কুমিরের মুখে চলে যাচ্ছে কুকুর- বাগেরহাটে মাজারের এই ঘটনা নিয়ে কী জানা যাচ্ছে

প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী এই দিঘিতে কুমির দেখতে আসেন
ছবির ক্যাপশান, প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী এই দিঘিতে কুমির দেখতে আসেন
Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বাগেরহাটে খান জাহান আলীর মাজারের দিঘির ঘাটে একটি কুকুরকে কুমিরের টেনে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় এসেছে।

ঘটনাটি তদন্ত করার জন্য একটি কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। কমিটির সদস্য ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিয়া খাতুন জানান, তারা ইতোমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছেন।

এদিকে, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে যে কুকুরটি দেখা যাচ্ছে সেটিকে পুকুরের ঘাটে পা বেঁধে রাখা হয়েছিল কি না, বা পা ভেঙে রাখা হয়েছিল কি না- এমন অভিযোগ উঠলেও স্থানীয় পুলিশ বলছে, কুকুরটিকে জোর করে কুমিরের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগের কোনো প্রমাণ তারা পাননি।

মাজার কর্তৃপক্ষ বলছে, কুকুরটি শ্যাওলায় পিচ্ছিল হয়ে থাকা ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে পারেনি এবং ততক্ষণে কুমির কাছে চলে আসায় সমবেত লোকজনও ভয়ে কুকুরটিকে উদ্ধার করতে পারেনি।

তবে এ ঘটনায় যে বিষয়টি বেশি আলোচনায় এসেছে তা হলো অনেক মানুষ তীরে দাঁড়িয়ে যখন ঘটনাটি দেখছিলেন বা অনেকে যখন মোবাইলে ভিডিও করছিলেন তখন কুমিরটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল, আর কুকুরটি অনেকটা আকুল দৃষ্টি নিয়ে তীরে থাকা লোকজনের দিকে তাকাচ্ছিল।

প্রসঙ্গত, জনহিতকর কাজ ও ধর্ম প্রচারের জন্য সুপরিচিত সুফিসাধক খান জাহান আলী দিঘিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

দিঘির এক পাশে তার মাজার বা তার সমাধি সৌধ রয়েছে। এই মাজারে প্রতিদিন অনেককে নানা প্রাণি মানত করে তা কুমিরের মুখে ছুড়ে দিতে দেখা যায়।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কাছেই অবস্থিত ষাট গম্বুজ মসজিদও তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

খান জাহান আলীর মাজার
ছবির ক্যাপশান, খান জাহান আলীর মাজার

ভিডিওতে কী দেখা যাচ্ছে ও ঘটনা কী

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, দিঘির ঘাটের সিঁড়ির যে ধাপটিতে পানি আছে সেই ধাপ থেকে কুকুরটি উপরে ওঠার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পা ওঠাতে পারছিল না। ওদিকে দিঘিতে থাকা কুমিরটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।

দিঘির তীরে দাঁড়িয়ে অনেকে তা দেখছিলেন এবং কেউ কেউ তা মোবাইলে ভিডিও করছিলেন। কুকুরটি উঠে আসার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সিঁড়িতে উঠতে পারছিল না।

এক পর্যায়ে কুমিরটি একেবারে কাছে চলে আসলে কুকুরটি অনেকটা হাল ছেড়ে দেয় এবং কুমিরটি হা করে কুকুরটিকে মুখে নিয়ে পানিতে চলে যায়।

কিছুক্ষণ পর কুকুরটি পানিতে ভেসে উঠলে সেটিকে উদ্ধার করে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

স্থানীয় একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে শুক্রবার তিনি জেনেছেন যে ওই ঘটনাটি আসলে বুধবারের। তবে ভিডিও শুক্রবার থেকেই ব্যাপকভাবে প্রচার হতে শুরু করে।

সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই ভিডিওটি দেখে অভিযোগ করেন যে কুকুরটি পেছনের দুই পা আগেই ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। আবার কেউ অভিযোগ করেন যে, কুকুরটিকে জোর করে কুমিরের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

যদিও মাজারের খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এমন অভিযোগ মোটেও সত্যি নয়।

"বরং কুকুরটি ঘাটের সিঁড়িতে গিয়ে টাইলসে শ্যাওলার কারণে উঠতে পারেনি। লোকজন কুমিরের ভয়ে কুকুরটিকে বাঁচাতে এগুতে পারেনি। এই দিঘির কুমিরের আক্রমণে মানুষের আহত নিহত হওয়ার রেকর্ডও আছে," বলছিলেন তিনি।

মাজারের এই দিঘিতেই কুমিরটি বাস করে
ছবির ক্যাপশান, মাজারের এই দিঘিতেই কুমিরটি বাস করে

বাগেরহাট সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. শহিদুল ইসলাম বলছেন, তারা ঘটনাটি শোনার পর তদন্ত করে এমন অভিযোগের কোনো সত্যতা পাননি।

পুলিশ, সাংবাদিকসহ স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যার আগে মাজারে অনেক দর্শনার্থীই ছিল।

ওই দর্শনার্থী ও মাজারে কাজ করেন এমন কয়েকজন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, মাজার এলাকায় থাকা ওই কুকুরটি একটি শিশুসহ তিনজনকে কামড় দেওয়ার পর তার পায়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। কুকুরের কামড়ে মাজারের একজন কর্মীও আহত হন।

এরপর দৌড়ে কুকুরটি নারীদের জন্য করা দিঘির ঘাটের দিকে যায় সেখানে একজন নারীর তিনটি মুরগি মেরে ফেলে এবং একজনকে কামড় দেওয়ার চেষ্টা করে।

তখন কুকুরকে তাড়াতে আবার লাঠি দিয়ে আঘাত করা হলে কুকুরটি পায়ে আঘাত পেয়ে দিঘির মূল ঘাটের দিকে চলে যায়।

সেখানে গিয়ে মাজারের একজন গার্ডকে আঁচড় দেয়। তিনি পা ঝাড়া দিলে কুকুরটির সিঁড়ির পানিতে পড়ে যান।

এর মধ্যেই দিঘিতে থাকা কুমিরটি এগিয়ে আসতে থাকে। কুকুরটি কুমির দেখে ওঠার জন্য চেষ্টা করলেও সিঁড়ির শ্যাওলায় কারণে পিচ্ছিল হয়ে থাকায় সিঁড়ির উপরের ধাপে উঠে আসতে পারেনি।

ততক্ষণে কুমিরটি বেশ খানিকটা এগিয়ে আসায় লোকজন আর ভয়ে সামনে এগুতে পারেনি বলে বলছেন মাজারের খাদেম তারিকুল ইসলাম।

খান জাহান আলী মাজার
ছবির ক্যাপশান, খানজাহান আলী মাজার

এরপর শুক্রবার নাগাদ কুকুরটির কুমিরটির মুখে চলে যাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয় এবং তাতে দেখা যায় বহু লোক দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছেন বা ভিডিও করছেন।

মি. ইসলাম বিবিসিকে বলেছেন যে, "এখন অনেকে বলছে কুকুরকে পা বেঁধে কুমিরের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এটি সত্যি নয়। লোকজনের উচিত ছিল রক্ষা করা। কিন্তু আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি ভয়ে কেউ এগোয়নি সামনে। পুলিশ প্রশাসনকেও তদন্ত করতে বলেছি। কুমির হিংস্র প্রাণী। অনেক সময় হয়তো দেখেন কেউ কেউ কুমিরের গায়ে হাত দিচ্ছে। কিন্তু কুমিরের আক্রমণে এখানে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে"।

ইতিহাসবিদদের মতে, খান জাহান আলী মাজারের এই দিঘিতে শত শত বছর ধরেই কুমির রাখা হচ্ছে। কথিত আছে, খান জাহান আলীর সময়ে দুটি কুমির দিঘিতে আনা হয়েছিল। পরে তাদের নাম হয়ে ওঠে কালা পাহাড় ও ধলা পাহাড়।

এরপর তাদের বংশধর কুমিরদের মধ্যে পুরুষটিকে 'কালা পাহাড়' আর নারী কুমিরকে 'ধলা পাহাড়' ডাকা হতো। তাদের সবশেষ বংশধরের মৃত্যু হয়েছে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

এরপর ভারত থেকে কয়েকটি কুমির এনে সেখানে ছাড়া হয়। কিন্তু এর কয়েকটি নিজেদের মধ্যে মারামারি করে আহত হয় ও মারা যায়। সবশেষ যে দুটি ছিল তার একটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যায়।

এরপর থেকে এখন একটি কুমিরই দিঘিতে আছে।

ওদিকে ঘটনাটি তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসন যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে তারা ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন বাগেরহাট সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আতিয়া খাতুন।