চীনের ক্ষমতাবান নেতা হওয়ার আগে সবকিছু হারিয়েছিলেন শি জিনপিং

    • Author, শন ইয়ুয়ান
    • Author, জ্যাক লাও
    • Role, বিবিসি গ্লোবাল চায়না ইউনিট
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রায় ১৪ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন শি জিনপিং। এই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি এবং বিশ্বে চীনের অবস্থানে আমূল পরিবর্তন এনেছেন তিনি।

তবে ৭৩ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদের জীবনটা খুব সহজ নয়, বরং বড় উত্থান-পতনে ঘেরা। বলা চলে, তিনি ছিলেন সেই 'রাজপুত্র' যিনি সবকিছু হারিয়েছিলেন।

শি-র গল্পের শুরুটা হয়েছিল বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থান থেকে।

১৯৫৩ সালে বেইজিং-এ জন্ম নেন শি জিনপিং। তার বাবা শি ঝংজুন ছিলেন একজন কমিউনিস্ট বিপ্লবী, যিনি গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিলেন, পরবর্তীতে দলের ঊর্ধ্বতন নেতা এবং উপ-প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন।

শি ঝংজুনের ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন শি জিনপিং।

শৈশবে শি নামকরা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং এমন সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন যা অধিকাংশ পরিবারের জন্য সহজলভ্য ছিল না।

এরপর রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার পরিবারের বিরুদ্ধে চলে যায়।

১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে, শি-র বাবাকে একটি 'দল-বিরোধী' চক্রের অংশ হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়, গ্রামাঞ্চলে একটি কারখানায় কাজ করার জন্য নির্বাসিত করা হয় এবং দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

‘প্রতিবিপ্লবী’ হিসেবে চিহ্নিত একজন ব্যক্তির পুত্র হওয়ায় কিশোর শি-কে জোর করে একটি পুনঃশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল।

তৎকালীন নেতা মাও জেদং আহ্বান জানান- গ্রামে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে শেখার। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৫ বছর বয়সী শি শহরের আরও লাখো ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে গ্রামাঞ্চলের দিকে রওনা হন।

২০০৪ সালের একটি সাক্ষাৎকারে নিজের যাত্রার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, "ট্রেনের সবাই কাঁদছিল। আমিই একমাত্র হাসছিলাম... যদি আমি বেরিয়ে আসতে না পারতাম, তাহলে আমিও কাঁদতাম। যদি থেকে যেতাম, আমি জানিও না যে আমি এখনো বেঁচে থাকতাম কি না।"

তিনি চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শানসি প্রদেশের লিয়াংজিয়াহে নামে এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে এসে পৌঁছান, যেখানে তিনি সাত বছর ধরে একটি ইয়াওদং—অর্থাৎ পাহাড়ের গুহা-বাসস্থানে—কৃষিকাজ, সার বহন এবং নালা খননের কাজ করে জীবনযাপন করেন।

সেখানকার দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "আচার করা সবজি আমার প্রিয় খাবার হয়ে উঠেছিল। আজও আমি সেই দিনগুলোর কথা সযত্নে স্মরণ করি।"

কাজের চাপ দেখে তিনি 'বিস্মিত' হয়েছিলেন এবং শুরুতে ক্ষুধা ও উকুনের উপদ্রবে ভুগলেও, দুপুরের খাবারের আগে ধূমপানের বিরতিতে স্বস্তি খুঁজে পেয়েছিলেন।

ক্ষমতার উত্থান

তিনি ২২ বছর বয়সে চীনের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়নিক প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করতে গ্রাম ছেড়েছিলেন।

স্নাতক শেষ করার পর, তিনি বেইজিং থেকে অনেক দূরে ফুজিয়ান ও ঝেজিয়াং-এ স্থানীয় কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। এই উপকূলীয় প্রদেশগুলো ১৯৮০-এর দশকে অর্থনীতি উন্মুক্ত হওয়ার পর চীনের অন্যতম ধনী প্রদেশে পরিণত হয়েছিল।

মাওয়ের মৃত্যুর পর শি-এর বাবার পুনর্বাসন তাকে কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বাহিনীতে পদ পেতে এবং দলের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।

এই কর্মকর্তাদের অনেকেই পরবর্তীকালে তার বিশ্বস্ত নেতৃত্ব বলয়ের অংশ হয়েছিলেন।

শি ১৯৭৯ সালে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদূতের কন্যা কে লিংলিংকে প্রথম বিয়ে করেন, কিন্তু তিন বছর পর তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়।

দ্বিতীয় ও বর্তমান স্ত্রী পেং লিউয়ানের সঙ্গে শি জিনপিং-এর পরিচয় হয় একজনের মাধ্যমে যিনি তাদের দুইজনেরই বন্ধু ছিলেন।

লিউয়ান সামরিক বাহিনীর একজন লোকসংগীত শিল্পী, যিনি প্রতি বছর চান্দ্র নববর্ষের টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে চীনে ইতোমধ্যেই ঘরে ঘরে পরিচিত ছিলেন, যা কোটি কোটি দর্শক দেখতেন।

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে অনেক চীনাদের কাছে, পেং তার স্বামী, প্রাদেশিক কর্মকর্তা শি-র চেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন।

পেং প্রায়শই শি-র সঙ্গে বিদেশ সফরে গিয়েছেন, যা চীনের ফার্স্ট লেডিদের ঐতিহ্যগতভাবে প্রচারবিমুখ ভাবমূর্তি থেকে একটি ব্যতিক্রম।

তাদের একমাত্র সন্তান, কন্যা শি মিংজে ১৯৯২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন—এটুকু ছাড়া তার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না।

২০০৭ সালে, সাংহাইয়ের শীর্ষ নেতা হিসেবে সংক্ষিপ্ত সময় দায়িত্ব পালনের পর, শি চীনের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটিতে যোগ দেন। পাঁচ বছর পর, তিনি হু জিনতাও-এর স্থলাভিষিক্ত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হন।

চীনের নেতা হিসেবে শি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এমনভাবে পরিবর্তন এনেছেন, যা খুব কম লোকই প্রত্যাশা করেছিল।

চীনকে যেভাবে তৈরি করেছেন শি

শি জিনপিংয়ের ১৪ বছরের শাসনামলে চীন ক্রমশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।

বিদেশে, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মতো প্রকল্পের মাধ্যমে চীনের বৈশ্বিক প্রভাব প্রসারিত করেছেন এবং একই সঙ্গে বেইজিংকে গ্লোবাল সাউথের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন শি।

একই সময়ে, অনেক প্রধান গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিতর্কিত হয়ে ওঠে, যার মধ্যে ছিল দক্ষিণ চীন সাগরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, তাইওয়ানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র হওয় ওঠা প্রতিযোগিতা।

তবে চীনের অভ্যন্তরে বৃহত্তর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও শি-র উত্তরাধিকার সংজ্ঞায়িত হয়।

শি জিনপিংয়ের অধীনে চীন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর অনেক বেশি জোর দিয়েছে এবং শিনজিয়াং, তিব্বত ও হংকংয়ের মতো জায়গায় এমন সব পদক্ষেপ নিয়েছে, যা সমর্থকদের মতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে, কিন্তু সমালোচকদের মতে তা নাগরিক স্বাধীনতাকে ব্যাপকভাবে খর্ব করেছে।

তিনি তার নামে নামকরণ করা একটি মতাদর্শের প্রচার করেছিলেন - "নতুন যুগের জন্য চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র বিষয়ে শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারা" - যা তার পূর্ববর্তী দুজন করতে পারেননি।

শি সংবিধান থেকে রাষ্ট্রপতির মেয়াদের সীমাও তুলে দিয়েছেন, যাতে তিনি দুই মেয়াদের বেশিও দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম শি-কে একজন গম্ভীর মানুষ হিসেবে চিত্রিত করে, কিন্তু মাঝে মাঝে তার একটি হালকা মেজাজের দিকও প্রকাশ পেয়েছে।

তিনি ফুটবলের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা বলেছেন, এমনকি থাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে চীনা পুরুষ দলের পারফরম্যান্স নিয়ে নিজের হতাশার কথাও রসিকতা করেছেন, যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সাথে এক গ্লাস বিয়ার পান করেছেন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতিকে তার কাছ থেকে উপহার হিসেবে চীনে তৈরি শাওমি ফোন গ্রহণ করার আগে সেগুলিতে কোনো 'ব্যাকডোর' আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখার বিষয়ে ঠাট্টা করেছেন।

বন্ধু নাকি শত্রু?

বিদেশি নেতাদের সঙ্গে শি-এর সম্পর্কের উত্থান-পতন ঘটেছে, যা চীনের বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারগুলোকেই প্রতিফলিত করে।

রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের চেয়ে ঘনিষ্ঠ কোনো বিদেশি নেতা তার নেই। শি ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাদের ৪০ বারেরও বেশি সাক্ষাৎ হয়েছে এবং শি এমনকি পুতিনকে তার 'সবচেয়ে কাছের আস্থাভাজন' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও জটিল। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রায়ই শি-র প্রশংসা করেন, তাকে বন্ধু বলেন এবং তার রাজনৈতিক শক্তির প্রশংসা করেন।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে শি জিনপিং প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত কূটনীতিতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছিলেন। এশিয়ার এই দুই পরাশক্তির মধ্যে সহযোগিতার ওপর জোর দিতে তারা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে কথা বলতেন, কিন্তু ২০২০ সালের প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষ সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ঠেলে দেয়।

ব্যক্তিগত আকর্ষণ বা তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনী ক্ষমতার জন্য পরিচিত নেতাদের থেকে ভিন্ন, শি কদাচিৎ রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে স্থান দেন।