ব্রিটেনের ওলট-পালট রাজনীতি নিয়ে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর

প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন কমন্স সভায় ডেসপ্যাচ বক্সের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন
ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সাধারণ নির্বাচন ডাকার হুমকি দিয়েছেন এবং তার দলের ২১জন এমপিকে বরখাস্ত করেছেন।
Published

ব্রিটিশ রাজনীতিকে পুরো উল্টে দেওয়া হয়েছে। আবার।

ব্রেক্সিট প্রশ্নে কমন্স সভার কার্যসূচির নিয়ন্ত্রণ সরকার হারানোর পর প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন মেয়াদ পুরো হবার আগেই সাধারণ নির্বাচন ডাকার হুমকি দিয়েছেন।

মাত্র এক সপ্তাহ আগে সরকার বলেছিল আগামী দুমাসের মধ্যে বেশ কয়েক সপ্তাহ সংসদ স্থগিত করে দেওয়া হবে - যে পদক্ষেপকে বিরোধীরা ''ক্যু'' বা ''অভ্যুত্থান'' বলে দাবি করেছিল।

কিন্তু এখন সংসদ প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপের ওপর থাবা বসিয়েছে। এমপিরা হাউস অফ কমন্সের কার্যসূচির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার পক্ষে ভোট দিয়েছে। এর ফলে ''নো-ডিল ব্রেক্সিট'' - অর্থাৎ বাণিজ্য ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত একটি চুক্তি ছাড়া যুক্তরাজ্যের ইউরোপিয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া বন্ধ করতে তারা একটি আইন পাশ করাতে চেষ্টা করবে।

এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী জনসন সাধারণ নির্বাচন ডাকার হুমকি দিয়েছেন এবং তার নিজের দল কনজারভেটিভ পার্টি থেকে ২১জন এমপিকে বহিষ্কার করেছেন।

তাহলে এখন কী হচ্ছে এবং আগামীতে কী ঘটতে পারে?

সরকার কোন্ ভোটাভুটিতে হেরে গেল?

সরকার ব্রেক্সিট সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভোটে হেরেছে। সরকারের পক্ষে ভোট পড়েছে ৩০১ আর বিপক্ষে ৩২৮।

এই ভোটে জেতার ফলে এমপিরা কমন্স সভার কার্যসূচির নিয়ন্ত্রণ নেবেন যাতে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট ঠেকানোর জন্য তারা কার্যত একটি আইন পাশ করাতে পারেন।

বিবিসি বাংলায় পড়তে পারেন:

সংসদের সামনে যুক্তরাজ্য এবং ইইউর পতাকা
ছবির ক্যাপশান, পার্লামেন্ট ব্রেক্সিট বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে

যুক্তরাজ্যের ইউরোপিয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য নির্ধারিত তারিখ এখন ৩১শে অক্টোবর। কিন্তু বাণিজ্য, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং অভিবাসনের মত বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাজ্য এবং ইইউ-র মধ্যে ভবিষ্যত সম্পর্ক কী হবে সেটা নিয়ে কোন চুক্তি হয়নি। বহু মানুষ এই কারণে উদ্বিগ্ন যে নতুন একটি চুক্তি সম্পাদনের জন্য হাতে একেবারেই সময় নেই।

সরকারের হেরে যাবার অর্থ হল এই চুক্তি-বিহীন ব্রেক্সিট ঠেকাতে সংসদে বিতর্ক হবে। অনেক এমপিই আশংকা করেন চুক্তি-বিহীন ব্রেক্সিট হলে তা ব্রিটিশ অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং যুক্তরাজ্যে খাদ্য ও ওষুধের সরবরাহ ব্যাহত হবে।

আর এই বিলের অর্থ হবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাজ্য যদি ইইউ-র সঙ্গে একটা ব্রেক্সিট চুক্তিতে সম্মত না হতে পারে, তাহলে ইউকে-র ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে যাবার তারিখ ২০২০ সালের ৩১শে জানুয়ারি পর্যন্ত পেছানো হবে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া কী?

ভোটের পরপরই প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন এই বিল পাশ হলে তিনি সাধারণ নির্বাচন ডাকবেন।

তিনি বলছেন সমালোচকরা চুক্তি-বিহীন ব্রেক্সিটের ক্ষতিকর প্রভাবটা অনেক বাড়িয়ে দেখাচ্ছেন এবং তিনি দাবি করেছেন একটা ব্যবস্থা নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছনর সময় ও সুযোগ এখনও আছে।

প্রধানমন্ত্রী এমপিদের বলেছেন এধরনের একটা বিল পাশ হলে ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে দেন-দরবারের ''নিয়ন্ত্রণ ইইউ-র হাতে তুলে দেয়া'' হবে এবং এর ফলে ''আরও দ্বিধা, আরও বিলম্ব, আরও বিভ্রান্তির'' সৃষ্টি হবে।

যুক্তরাজ্যের সাউথহ্যম্পটনে হন্ডা গাড়ির কারখানায় কয়েকশ হন্ডা তৈরি করা হয়েছে ইইউতে রপ্তানির জন্য।
ছবির ক্যাপশান, ব্রেক্সিট নিয়ে বর্তমানের লড়াই কোন চুক্তি ছাড়াই যুক্তরাজ্যের ইইউ ছাড়া নিয়ে, যে চুক্তির মধ্যে আমদানি, রপ্তানিসহ ইইউ-র সঙ্গে ভবিষ্যত সম্পর্কের বিষয়গুলো থাকবে।

সরকার কনজারভেটিভ পার্টি থেকে ২১ জন এমপিকে বরখাস্ত করেছে, যে ২১জন এমপি এই গুরুত্বপূর্ণ ভোটে বিরোধীদের সমর্থন করেছে।

যাদের বরখাস্ত করা হয়েছে তাদের মধ্যে দলের খুবই শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন সদস্য রয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন সার নিকোলাস সোমস্, যিনি উইনস্টন চার্চিলের নাতি। বরিস জনসন যেসব রাজনৈতিক নেতার আদর্শে অনুপ্রাণিত তাদের একজন উইনস্টন চার্চিল।

তাহলে সাধারণ নির্বাচন কি হবে?

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর এখন চাইলেই তার ইচ্ছামত সাধারণ নির্বাচন ডাকার ক্ষমতা নেই।

এখন, চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট ঠেকানোর জন্য আইন যদি পাশ হয়, তাহলে নির্বাচন ডাকা যাবে কিনা সে বিষয়টা কমন্স সভায় সরকারকে ভোটের জন্য পেশ করতে হবে।

আইনত, সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হলে দুই-তৃতীয়াংশ এমপিকে এর পক্ষে ভোট দিতে হবে।

ব্যালট পেপার গোনা হচ্ছে
ছবির ক্যাপশান, ইউকে হয়ত শিগগিরি আরেকটি সাধারণ নির্বাচনের জন্য ব্যালটপত্র গুনবে

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির পক্ষে একা সংসদে এই সংখ্যা অর্জন করা সম্ভব হবে না। এই দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা একমাত্র সম্ভব প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির সমর্থন পেলে। অর্থাৎ লেবারের সমর্থন ছাড়া নির্বাচন ডাকার পক্ষে যথেষ্ট ভেঅট পাওয়া সম্ভব হবে না।

সাধারণ নির্বাচন ডাকার বিষয়ে লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন: ''ঠিক আছে। কিন্তু নো-ডিল ব্রেক্সিটের সম্ভাবনা ঠেকানোর জন্য আগে সংসদে বিল তো পাশ হোক্।''

বুধবার (আজ) কমন্স সভার অধিবেশনে এই বিলটি নিয়ে বিতর্ক হবে এবং নির্বাচন নিয়ে ভোটাভুটি হতে পারে এর ঠিক পরপরই।

কিন্তু সরকার তো সংসদ স্থগিত করে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?

গত সপ্তাহে সরকার বলেছিল সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর মাসে প্রায় পাঁচ সপ্তাহের জন্য সরকার সংসদ বন্ধ করে দেবে।

শীর্ষ বিরোধী এমপিরা এই সিদ্ধান্তকে একটা ''অভ্যুত্থান'' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন জোর দিয়ে বলেছিলেন তিনি শুধু নতুন কিছু আইন উত্থাপনের জন্য এই সংসদ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন।

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসরনে বসে তাঁর ভাষণ দিচ্ছেন।
ছবির ক্যাপশান, সরকার বলেছিল রানির ভাষণের জন্যই সংসদ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

সমালোচকরা দাবি করেছেন সরকার সংসদের কার্যদিবস সীমিত রাখার জন্যই এই পদক্ষেপ নিয়েছে যাতে চুক্তি-বিহীন ব্রেক্সিট ঠেকাতে সংসদে ভোটদানের সুযোগ না পাওয়া যায়। সেটাই যদি সরকারের পরিকল্পনা হয়ে থাকে, তাহলে তা ব্যর্থ হয়েছে, কারণ এমপিরা এখন সেই প্রক্রিয়াই হাতে নিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সংসদ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত, যার আনুষ্ঠানিক নাম "proroguing" তার সঙ্গে ব্রেক্সিটের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু সংসদের অধিবেশনের উদ্বোধন করে রানি যে ভাষণ দেন তার জন্য এটা প্রয়োজন।

এই ভাষণে সংসদে আগামী বছরে সরকার যেসব নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে রানি সেগুলো পাঠ করে শোনান।

ব্রেক্সিটের জন্য এর অর্থ কী?

চুক্তি ছাড়া ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাবার সম্ভাবনা হয়ত কমেছে, কিন্তু এর ফলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা হয়ত বেড়ে গেছে। T

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হয় সেটা ভিন্ন বিষয়।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ইইউ এবং ইউকে পতাকা নিয়ে এক নারী
ছবির ক্যাপশান, কিছু কিছু অন্দোলনকারী ব্রেক্সিট রুখতে বদ্ধপরিকর

বিবিসির রাজনৈতিক সম্পাদক লরা কুয়্যন্সবার্গ বলছেন: প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ কেউ কেউ মনে করেন এই সঙ্কট একটা সমস্যা সমাধানের সুযোগ করে দিতে পারে। সেটা হল ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়নের যে কাজটা এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে সেটা শেষ করা। টোরি পার্টি এখন দেখাবে ব্রেক্সিট নিয়ে এ পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা তারাই বহন করছে।''

''রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা এখন এমনই উল্টা-পাল্টা হয়ে গেছে যে, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেবার পর সংসদে প্রথম ভোটে হারলেও কিছু সমর্থক সেটাকে তার সাফল্য হিসেবে দেখছে।''

এই সর্বশেষ সংকট যদি একটি নির্বাচন ঘটিয়ে ফেলে, তাহলে বরিস জনসন এবং তার কনজারভেটিভ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে, এবং কোন চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট তার হাতের নাগালে আসবে।

ব্রেক্সিট-পন্থী সমর্থক
ছবির ক্যাপশান, আবার কিছু কিছু ব্রেক্সিট সমর্থক ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়া দেখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ

কিন্তু জেরেমি করিবনের লেবার পার্টি যদি বর্তমানের জনমত জরিপকে ভুল প্রমাণিত করে এবং নির্বাচনে জেতে, ব্রিটেন তখন একেবারে ভিন্ন পথে হাঁটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এছাড়াও কোন দলই অথবা কোনো জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না তার খুবই বড়রকম সম্ভাবনা রয়েছে। সেটা হলে ব্রেক্সিট প্রশ্নে যুক্তরাজ্যে অনিশ্চয়তা গভীর হতে পারে, সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে এবং দেশটির রাজনীতি আরও বেশি বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে।

ব্রেক্সিট বিরোধী ব্রিটিশ বিক্ষোভকারী
ছবির ক্যাপশান, ব্রেক্সিট নিয়ে ব্রিটেনের রাজনীতিতে ঘটে গেছে ওলট পালট

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন: