর্তাদের সমিতি যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম এবং কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। এটিকে রাষ্ট্রের দু'টি পেশাদার বাহিনীকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টা বলেও পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন উল্লেখ করেছে।

সিনহা হত্যা, পুলিশ, কক্সবাজার, বাংলাদেশ।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের বার্তা বিভাগের প্রধান মোস্তফা ফিরোজ মনে করেন, অনেক মানুষ পুলিশের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রকাশ করছে। এর পিছনে সংগঠিত কোন বিষয় নেই বলে তিনি মনে করেন।

"এ ধরণের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবে কোন কোন মহল ক্ষুব্ধ হয়। আর পুলিশের ব্যাপারেতো অনেকের দীঘদিন থেকে ক্ষোভ আছে। বিশেষ করে ক্রসফায়ার, গুম-হত্যাসহ নানান রকম ঘটনায় এবং চাঁদাবাজি-এসব কারণে একটা ক্ষোভ আছে। সেই ক্ষোভটাকে হয়তো সিনহার ঘটনার পর অনেকে পুলিশের ব্যাপারে অনেক বেশি আক্রমণাত্নক বক্তব্য দিচ্ছে ফেসবুকে বা নানান মাধ্যমে।"

"আরেকটা দিক হলো যে, পুলিশ আশ্বস্ত করেছে যে আর ক্রসফায়ার হবে না। এই কথাটা যদি পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হতো, তাহলে কনফিউশনটা কিন্তু আরও দূর হতো। শুধুমাত্র একটা সংস্থার পক্ষ থেকে যখন স্টেটমেন্ট আসলো যে পুলিশ আশ্বস্ত করেছে এটিই শেষ ঘটনা। তখন কিন্তু এক ধরণের কনফিউশন থেকে গেলো।"

কক্সবাজারে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটির পর পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর প্রধানরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলেন।

এরপর আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছিল, পুলিশ প্রধান আশ্বস্ত করেছেন যে এটাই শেষ ঘটনা।

এদিকে, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো: রাশেদকে হত্যার মামলায় অভিযুক্ত টেকনাফ থানা পুলিশের বরখাস্ত হওয়া ওসি টেলিফোনে আইনজীবী বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যে কথা বলেছেন, তা সামাজিক মাধ্যমে ফাঁস হয়েছে।

বিভিন্ন টেলিভিশনেও তা প্রচার করা হয়েছে।

এই বিষয়টি পুলিশ বাহিনীকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে বলে এর কর্মকর্তাদের অনেকে মনে করেন।

এছাড়া ক্রসফায়ার এবং গুমের বিভিন্ন ঘাটনাতেও পুলিশের বিরুদ্ধেই আলোচনা হচ্ছে।

কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকতের পাশ দিয়ে যাওয়া মেরিন ড্রাইভে গত ৩১শে জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন সিনহা মো. রাশেদ খান
ছবির ক্যাপশান, কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকতের পাশ দিয়ে যাওয়া মেরিন ড্রাইভে গত ৩১শে জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন সিনহা মো. রাশেদ খান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবায়দা নাসরিন মনে করেন, মানুষ এক ধরণের অনাস্থা থেকে বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরছে।

"যেহেতু আমাদের দেশে বা বিভিন্ন দেশে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পুলিশের দায়িত্বের একটা অংশ। সেই জায়গা থেকে যখন একজন পুলিশ সদস্য খুনের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন, তখন মানুষের মাঝে আস্থাহীনতার জায়গা তৈরি হয়। সেটা বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়তো আছে, এখনকার ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই আস্থাহীনতা আরও প্রকট হয়েছে।"

তিনি আরও বলেছেন, "আমার মনে হয়, সেটা পুলিশ হয়তো বুঝতে পেরেছে। সেই জায়গা থেকেই পুলিশ বাহিনী তাদের অবস্থানটা এবং ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ না থাকার বিষয়টাকে ওনারা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।"

বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুলিশ কর্মকর্তাদের অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে প্রশ্নের মুখে পড়া ভাবমূর্তি উন্নত করার চেষ্টা থেকে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

সেই বিবৃতিতে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে জঙ্গী দমন এবং সর্বশেষ করোনাভাইরাস মহামারিতে পুলিশের অবদানের বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বলেছেন, "আমরা যেটা স্পষ্ট বলতে চাচ্ছি, আমাদের মাননীয় আইজি মহোদয় এবং মাননীয় সেনা প্রধান মহোদয় বলেছেন যে, ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। আমরা সেটাই বলতে চাই যে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে, তার জন্য যদি কোন ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হয়, সেটা তার ব্যাপার। কিন্তু আমাদের সংগঠন বা বাংলাদেশ পুলিশ তা ওোন করে না।"

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেছেন, "যেহেতু আমরা বলেছি, ওটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, সেভাবে যদি সবাই দেখে তাহলে কারও প্রতি দোষারোপটা আসে না।আর আমরা সকলে একসাথে মিলেমিশে কাজ করতে চাই।"

তবে বিশ্লেষকরা বলেছেন, ক্রসফায়ারসহ যে ইস্যুগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে, সেই সমস্যা সমাধানে এখন পুলিশের আন্তরিকতা দেখানো উচিত।