প্রাচীন যেসব হজপথ দিয়ে দূর-দূরান্তের হাজিরা মক্কায় এসে সমবেত হতেন

১৯৬৭ সালের ২১শে মার্চ: সৌদি আরবের মক্কায় হজ পালনের সময় মুসলমানদের একটি ক্যাম্প বা শিবির।
ছবির ক্যাপশান, ১৯৬৭ সালে হাজিদের তাঁবু
    • Author, ওমাইমা আল-শাজলি
    • Role, বিবিসি অ্যারাবিক
  • Published
  • পড়ার সময়: ১২ মিনিট

"কল্পনা করুন, একদল হাজি চীন থেকে যাত্রা শুরু করলো, তুর্কি ভূখণ্ড ও মাওয়ারাউন-নাহর অতিক্রম করে, পারস্যে নেমে ইরাকে পৌঁছালো, সেখান থেকে আরব উপদ্বীপের হৃদয়ে কিংবা হিজাজ উপকূলে গিয়ে, নবীর নগরীর দিকে রওনা হয়ে শেষে মক্কা নগরে পৌঁছালো।"

কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক ডা. আতিফ মুতামিদের কল্পনায় আঁকা এই যাত্রা শুধু কল্পনা নয়; প্রায় এক হাজার বছর আগে অনেক হাজির বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল এটি। এই ভ্রমণ কখনও কয়েক মাস, কখনও এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতো, এমনকি ইবনে জুবাইর ও ইবনে বতুতার মতো পর্যটকদের ক্ষেত্রে বহু বছর পর তারা নিজ দেশে ফিরতেন।

সেই সময়ে হজ কেবল ধর্মীয় আচার ছিল না, বরং ছিল সংবাদ, জ্ঞান, ভাষা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি বড় সুযোগ। হজ বাণিজ্যের সুযোগও তৈরি করেছিল এবং এই পথগুলোতে স্থাপত্যকলার উন্নয়ন ঘটিয়েছিল।

ডা. মুতামিদ বিবিসি আরবিকে বলেন, "আধুনিকতার পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোতে হজ সভ্যতাগত বিশ্বায়নের ধারণা তৈরি করেছিল, যা বর্তমান 'গ্লোবালাইজেশন' শব্দটির বহু আগের।"

তিনি বলেন, "হজের বিশ্বায়ন ছিল বিনিময়মূলক ও গঠনমূলক, একচেটিয়া বা উপনিবেশবাদী নয়; এটি সংস্কৃতি, জ্ঞান ও উপলব্ধির পারস্পরিক নৈকট্য সৃষ্টি করেছে।"

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর মালয়েশিয়ার প্রথম হজ যাত্রায় কেপটাউন বন্দরে হাজার হাজার মালয়েশিয় নাগরিক পুণ্যার্থীদের বিদায় জানাচ্ছেন।
ছবির ক্যাপশান, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মালয়েশিয়া থেকে প্রথম হজযাত্রা

সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য

''এই পথগুলো শুধু হাজিদের হজের স্থানে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম ছিল না, বরং ছিল ইসলামি বিশ্বের প্রাণকেন্দ্রে প্রবাহমান ধমনী। সেইসাথে যা আবার উল্টো দিকেও প্রবাহিত হয়ে ইসলামি ঐতিহ্যকে নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছে এমন সময়ে যখন মুদ্রণ প্রযুক্তি ছিল না'', ডা. সাইয়্যেদ আবদুল মজিদ বকর তার বই হজপথের ভূগোলিক বৈশিষ্ট্য-এ উল্লেখ করেছেন।

এই পথগুলোর পাশে নির্মিত হয়েছিল মসজিদ, বিশ্রামাগার, প্রাসাদ, দুর্গ, খান, পানির ট্যাংক ও কূপ, যা ইসলামী সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করে। ইতিহাসবিদ ও ভ্রমণকারীরা এগুলোর বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।

এই পথগুলোতে তাফসির, হাদিস, ফিকহ, ভাষা ও সাহিত্যের আলেমদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ তৈরি হতো, যা বিস্তৃত ছিল দামেস্ক, জেরুজালেম, কুফা, বসরা, বাগদাদ এবং কায়রো হয়ে মক্কা ও মদিনা পর্যন্ত।

হাজিদের যাত্রাপথে "মানাজিল" নামে পরিচিত বিরতি কেন্দ্র ছিল, যেখানে তাঁরা বিশ্রাম নিতেন। এগুলো ছিল মানবিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অনন্য উদাহরণ।

চীন ও ভারত থেকে শুরু করে আটলান্টিক উপকূল এবং ইউরোপ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজিরা একত্র হতেন, এবং শেষ পর্যন্ত তারা আরব ও ইসলামী বিশ্বের প্রধান হজপথগুলোতে মিলিত হতেন, বিশেষ করে ইরাক, শাম ও মিসরের পথে।

মীকাত

মক্কার কাছাকাছি পৌঁছালে পাঁচটি নির্দিষ্ট স্থানের ভিত্তিতে কাফেলার গতিপথ নির্ধারিত হতো, যেগুলো মক্কার প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত।

এই মীকাতগুলো হলো ভৌগোলিক সীমা, যেখানে পৌঁছে হাজিদের ইহরাম পরিধান ও হজের নিয়ত করতে হয়:

  • যুলহুলাইফা (আবিয়ার আলী) – মদিনাবাসীর জন্য
  • জাতু ইরক – ইরাকবাসীর জন্য
  • কার্ন আল-মানাজিল (আস-সাইল আল-কাবির) – নাজদের জন্য
  • আল-জুহফা (রাবেগ) – মিসর ও শাম অঞ্চলের জন্য
  • ইয়ালামলাম (আস-সাদিয়া) – ইয়েমেনবাসীর জন্য
মক্কার চারপাশে পাঁচটি মীকাতের মানচিত্র
ছবির ক্যাপশান, মক্কার চারপাশে পাঁচটি মীকাতের মানচিত্র
দামেস্ক থেকে আগত হাজিদের উটের কাফেলা, ৩০ দিনের যাত্রা শেষে মক্কার কাছাকাছি
ছবির ক্যাপশান, দামেস্ক থেকে আগত হাজিদের উটের কাফেলা, ৩০ দিনের যাত্রা শেষে মক্কার কাছাকাছি

১- দারব জুবাইদা (জুবাইদা পথ)

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ইরাক থেকে হজের এই পথটিকে আরবরা আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদের স্ত্রী জুবাইদার নামানুসারে "দারব জুবাইদা" বলে ডাকত, যিনি কুফা শহর থেকে মক্কা পর্যন্ত এই পথটির উন্নয়নে কাজ করেছিলেন এবং পুরো পথ জুড়ে পানির ব্যবস্থা করেছিলেন।

ইরাকের হজযাত্রীদের জন্য এই পথটি নতুন ছিল না। ইসলামের পূর্বে প্রাচীনকাল থেকেই নবী ইব্রাহিমের সময় থেকে এই পথ ধরে "বাইতুল আতিক" বা প্রাচীন গৃহের দিকে যাত্রা করতেন। ইতিহাসবিদরা "আল-হিরা - মক্কা" পথের কথা উল্লেখ করেছেন।

আল-হিরা হলো খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে ইরাক বিজয়ের সময় ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে (১৭ হিজরি) কুফা শহরের পরিবর্তে গড়ে ওঠা বর্তমান কুফা থেকে ৩ মাইল দূরের একটি শহর।

আব্বাসীয় রাজবংশের শাসনামলে দ্বিতীয় হিজরি শতকে এই পথটির ব্যাপক উন্নতি ঘটে এবং পুণ্যার্থীদের কাফেলার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যারা বাগদাদকে ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

সৌদি আরবের ঐতিহাসিক গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক জার্নাল 'আল-দারাহ' উল্লেখ করেছে যে, মামুন বিন আল-রশিদ যখন খিলাফতের দায়িত্ব নেন, তখন তিনি "দারব জুবাইদা" পরিমাপের নির্দেশ দেন এবং দেখতে পান যে বাগদাদ থেকে মক্কা পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্য ছিল "৭১২ আরবি মাইল", যা প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার।

হাজিদের পানি পানের সুবিধার্থে একটি ঝর্ণা তৈরির কৃতিত্ব সাইয়্যেদা জুবাইদার, যা তার নামেই পরিচিত। মক্কা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে ওয়াদি নুমান থেকে এর উৎপত্তি, যা আজ অবধি একটি চিরস্থায়ী সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে।

কুফা থেকে ইরাকি পুণ্যার্থীদের জন্য জুবাইদা ট্রেইল বা পথের রুট দেখানো একটি মানচিত্র।
ছবির ক্যাপশান, কুফা থেকে ইরাকি তীর্থযাত্রীদের জন্য জুবাইদা ট্রেইল বা পথের রুট দেখানো একটি মানচিত্র।

দূরত্বের সংক্ষেপণ বা বাধা এড়ানোর জন্য রুটে কিছু পরিবর্তনসহ দারব জুবাইদার ব্যবহার প্রায় ১৩ শতাব্দী ধরে অব্যাহত ছিল। এরপরে ভ্রমণ মাধ্যমের পরিবর্তনের সাথে চতুর্দশ হিজরি শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বন্ধ হয়ে যায়।

ড. বকর তাঁর বইয়ে অনুমান করেছেন যে, "প্রতি বছর এই পথ ব্যবহারকারী কাফেলার সর্বনিম্ন আনুমানিক সংখ্যা"র ওপর ভিত্তি করে এই পথটি ব্যবহারকারী পুণ্যার্থীর সংখ্যা কয়েক কোটিতে পৌঁছায়।

আজ এই পথটি বিমানে পাড়ি দিতে প্রায় এক ঘণ্টা বা তার কিছু বেশি সময় লাগে, অথবা গাড়িতে দুই দিনের যাত্রা, আর উটের পিঠে ভ্রমণকারীর জন্য এক মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে।

ড. আতেফ মোয়াতামেদ এই সংক্ষিপ্তকরণকে "দূরত্ব এবং ভূগোলের মৃত্যু" হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, "গত শতাব্দী আমাদের হাজিদের সংখ্যায় একশ গুণ বেশি প্রাচুর্য এনে দিয়েছে; কিন্তু এটি তীর্থযাত্রীদের জন্য আর সেই একই অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক ভাবধারা বহন করে না।"

তিনি আরও যোগ করেন যে, যেটিকে তিনি "আধুনিকতার হজ" বলে বর্ণনা করেছেন তা মানুষের জন্য আচার-অনুষ্ঠান পালন সহজ করেছে; "কিন্তু এটি তাদের সেই ইবাদতের অনেক আত্মিক প্রকাশ থেকে বঞ্চিত করেছে, যেখানে তারা দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের সাথে মিলিত হতো।"

বসরা থেকে হিজাজে আসা হজের কাফেলার রুট দেখানো একটি মানচিত্র।
ছবির ক্যাপশান, বসরা থেকে হিজাজে আসা হজের কাফেলার রুট দেখানো একটি মানচিত্র।

২- আল-দারব আল-বাসরি (বসরা পথ)

ইরাকের এই পথটি (দারব জুবাইদা) এর চেয়ে কম পরিচিত ছিল, যা দক্ষিণ ইরাকের বসরা শহর থেকে হজযাত্রীদের বিশ্রামের জন্য অসংখ্য স্টেশন হয়ে মক্কা শহর পর্যন্ত যেত।

অ্যাটলাস বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. সামি আব্দুল্লাহ আল-মাগলুথ বলেন যে, দারব জুবাইদার তুলনায় এই পথটি পর্যাপ্ত মনোযোগ পায়নি। এর কারণ উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তানের মতো ট্রান্সঅক্সিয়ানা অঞ্চল থেকে আসা হজযাত্রীরা তুর্কমেনিস্তান, তারপর ইরানের খোরাসান হয়ে ইরাকে আসতেন এবং ককেশাস অঞ্চলের পুণ্যার্থীরাও এর সাথে যুক্ত হতেন।

আল-মাগলুথ বিবিসিকে ব্যাখ্যা করেন যে, এই হজযাত্রীরা সবাই জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার আসরে যোগ দিতে বাগদাদে যাওয়া পছন্দ করতেন। তাই ইরাকের রাজধানী কুফার কাছাকাছি হওয়ায় তাদের জন্য সবচেয়ে নিকটবর্তী পথ ছিল "দারব জুবাইদা", যা ইরাকের সুদূর দক্ষিণে অবস্থিত এবং বাগদাদ থেকে কুফার তুলনায় দ্বিগুণ দূরত্বে অবস্থিত বসরার চেয়ে সুবিধাজনক ছিল।

শামি বা লেভান্টাইন হজের কাফেলাগুলোর রুট দেখানো একটি মানচিত্র।
ছবির ক্যাপশান, শামি বা লেভান্টাইন হজের কাফেলাগুলোর রুট দেখানো একটি মানচিত্র।

৩- শামি হজের পথ (সিরীয় পথ)

শাম বা লেভান্ট অঞ্চল থেকে দুটি পথ বা ধারা ছিল; একটি বর্তমান জর্ডানে অবস্থিত মাআন শহরের দিকে যেত, তারপর তাবুক হয়ে মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছাত।

ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের দক্ষিণ অংশ থেকে আকাবা পর্যন্ত আরেকটি পথ ছিল, যা মিশরের হজের পথের সাথে মিলিত হওয়ার আগে (গাজা পথ) নামে পরিচিত ছিল।

শামের এই পথটি কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করেছে।

প্রথম ধাপটি ক্রুসেড যুদ্ধ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। যখন ক্রুসেডাররা জর্ডানের কারাক শহর দখল করে নেয়, যা পুণ্যার্থীদের কাফেলার একটি প্রধান স্টেশন ছিল।

এর ফলে তারা তাদের রুট পরিবর্তন করে ইরাকি হজের পথের সাথে যোগ দিতে বাধ্য হয় এবং এটি পুনরায় আগের অবস্থায় ফেরার আগে দুই শতাব্দী ধরে এভাবে চলেছিল।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, হিজাজ পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের মাধ্যমে শামি হজের পথে অভূতপূর্ব উন্নয়ন দেখা যায়, যার ফলে ভ্রমণের সময় এক মাসেরও বেশি সময় থেকে কমে প্রায় চার দিনে নেমে আসে। এই ট্রেনের স্টেশনগুলো শামের হজযাত্রীদের স্থলপথের স্টেশনগুলোর সাথে হুবহু মিলে যেত।

ড. বকরের মতে, উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের আদেশে ১৯০০ সাল থেকে এই রেলপথ নির্মাণে আট বছর সময় লেগেছিল এবং প্রথম ট্রেনটি ১৩২৬ হিজরির শাবান মাসে (১৯০৮ খ্রিস্টাব্দ) মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছায়।

পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় হিজাজ রেলপথ ধ্বংস হয়ে যায় এবং ১০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটি ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়।

দামেস্ক থেকে হিজাজ পর্যন্ত রেললাইনের রুটের মানচিত্র।
ছবির ক্যাপশান, দামেস্ক থেকে হিজাজ পর্যন্ত রেললাইনের রুটের মানচিত্র।
১৯০১ সালে মিনার পূর্ব দিকে পুণ্যার্থীবৃন্দ
ছবির ক্যাপশান, ১৯০১ সালে মিনার পূর্ব দিকে পুণ্যার্থীবৃন্দ।

৪- মিশরীয় হজের পথ

এই পথটি কায়রো বা (ফুস্তাত) থেকে শুরু হতো, যা মিশরের এবং আফ্রিকার প্রথম ইসলামিক রাজধানী, যা খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলে ২১ হিজরি বা ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে আমর ইবনুল আস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এই পথটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার এবং এটি পাড়ি দিতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগত।

ড. মোয়াতামেদ বিবিসিকে বলেন যে, মিশরের হজের কাফেলা আন্দালুস, মাগরেব (মরক্কো), উত্তর আফ্রিকা এবং আফ্রিকান মহাদেশের পশ্চিমে অবস্থিত তিকরুর দেশের পুণ্যার্থীদের পাশাপাশি সুদানের পুণ্যার্থীদেরও একত্রিত করত।

মোয়াতামেদের মতে, কিছু উৎস এমনকি ইঙ্গিত করে যে মিশরের হজের কাফেলা রাশিয়া এবং ইউরোপের মুসলিম পুণ্যার্থীদেরও স্বাগত জানাত, যখন তারা কৃষ্ণ সাগর থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে সামুদ্রিক পথ ধরে আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছাতেন এবং তারপর কায়রো থেকে রওনা হওয়া মিশরীয় কাফেলায় যোগ দিতেন।

ভৌগোলিক ড. বকরের মতে, মিশরীয় হজের পথটি চারটি ধাপ অতিক্রম করেছে।

প্রথম ধাপ: এই যাত্রাটি ছিল স্থলপথের, যা ফুস্তাতের (জুব উমাইরাহ) নামক একটি এলাকা থেকে শুরু হতো, যা আজ কায়রোর পূর্বে (বিরকাত আল-হাজ) নামে পরিচিত। সেখান থেকে উটের কাফেলা মরুভূমির মধ্য দিয়ে কুলজুমের দিকে যেত, যা সুয়েজ শহরের প্রাচীন নাম।

সুয়েজ থেকে হজযাত্রীদের কাফেলা সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম থেকে পূর্বে পাড়ি দিয়ে সিনাইয়ের কেন্দ্রে অবস্থিত এর প্রাচীন রাজধানী "নিখিল" শহর হয়ে কুলজুম সাগর (লোহিত সাগর) বরাবর বর্তমান জর্ডানের সুদূর দক্ষিণে অবস্থিত আইলা (আকাবা) শহরে পৌঁছাত।

আকাবা থেকে যাত্রাটি দক্ষিণের মাদইয়ান, তারপর আল-জার (আল-রায়িস)-এর দিকে অগ্রসর হতো, যা মদিনা মুনাওয়ারার প্রাচীন বন্দর ছিল। সাধারণত মক্কায় যাওয়ার আগে এটি হজযাত্রীদের প্রথম স্টপেজ হতো।

সৌদি অ্যাটলাস বিশেষজ্ঞ ড. মাগলুথ বলেন যে, হজযাত্রীদের মন মক্কায় আচার-অনুষ্ঠান পালনের আগে ইসলামের নবী মুহাম্মদের শহর জিয়ারত করার জন্য "আকুল" হয়ে উঠত, তাই তারা "নবীর প্রতি সম্মান ও সালাম জানানোর তাগিদে" প্রথমে মদিনার দিকে যেতেন।

দ্বিতীয় ধাপটি নীল নদ দিয়ে ফুস্তাত থেকে মিশরের কুস পর্যন্ত শুরু হতো, তারপর হজযাত্রীরা কুস থেকে মিশরের দিকে কুলুম সাগরের (লোহিত সাগর) উপকূল পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতেন।

সেখানে মিশরের দক্ষিণে অবস্থিত (আইদাব) বন্দর ছিল। আইদাব থেকে হজযাত্রীরা (জালাব) নামক ছোট নৌকায় উঠতেন, যা পেরেক ছাড়াই দড়ি দিয়ে বাঁধা কাঠ দিয়ে তৈরি হতো। এগুলো দিয়ে তারা জেদ্দার দিকে যেতেন এবং সেখান থেকে উটের পিঠে মক্কা ও মদিনায় পৌঁছাতেন।

মিশর এবং আফ্রিকা থেকে পুণ্যার্থীদের কাফেলার রুট দেখানো একটি মানচিত্র।
ছবির ক্যাপশান, মিশর এবং আফ্রিকা থেকে হজযাত্রীদের কাফেলার রুট দেখানো একটি মানচিত্র।

ড. আতেফ মোয়াতামেদ বলেন যে মধ্যযুগের ভ্রমণকারীরা আইদাব বন্দরের এই নামকরণের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে এটি হজযাত্রীদের কষ্ট ও ক্লান্তি (আযাব) থেকে উদ্ভূত হয়েছে।

মিশরীয় ইতিহাসবিদ তাকিউদ্দিন আল-মাকরিজি উল্লেখ করেছেন যে, মিশর এবং মরক্কোর হজযাত্রীরা সুয়েজ ও সিনাই হয়ে স্থলপথের পরিবর্তে দুই শতাব্দী ধরে এই পথটি ব্যবহার করেছিলেন। ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দ বা ৪৫০ হিজরি থেকে ক্রুসেড যুদ্ধের কারণে এই প্রাচীন পথটি পরিহার করে নতুন পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল যাতে বিপদ এড়ানো যায়।

তৃতীয় ধাপ: সুয়েজ ও সিনাই হয়ে প্রথম স্থলপথে প্রত্যাবর্তন।

শাজার আল-দুর ১২৪৭ খ্রিস্টাব্দ বা ৬৪৫ হিজরিতে এই প্রত্যাবর্তনের সূচনা করেন। শাজার আল-দুর হলেন আইয়ুবীয় সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুবের মৃত্যুর পর ইসলামি ইতিহাসে মিশরের সিংহাসনে বসা প্রথম নারী।

এই রুটে সামান্য কিছু পরিবর্তন হয়েছিল, যেমন আল-জারের পরিবর্তে ইয়ানবু বন্দরে নোঙর করা।

চতুর্থ ধাপ: কায়রো থেকে সুয়েজ পর্যন্ত ট্রেনে যাত্রা, যা ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ বা ১২৭৫ হিজরিতে ওয়ালি মোহাম্মদ সাঈদ পাশার আমলে নির্মিত হয়েছিল।

সুয়েজ থেকে হজযাত্রীরা সমুদ্রপথে জেদ্দা বন্দরে যেতেন এবং সেখান থেকে মক্কা ও মদিনায় যেতেন।

আজ, মিশরীয় হজযাত্রীরা কায়রো থেকে জেদ্দায় বিমানে দুই ঘণ্টায় ভ্রমণ করেন এবং সেখান থেকে মক্কা বা মদিনায় যান, যেখানে অতীতে তাদের মরুভূমিতে চল্লিশ দিন ভ্রমণ করতে হতো।

ড. মোয়াতামেদ বিবিসিকে মন্তব্য করেছেন যে, তাঁর ভাষায় "গ্রাসকারী বিশ্বায়নের" যুগে আধুনিক হজযাত্রীদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে "যা তাদের কোনো আত্মিক লাভ ছাড়াই কেবল খাদ্য ও পানীয় ভোগের আকাঙ্ক্ষা এবং মোবাইল ফোনের ক্যামেরার ছবির বন্দি করে রাখতে চায়, যা নিয়ে মানুষ কাবার চত্বরে মগ্ন থাকে, অথচ তাদের পূর্বপুরুষরা সেখানে জিকির, তাসবিহ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।"

পশ্চিম মধ্য এবং মধ্য আফ্রিকা থেকে হিজাজ পর্যন্ত আফ্রিকান পুণ্যার্থীদের প্রধান রুটগুলো।
ছবির ক্যাপশান, পশ্চিম মধ্য এবং মধ্য আফ্রিকা থেকে হিজাজ পর্যন্ত আফ্রিকান পুণ্যার্থীদের প্রধান রুটগুলো।

৫- আফ্রিকান হজের পথ

এটি উল্লেখযোগ্য যে আফ্রিকায় হজযাত্রীদের কাফেলার জন্য অন্যান্য পথও ছিল, তবে ড. মাগলুথের মতে সেগুলো মিশরীয় পথের চেয়ে কম পরিচিত ছিল, যেমন পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার হজযাত্রীদের স্থলপথ।

তিনি বিবিসিকে ব্যাখ্যা করেছেন যে, এটি "এমন একটি পথ যা এর বিপজ্জনক প্রকৃতির কারণে সাময়িক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল ছিল", কারণ এই পথের যাত্রা প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত।

এই স্থলপথটি পূর্ব দিকে সুন্নার শহর হয়ে সুদানের খার্তুম, তারপর বারবার এবং লোহিত সাগরের সুদানি বন্দর সুয়াকিন পর্যন্ত যেত, যেখান থেকে হজযাত্রীরা সমুদ্রপথে বিপরীত দিকে জেদ্দা বন্দরে পৌঁছাতেন। এই যাত্রায় হয়তো এক বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যেত।

হিজাজে আফ্রিকান হজের রুট দেখানো একটি মানচিত্র।
ছবির ক্যাপশান, হিজাজে আফ্রিকান হজের রুট দেখানো একটি মানচিত্র।

আফ্রিকার শিং (হর্ন অব আফ্রিকা) অঞ্চলের দেশগুলো, যা মিশর ও শামে জাইলা দেশ নামে পরিচিত ছিল, সেখানকার হজযাত্রীরা ভারত মহাসাগরের উপকূল ধরে সোমালিয়ার জাইলা বন্দর পর্যন্ত একটি স্থলপথ ব্যবহার করতেন। সেখান থেকে বাব আল-মান্দাব প্রণালি হয়ে জেদ্দায় যেতেন।

এছাড়াও ভারত মহাসাগরের কমোরোস দ্বীপপুঞ্জ থেকে জাঞ্জিবার হয়ে এডেন উপসাগর এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালি পেরিয়ে জেদ্দা বন্দর পর্যন্ত একটি সামুদ্রিক পথ ছিল।

প্রাচীনকালে ইয়েমেন থেকে আসা হজযাত্রীদের কাফেলার রুট দেখানো একটি মানচিত্র।
ছবির ক্যাপশান, প্রাচীনকালে ইয়েমেন থেকে আসা হজযাত্রীদের কাফেলার রুট দেখানো একটি মানচিত্র।

৬- ইয়েমেনি হজের পথ

এই পথটি সানা থেকে শুরু হয়ে সয়দা এবং জুরাশ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের কাছাকাছি আসির পর্বতমালা, তারপর বিশা, তাবালা কেন্দ্র এবং তুরাবাহ শহর হয়ে কারনুল মানাজিল (যা আজ আস-সায়লুল কাবির নামে পরিচিত) পর্যন্ত পৌঁছাত, যা নজদবাসীদের হজের মিকাত।

কখনও কখনও ইয়েমেনের হজযাত্রীরা তাবালা থেকে লোহিত সাগরের উপকূলে ইয়েমেনবাসীদের মিকাত ইয়ালামলামের পথ ধরতেন, যা মক্কা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং বর্তমানে সৌদি আরবের আল-লিথ গভর্নরেটের অধীনস্থ (আস-সাদিয়া) নামে পরিচিত।

ড. মাগলুথ উল্লেখ করেন যে, কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন রশিদ আল-থুনাইয়ান এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, প্রাচীনকালে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত পথটিই ইসলামের পর ইয়েমেনের হজযাত্রীরা হিজাজে পৌঁছানোর জন্য ব্যবহার করেছিলেন।

ওমান থেকে পুণ্যার্থীদের কাফেলার রুট দেখানো একটি মানচিত্র।
ছবির ক্যাপশান, ওমান থেকে হজযাত্রীদের কাফেলার রুট দেখানো একটি মানচিত্র।

ওমানি হজের পথ

এই পথটি দুটি রুটে বিভক্ত ছিল; একটি ওমান থেকে (ইয়াবরিন) পর্যন্ত যেত, যা রিয়াদের ২১০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং সৌদি আরবের রুব আল-খালি মরুভূমির উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি মরূদ্যান।

ড. মাগলুথের মতে, এর পর কাফেলাগুলো ইয়ামামা এবং তারপর দারিয়াহর দিকে যেত, যা বসরা ও বাহরাইন (আরব উপদ্বীপের পূর্ব অঞ্চল) থেকে আসা হজযাত্রীদের মিলনস্থল ছিল।

আর দ্বিতীয় রুটটি বর্তমান ওমান সালতানাতের নিজওয়া প্রদেশের ফিরাক গ্রাম, তারপর আওকালান, তারপর হাবাত উপকূল এবং এরপর আল-শিহর পর্যন্ত যেত, যা ভারত মহাসাগরে হাজরামাউতের প্রবেশদ্বার ছিল।

এর পর কাফেলাগুলো মক্কার দিকে যাওয়া প্রধান ইয়েমেনি পথগুলোর একটি ধরে যাত্রা করত।

ইয়েমেনে, ওমানি হজযাত্রীরা হয় লোহিত সাগরের সমান্তরালে জেদ্দা হয়ে মক্কা পর্যন্ত উপকূলীয় হজের পথ, অথবা ইয়েমেন থেকে মক্কা পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ পথ ব্যবহার করতেন।

আল-আহসা হজের রুটে কাফেলাগুলোর পথের মানচিত্র।
ছবির ক্যাপশান, আল-আহসা হজের রুটে কাফেলাগুলোর পথের মানচিত্র।

৮- হাজারি হজের পথ (আল-আহসা পথ)

এই পথটি আরব উপদ্বীপের পূর্ব অঞ্চলের হজযাত্রীদের অন্তর্ভুক্ত করত, যা আজকের উপসাগরীয় দেশগুলো নামে পরিচিত এবং এর দৈর্ঘ্য আল-আহসা থেকে শুরু করে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার ছিল।

আজকের পূর্ব সৌদি আরবে অবস্থিত আল-আহসা শহরটিকে প্রাচীনকালে (হাজার) বলা হতো এবং এটি বসরার দক্ষিণ থেকে ওমান উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অঞ্চলে অবস্থিত ছিল যাকে (বাহরাইন) বলা হতো।

এর সাথে আজকের একই নামের উপসাগরীয় রাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক নেই, যা ড. মাগলুথের মতে প্রাচীনকালে (উয়াল) দ্বীপ নামে পরিচিত ছিল।

এই পথটি পারস্য উপসাগরের উপকূলের কাতিফ শহর (যাকে প্রাচীনকালে আল-খাত বলা হতো) থেকে শুরু হতো, মুবাররাজ হয়ে যা কাতার থেকে আসা কাফেলাগুলোর হাজরা থেকে রওনা হওয়ার আগে একত্রিত হওয়ার স্টেশন ছিল, এরপর নজদ হয়ে মক্কায় পৌঁছাত।

সৌদি আরবের জেনারেল অথরিটি ফর সার্ভে এবং মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত মাগলুথের মতে, এই পথটি কাতিফের পার্শ্ববর্তী জুবাইল থেকে শুরু হয়ে নজদের কেন্দ্রস্থল দিয়ে মদিনা পর্যন্তও যেতে পারত।

ছবিটি ১৯৩৪-১৯৪০ সালের দিকে সৌদি আরবে তোলা হয়েছিল।
ছবির ক্যাপশান, ছবিটি ১৯৩৪-১৯৪০ সালের দিকে সৌদি আরবে তোলা হয়েছিল।

মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া হজযাত্রীদের মহাকাব্যিক যাত্রাগুলোর দিকে তাকালে, ইসলামের পবিত্র ভূমি থেকে দূরে বসবাসকারী মুসলমানদের কাছে 'হাজি' উপাধির গভীর গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।

সাইয়্যেদ আবদেল-মাজিদ বকর তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন, "তারা দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন, পাথর ও শিলা তাদের পা রক্তাক্ত করেছিল এবং প্রাচীন গৃহের যাত্রায় তারা ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করেছিলেন।"

আজ, ড. আতেফ মোয়াতামেদ "আধুনিক যুগের" হজের সমালোচনা করেন, যা এর সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যার প্রকাশ ঘটে খাদ্য ও পানীয় ভোগের আকাঙ্ক্ষা এবং মোবাইল ফোনের ক্যামেরার ছবিতে "যা মানুষ কাবার চত্বরে দাঁড়িয়ে ব্যবহার করে, অথচ তাদের পূর্বপুরুষরা সেখানে জিকির, তাসবিহ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।"