মধ্যরাতে জেনারেল এরশাদের ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব

জাতীয় পার্টির প্রধান জেনারেল এরশাদ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জাতীয় পার্টির প্রধান জেনারেল এরশাদ।

বাংলাদেশে জাতীয় পার্টির নেতা এবং সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ তার ভাই জি এম কাদেরকে আবারও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করায় দলের ভেতরে বিরোধ নতুন করে মাথা চাড়া দিয়েছে বলে এই দলের নেতাকর্মীদের অনেকে বলেছেন।

দীর্ঘদিন পর শনিবার মধ্যরাতে জেনারেল এরশাদ গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তার অনুপস্থিতিতে মি: কাদের দলের চেয়ারম্যান বা তার উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।

জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের অনেকে বলেছেন, নেতৃত্ব নির্ধারণসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের নেতা বার বার সিদ্ধান্ত বদল করায় তারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন।

বার বার কেন সিদ্ধান্ত বদল?

জেনারেল এরশাদ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে গত পহেলা জানুয়ারি তার ভাই জি এম কাদেরকে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান করার পাশাপাশি নিজের উত্তরসূরি হিসেবেও ঘোষণা করেছিলেন।

কিন্তু সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পর গত ২১শে মার্চ আকস্মিকভাবেই তিনি মি. কাদেরকে কো-চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেন।

এমনকি তখন মি: কাদেরকে সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতার পদ থেকেও সরিয়ে জেনারেল এরশাদ তার স্ত্রী রওশন এরশাদকে সেই পদে বসিয়েছিলেন।

এর কয়েকদিন পরই ৪ঠা এপ্রিল তিনি মি: কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান পদে ফিরিয়ে আনেন।

শনিবার মধ্যরাতে জেনারেল এরশাদ আকস্মিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে মি: কাদেরকে দলের দায়িত্ব দেয়ার কথা ঘোষণা করেন।

জি এম কাদের বলেছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী পার্টির চেয়ারম্যান সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারে যোগদানের ব্যাপারেও জেনারেল এরশাদ একেক সময় একেক কথা বলেছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারে যোগদানের ব্যাপারেও জেনারেল এরশাদ একেক সময় একেক কথা বলেছেন।

তবে দলটির সিনিয়র নেতাদের অনেকে বলেছেন, দলের ভেতরে বিরোধের কারণে সিদ্ধান্ত বার বার বদল হচ্ছে। তারা বলছেন, জেনারেল এরশাদের একক সিদ্ধান্তেই এসব হচ্ছে।

মধ্যরাতে কেন ঘোষণা?

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা এই প্রশ্ন রেখেছেন।

তিনি বলেছেন, "কেন এটা অত রাতে করা হলো এটা আমার বোধগম্য নয়। এরশাদ সাহেবের অনুপস্থিতিতে উনি দায়িত্ব পালন করবেন, এটা তো আগেই ছিল। এখন যেহেতু এরশাদ সাহেব অফিসে যেতে পারেন না এবং সিগনেচার ঠিকমত করতে পারেন না বা আগের সিগনেচারের সাথে মিলে না, সে কারণে হয়তো এই দায়িত্বগুলো তিনি পালন করবেন।"

জাতীয় পার্টিতে বিরোধ

রওশন এরশাদ এবং জি এম কাদেরের মধ্যে বিরোধের কারণে জাতীয় পার্টির নেতা কর্মীদের মাঝেও বিভক্তি আছে বলে দলটির নেতাদের অনেকে জানিয়েছেন।

তারা বলেছেন, মি: কাদেরকে এখন আবার দলের দায়িত্ব দেয়ায় সেই বিরোধ নতুন করে সামনে এসেছে।

দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর জি এম কাদের সংবাদ সম্মেলন করলে সেখানে দলটির সিনিয়র নেতাদের কেউ উপস্থিত ছিলেন না।

তবে মি: কাদের বলেছেন, তাদের দলে বিভক্তি নেই, কিন্তু মতপার্থক্য থাকতে পারে। তিনি উল্লেখ করেছেন, ভিন্নমতের কেউ দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পারলে দল ছেড়ে চলে যেতে পারেন।

"আমার মনে হয়, বিভক্তি বলে যেটা বলা হচ্ছে, তেমন কিছু নেই। মতভেদ প্রত্যেক দলেই থাকে। যারা একমত হতে পারবেন না, তারা হয়তো আলাদা হবেন।"

এমন মন্তব্য করার পর মি: কাদের আবার কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়ে বলেছেন, "কেউ আলাদা হবেন, সেটা আশঙ্কা করছি না। যদি হন, তাহলে জাতীয় পার্টির কোনো ক্ষতি হবে না, এর আগেও দল ছেড়ে অনেকে গেছে জাতীয় পার্টির ক্ষতি হয়নি।"

বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্কট

বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে জেনারেল এরশাদ বার বার সিদ্ধান্ত বদল করায় জাতীয় পার্টি বিভিন্ন সময় বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছে বলে দলটির নেতাদের অনেকে মনে করেন।

জাতীয় পার্টির এমপি অধ্যাপক মাসুদা রশিদ চৌধুরী বলেছেন, দলের নেতৃত্বের ব্যাপারে বার বার সিদ্ধান্ত বদল করায় দল বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছে।

জেনারেল এরশাদের ভাই জি এম কাদের।
ছবির ক্যাপশান, জেনারেল এরশাদের ভাই জি এম কাদের।

"আমরা সত্যি লজ্জিত এবং খারাপ লাগে যে, মানুষ এই নিয়ে কথা বলে। যেহেতু স্যার করছেন সেজন্য আমরা কোনো কমেন্ট করছি না। কারণ তিনি যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন তিনি পার্টির চেয়ারম্যান থাকবেন। সেজন্য আমরা তাকে এবং তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি।"

এরশাদ কি অবসরে যাচ্ছেন?

দীর্ঘ সময় পর জেনারেল এরশাদ যখন গত শনিবার মধ্যরাতে হুইল চেয়ারে করে সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে আসেন, তখন তাকে গুরুতর অসুস্থ দেখা গেছে। তিনি কথাই বলতে পারছিলেন না।

ফলে তিনি অবসরে যাচ্ছেন কিনা, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

জি এম কাদের বলছিলেন, "পরিণত বয়স বলতে যা বুঝায় তিনি সেরকম ৯০ বছর পার করেছেন। আর এখন উনার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। বেশ খারাপ। তবে উনি যতদিন বেঁচে আছেন, উনিই চেয়ারম্যান, উনি যেটা বলবেন তার বাইরে কিছু হবে না।"

দলটির ভবিষ্যৎ

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, পারিবারিক বিরোধ এখন দলেও এসে পড়েছে।

"বেগম রওশন এরশাদের পক্ষে কিছু লোক আছে। আবার জেনারেল এরশাদের পক্ষে যারা, তারা জিএম কাদেরকে উত্তরসূরি হিসেবে দেখতে চায়। সুতরাং পারিবারিক দ্বন্দ্ব পার্টি পর্যন্ত গড়িয়েছে।"

"এরশাদের অনুপস্থিতিতে এই পার্টি ভেঙ্গে যাবে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দলের ভবিষ্যৎ আমি দেখি না।"

তবে জাতীয় পার্টির একাধিক সিনিয়র নেতা বলেছেন, তাদের দলে বিরোধ চরম একটা অবস্থায় যেতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে দল ভাঙ্গার দায় কেউ নিতে চাইবেন না বলে তারা মনে করেন।