আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলেই তাকে এলাকাছাড়া করা যায় না: বম্বে হাই কোর্ট
"সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা বা তার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ায় কোনো ব্যাক্তিকে কোনো এলাকা থেকে বহিষ্কার করার বৈধ কারণ হতে পারে না," বলে জানিয়েছে বম্বে হাই কোর্ট।
সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখানো এবং স্লোগান দেওয়ায় 'সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইন্ডিয়ার' (এসডিপিআই) মহারাষ্ট্রের সাধারণ সম্পাদক সাঈদ আহমেদ আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে 'এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার' বা বহিষ্কারের আদেশ জারি করেছিল মহারাষ্ট্র পুলিশ।
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন এবং জ্ঞানবাপী মসজিদ-সহ বিভিন্ন বিষয়ে কেন্দ্র সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে দেখা গিয়েছে মি. চৌধুরীকে। সরকার বিরোধী ধর্না ও বিক্ষোভের আয়োজনও করেছিলেন তিনি।
২০২৫ সালে তাকে মুম্বাই ও সংলগ্ন এলাকা থেকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই সংক্রান্ত মামলার শুনানির সময়েই এই মন্তব্য করেছেন বম্বে হাই কোর্টের বিচারপতি মাধব জামদার।
'এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার' হলো এমন এক প্রতিরোধমূলক আইনি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে একটা নির্দিষ্ট এলাকা বা জেলা ছেড়ে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দূরে থাকতে বাধ্য করা যেতে পারে।
এটা স্টেট পুলিশ অ্যাক্ট বা রাজ্য-স্তরের পুলিশ আইন (যেমন মহারাষ্ট্র পুলিশ অ্যাক্ট) দ্বারা পরিচালিত। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ কমিশনারের মতো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ এই নির্দেশ জারি করতে পারেন।
আইন সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ করে এমন এক পোর্টাল 'লাইভ ল'-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মি. চৌধুরীর মামলার শুনানির সময় বৃহস্পতিবার বিচারপতি জামদারকে মন্তব্য করতে শোনা যায়, "এসব কী হচ্ছে? সব নাগরিককে কি ভারত সরকারের দাস বানানো হচ্ছে... তারা কি প্রতিবাদ বা আন্দোলন করতে পারে না – কী হচ্ছে এসব?"
'বিজেপি সরকার মুর্দাবাদ' এবং 'অমিত শাহ মুর্দাবাদ'-এর মতো স্লোগান কীভাবে কারো বিরুদ্ধে (আইনি) পদক্ষেপের ভিত্তি হতে পারে- সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে সেই প্রসঙ্গও টেনে আনেন বিচারপতি। শুনানির সময় তিনি মৌখিকভাবে বলেন, পুলিশের কর্মকর্তারা কোনো মন্ত্রীর অধীনে কর্মরত নন, জনসাধারণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।
'প্রতিবাদ জানানো নাগরিকদের অধিকার'
বছর ৪৯-এর এসডিপিআই-এর সাধারণ সম্পাদক সাঈদ আহমেদ আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে বহিষ্কার আদেশ জারি করায় মুম্বাই পুলিশের তীব্র সমালোচনা করেন বিচারপতি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো ও আন্দোলন করার অধিকার নাগরিকদের আছে। শুধুমাত্র প্রতিবাদ বা স্লোগান দেওয়ার জন্য পুলিশ কোনও ব্যক্তিকে তার শহর থেকে বহিষ্কার করতে পারে না।
বিচারপতি জামদার বলেন, "কী হচ্ছে? সমস্ত নাগরিককে ভারত সরকারের দাস বানানো হচ্ছে। তারা প্রতিবাদ করতে পারবে না, তারা আন্দোলন করতে পারবে না, এসব কী? অনেক পেপার ফাঁস হয়ে গেছে। মানুষ প্রতিবাদ করলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন। এটা কী হচ্ছে? প্রতিবাদ জানানো নাগরিকদের অধিকার।"
বিচারপতি মাধব জামদার বলেন, "আবেদনকারী শুধুমাত্র বিজেপি সরকার মুর্দাবাদ এবং অমিত শাহ মুর্দাবাদ-এর মতো স্লোগান দিয়েছিলেন। নাগরিকরা কেন স্লোগান দিতে পারবেন না? শুধু এই ধরনের স্লোগান দেওয়ার জন্য কীভাবে বহিষ্কারের আদেশ জারি করা যায়?"
তিনি ওই আদেশ বাতিল করে দিয়ে বলেন মি. চৌধুরী ধর্না ও বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করে তাতে অংশ গ্রহণ করেছিলেন বলেই তার বিরুদ্ধে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
বম্বে হাই কোর্ট জানিয়েছে, "ভারত সরকারের কিছু সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার ভিত্তিতে চৌধুরীকে বহিষ্কার করা আবেদনকারীর মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার অধিকারের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে।"
মুম্বাইয়ের চেম্বুরের বাসিন্দা সাঈদ আহমেদ আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরী বাবরি মসজিদ, জ্ঞানবাপী মসজিদ, ওয়াকফ বোর্ডে দুর্নীতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ, জাতীয় নাগরিক পঞ্জী বা এনআরসি-র মতো বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সরব হয়েছেন। বিক্ষোভও দেখিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ-সহ অনেকেই বিচারপতি মাধব জামদারের প্রশংসা করেছেন। প্রশান্ত ভূষণ এক্স হ্যান্ডেলে একটা পোস্টে লিখেছেন, "এ থেকে বোঝা যায় যে এখনও এমন বিচারপতি আছেন যাদের সরকারকে প্রশ্ন করার এবং নাগরিকদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস রয়েছে। প্রশংসনীয়।"
কী ঘটেছিল?
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে মহারাষ্ট্র পুলিশ অ্যাক্ট (এমপিএ) এর আওতায় তার বিরুদ্ধে বহিষ্কারের আদেশ সংক্রান্ত পদক্ষেপ শুরু করা হয়। প্রথমে তাকে একটা শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বেশ কয়েকটা এফআইআরের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ বলে জানা গিয়েছে।
এরপর ডিসেম্বর মাসে ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ (জোন ৬- চেম্বুর)_এর তরফে বহিষ্কারের অর্ডার জারি করা হয়। ২০২৫ সালে চেম্বুরের পুলিশ কমিশনার এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার জারি করেছিলেন। সেখানে মি. চৌধুরীকে ১২ মাসের জন্য মুম্বাই শহর এবং শহরতলির সীমার বাইরে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
যে সমস্ত এফআইআর-এর ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ, সেগুলো মি. চৌধুরীর বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের কারণে দায়ের করা হয়েছিল। সেখানে আইপিসির ১৮৮ ধারা প্রয়োগ করা হয়। ওই ধারায় কর্তৃপক্ষের জারি করা আদেশের ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করলে কী হতে পারে তা উল্লেখ করা আছে।
মি. চৌধুরীর বিরুদ্ধে যে আদেশ জারি করা হয়েছিল সেখানে ওই এফআইআর-এর দেওয়া বিবৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছিল যে সাঈদ আহমেদ আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরীর কার্যকলাপ "ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে এবং জনশৃঙ্খলাকে বিপন্ন করেছে।"
কোঙ্কন ডিভিশনের বিভাগীয় কমিশনারও সেই আদেশই বহাল রেখেছিলেন।
মি. চৌধুরী এই দুই আদেশকেই হাই কোর্টে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে মুম্বই পুরসভা নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এবং যে সময় তার দলের জন্য প্রচার এবং সাংগঠনিক কাজ করার কথা ছিল তখন তাকে নিজের এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়।
তার আরো অভিযোগ, ভিন্ন মত প্রকাশের কারণেই এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পাশাপাশি মি. চৌধুরীর যুক্তি, "তার কার্যকলাপ সন্ত্রাসের সাম্রাজ্য তৈরি করেছে" বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলেও স্থানীয় বাসিন্দা, দোকানদার এবং অন্যান্যদের মতের সঙ্গে তা মেলে না।
তার পক্ষের আইনজীবী পায়োষী রায় ও ইব্রাহিম হরবত আদালতে যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে মহারাষ্ট্র পুলিশ অ্যাক্ট-এর আওতায় এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার জারি করার যে ক্ষমতা রয়েছে, এক্ষেত্রে তার অপব্যবহার করা হয়েছে।
তারা আদালতে জানান, ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারার অধীনে প্রতিবাদ-সংক্রান্ত কোনো অপরাধকে এমপিঅ্যাক্ট-এর ৫৬ ধারার আওতায় আনা যায় না। ৫৬ নম্বর ধারা জীবন বা সম্পত্তির গুরুতর হুমকির মোকাবেলার জন্য তৈরি হয়েছিল।
বিচারপতি জামদার তার রায়ে জানিয়েছেন, বহিষ্কারের আদেশ পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল। মি. চৌধুরীর কার্যকলাপ এমপি অ্যাক্ট-এর আওতায় তাকে বহিষ্কারের ভিত্তি হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ (জোন ৬) এবং কোঙ্কন ডিভিশনের ডিভিশনাল কমিশনারের আদেশ বাতিল করে দেন বিচারপতি।
এসডিপিআই কী বলেছে?
এসডিপিআই-এর পক্ষ থেকে এই প্রসঙ্গে জানানো হয়েছে, "মহারাষ্ট্র সরকারের এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার বাতিল করার জন্য বম্বে হাই কোর্টের সিদ্ধান্ত সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য একটা ঐতিহাসিক বিজয়।"
"এই স্বেচ্ছাচারী আদেশ জারি করা হয়েছিল মুম্বইয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার জন্য, যদিও তার কথিত অপরাধ ছিল যে তিনি সিএএ বিরোধী আন্দোলন এবং জ্ঞানবাপী মসজিদ ইস্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক ইস্যুতে গণতান্ত্রিক বিক্ষোভে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।"
"আদালত দ্ব্যর্থহীনভাবে রায় দিয়েছে যে, সরকারি নীতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং স্লোগান দেওয়া সংবিধানের ১৯ এবং ২১ অনুচ্ছেদ দ্বারা সুরক্ষিত।"
বিচারপতি মাধব জামদার মন্তব্য করেছিলেন, "নাগরিকরা ভারত সরকারের দাস নয়।" এবং "পুলিশ অফিসাররা জনগণের সেবক, তারা প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর সেবক নয়।"
এই মন্তব্যকে "শক্তিশালী বার্তা" বলে উল্লেখ করেছে এসডিপিআই। "বিশেষত রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের জন্য" এটা একটা বার্তা বলেও জানিয়েছে তারা।
বিচারপতি মাধব জামদার
২০২০ সালে ভারতের বোম্বে হাই কোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসাবে নিযুক্ত হন মহারাষ্ট্রের পুণের বাসিন্দা মাধব জামদার। তার কর্মজীবন বেশ উল্লেখযোগ্য।
এক সময় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। পরে তার বাবা ও আইনজীবী জেডি জামদারের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন।
মুম্বাইয়ের কীর্তি কলেজ অব আর্টস, সায়েন্স অ্যান্ড কমার্স থেকে বিএসসি পাশ করার পর ১৯৮৮ সালে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যানালিটিকাল কেমিস্ট্রিতে ডিপ্লোমা অর্জন করেন মাধব জামদার। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে কাজ করার পর মুম্বাইয়ের 'নিউ ল কলেজ' থেকে এলএলবি পাশ করেন।
তার বাবা জে ডি জামদার ১৯৬০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বিচার বিভাগীয় পরিষেবায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন ১৯৮৯ সালে বোম্বে সিটি সিভিল অ্যান্ড সেশন কোর্টের বিচারক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। পরে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত মুম্বাই শিল্প আদালতের সদস্য হিসাবে কাজ করেছেন। ২০১১ সালে তার মৃত্যু হয়।
বিচারপতি মাধব জামদার তার কর্মজীবনে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও সাংবিধানিক বিষয় নিয়ে একাধিক মামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নর্দমা সাফ করতে গিয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু, পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যু যেমন নদী দূষণ, গাছ কাটা থেকে শুরু করে কলেজে অতিরিক্ত ফি আদায়-সহ বেশ কয়েকটা জনস্বার্থ মামলার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।
হাই কোর্ট তাকে একাধিক মামলায় অ্যামিকাস কিউরি বা আদালত বন্ধু হিসাবেও নিযুক্ত করেছিল। এর মধ্যে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ বৃদ্ধি, রেল দুর্ঘটনা এবং থানে কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকাকালীন মৃত্যু-সহ মামলাও আছে।
কয়েক বছর ভারত সরকারের পক্ষে সিনিয়র কাউন্সেল (গ্রুপ-২) হিসাবেও ওকালতি করেছেন তিনি।
তাছাড়া, মুম্বইয়ের পুনর্নবীকরণ প্রকল্পের সাথে জড়িত বেশ কয়েকটা টেন্যান্ট কমিটি এবং সমিতির আইনী উপদেষ্টাও ছিলেন। তিনি মহারাষ্ট্র মেডিকেল কাউন্সিল, সেরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া, মহারাষ্ট্র স্টেট টেক্সটাইল কর্পোরেশন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।