সংসদে যে অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা কার্যকারিতা হারাচ্ছে তাতে কী আছে?

সংসদ অধিবেশন

ছবির উৎস, BNP Media Cell

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের সংসদ অধিবেশনে শুরু হয়েছে গত ১২ই মার্চ
    • Author, মুকিমুল আহসান
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত দেড় বছরে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করতে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। বাকি ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

আর বাকি ২০টি অধ্যাদেশের মধ্যে চারটি বাতিল বা রহিত, আর ১৬টি এখনই সংসদে পাশের জন্য বিল আকারে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।

ওই অধ্যাদেশগুলো আগামী ১০ই এপ্রিলের মধ্যে জাতীয় সংশোধনে পাশ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে পাশ না হলে সেগুলোর আর কার্যকারিতা থাকবে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা যে ১৬টি অধ্যাদেশ আইন আকারে পাশ না হওয়ায় কার্যকারিতা হারাচ্ছে তার মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গুম প্রতিরোধ, গণভোটসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ রয়েছে।

অন্যদিকে যে চারটি অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করার সুপারিশ করেছে সরকার সেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় গঠনের বিষয়গুলো রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ এসব অধ্যাদেশগুলো এখনই পাশ না করা বা রহিত করা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

এই আইনগুলো নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনই বিএনপি নেতা জয়নুল আবেদীনকে সভাপতি সংসদে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।

যে সব অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করা হয়েছে, সেগুলোতে কি আছে সেটি বিবিসি বাংলার পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো।

গত ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গত ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়

বাতিল হওয়া চারটি অধ্যাদেশে কী আছে?

  • জাতীয় সংসদ সচিবালয় অধ্যাদেশ
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বিশেষ কমিটি যে চারটি অধ্যাদেশ রহিত করার সুপারিশ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের নভেম্বর এই অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর মূলত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকারের অবর্তমানে তার দায়িত্ব আইন উপদেষ্টাকে প্রদানে এই অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছিল। বিশেষ কমিটি তাদের রিপোর্টে বলেছে, নতুন করে এই অধ্যাদেশের কার্যকারিতা না থাকায় এই অধ্যাদেশটি রহিত বা বাতিলের সুপারিশ করা হয়।

  • সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ

২০২৫ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ করে।

এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে 'সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল'। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে। মূলত সুপ্রীম কোর্টের বিচারক নিয়োগের লক্ষ্যে উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাইপূর্বক প্রধান বিচারপতি কর্তৃক রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ প্রদানের উদ্দেশ্যে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।

  • সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় অধ্যাদেশ

এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটি বিষয়ক সব সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় এই সচিবালয়ের হাতে থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সচিবালয়ের সচিব প্রশাসনিক প্রধান হবেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।

  • সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ

বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির নিয়ন্ত্রণে সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয়ের ওপর ন্যস্ত করার লক্ষ্যে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করা হয়েছে।

সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ছবির উৎস, PM PRESS WING

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে দেশটির প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

যে ১৬টি কার্যকারিতা হারাচ্ছে

মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ

কমিশনের সভাপতির অবর্তমানে সভায় উপস্থিত সদস্যদের সম্মতিতে সভাপতি নির্বাচন করা এবং বাছাই কমিটির কোন সদস্য পদে শূন্যতা বা অনুপস্থিতি কিংবা অন্য কোন কারণে কাজ করতে অক্ষম থাকলে কার্যক্রম তবুও বহাল থাকবে এবং এ নিয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না, এ লক্ষ্যেই এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করা হয়েছিল।

রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিদ্যমান কাঠামো পুনর্গঠন করে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম পৃথক করা হয়েছিল এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে 'রাজস্ব নীতি বিভাগ' ও 'রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ' নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী।

রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ

সংশোধিত এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাজস্ব নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি করনীতি প্রণয়ন, আইন সংশোধন, আন্তর্জাতিক চুক্তি, প্রকল্প ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ কর ও শুল্ক আইন বাস্তবায়ন, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছিল।

মূল্য সংযোজন কর সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ

মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক সংক্রান্ত বিধান সংশোধন করার লক্ষ্যে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করা হয়েছে।

কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ

কাস্টমস আইন ২০২৩ এ বিভিন্ন স্থানে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ অন্তর্ভুক্তির জন্য এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়।

আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ

আয়কর আইন, ২০২৩ এ বিভিন্ন স্থানে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ অন্তর্ভুক্তির জন্য এ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ

২০২৫ সালের নভেম্বরে মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ (২০০৯ সালের ৫৩ নং আইন) রহিত করে মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও নিশ্চিতে জারি করা হয়েছিল এই অধ্যাদেশটি।

গণভোট অধ্যাদেশ

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ কার্যকরে গণভোটে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল ২০২৫ সালে। সংবিধানের সকল সংশোধনীর বিধানের গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদন গ্রহণের বিষয়ে বিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে গণভোটের বিধান প্রবর্তনে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ

গুম থেকে সব ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে গুমকে 'চলমান অপরাধ' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এর সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের কিছু ধারায় সংশোধন আনতে সংশোধিত এই অধ্যাদেশটি জারি করা হয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২০২৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর এই অধ্যাদেশটি জারি করেছিল।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ

ছবির উৎস, BBC/MUKIMUL AHSAN

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ

দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ

বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের তদন্ত ও গোপন অনুসন্ধান ক্ষমতা বাড়িয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয় ২০২৫ সালে। এতে সরাসরি এজাহার দায়েরের বিধান, বিদেশে সংঘটিত অপরাধসহ গুরুতর আর্থিক অপরাধকে আইনের আওতায় আনা, কমিশনের সদস্য বাড়ানোর বিধান করা হয়েছিল।

বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ

বিমানের টিকিটিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং বিমান ভাড়ায় কারসাজি রোধে সুদৃঢ় আইনগত কাঠামো প্রণয়ণে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এতে এয়ার অপারেটরদের কর্তৃপক্ষের নিকট সকল রুটের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ভাড়ার তালিকা আবশ্যিকভাবে দাখিলের বিধান রাখা হয়েছিল।

বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (সংশোধন) অধ্যাদেশ

এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকারের বিধি দ্বারা অপরাধ চিহ্নিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে দণ্ড নির্ধারণ-সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ট্রাভেল এজেন্সি আইন লঙ্ঘনে এক বছরের কারাদণ্ড, অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ

সংশোধিত এই অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালে পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগের বিধান আনা হয়েছে। এছাড়াও অভিযোগকারী বা ভুক্তভোগী ব্যক্তিগত উদ্যোগেও আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবেন। সংশোধিত এই অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল কোনো ব্যক্তি নূন্যতম পাঁচ বছর ধরে গুম থাকলে এবং জীবিত না ফিরলে ট্রাইব্যুনাল তাঁর সম্পত্তি বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনযোগ্য মর্মে ঘোষণা দিতে পারবে।

মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ

মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬ প্রণয়ন করে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার। অবৈধভাবে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করা হয়েছিল।

তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ

দেশে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত এবং সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে 'তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।