অনুমতি ছাড়া কারো ছবি তুললেই কি অপরাধ?

আলোর বিপরীতে ধারণ করা এক যুগলের প্রতীকী ছবি।
ছবির ক্যাপশান, কারো ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি গোপনে তুললে বা ছড়িয়ে দিলে সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে
    • Author, মরিয়ম সুলতানা
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ এবং মুহূর্তেই অন্যের কাছে পাঠানো এখন অনেক সহজ। তবে প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার সঙ্গে বেড়েছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগও।

সম্প্রতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তিনি তার সহপাঠী ও রুমমেটদের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় ছবি অনুমতি ছাড়া তার প্রেমিকের কাছে পাঠিয়েছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমে এসেছে, এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে হল প্রশাসন এবং ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তবে এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রায়ই কারও সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ বা অন্যের কাছে পাঠানোর অভিযোগ সামনে আসে।

সাম্প্রতিক কয়েক মাসেও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশ নিয়ে একাধিক ঘটনা আলোচনায় এসেছে। কখনও কোনো অভিনেতার পরিবারের সদস্যকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, কখনও জনসমক্ষে ধারণ করা ভিডিও নিয়ে বিতর্ক, আবার কখনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও ভুক্তভোগী হন।

অন্যদিকে, এমন ঘটনাও আছে যেখানে গোপনে ধারণ করা ছবি বা ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অন্য কোনো অনিয়ম প্রকাশ্যে এসেছে।

ফলে প্রশ্ন ওঠে যে জনস্বার্থে কোনো তথ্য প্রকাশ আর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মধ্যে সীমারেখা কোথায়? কোন পরিস্থিতিতে এটি আইনগতভাবে দণ্ডনীয়, আর কোন ক্ষেত্রে জনস্বার্থের প্রশ্নটি বিবেচনায় আসে? এই প্রতিবেদনে সেই বিষয়গুলোই তুলে ধরা হলো।

একাধিক টেলিভিশন স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণীর প্রতীকী ছবি।
ছবির ক্যাপশান, একাধিক টেলিভিশন স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণীর প্রতীকী ছবি।

ছবি বা ভিডিও ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়া কখন অপরাধ?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা বলছেন, অনুমতি ছাড়া কারও ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দিলে অনেক ক্ষেত্রেই আইনের আওতায় সেগুলো অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

বিশেষ করে কারও ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি-ভিডিও, কিংবা এমন পোশাক পরা ছবি যেখানে শরীরের অংশ প্রকাশ পাচ্ছে– অনুমতি ছাড়া এসব অন্যের কাছে পাঠানো বা ছড়িয়ে দিলে একাধিক আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অভিযোগ ভেদে সেটি হতে পারে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬, এমনকি ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অথবা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে; যেগুলোর মাধ্যমে নারী পুরুষ নির্বিশেষে ভুক্তভোগী আইনি সুরক্ষা ও প্রতিকার পেতে পারেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, "ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ছড়ালে পর্নোগ্রাফি আইনে ১০ বছরের সাজার বিধান আছে। সাইবার সুরক্ষা আইনেও ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান আছে। এ ধরনের ছবি আদান-প্রদানও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।"

উদাহরণ হিসেবে বলেন, "ধরা যাক, কেউ কোথাও বসে আছে বা সিগারেট খাচ্ছে, সেই ছবি কেউ তুলে ছড়িয়ে দিলো। আবার, কেউ কোথাও নামাজ পড়ছে এবং সেই ছবি সামনে এলে কেউ বলবে না যে অশ্লীল। কিন্তু যেহেতু আমাদের সমাজে শ্লীলতা-অশ্লীলতার মানদণ্ড নাই, তাই কেউ নাচলে সেটাই খারাপ মনে করা হয়, কারও মাথায় ঘোমটা না থাকলেও গালি শুনতে হয়।"

"তো, তার ছবিগুলো ছড়ানোর কারণে কারণে সে আক্রমণের শিকার হলো। অর্থাৎ, যখনই সে হেয় প্রতিপন্ন হলো, তার বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হলো; তখন যে উদ্দেশ্যই ছবি বা ভিডিও দেয়া হোক, বিষয়টি আইনের আওতায় চলে আসে। সাধারণত কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা ভিডিও করতে গিয়ে অন্যদের ছবিও প্রচার করে দিচ্ছে," বলছিলেন তিনি।

"এতে যদি কারও মানহানি ঘটে, কেউ যদি বলে যে আমি চাচ্ছিলাম না আমার ব্যক্তিগত জীবনের ছবি-ভিডিও সামনে আসুক, তাহলে তার তখন মামলা করার সুযোগ আছে।"

মিজ হাসান আরও বলছিলেন, অনেক সময় পার্কে কেউ বা কারা ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের ভিডিও করে বলে যে 'আপত্তিকর অবস্থায়' ধরা হয়েছে।

তার মতে, প্রয়োজনে তাদের বাবা-মাকে জানানো যেতে পারে। কিন্তু তাদের ভিডিও ধারণ করে প্রচার করে দেওয়াটা সাইবার অপরাধ। ভুক্তভোগীদের জন্য এটা মানহানিকরও।

এমনকি, কারও ছবির ওপর মানহানিকর কোনো ক্যাপশন বা বক্তব্য জুড়ে দেওয়া হলেও বাংলাদেশের আইনে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী মানহানির মামলা করতে পারে।

একই ধরনের মত দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

তার মতে, "আইনের কথা হলো, কোনো ভিডিও ধারণ করা ও প্রকাশের কারণে কারও প্রাইভেসি নষ্ট হচ্ছে, মানহানি হচ্ছে...যেমন- কোনো নারী হয়তো তার প্রেমিকের সাথে গল্প করছে বা চা খাচ্ছে দাঁড়িয়ে, এটা কেউ ধারণ করে ছেড়ে দিলো... কিন্তু এটা তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন... এজন্য তো তাকে সমাজে বা তার পরিবারে জবাবদিহি করতে হতে পারে... অর্থাৎ, ক্ষতি হতে হবে এমন কথা নেই, যদি ব্যক্তিগত মানসম্মানও ক্ষুণ্ণ হয়, আইনে সেটাও অপরাধ।"

এছাড়া, যদি আসল বা এআই দিয়ে বানানো ছবি-ভিডিও দিয়ে কাউকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়, সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ অনুযায়ী সেটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

আপত্তিকর বার্তা পড়ে কাঁদছেন এক তরুণী। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার প্রতীকী ছবি।
ছবির ক্যাপশান, আপত্তিকর বার্তা পড়ে কাঁদছেন এক তরুণী। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার প্রতীকী ছবি।

কখন এটি অপরাধ হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে?

তবে দুই আইনজীবীই বলছেন, অনুমতি ছাড়া ধারণ করা প্রতিটি ছবি বা ভিডিও একইভাবে দেখা যায় না। কোনো ছবি বা ভিডিও জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হলে বেশিরভাগ সময়েই আদালত সেটিকে ভিন্নভাবে বিবেচনা করতে পারে।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদের ভাষ্য, দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ বা অন্য কোনো অপরাধের প্রমাণ হিসেবে কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা হলে সেটির উদ্দেশ্যও আদালত বিবেচনায় নেবে।

তবে তিনি এও বলেন, "একইভাবে গোপনে তাদের ছবি-ভিডিও ধারণের কারণে তারা যদি মনে করে যে অনুমতি ছাড়া করা হয়েছে, তখন তারাও পাল্টা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।"

সেক্ষেত্রে আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য, ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য, জনস্বার্থ এবং ক্ষতির বিষয়গুলো বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।

যদিও কারও কোনো অপরাধের ছবি বা ভিডিও সামনে আসার পর সাধারণত তিনি পাল্টা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না উল্লেখ করে মি. মোরসেদ বলেন, "অনেক সময় সাংবাদিকরা ঘুষ নেওয়ার ছবি প্রকাশ করে দেয়। কিন্তু এই কারণে কি ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়?"

"কারণ যিনি মামলা করবেন, তার তো সেই নৈতিক শক্তিই নাই। অপরাধ করে এমনিতেই তিনি চাপে থাকেন। এর মাঝে তিনি আবার আরেকজনের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাবে যে আমার প্রাইভেসি নষ্ট হয়েছে... এমনটা এখনও দেখিনি। ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা নাই।"

"তারপরও যদি ছবি/ভিডিও ধারণকারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়ে হয়ে যায়, তখন উনি বলবেন যে দেশের জন্য করেছেন। তখন তাকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের আছে।"

ইশরাত হাসানও বলেন, "দুর্নীতি-অপরাধের আর ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও প্রচার আলাদা বিষয়। কোথাও রেপ হলো। সেই অপরাধের ছবি-ভিডিও দেওয়া যাবে...আদালতে।"

তবে তিনি এও জানান, যদি এমন হয় যে কারও ছবি প্রচার হয়নি, কিন্তু তোলা হয়েছে বা আদান-প্রদান হচ্ছে, সেখানে কী হবে বাংলাদেশের আইনে তা এখনও স্পষ্ট না।

অর্থাৎ, বালাদেশের কারও অনুমতি ছাড়া শুধু ছবি তোলার ঘটনাকে সব ক্ষেত্রে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। তবে কেউ যদি মনে করেন, তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়েছে বা তিনি সংক্ষুব্ধ হয়েছেন, কেবল তখনই বিষয়টি আইনি প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

এটি ব্যাখ্যা করতে তিনি পাবলিক প্লেস প্রসঙ্গে আনেন। পাবলিক প্লেস হল যা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন না। যেমন: বাস স্টেশন, রেল স্টেশন, ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস, শপিং মল।

"এই ধারণা সঠিক না যে পাবলিক প্লেসে ছবি তুললে কোনো সমস্যা নাই। পাবলিক প্লেসে বসলেই কেউ পাবলিক প্রোপার্টি না। এখানেও কারও ব্যক্তিগত মুহূর্ত থাকতে পারে। কেউ তার প্রেমিক বা এমন কারও সাথে কথা বলতে পারে যা সে চাচ্ছে না যে প্রকাশ হোক," বলেন তিনি।

"পাবলিক প্লেসে তোলা কোনো ছবি-ভিডিও প্রকাশের ফলেও কেউ আপত্তি তুলতে পারে। কিছু না হলেও সে সিভিল কোর্টে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কীভাবে হলো, এটা তাকে দেখাতে হবে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এটা আইনের পেরিফেরিতে চলে আসবে," তিনি বলেন।