আল শিফা হাসপাতালে ইসরায়েলের নতুন অভিযান হামাসেরই সামর্থ্যের ইঙ্গিত

আল শিফা হাসপাতালে গত নভেম্বরে বড় ধরনের অভিযান চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।
Published

গাজার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল আল-শিফায় হামাসের কমান্ড এবং নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র আছে এমন দাবিতে চার মাস আগে সেখানে হামলা চালায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। কিন্তু, এখন আবার বলা হচ্ছে হামাস সেখানে ফিরে এসেছে।

ইসরায়েলি বাহিনী বলছে, তাদের কাছে "সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য" রয়েছে যে হামাস কর্মীরা সেখানে পুনরায় সংগঠিত হয়েছে।

এদিকে, নতুন করে ভয়াবহ যুদ্ধের মাঝখানে পড়ে যাওয়ার শঙ্কায় আছেন ফিলিস্তিনিরা।

এতে তীব্র মানবিক সংকটের বিষয়টি যেমন টের পাওয়া যায়, এটাও স্পষ্ট হয়, হামাস এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, এ থেকে বোঝা যায় ইসলামিক সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে মোকাবিলা করার জন্য কত বিস্তৃত কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন।

তাছাড়া, গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনাও জরুরি বলে মত তাদের।

আল শিফা হাসপাতাল
ছবির ক্যাপশান, আল শিফা হাসপাতাল

ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী-আইডিএফের দাবি , তারা আল-শিফায় চলমান লড়াইয়ে "১৪০ জনেরও বেশি সন্ত্রাসীকে" হত্যা করেছে, গ্রেপ্তার করেছে প্রায় ছয়শো জনকে। যার মধ্যে হামাসের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক কমান্ডার রয়েছেন। ইসলামিক জিহাদের কয়েকজনও আছেন তাদের সাথে।

দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার কথাও জানিয়েছে আইডিএফ।

ইসরায়েলি প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি হামাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আল-শিফাতে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করেছেন। কেউ কেউ তাদের পরিবারকেও হাসপাতালটিতে নিয়ে গেছেন।

ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্রের ভাণ্ডার এবং বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছে আইডিএফ।

তবে, হামাস এসবই অস্বীকার করেছে।

বলছে, তাদের যোদ্ধারা সেখানে অবস্থান করছে না।

তাদের বদলে বরং আহত রোগী এবং বাস্তুচ্যুত মানুষই হামলায় নিহত হয়েছেন।

গাজায় নিরাপদ আশ্রয় বলে কিছু নেই
ছবির ক্যাপশান, গাজায় নিরাপদ আশ্রয় নেই বললেই চলে।

ফিলিস্তিনি প্রত্যক্ষদর্শীরা বিবিসিকে বলেন, বন্দুকযুদ্ধ এবং ইসরায়েলি বিমান হামলায় রোগী, চিকিৎসক এবং সেখানে আশ্রিত শত শত লোকের জীবন বিপন্ন।

স্থানীয় এক সাংবাদিকের শেয়ার করা ফুটেজে, ওই স্থান থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত আরেকটি ভিডিওতে অনেক নারী ও শিশুকে একটি ভবনের মধ্যে সন্তানদের নিয়ে লুটিয়ে পড়তে দেখা যায়। যদিও ভিডিওটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

একজন বলছিলেন, “তারা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে গেছে। এখন নারী ও শিশুদের চলে যেতে বলছে। আমরা জানি না কোথায় যাবো।”

এসময় লাউড স্পিকারে একজন আইডিএফ অফিসারকে বলতে শোনা যায়, “বিনা অনুমতিতে ভবন থেকে বের হবেন না কেউ। অন্যান্য হাসপাতালের মতোই এখানকার বেসামরিক নাগরিকদেরও কোনো ক্ষতি ছাড়াই সরিয়ে নিতে চাই আমরা।”

বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে যোগাযোগব্যবস্থা খুবই সীমিত করে আনা হয়েছে। এতে ঘটনাস্থলে অবস্থানরত চিকিত্সক এবং অন্যদের সাথে যোগাযোগ দুরূহ হয়ে পড়েছে।

কালাশনিকভ রাইফেল
ছবির ক্যাপশান, আগের অভিযানে এআরআই স্ক্যানারের পেছনে লুকিয়ে রাখা কালাশনিকভ রাইফেল উদ্ধারের দাবি করে আইডিএফ

গত নভেম্বরে, গাজার কেন্দ্রস্থলে আল-শিফার কাছে ইসরায়েলের ট্যাঙ্ক নিয়ে যাওয়াটা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

অবরুদ্ধ হাসপাতালে যাদের মৃত্যু হয়, তাদের মধ্যে প্রিম্যাচিওর বেবিও (অপরিণত নবজাতক) ছিল।

আইডিএফ সার্ভেইলেন্স (নজরদারি) ক্যামেরার ছবি প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, দুই ইসরায়েলি জিম্মিকে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সে সময় ব্যাপক তল্লাশি চালায় ইসরায়েলি সৈন্যরা। পরে তারা মাটির নিচে থাকা একটি বড় টানেল উড়িয়ে দেয়।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলে আসছিল, গাজা উপত্যকার উত্তরে হামাসের আঞ্চলিক ব্রিগেড এবং ব্যাটালিয়নগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

কিন্তু, অল্পদিনের মধ্যেই খবর আসে, ছোট ছোট দলে পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে তারা।

নভেম্বরে অভিযানের পর আইডিএফের সাথে সরেজমিনে আল শিফায় যান বিবিসি সাংবাদিক
ছবির ক্যাপশান, নভেম্বরে আইডিএফের অভিযানের পর আল শিফায় গিয়েছিলেন বিবিসি সাংবাদিক।

হামাস নিঃসন্দেহে এই যুদ্ধে মারাত্মকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবু, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ত্রাণ বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থেকে শাসনক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন গোষ্ঠীটির সদস্যরা।

আল-শিফা হাসপাতালে ইসরায়েলের পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ দেখে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ ফুটে ওঠে যে তার ঘনিষ্ঠ মিত্রের কাছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে ভেঙে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত কৌশল নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান এই সপ্তাহে বলেছেন, “ইসরায়েল একবার শিফাকে হামাসমুক্ত করলো। হামাস শিফায় ফিরে এলো আবার। তাহলে, হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান কতটা টেকসই হলো সেটাই প্রশ্ন।”

আল শিফা হাসপাতালে নভেম্বরের হামলায় আশ্রয়হীন হয়েছিল নবজাতকরাও
ছবির ক্যাপশান, আল শিফা হাসপাতালে নভেম্বরের হামলায় আশ্রয়হীন হয়েছিল এই নবজাতকরাও

গাজায় হামাস শাসনের বিকল্প নিয়ে আসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে চাপ দিয়ে আসছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (পিএ) সামনে নিয়ে আসা এবং ক্ষমতাকাঠামোতে কোনো শূন্যতা যাতে তৈরি না হয় সেজন্য আরব রাষ্ট্রগুলির সাথে কাজ করার তাগিদে দেয়া হচ্ছে।

ইসরায়েল এর আগে বলেছিল, তারা পিএ বা হামাসের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই গাজার নেতৃস্থানীয়দের সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে।

এখন, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন বলছে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা হামাসের সাথে যুক্ত নয় এমন ফিলিস্তিনি নেতা এবং ব্যবসায়ীদের সাথে মিলে "ত্রাণ বিতরণের জন্য একটি পরিকল্পনা নীরবেই তৈরি করছে ।" তারা ধারণা করছে, "পরবর্তীতে একটি ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন কর্তৃপক্ষ তৈরিতে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।"

ইসরায়েলি গণমাধ্যমের তথ্য, শিফা হাসপাতালে অভিযান কয়েক দিন ধরে চলতে পারে। এর সাথে রাফাহর সামরিক অভিযানের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসরায়েল জোর দিয়ে বলছে, হামাসকে পরাজিত করতে হলে রাফাহ অভিযান চালিয়ে যেতে হবে তাদের।