চড়া মূল্যে ট্রাম্পকে লড়াই থেকে বের হওয়ার পথ করে দিল ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি

ছবির উৎস, EPA
- Author, অ্যান্থনি জারখার
- Role, উত্তর আমেরিকা সংবাদদাতা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
শেষ পর্যন্ত ঠান্ডা মাথারই জয় হলো– অন্তত এখনকার মতো।
ওয়াশিংটন সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি "চূড়ান্ত" শান্তি চুক্তির "খুব কাছাকাছি" পৌঁছেছে এবং আলোচনা এগিয়ে নিতে তিনি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন।
ঠিক শেষ মুহূর্তে এই ঘোষণা আসে এমনটি নয়। তবে, রাত ৮টার মধ্যে কোনো চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক হামলা চালাবে—ট্রাম্পের এমন ঘোষণার সময়সীমা তখন প্রায় ঘনিয়ে আসছিল ছিল।
এর সবকিছুই নির্ভর করছে ইরানের লড়াই স্থগিত করা এবং হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ওপর—যা করবে বলেছে দেশটির শাসকগোষ্ঠী। যদিও একই সঙ্গে জলপথটির ওপর তাদের "আধিপত্য" বজায় থাকার কথা তারা জোর দিয়ে বলছে।
এই চুক্তি ট্রাম্পকে এক বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার সুযোগ দিয়েছে—হয় তিনি "আজ রাতেই একটি পুরো সভ্যতা মারা যাবে" প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে সংঘাত আরও বাড়াতেন, না হয় পিছু হটে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়তো কেবল সাময়িক স্বস্তিই কিনে নিয়েছেন।
এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আগামী দুই সপ্তাহ আলোচনায় বসবে, স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে কিছুটা সময় পাবে।
যাত্রাপথটি হয়তো মসৃণ হবে না, তবে এখন জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দিনের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের সূচক দ্রুত বেড়েছে।
সবচেয়ে খারাপ সময়টা পেরিয়ে গেছে—এমন এক ধরনের আশাবাদ দেখা যাচ্ছে।
এমন অগ্রগতি মঙ্গলবার সকাল পর্যন্তও মোটেই নিশ্চিত ছিল না; তখনই ট্রাম্প ইরানি সভ্যতার মৃত্যু ঘটবে—এমন হুমকি দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন এটি "আর কখনও ফিরিয়ে আনা যাবে না"।
একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এমন বিস্ময়কর হুমকি ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে চাপ দিয়েছে কি না, তা অনিশ্চিত। যদিও তারা আগে বারবার এটি প্রত্যাখ্যান করছিল।
তবে যা স্পষ্ট, তা হলো— স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো ভাষায় ট্রুথ সোশ্যালে লেখা বার্তার মাত্র দুই দিন পর ট্রাম্পের এই অত্যন্ত উসকানিমূলক ঘোষণা আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আগে কখনো শোনা যায়নি বা এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যায়নি।
এমনকি যদি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেয়ও, ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য—বিশ্বের বাকি অংশ যুক্তরাষ্ট্রকে যেভাবে দেখে, তা মৌলিকভাবে বদলে দিয়ে থাকতে পারে।

ছবির উৎস, Reuters
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
যে দেশ একসময় নিজেকে বিশ্বজুড়ে স্থিতিশীলতার শক্তি হিসেবে তুলে ধরত, এখন সেই দেশই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ঘরোয়া রাজনীতিতে রীতিনীতি ও ঐতিহ্য ভাঙতে যে প্রেসিডেন্টকে আগ্রহী মনে হয়েছে, তিনি এখন বৈশ্বিক অঙ্গনেও একই কাজ করছেন।
মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটরা দ্রুত ট্রাম্পের বক্তব্যের নিন্দা করেন; কেউ কেউ তার অপসারণের দাবিও তোলেন।
"এটা স্পষ্ট যে প্রেসিডেন্টের অবস্থান আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং তিনি নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত নন," এক্স-এ লেখেন কংগ্রেসম্যান হোয়াকিন কাস্ত্রো।
মার্কিন সিনেটে শীর্ষ ডেমোক্র্যাট চাক শুমার বলেন, ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য যে রিপাবলিকান সদস্য ভোটে অংশ নেবেন না, তিনি "এই পুরো ঘটনার যেকোনো পরিণতির দায় নিজের কাঁধে নেবেন"।
ট্রাম্পের নিজের দলেও অনেকে তার পাশে দাঁড়ালেও তিনি প্রায়ই যেরকম সার্বজনিক সমর্থন পেয়ে থাকেন, তা এবার দেখা যায়নি।
জর্জিয়ার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান এবং হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য অস্টিন স্কট 'একটি সভ্যতার মৃত্যু' নিয়ে ট্রাম্পের হুমকির তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি বিবিসিকে বলেন, "প্রেসিডেন্টের মন্তব্যগুলো বিপরীতমুখী" এবং "আমি এগুলোর সঙ্গে একমত নই"।
উইসকনসিনের সিনেটর রন জনসন, যিনি সাধারণত ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত, বলেন, বোমা হামলার অভিযান চালানো হলে তা হবে "বড় ভুল"।
টেক্সাসের কংগ্রেসম্যান নাথানিয়েল মোরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, তিনি "একটি 'পুরো সভ্যতা' ধ্বংসের" পক্ষে নন।
"এটা আমরা নই," তিনি লেখেন, "এবং এটি সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকাকে পথ দেখিয়েছে"।
আলাস্কার সিনেটর লিসা মারকাউস্কি, প্রায়ই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যার দূরত্ব তৈরি হয়, তিনিও সরাসরি লিখেছেন— প্রেসিডেন্টের এই হুমকি "ইরানের সঙ্গে আলোচনায় সুবিধা আদায়ের চেষ্টা হিসেবেও ক্ষমার যোগ্য নয়"।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
যাই হোক, হোয়াইট হাউস অবশ্য যুক্তি দিতে পারে যে এই চাপ কাজ করেছে।
আর এটা সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ করে দিয়ে এমন এক প্রেসিডেন্টের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে, যিনি জনমত জরিপে পতন, নিজের দলের ভেতরে সমালোচকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং উচ্চ জ্বালানি মূল্যের কারণে চাপে থাকা এক অর্থনীতির মুখোমুখি।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে দেওয়া ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সব সামরিক লক্ষ্য "পূরণ করেছে এবং ছাড়িয়ে গেছে"।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয় হয়েছে। ইসলামি মৌলবাদী শাসন এখনো ক্ষমতায় থাকলেও বোমা হামলায় তাদের শীর্ষ অনেক নেতা নিহত হয়েছেন।
তবে এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত বহু লক্ষ্যই এখনো অনিশ্চিত।
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান—যা তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির ভিত্তি—তা অজানা।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো আঞ্চলিক ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর ওপর দেশটির প্রভাব এখনো রয়েছে।
আর ইরান যদি টোল বা অন্য কোনো অর্থপ্রদানের শর্ত ছাড়াই পুরোপুরি হরমুজ খুলেও দেয়, তবুও এই গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সংকীর্ণ পথটি নিয়ন্ত্রণ করার তাদের সক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির বার্তার পর এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইরান তাদের "প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম" স্থগিত রাখবে এবং "ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে" হরমুজ দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করবে। তিনি যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনার "সাধারণ কাঠামো" মেনে নিয়েছে।
ওই পরিকল্পনায় রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং হরমুজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
ট্রাম্প বাস্তবে এসব শর্তে সম্মত হবেন—এটা কল্পনা করা কঠিন; যা ইঙ্গিত দেয়, পরবর্তী দুই সপ্তাহের আলোচনা হতে পারে বিপজ্জনক।
তবে এই মুহূর্তে এটি ট্রাম্পের জন্য এক আংশিক রাজনৈতিক বিজয়। তিনি নাটকীয় একটি হুমকি দিয়েছেন এবং কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়েছেন। কিন্তু এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী সমাধান নয়, এটি কেবল একটি সাময়িক অবকাশ।
প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য, এবং পুরো যুদ্ধের পরিণতি, এখনো পুরোপুরি মূল্যায়িত হয়নি।








