সংসদ নির্বাচন: রাজশাহীর নির্বাচনী পরিবেশ: শহরে 'ভালো', বাইরে 'উদ্বেগ'

রাজশাহীতে নির্বাচনী আমেজ।
ছবির ক্যাপশান, রাজশাহীতে নির্বাচনী আমেজ।
    • Author, তাফসীর বাবু
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলগুলো যখন নানাবিধ বাধার কারণে প্রচারণা না চালাতে পারার অভিযোগ তুলছে, তখন রাজশাহীতে এসে দেখা গেল কিছুটা ভিন্ন চিত্র।

এখানে সদর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী সবগুলো দল অনেকটা নির্বিবাদেই তাদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

যদিও সদরের বাইরে অন্তত: ৩টি আসনে পুলিশের গ্রেফতারের কারণে নেতা-কর্মীরা ভীতির মধ্যে আছেন বলে অভিযোগ করছে বিএনপি।

তবে পুলিশ বলছে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না।

পদ্মার কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই রাজশাহী-২ আসন। নদীর পারে গিয়ে দেখা গেল, সকালবেলার বেশ কড়া শীতের মধ্যেও জেলেরা মাছ ধরতে নেমে পড়েছেন।

ভোট নিয়ে তাদের মধ্যে কি বাড়তি কোন উৎসাহ আছে?

আব্দুল আজিজ নামে ষাটোর্দ্ধ এক জেলের সঙ্গে কথা বলে অবশ্য তেমন কোন আগ্রহ দেখা গেলো না।

"ভোট আসছে, দিবো। এই তো। ভোটের সময় সবাইকে দেখি। কিন্তু পরে আর তো আর কাউকে এলাকায় পাই না।"

রাজশাহীতে ভোটের মাঠে জেলে ভোটারদেরও গুরুত্ব আছে।
ছবির ক্যাপশান, রাজশাহীতে ভোটের মাঠে জেলে ভোটারদেরও গুরুত্ব আছে।

কিন্তু ভোটের পরিবেশ কেমন - এমন প্রশ্নে অবশ্য স্বস্তিই ধরা পড়লো আব্দুল আজিজের কথায়।

"এলাকায় সব প্রার্থীরাই তো নামছে। কেউ কাউকে নিষেধ করে না। মিছিল-মিটিং হচ্ছে। মারামারি-গ্যাঞ্জাম নাই।"

আব্দুল আজিজের কথার সত্যতা মিললো শহরে ঢুকতেই।

পুরো নগর জুড়েই নির্বাচনী আমেজ । ধানের শীষ আর নৌকা মার্কার ব্যানার-পোস্টার নগর জুড়েই শোভা পাচ্ছে। পরিমাণে কম হলেও হাতপাখা মার্কায় ইসলামি আন্দোলনের ফয়সাল হোসেন আর কাস্তে মার্কা সিপিবি'র এনামুল হকের পোস্টারও কোথাও কোথাও চোখে পড়লো।

বিকেলে নগরীর বেলদার পাড়ায় দেখা গেলো, কর্মী সমর্থকদের বিশাল মিছিল নিয়ে প্রচারে বেরিয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু। তার সঙ্গে কথা বলি।

নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয় ছাড়া আর কিছু দেখছেন না তিনি। মিজানুর রহমান মিনু বলছিলেন, "এখানে আমাদের শুধু নিজস্ব কর্মীই আছে চল্লিশ হাজারের বেশি। আমাদের জনসমর্থনও প্রচণ্ড।"

"গত ১২ বছরে রাজশাহীর মানুষের কোন উন্নয়ন হয়নি। বরং এখানকার মানুষ বঞ্চিত, অপমানিত হয়েছে। তারা ব্যালটের মাধ্যমে সবকিছুর জবাব দেবে।"

এর পর খোঁজ নিলাম নৌকা মার্কার প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশার।

সিপিবি থেকে মহাজোটের এই প্রার্থী প্রচার চালাচ্ছিলেন নগরীতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে। তার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাদেরও দেখা গেল।

তিনি অবশ্য বলছেন, এই আসনে বিএনপি'র নিজস্ব কোন ভোট ব্যংক এখন আর নেই। তার ভাষায়, "বিএনপি'র যে ভোট ব্যাংক এবং জনপ্রিয়তার তত্ত্ব, সেটা আশির দশকের গল্প।"

তার কথা : "এখন রাজশাহীতে উন্নয়নের ভোট ব্যাংক তৈরি হয়েছে। জনগণ এমনকি বিএনপি'র অনেক ভোটারও উন্নয়নের পক্ষে ভোট দেবে।"

রাজশাহীতে ভোটের মাঠে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলছেন ভোটাররা।
ছবির ক্যাপশান, রাজশাহীতে ভোটের মাঠে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলছেন ভোটাররা।

পরিসংখ্যানে অবশ্য দেখা যাচ্ছে, রাজশাহী-২ আসনে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ৪টি নির্বাচনের ৩টিতেই জয়ী দল বিএনপি।

আর রাজশাহীর সবগুলো আসনে বিএনপি'র জয়ের হার প্রায় ৫৮ শতাংশ। আর আওয়ামী লীগের ৩১ শতাংশ। এবার তাহলে কার দিকে মুখ তুলে তাকাবে ভোটাররা?

নগরীর ২ নম্বর ওয়ার্ডে একটি চায়ের দোকানে কথা বলি কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে। মধ্যবয়সী একজন বলছিলেন, "এখানে মিনু ভাই দীর্ঘদিন মেয়র ছিলেন, সংসদ সদস্যও ছিলেন। অন্যদিকে বাদশা ভাই এখন রানিং এমপি। তারা দুজনেই ভালো কাজ করেছেন। জনগন কোন যুক্তিতে কাকে বেছে নেবে এখনো বোঝা যাচ্ছে না।"

রাজশাহী-২ আসন থেকে চলে এলাম রাজশাহী-৩ আসনে। এখানেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচার চোখে পড়লো।

যদিও এখানে দলীয় কর্মীদের গ্রেফতার ও প্রচার ক্যাম্পে হামলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করছে স্থানীয় বিএনপি।

দলটির প্রার্থী শফিকুল হক মিলন দাবি করছেন, প্রতিদিনই তার কর্মীরা গ্রেফতারের শিকার হচ্ছেন। এছাড়া নির্বাচনী ক্যাম্পেও প্রতিপক্ষরা হামলা ভাংচুর করছে।

তবে আওয়ামী লীগ একে নাকচ করে দিচ্ছে। রাজশাহী-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. আয়েন উদ্দীনের দাবি, তার ভাষায় বিএনপি নিজেরাই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এ ধরণের হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে।

রাজশাহী-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন পাঁচ প্রার্থী।
ছবির ক্যাপশান, রাজশাহী-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন পাঁচ প্রার্থী।

এই আসনে হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের ফজলুর রহমান, কুলা প্রতীকে বিকল্প ধারার মো. মনিরুজ্জামান এবং চাকা প্রতীকে বাংলাদেশের সাম্যবাদি দলের সাজ্জাদ আলীও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। তবে কিছু ব্যানার-পোস্টার ছাড়া তাদের প্রচার সেভাবে চোখে পড়লো না।

এদিকে রাজশাহী-৩ আসনের মতো রাজশাহী-৪ এবং রাজশাহী-৫ আসনেও বিএনপি'র পক্ষ থেকে একইরকম অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ কী বলছে? কথা বলি রাজশাহী পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ'র সঙ্গে। তিনি অবশ্য বলছেন, রাজশাহীতে সব দলের সঙ্গেই সমান আচরণ করো হচ্ছে।

তিনি বলছিলেন, "রাজশাহীতে কিন্তু কোথাও বড় কোন ঘটনা ঘটেনি। পরিবেশ পজিটিভ আছে। ঢালাওভাবে কাউকে গ্রেফতার করা বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে গ্রেফতার করা - এরকমটা হচ্ছে না। শুধুমাত্র যদি ফৌজদারি কোন অপরাধ ঘটে, সেক্ষেত্রে দুয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখানে অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই।"

এদিকে আদালতে প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় রাজশাহী-৬ আসনে এখন বিএনপি'র কোন প্রার্থী নেই। তবে বিএনপি জানিয়েছে, প্রার্থিতা ফিরে পিতে আইনি লড়াই চলছে।

কিন্তু এসব কিছুর মধ্যেও সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের অন্য অনেক এলাকার চেয়ে তুলনামূলকভাবে রাজশাহীতে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে এক ধরণের স্বস্তিই দেখতে পেয়েছি আমি।

যদিও শেষ পর্যন্ত এই পরিবেশ কেমন থাকে - সেটা নিয়ে উদ্বেগও দেখা গেছে কোন কোন প্রার্থীর মধ্যে।