ঈদে বাড়ি ফেরার পথে রড-বোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত, এই দায় কার?

ছবির উৎস, Abdullah Al Numan
ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে একটি রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়েছেন এবং ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
মহাসড়কের সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের নাম-পরিচয় এখনও জানা যায়নি। আহতরা এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন।
টাঙ্গাইলের যমুনা সেতু পূর্ব থানা'র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার ফুয়াদ রুহানি বিবিসি বাংলাকে জানান, নিহতদের মরদেহ মর্গে রাখা আছে।
নিহতদের পরিবার এসে শনাক্ত করার পর তাদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে যে ওই যাত্রীরা ঈদের ছুটি কাটাতে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন। মূলত, যাতায়াত খরচ কমানোর জন্যই তারা এভাবে ভ্রমণ করছিলেন।
যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বলছে, এই দুর্ঘটনার দায় রাষ্ট্র ও পুলিশের।
তবে পুলিশ বলছে, লুকিয়ে ট্রাকে করে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছিল। এই ঘটনায় তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে।
ট্রাকের নীচে ২১ জন, চালক-সহকারী পলাতক
আহত এবং ওই ট্রাকে থাকা অন্যান্য যাত্রীদের সাথে কথা বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী জানতে পেরেছে, ওই ট্রাকের যাত্রীদের বেশিরভাগের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলায়।
মান্দা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বিবিসি বাংলাকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেছেন, ''বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি, নিহতদের অধিকাংশই মান্দা উপজেলার। শোনা যাচ্ছে, অন্তত ১৩ জনের বাড়ি মান্দায় হতে পারে।''
''নিহতদের পরিচয় জানি না এখনও, তবে শুনেছি তারা চুলের ব্যবসা করতেন। ঈদের ছুটিতে তারা চট্টগ্রাম থেকে নওগাঁ ফিরছিলেন বলে জানতে পেরেছি'', যোগ করেন তিনি।
এদিকে, এলেঙ্গা ফায়ার স্টেশনের ইনচার্জ আতাউর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান, আজ সোমবার ভোর ৪টা ৫ মিনিটে দুর্ঘটনার খবরটি পান এবং এরপর ঘটনাস্থলে যান।
"আমরা গিয়ে দেখি ট্রাকটা উল্টে পড়ে আছে। ট্রাকটা রড-বোঝাই ছিল। ওই রডের ওপর যাত্রীরা বসে ছিল। জীবিতদের ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে আমরা জেনেছি, ট্রাকটিতে ২৫-২৬ জন যাত্রী ছিল। এদের কয়েকজন ছিটকে পড়ে ও আহত হয়। বাকি ২১ জন পড়ে রডের নীচে।"

ছবির উৎস, Abdullah Al Numan
স্থানীয় ও পুলিশের সহযোগিতায় ট্রাকের তল থেকে সবাইকে বের করা হয়। কিন্তু উদ্ধারকৃতদের ১৫ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তাদের মরদেহ যমুনা সেতু পূর্ব থানায় হস্তান্তত করা হয়েছে এবং বাকী ছয়জনকে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা আতাউর রহমান আরও জানান, তারা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে যে ওই ট্রাকের প্রায় সবার বাড়ি নওগাঁ, রাজশাহী ও চাপাইনবাবগঞ্জ এলাকায়।
দুর্ঘটনার কারণ জানা গেছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন যে ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। হতে পারে যে ড্রাইভার হয়তো ঘুমাচ্ছিলো বা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল।
"কারণ ট্রাকটি অন্য কোনো গাড়ির সাথে লাগেনি। সামনে-পেছনে কোনো আঘাত নেই। যারা গাড়িতে ছিল, তারাও বলছে গাড়ির সাথে অন্য কিছু লাগেনি।"
তবে ওই ট্রাকের ড্রাইভার ও ড্রাইভারের সহকারী ঘটনার পরপরই পালিয়েছে।
ড্রাইভার ও ড্রাইভারের সহকারী খুব বেশি আহত হয়নি শুনেছি। যাত্রীরা আহত হয়েছে একারণ তারা ছিল রডের ওপরে, পেছনে," যোগ করেন তিনি।
ঈদের ছুটিতে মানুষের মৃত্যু, এই দায় কার?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
টাঙ্গাইলের স্থানীয় সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমান ঘটনাস্থলে ওই ট্রাকের যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানান, কম টাকার জন্য তারা ট্রাকে উঠেছিলেন।
রবান্নী নামক এক যাত্রী বলেছেন, তারা ঘুমের অবস্থায় ছিলাম। হঠাৎ করেই দেখি ট্রাকটি উল্টে গিয়েছে। এর পরে আর কিছুই বলতে পারবো না। আমরা ট্রাকে ২২ জন যাত্রী ছিলাম।
ট্রাকের আরেক যাত্রী তরিকুল ইসলাম বলেন, ট্রাকটি নওগা জেলার মান্দা উপজেলা যাবে। আমরা চাপাইনবাবগঞ্জের যাওয়ার জন্য চট্টগ্রামের অলংকার থেকে উঠেছিলাম। মূলত বাসের ভাড়া জনপ্রতি ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা চাওয়া হয়। কম টাকার জন্য আমরা ট্রাকে উঠি। আমরা চার জনে ২৩০০ টাকা দেই। আমার দুইজন মারা গিয়েছে।
সড়ক অব্যবস্থাপনা ও যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই দুর্ঘটনার মূল দায় মালিক সমিতিকে দিয়েছেন।
তার ভাষায়, ''এখানে স্পষ্টত মালিক সমিতি দায়ী। কারণ ঈদের আগে মালিক সমিতি বলেছিল, তারা ঈদের সময় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করবে না''।
কিন্তু "এখন বাসে বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। স্বাভাবিকভাবে চট্টগ্রাম থেকে নওগাঁয় ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা ভাড়ায় যাওয়া যায়। কিন্তু ঈদের সময় এই ভাড়া বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার। এখন কারও পরিবারে চারজন সদস্য থাকলে একটা সাধারণ পরিবারের পক্ষে আট হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে ঈদে বাড়ি যাওয়া সম্ভব না," বলেন মি. চৌধুরী।
পাশাপাশি, রাষ্ট্রকেও সমানভাবে দায়ী করেন তিনি।
তিনি বলেন, "যে শ্রমিকরা রাষ্ট্র তৈরি করছেন, তারা ঈদে বাড়ি যাবেন, রাষ্ট্র তাদেরকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। পরিবহন ক্ষেত্রে আমরা অমানবিকই রয়ে গেলাম।"

ছবির উৎস, Abdullah Al Numan
এদিকে, হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, "ওই লোডেড ট্রাকের ডালা ছিল অনেক উঁচু। ট্রাকের ভেতরে যে মালামাল বা মানুষ আছে, তা দেখা যায় না। কাজেই, আমাদের সামনে দিয়ে যখন গেছে, তখন আমাদের ফোর্স বা পুলিশ সেটা দেখতে পায়নি। হয়তো ওরা (যাত্রী) ঘুমিয়ে ছিল। আর যেহেতু রড ভর্তি ছিল, রডটা তো নীচু, উপরে উঠে নাই। তাই, ওখানে যে লোক ছিল, সেটা হাইওয়ে পুলিশ দেখতে পারে নাই। বাইরে থেকে দেখা যায় না। অ্যাক্সিডেন্ট যখন করছে, তখন বুঝতে পারছে যে লোক ছিল।"
তিনি বলেন, "আমরা সবসময় ডিসকারেজ করি লোডেড কোনো গাড়িতে না আসার জন্য। লোকগুলো যেখান থেকে উঠছে, পুলিশকে হয়তো ফাঁকি দিয়েই উঠছে। আর যেহেতু ডালা অনেক উঁচু, দেখা যায় নাই...তাই, হাইওয়ে পুলিশ যে নামিয়ে দিবে, সেটাও করতে পারে নাই।"
তিনি জানান, "লোডেড গাড়িতে যাত্রী ওঠানোর কথা না। তাই এদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।"
ঈদের সময়ে না শুধু, প্রায় সারাবছরই প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশের কোনো না কোনো স্থান থেকে সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়।
গণমাধ্যমের সংবাদ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী , গত বছর ঈদুল আযহায় সারাদেশে ৩৮৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং সেসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৩৯০ জন। আর এসব দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যা এক হাজার ১৮২।
চলতি বছর ঈদুল ফিতরেও সড়ক, রেল ও নৌপথে ১৫ দিনে মোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত হয়েছেন।
এক নজরে সড়ক পরিবহন আইন
বাংলাদেশে চালক ও পথচারী উভয়ের জন্য কঠোর বিধান যুক্ত করে ২০১৯ সাল থেকে কার্যকর করা হয়েছে বহুল আলোচিত 'সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮'।
২০১৮ সালে ঢাকার দুই কলেজ শিক্ষার্থী সড়কে বাস চাপায় প্রাণ হারানোর পর শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে ১৯শে সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন আইন পাস করে সরকার।
তার ১৪ মাস পর ২০১৯ সালের পহেলা নভেম্বর থেকে সেটি কার্যকর হয়েছে।
সড়ক পরিবহন আইন বেশ কিছু বিধান রাখা হয়েছে। সেগুলো হলো:
- সড়কে গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হত্যা করলে ৩০২ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
- সড়কে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে বা প্রতিযোগিতা করার ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আদালত অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেয়ার নির্দেশ দিতে পারবে।
- মোটরযান দুর্ঘটনায় কোনও ব্যক্তি গুরুতর আহত বা প্রাণহানি হলে চালকের শাস্তি দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল ও সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা।
- ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান বা গণপরিবহন চালানোর দায়ে ছয় মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া হয়েছে।
- নিবন্ধন ছাড়া মোটরযান চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
- ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার এবং প্রদর্শন করলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে।
- ফিটনেসবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ মোটরযান চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া হয়েছে।
- ট্রাফিক সংকেত মেনে না চললে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দণ্ডিত করা হবে।
- সঠিক স্থানে মোটর যান পার্কিং না করলে বা নির্ধারিত স্থানে যাত্রী বা পণ্য ওঠানামা না করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।
- গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বললে এক মাসের কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
- একজন চালক প্রতিবার আইন অমান্য করলে তার পয়েন্ট বিয়োগ হবে এবং এক পর্যায়ে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে।
- গণপরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অতিরিক্ত ভাড়া, দাবি বা আদায় করলে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দণ্ডিত করা হবে।
- ড্রাইভিং লাইসেন্সে পেতে হলে চালককে অষ্টম শ্রেণি পাস এবং চালকের সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে হবে। আগে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনও প্রয়োজন ছিল না।
- গাড়ি চালানোর জন্য বয়স অন্তত ১৮ বছর হতে হবে। এই বিধান আগেও ছিল।
এছাড়া, সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনও যাত্রী বসলে এক মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।








