'বাসে দাঁড়িয়ে ঢাকার এক মাথা থেকে আরেক মাথায় গেছি কিন্তু কেউ আমাকে সিট ছেড়ে দেয়নি'- বাংলাদেশে এক বৃদ্ধ মহিলা

বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের দেখাশোনার জন্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে খুব একটা উদ্যোগ নেই।
ছবির ক্যাপশান, বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের দেখাশোনার জন্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে খুব একটা উদ্যোগ নেই।
    • Author, সাইয়েদা আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

ঢাকার আগারগাওয়ে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের একটি অনুষ্ঠানে এসেছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রাফাত সুলতানা।

কয়েক বছর আগে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি। স্বামী আর মেয়েকে নিয়ে থাকেন সোবাহানবাগের একটি বাড়িতে।

তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বিদেশে থাকেন।

তিনি বলছেন, বাংলাদেশে তার মতো বয়স্ক মানুষজনকে দেখাশোনা করার মতো আসলেই কেউ নেই। আর একারণে বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি আরো বেশি অসহায়ত্ব বোধ করছেন।

রাফাত সুলতানা বলেন, বয়স্ক মানুষের জন্য সমাজের বা রাষ্ট্রের তেমন কোন বিশেষ যত্নের কিছু তিনি দেখেন নি।

"অনেক শুনেছি বাসে বয়স্ক লোকজনের জন্য আলাদা করে আসন রাখা হবে, ট্রেন বা বিমানের টিকিট কাটতে অগ্রাধিকার পাওয়া যাবে। কিন্তু কোথায় কি!"

"কখনো পাইনি সেসব। এমনও হয়েছে যে আমি বাসে করে দাঁড়িয়ে ঢাকার এক মাথা থেকে আরেক মাথায় গেছি। কিন্তু বাসের লোকজন কেউ আমাকে তাদের সিট ছেড়ে দেয়নি," বলেন তিনি।

রাফাত সুলতানা আক্ষেপের সুরে বললেন, "বয়স্কদের সম্মান দেখানোর কাজটি ঘরেই যখন হয়নি, রাষ্ট্র আর কতোটা করবে!"

বয়স্ক মানুষের জন্যে আছে হাতেগোনা কিছু প্রবীণ নিবাস।
ছবির ক্যাপশান, বয়স্ক মানুষের জন্যে আছে হাতেগোনা কিছু প্রবীণ নিবাস।

আরো পড়তে পারেন:

বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের জন্য সরকারের তরফ থেকে খুব বেশি কার্যক্রম যেমন নেই, তেমনি বেসরকারিভাবেও তাদের জন্যে বেশি কিছু করা হচ্ছে না।

সরকারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইদা নাইম জাহান বলেছেন, বর্তমানে সরকার বয়স্কদের ভাতা দিচ্ছে। গ্রামের ৬২ বছর বয়সী একজন নারী এবং ৬৫ বছর বয়সী একজন পুরুষ এই ভাতা পেতে পারেন। শহরের বয়স্কদের জন্যে এরকম কোন ভাতার ব্যবস্থা নেই।

"বয়স্ক ভাতা হিসেবে সরকার ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ২,৪০০ কোটি টাকা খরচ করছে। এর বাইরে বিধবা ভাতাও দেয়া হয়, কিন্তু তাদের সবাই আবার বয়স্ক নন। এছাড়া সরকারের দিক থেকে আর কোন আর্থিক সহায়তার কর্মসূচী নাই," বলেন তিনি।

সাইদা নাইম জাহান জানিয়েছেন, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের জন্য ৮৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে সরকারের।

তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, শহরাঞ্চলের প্রবীণদের জন্য সরকারের কোন কার্যক্রম নেই। এমনকি সরকারের নিজের কোন প্রবীণ নিবাসও নেই।

ঢাকায় প্রবীণ হিতৈষী সংঘের উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে একটি প্রবীণ নিবাস। সেখানে ৫০ জনের মতো বয়স্ক মানুষের থাকার জায়গা রয়েছে।

হিতৈষী সংঘের মহাসচিব অধ্যাপক এএসএম আতীকুর রহমান বিবিসিকে জানিয়েছেন, এই প্রবীণ নিবাসটি বেসরকারি সংস্থা হলেও এর জন্যে বছরে পাঁচ কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে সরকার ।

তিনি জানিয়েছেন, দেশে এখন বেসরকারি উদ্যোগেও কিছু প্রবীণ নিবাস পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকায় এধরনের নিবাসের সংখ্যা ১০টির মতো।

মি. রহমান বলেন, সাধারণত লোকজন এধরনের নিবাসের পেছনে বিনিয়োগ করতে চায় না।

"আমরা অল্প কিছু লোকের থাকার ব্যবস্থা করতে পারি, কিন্তু আমাদের কাছে তো আরো বহু বয়স্ক মানুষ আবেদন জানিয়ে রেখেছেন। আমাদের তো আর জায়গা নাই।"

শুধুমাত্র গ্রামের বয়স্ক মানুষের জন্যে আছে সরকারি ভাতা।
ছবির ক্যাপশান, শুধুমাত্র গ্রামের বয়স্ক মানুষের জন্যে আছে সরকারি ভাতা।

তিনি জানান, এই নিবাসে থাকতে হলে একজন বোর্ডারকে কিছু অর্থ দিতে হয়।

তবে মি. রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশে এখন ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক মানুষের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। ২০২৫ সালে তাদের সংখ্যা হবে দুই কোটি।

এই হিসাবে বাড়তে থাকলে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দেশের তরুণদের চেয়েও বেশি হবে।

আর একারণে তাদের ব্যাপারে সরকারসহ সবাইকে আরো সচেতন হতে হবে বলে তিনি জানান।

একই সঙ্গে কর্মক্ষম প্রতিটি মানুষকে তিনি বার্ধক্যের সময়ের জন্য এখনই সঞ্চয় শুরু করারও পরামর্শ দিয়েছেন।